যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক-এর আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কসহ পুরো কমিউনিটিতে ব্যাপক উৎসাহ ও তৎপরতা শুরু হয়েছে। সংগঠনের সদস্যপদ সংগ্রহ কার্যক্রমের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ জুন। একই সঙ্গে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে আগামী ১৮ অক্টোবর। যদিও নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেনি, তবে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সদস্যপদ সংগ্রহ ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন। সংগঠনের সূত্র অনুযায়ী, ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার আজীবন সদস্য এবং ৮০০ জন নতুন ও নবায়ন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। তবে এখনো অনেকেই ফর্ম জমা দেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শেষ সময়ে সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং মোট ভোটার সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
সদস্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে আজীবন সদস্যের জন্য ৫০০ ডলার এবং সাধারণ সদস্যের জন্য ২০ ডলার। তবে একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে আজীবন সদস্য হলে একজনের ৫০০ ডলার ফি দিলেই দুজন সদস্য হতে পারবেন, আলাদা ফি দিতে হবে না।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দুটি প্রধান প্যানেল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একদিকে আছেন বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী নেতৃত্বাধীন প্যানেল, অন্যদিকে রয়েছেন আজমল হোসেন কুনু ও ফিরোজ আলম নেতৃত্বাধীন প্যানেল। দুই পক্ষই এখন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
প্রচারণা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চলছে জোরেশোরে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন, নতুন সদস্য সংগ্রহ করছেন এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। কমিউনিটিতে এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনা, সমীকরণ ও প্যানেল কৌশলই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে আবু নাসেরের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ অক্টোবর নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ধরা হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত নয়।
সূত্র জানায়, বর্তমান কমিটির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও নতুন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করবে ১ জানুয়ারি। সে অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় উভয় প্যানেলই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও মোহাম্মদ আলী প্যানেল দাবি করছে, তারা দায়িত্বকালীন সময়ে কমিউনিটির উন্নয়নমূলক বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি সেন্টার উন্নয়ন, বিভিন্ন এলাকায় স্কুল স্থাপন এবং মাসিক জব সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা। তারা আরও বলছেন, স্টেট থেকে প্রাপ্ত ৬৫ হাজার ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
অন্যদিকে কুনু-ফিরোজ প্যানেল নতুন নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার কথা বলছে এবং ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্রিয় রয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের মতে, এই নির্বাচনে সদস্যপদই মূল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। কারণ বৈধ সদস্যরাই ভোট দিতে পারবেন। তাই ৩০ জুনের মধ্যে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম নির্বাচনী ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এদিকে সংগঠনটি এবার প্রথমবারের মতো অনলাইন সদস্যপদ গ্রহণ ও নবায়নের সুযোগ চালু করেছে। ফলে প্রবাসীরা ঘরে বসেই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফরম পূরণ ও ফি পরিশোধ করতে পারছেন, যা প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে।
নির্বাচন ঘিরে উৎসাহ বাড়লেও এখনো নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ভোট গ্রহণ হতে পারে। কমিউনিটির প্রত্যাশা, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে।
ভোটের আগে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সোসাইটির লাইফ মেম্বার ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির খান পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টে নির্বাচন আয়োজনের আগে ৯.৪৫ লাখ ডলারের একটি অভ্যন্তরীণ (ইন্টারনাল) অডিট করার দাবি জানান। তার এই দাবি ঘিরে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নাসির খান পল দাবি করেন, একসময় সোসাইটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার ডলার থাকলেও বর্তমানে সেই হিসাব মাইনাস ব্যালেন্সে চলে গেছে। অথচ এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের মতো দৃশ্যমান কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, নির্বাচনের আগে পূর্ণাঙ্গ অডিট ছাড়া নির্বাচন আয়োজন করলে সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতা তৈরি হবে। তিনি লাইফ মেম্বারদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দেওয়ার আহ্বানও জানান।
এদিকে নাসির খান পলের এই দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া প্রথমে না এলেও পরে বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন।
সোসাইটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলাম তখনো সিপিএ দ্বারা হিসাব দেওয়া হয়েছে। এখনো সেটাই চলছে। আমাদের সংবিধানে অডিট রিপোর্টের বাধ্যবাধকতা নেই, তাই আলাদা অডিট করা হয় না। তবে প্রতিবছর সিপিএ দিয়ে হিসাব করা হয় এবং সাধারণ সভায় তা উপস্থাপন করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান কোষাধ্যক্ষ কুইকবুক সফটওয়্যার ব্যবহার করে হিসাব পরিচালনা করছেন, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলারে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি মাসিক ভিত্তিতে সিপিএকে ৫৫০ ডলার করে দেওয়া হয় হিসাব ব্যবস্থাপনার জন্য। তার দাবি, যে কেউ চাইলে কোষাধ্যক্ষের কাছে গিয়ে আর্থিক হিসাব দেখতে পারেন।
নাসির খান পলের ৯.৪৫ লাখ ডলারের দাবির বিষয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সোসাইটির ইতিহাসে আমার জানামতে কখনোই ৯.৪৫ লাখ ডলারের হিসাব ছিল না। তিনি কোথা থেকে এই তথ্য পেয়েছেন, তা জানা নেই।’ তিনি পলকে অনুরোধ করেন, যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে সেটি লিখিতভাবে বা সাধারণ সভায় উপস্থাপন করতে, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মোহাম্মদ আলী আরও দাবি করেন, বর্তমান সময়ে সোসাইটির বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ ডলার রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকে জমা, কবর কেনার অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য তহবিল অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, ‘বাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ২ লাখ ডলারের ডাউন পেমেন্ট ফেরত এসেছে এবং ব্যাংকে জমা আছে। কোনো অর্থ নয়ছয় হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘এর আগের কমিটি নোয়াখালী সোসাইটির কাছ থেকে নির্বাচিত কমিটির অনুমোদন ছাড়াই আমাদেরকে না জানিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের কবর কিনেছিল, সেই অর্থ আমরা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি।’ বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম বলেন, ‘আমাদের সময়ে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়নি। প্রতিবছর সিপিএ দিয়ে হিসাব করা হয় এবং সাধারণ সভায় তা উপস্থাপন করা হয়। ৯.৪৫ লাখ ডলারের কোনো হিসাব সোসাইটির ছিল না। এটি কোথা থেকে এসেছে, তা আমার জানা নেই।’ তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে সোসাইটির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তার মতে, সংগঠনের অর্থ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে হবে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, বর্তমান কমিটির সময়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে- এমন তথ্য তার জানা নেই। তিনি বলেন, ‘যেকোনো অভিযোগের জায়গা হলো সাধারণ সভা। সেখানে এসে প্রশ্ন করা উচিত। কোষাধ্যক্ষই মূলত আর্থিক হিসাবের দায়িত্বে থাকেন।’ তিনি আরও জানান, তাদের দায়িত্বকালে ভবন কেনার বিষয়ে একটি অনুমোদন ছাড়া আর বড় কোনো আর্থিক বিষয় অনুমোদনের জন্য আসেনি। তিনি বর্তমান নেতৃত্বকে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে সাবেক কোষাধ্যক্ষ নওশেদ হোসেন দাবি করেন, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বর্তমান কমিটিকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ডলারের বেশি অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, কবর কেনার জন্য প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছিল এবং মোট ৪০০টি কবর কেনা হয়েছিল। তার দাবি, বর্তমানে এসব কবরের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তবে মোহাম্মদ আলী এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, তারা মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার বুঝে পেয়েছেন। বাকি অর্থ বা লেনদেন সম্পর্কে তাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, নোয়াখালী সোসাইটিকে দেওয়া ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিষয়টি তখনকার সময়ে নির্বাচিত নতুন কমিটিকে জানানো হয়নি।
এদিকে নাসির খান পল আবার নতুন একটি পোস্টে দাবি করেন, অভ্যন্তরীণ অডিটের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এক অনুষ্ঠানে সোসাইটির সভাপতি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইন্টারনাল অডিটের বিষয়ে সম্মতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘সুখবর! সভাপতি রাজি হয়েছেন ইন্টারনাল অডিট করতে, সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।’
তবে মোহাম্মদ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধানে অডিটের বাধ্যবাধকতা না থাকায় তারা সিপিএ-নির্ভর হিসাব-ব্যবস্থায় কাজ করছেন। ভবিষ্যতে চাইলে সংবিধান সংশোধন করে অডিট যুক্ত করা যেতে পারে।
সব পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট, নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ সোসাইটির আর্থিক স্বচ্ছতা ও হিসাব-নিকাশ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সদস্যদের একাংশ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিটের দাবি তুললেও নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নিয়মিত সিপিএ-নির্ভর হিসাব-ব্যবস্থাকেই যথেষ্ট বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে অডিট ইস্যু ঘিরে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা ও কৌতূহল আরও বাড়ছে।
সোসাইটির ৯.৪৫ লাখ ডলারের অডিট দাবি
বাংলাদেশ সোসাইটির লাইফ মেম্বার ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির আলী খান পল বলেছেন, সংগঠনের আর্থিক হিসাবে গুরুতর অসচ্ছতা ও গরমিল রয়েছে। তার দাবি, ৯.৪৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থের খরচ ও লেনদেন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অডিট হওয়া জরুরি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই ডলার গেল কোথায়, কীভাবে খরচ হলো?’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কমিটি দাবি করছে সোসাইটির ফান্ডে অর্থ আছে, কিন্তু তার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী বর্তমান কমিটি প্রায় ৫৬ হাজার ডলার মাইনাসে রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমি একজন লাইফ মেম্বার, আমার অধিকার আছে সব জানার। আমি কোনো অর্থ নয়ছয় করিনি, আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থও নেই। কিন্তু মোহাম্মদ আলী যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, তখন থেকে এখন পর্যন্ত ৯.৪৫ লাখ ডলারের বেশি লেনদেনের হিসাব আমরা জানতে চাই।’
নাসির আলী খান পল অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন পর্যায়ের আর্থিক হিসাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নওশেদ হোসেন যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, তখন কত অর্থ ছিল এবং বর্তমান কমিটির কাছে কত অর্থ হস্তান্তর হয়েছেÑএটি পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার। একইভাবে বর্তমান কমিটি ব্যাংকে কত ডলার পেয়েছে এবং এখন কত রয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময় কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মোহাম্মদ আলী দায়িত্বে থাকার সময় এবং পরে রব-রুহুল পরিষদের কাছে অর্থ হস্তান্তরের পুরো হিসাব এখনো স্বচ্ছ নয়। তার প্রশ্ন, ‘তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় কত টাকা হাতে নিয়েছিলেন, আর পরে কত টাকা হস্তান্তর করেছেনÑসব হিসাব কোথায়?’ তিনি আরও বলেন, সোসাইটির ১৯ সদস্যের বর্তমান কমিটির সবাই আর্থিক হিসাব সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবগত নন। তার ভাষায়, ‘১৯ জনের সবাই জানেন না কোথা থেকে কত টাকা আসে, কোথায় কত খরচ হয়। অনেক খরচের বিষয়ে তারা জানেনই না।’
নাসির আলী খান পল অভিযোগ করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে সদস্যদের কাছ থেকে ফি ও চাঁদা সংগ্রহ করা হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থের সঠিক হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে, ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রত্যেক অতিথির কাছ থেকে ৫০ ডলার করে চাঁদা নেওয়া হয় এবং অতীতের নেতাদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, ‘১০ জন সিকিউরিটি দিয়ে অনুষ্ঠান করা হলো, আবার ফান্ডেও টাকা তোলা হলো- সব টাকার হিসাব দিতে হবে।’
সংগঠনের নিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো খাতে ১০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় হলে ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে কয়টি প্রস্তাব ট্রাস্টি বোর্ডে গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, বড় বড় অনুষ্ঠান, যেমন ইফতার পার্টি, অভিষেক ও ৫০ বছর পূর্তির ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি এখনই ৯.৪৫ লাখ ডলারের পূর্ণ ব্রেকডাউন দিচ্ছেন না, তবে এটি একটি সঠিক হিসাব। তার মতে, মোহাম্মদ আলী কোষাধ্যক্ষ থাকার সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যা অডিট করলেই প্রমাণ মিলবে। তিনি আরও বলেন, ‘চেক বই অফিসে থাকার কথা, কিন্তু মোহাম্মদ আলী সেটি পকেটে রাখতেনÑএটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।’ অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে তিনি বিগত তিনটি কমিটির আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট দাবি করেন। তার ভাষায়, ‘প্রতি সেন্টের হিসাব দিতে হবে। তৃতীয় পক্ষের সিপিএ দিয়ে অডিট করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, যদি হিসাব সঠিক হয়, তবে অডিটে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত তিন কমিটির হিসাব সামনে আনলেই সব অনিয়ম বের হয়ে আসবে।
সোসাইটির ভবন কেনা বা কবরস্থানের জন্য আড়াই লাখ ডলার করে ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রেও যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না তা পরিষ্কার নয়। তার মতে, অন্তত পাঁচ লাখ ডলারের অনিয়ম এসব খাতে হয়েছে। সবশেষে তিনি বলেন, তিনি সোসাইটির স্বার্থেই এসব প্রশ্ন তুলছেন। তার ভাষায়, ‘আমি ফেসবুকে বলেছি, এখন সভাপতি ও সহসভাপতি চাইলে অডিট করাতে পারেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সদস্যপদ সংগ্রহ ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন। সংগঠনের সূত্র অনুযায়ী, ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার আজীবন সদস্য এবং ৮০০ জন নতুন ও নবায়ন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। তবে এখনো অনেকেই ফর্ম জমা দেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শেষ সময়ে সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং মোট ভোটার সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
সদস্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে আজীবন সদস্যের জন্য ৫০০ ডলার এবং সাধারণ সদস্যের জন্য ২০ ডলার। তবে একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে আজীবন সদস্য হলে একজনের ৫০০ ডলার ফি দিলেই দুজন সদস্য হতে পারবেন, আলাদা ফি দিতে হবে না।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দুটি প্রধান প্যানেল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একদিকে আছেন বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী নেতৃত্বাধীন প্যানেল, অন্যদিকে রয়েছেন আজমল হোসেন কুনু ও ফিরোজ আলম নেতৃত্বাধীন প্যানেল। দুই পক্ষই এখন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
প্রচারণা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চলছে জোরেশোরে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন, নতুন সদস্য সংগ্রহ করছেন এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। কমিউনিটিতে এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনা, সমীকরণ ও প্যানেল কৌশলই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে আবু নাসেরের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ অক্টোবর নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ধরা হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত নয়।
সূত্র জানায়, বর্তমান কমিটির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও নতুন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করবে ১ জানুয়ারি। সে অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় উভয় প্যানেলই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও মোহাম্মদ আলী প্যানেল দাবি করছে, তারা দায়িত্বকালীন সময়ে কমিউনিটির উন্নয়নমূলক বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি সেন্টার উন্নয়ন, বিভিন্ন এলাকায় স্কুল স্থাপন এবং মাসিক জব সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা। তারা আরও বলছেন, স্টেট থেকে প্রাপ্ত ৬৫ হাজার ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
অন্যদিকে কুনু-ফিরোজ প্যানেল নতুন নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার কথা বলছে এবং ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্রিয় রয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের মতে, এই নির্বাচনে সদস্যপদই মূল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। কারণ বৈধ সদস্যরাই ভোট দিতে পারবেন। তাই ৩০ জুনের মধ্যে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম নির্বাচনী ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এদিকে সংগঠনটি এবার প্রথমবারের মতো অনলাইন সদস্যপদ গ্রহণ ও নবায়নের সুযোগ চালু করেছে। ফলে প্রবাসীরা ঘরে বসেই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফরম পূরণ ও ফি পরিশোধ করতে পারছেন, যা প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে।
নির্বাচন ঘিরে উৎসাহ বাড়লেও এখনো নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ভোট গ্রহণ হতে পারে। কমিউনিটির প্রত্যাশা, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে।
ভোটের আগে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সোসাইটির লাইফ মেম্বার ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির খান পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টে নির্বাচন আয়োজনের আগে ৯.৪৫ লাখ ডলারের একটি অভ্যন্তরীণ (ইন্টারনাল) অডিট করার দাবি জানান। তার এই দাবি ঘিরে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নাসির খান পল দাবি করেন, একসময় সোসাইটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার ডলার থাকলেও বর্তমানে সেই হিসাব মাইনাস ব্যালেন্সে চলে গেছে। অথচ এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের মতো দৃশ্যমান কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, নির্বাচনের আগে পূর্ণাঙ্গ অডিট ছাড়া নির্বাচন আয়োজন করলে সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতা তৈরি হবে। তিনি লাইফ মেম্বারদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দেওয়ার আহ্বানও জানান।
এদিকে নাসির খান পলের এই দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া প্রথমে না এলেও পরে বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন।
সোসাইটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলাম তখনো সিপিএ দ্বারা হিসাব দেওয়া হয়েছে। এখনো সেটাই চলছে। আমাদের সংবিধানে অডিট রিপোর্টের বাধ্যবাধকতা নেই, তাই আলাদা অডিট করা হয় না। তবে প্রতিবছর সিপিএ দিয়ে হিসাব করা হয় এবং সাধারণ সভায় তা উপস্থাপন করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান কোষাধ্যক্ষ কুইকবুক সফটওয়্যার ব্যবহার করে হিসাব পরিচালনা করছেন, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলারে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি মাসিক ভিত্তিতে সিপিএকে ৫৫০ ডলার করে দেওয়া হয় হিসাব ব্যবস্থাপনার জন্য। তার দাবি, যে কেউ চাইলে কোষাধ্যক্ষের কাছে গিয়ে আর্থিক হিসাব দেখতে পারেন।
নাসির খান পলের ৯.৪৫ লাখ ডলারের দাবির বিষয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সোসাইটির ইতিহাসে আমার জানামতে কখনোই ৯.৪৫ লাখ ডলারের হিসাব ছিল না। তিনি কোথা থেকে এই তথ্য পেয়েছেন, তা জানা নেই।’ তিনি পলকে অনুরোধ করেন, যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে সেটি লিখিতভাবে বা সাধারণ সভায় উপস্থাপন করতে, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মোহাম্মদ আলী আরও দাবি করেন, বর্তমান সময়ে সোসাইটির বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ ডলার রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকে জমা, কবর কেনার অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য তহবিল অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, ‘বাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ২ লাখ ডলারের ডাউন পেমেন্ট ফেরত এসেছে এবং ব্যাংকে জমা আছে। কোনো অর্থ নয়ছয় হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘এর আগের কমিটি নোয়াখালী সোসাইটির কাছ থেকে নির্বাচিত কমিটির অনুমোদন ছাড়াই আমাদেরকে না জানিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের কবর কিনেছিল, সেই অর্থ আমরা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি।’ বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম বলেন, ‘আমাদের সময়ে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়নি। প্রতিবছর সিপিএ দিয়ে হিসাব করা হয় এবং সাধারণ সভায় তা উপস্থাপন করা হয়। ৯.৪৫ লাখ ডলারের কোনো হিসাব সোসাইটির ছিল না। এটি কোথা থেকে এসেছে, তা আমার জানা নেই।’ তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে সোসাইটির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তার মতে, সংগঠনের অর্থ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে হবে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, বর্তমান কমিটির সময়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে- এমন তথ্য তার জানা নেই। তিনি বলেন, ‘যেকোনো অভিযোগের জায়গা হলো সাধারণ সভা। সেখানে এসে প্রশ্ন করা উচিত। কোষাধ্যক্ষই মূলত আর্থিক হিসাবের দায়িত্বে থাকেন।’ তিনি আরও জানান, তাদের দায়িত্বকালে ভবন কেনার বিষয়ে একটি অনুমোদন ছাড়া আর বড় কোনো আর্থিক বিষয় অনুমোদনের জন্য আসেনি। তিনি বর্তমান নেতৃত্বকে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে সাবেক কোষাধ্যক্ষ নওশেদ হোসেন দাবি করেন, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বর্তমান কমিটিকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ডলারের বেশি অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, কবর কেনার জন্য প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছিল এবং মোট ৪০০টি কবর কেনা হয়েছিল। তার দাবি, বর্তমানে এসব কবরের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তবে মোহাম্মদ আলী এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, তারা মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার বুঝে পেয়েছেন। বাকি অর্থ বা লেনদেন সম্পর্কে তাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, নোয়াখালী সোসাইটিকে দেওয়া ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিষয়টি তখনকার সময়ে নির্বাচিত নতুন কমিটিকে জানানো হয়নি।
এদিকে নাসির খান পল আবার নতুন একটি পোস্টে দাবি করেন, অভ্যন্তরীণ অডিটের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এক অনুষ্ঠানে সোসাইটির সভাপতি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইন্টারনাল অডিটের বিষয়ে সম্মতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘সুখবর! সভাপতি রাজি হয়েছেন ইন্টারনাল অডিট করতে, সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।’
তবে মোহাম্মদ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধানে অডিটের বাধ্যবাধকতা না থাকায় তারা সিপিএ-নির্ভর হিসাব-ব্যবস্থায় কাজ করছেন। ভবিষ্যতে চাইলে সংবিধান সংশোধন করে অডিট যুক্ত করা যেতে পারে।
সব পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট, নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ সোসাইটির আর্থিক স্বচ্ছতা ও হিসাব-নিকাশ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সদস্যদের একাংশ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিটের দাবি তুললেও নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নিয়মিত সিপিএ-নির্ভর হিসাব-ব্যবস্থাকেই যথেষ্ট বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে অডিট ইস্যু ঘিরে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা ও কৌতূহল আরও বাড়ছে।
সোসাইটির ৯.৪৫ লাখ ডলারের অডিট দাবি
বাংলাদেশ সোসাইটির লাইফ মেম্বার ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির আলী খান পল বলেছেন, সংগঠনের আর্থিক হিসাবে গুরুতর অসচ্ছতা ও গরমিল রয়েছে। তার দাবি, ৯.৪৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থের খরচ ও লেনদেন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অডিট হওয়া জরুরি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই ডলার গেল কোথায়, কীভাবে খরচ হলো?’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কমিটি দাবি করছে সোসাইটির ফান্ডে অর্থ আছে, কিন্তু তার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী বর্তমান কমিটি প্রায় ৫৬ হাজার ডলার মাইনাসে রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমি একজন লাইফ মেম্বার, আমার অধিকার আছে সব জানার। আমি কোনো অর্থ নয়ছয় করিনি, আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থও নেই। কিন্তু মোহাম্মদ আলী যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, তখন থেকে এখন পর্যন্ত ৯.৪৫ লাখ ডলারের বেশি লেনদেনের হিসাব আমরা জানতে চাই।’
নাসির আলী খান পল অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন পর্যায়ের আর্থিক হিসাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নওশেদ হোসেন যখন কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, তখন কত অর্থ ছিল এবং বর্তমান কমিটির কাছে কত অর্থ হস্তান্তর হয়েছেÑএটি পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার। একইভাবে বর্তমান কমিটি ব্যাংকে কত ডলার পেয়েছে এবং এখন কত রয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময় কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মোহাম্মদ আলী দায়িত্বে থাকার সময় এবং পরে রব-রুহুল পরিষদের কাছে অর্থ হস্তান্তরের পুরো হিসাব এখনো স্বচ্ছ নয়। তার প্রশ্ন, ‘তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় কত টাকা হাতে নিয়েছিলেন, আর পরে কত টাকা হস্তান্তর করেছেনÑসব হিসাব কোথায়?’ তিনি আরও বলেন, সোসাইটির ১৯ সদস্যের বর্তমান কমিটির সবাই আর্থিক হিসাব সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবগত নন। তার ভাষায়, ‘১৯ জনের সবাই জানেন না কোথা থেকে কত টাকা আসে, কোথায় কত খরচ হয়। অনেক খরচের বিষয়ে তারা জানেনই না।’
নাসির আলী খান পল অভিযোগ করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে সদস্যদের কাছ থেকে ফি ও চাঁদা সংগ্রহ করা হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থের সঠিক হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে, ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রত্যেক অতিথির কাছ থেকে ৫০ ডলার করে চাঁদা নেওয়া হয় এবং অতীতের নেতাদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, ‘১০ জন সিকিউরিটি দিয়ে অনুষ্ঠান করা হলো, আবার ফান্ডেও টাকা তোলা হলো- সব টাকার হিসাব দিতে হবে।’
সংগঠনের নিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো খাতে ১০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় হলে ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে কয়টি প্রস্তাব ট্রাস্টি বোর্ডে গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, বড় বড় অনুষ্ঠান, যেমন ইফতার পার্টি, অভিষেক ও ৫০ বছর পূর্তির ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি এখনই ৯.৪৫ লাখ ডলারের পূর্ণ ব্রেকডাউন দিচ্ছেন না, তবে এটি একটি সঠিক হিসাব। তার মতে, মোহাম্মদ আলী কোষাধ্যক্ষ থাকার সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যা অডিট করলেই প্রমাণ মিলবে। তিনি আরও বলেন, ‘চেক বই অফিসে থাকার কথা, কিন্তু মোহাম্মদ আলী সেটি পকেটে রাখতেনÑএটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।’ অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে তিনি বিগত তিনটি কমিটির আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট দাবি করেন। তার ভাষায়, ‘প্রতি সেন্টের হিসাব দিতে হবে। তৃতীয় পক্ষের সিপিএ দিয়ে অডিট করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, যদি হিসাব সঠিক হয়, তবে অডিটে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত তিন কমিটির হিসাব সামনে আনলেই সব অনিয়ম বের হয়ে আসবে।
সোসাইটির ভবন কেনা বা কবরস্থানের জন্য আড়াই লাখ ডলার করে ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রেও যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না তা পরিষ্কার নয়। তার মতে, অন্তত পাঁচ লাখ ডলারের অনিয়ম এসব খাতে হয়েছে। সবশেষে তিনি বলেন, তিনি সোসাইটির স্বার্থেই এসব প্রশ্ন তুলছেন। তার ভাষায়, ‘আমি ফেসবুকে বলেছি, এখন সভাপতি ও সহসভাপতি চাইলে অডিট করাতে পারেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’