তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৩ , অনলাইন ভার্সন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আলোচিত ভিডিও ধারণ ও প্রচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা বা না থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসা বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরীর মরদেহ মিলেছে রাজাবাড়ি ঘাট এলাকার তুরাগ নদে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর উত্তরার কাছাকাছি তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আলোচনা চলছে, এটি পরিকল্পিত হত্যা কি না।

তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তার বাবা একেএম এনায়েতুল করিম। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘মৃত্যুর কারণ জানতে প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলের অপেক্ষা করতে হবে।’ তদন্তের আগে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।’

মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাটি হত্যা, দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু- তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তের ফলের অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা।

বৃহস্পতিবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর বিকাল ৪টার দিকে তাহসিফের লাশ উত্তরার বাসার নিচে নেওয়া হয়। তখন স্বজনদের অনেককেই কাঁদতে দেখা যায়। স্থানীয় মসজিদে জানাজার পর সন্ধ্যায় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।

যা বলছেন স্বজনরা

নিখোঁজ হওয়ার আগে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের ডাকে ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ সাউরী। সেটিরও এখনো হদিস মেলেনি। তার এক স্বজন জানান, পুলিশ মোটরসাইকেলটির ছবি ও অন্যান্য তথ্য পরিবারের কাছে চেয়েছিল। সেগুলো দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার পর তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম উত্তরায় নিজের বাসায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, গত মঙ্গলবার সারা দিন মায়ের সঙ্গে কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন তাহসিফ। বাবার জন্যও কিছু কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামের এক তরুণ বাসার নিচে এসে ডাকেন তাকে। তার সঙ্গে কথা বলে ফিরবেন জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এনায়েতুল করিম বলেন, ‘ওর মাকে বলে যে, দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি।’ এটা বলে সে নিচে যায়, আর ফেরেনি। এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ফেরে নাই।

পরিবারের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে বারবার মা ফোন করায় তার মোবাইল ফোনে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরদিন বুধবার পরিবারের সদস্যরা থানায় যোগাযোগ করেন। এনায়েতুল করিমের দাবি, দুপুরে তুরাগ থানায় গেলে তাকে জানানো হয়েছিল, তার ছেলের বিষয়ে কোনো খারাপ খবর নেই। তবে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানানো হয়।

যা বলছেন দ্বীপ

গণমাধ্যমে দ্বীপের দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে তারা তাহসিফের বাইক মেরামতের জন্য গ্যারেজে যান। সেখান থেকে উত্তরার রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুকরুক্কু’ রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। খাওয়ার সময় তাহসিফের ফোনে একটি কল এসেছিল, যেটিকে ‘স্বাভাবিক আলাপ’ বলেই মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন দ্বীপ। পরে তাহসিফকে তার বাসার এলাকার কাছাকাছি রেখে দ্বীপ ১৬-১৭ কিলোমিটার দূরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায় নিজের বাসায় ফিরে যান।

সুরতহালে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন নেই

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোস্তাফিজুর রহমানের তৈরি সুরতহাল প্রতিবেদনে তাহসিফের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার ও পেট ফোলা থাকার কথাও রয়েছে। মরদেহের অন্যান্য দৃশ্যমান অংশের অবস্থাও প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে।

গত বুধবার বিকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ সময় তার পরনে ছিল সাদা ট্রাউজার এবং কালো জামা। তার পকেটে একটি আইফোন ও হাতে ঘড়ি পাওয়া যায়। ফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে রাজাবাড়ি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের অপর প্রান্তেই টঙ্গী নদীবন্দরের অফিস। নৌ পুলিশের বেশ কিছু বোট ঘাটে ভেড়ানো। স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘাটের কর্মী মোকছেদ আলী বলেন, বুধবার বেলা ১১টার দিকে তারা নদীতে মরদেহটি দেখতে পান। পরে সেটি ভেসে ঘাটের কাছাকাছি আসে। তার দাবি, মরদেহে দৃশ্যমান কোনো দাগ ছিল না। স্থানীয় মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল গণি মরদেহ উদ্ধারের সময় সেখানে লোকজনের উপস্থিতির কথা জানান।

চাকরি হারানোর পর জীবনের শঙ্কা

তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, তার ছেলে বিমানবাহিনীর ৭৭তম লং কোর্সে কমিশন পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের বিস্তারিত তাদের জানা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। চাকরি হারানোর পর তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও নেত্র নিউজে কাজ করেন। সর্বশেষ তিনি ভারগো টোব্যাকোতে চাকরি করছিলেন।

এনায়েতুল করিম বলেন, বরখাস্ত হওয়ার পর একাধিকবার ছেলে নিজের জীবনের শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তবে কে বা কারা তাকে হুমকি দিত, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি বলে দাবি করেন বাবা। তিনি বলেন, ‘সরকারকে বলব, তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করুক। হত্যাকারীরা যেন ছাড় না পায়।’

ভিডিও নিয়ে আলোচনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে ওঠার বহুল প্রচারিত ভিডিওটি তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। এ নিয়ে গত জুলাইয়ে একটি পডকাস্টে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভিডিও ধারণের কারণে তার বিমানবাহিনীর চাকরি গিয়েছিল কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘হতে পারে’। ওই পডকাস্টে ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলা হয়েছিল। তাহসিফ তখন প্রতিবেদনটিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

গত বছরের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রতিবাদলিপিতে জানায়, তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তাকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অবসরে পাঠানো হয়েছে; এর সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের সম্পর্ক নেই।

সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জামায়াতের

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক এবং এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’ 

বিবৃতিতে তিনি এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা দ্রুত উদঘাটনের এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ঠিকানা/এনআই
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]