তাসিনকে শেষ বিদায়

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১২ , অনলাইন ভার্সন
আবীর আলমগীর: কিছু কিছু বিদায় মেনে নেওয়া যায় না। কিছু কিছু মৃত্যু হৃদয়ে এমন গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা সময়ের ব্যবধানেও পুরোপুরি মুছে যায় না। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাসিন ফেরদৌসের আকস্মিক চলে যাওয়া ঠিক তেমনই এক বেদনাবিধুর ঘটনা। যে মেয়েটি তাঁর প্রাণবন্ত হাসি, অসাধারণ প্রতিভা আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে চারপাশের মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন, সেই তাসিনকে এবার চিরবিদায় জানালেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির শত শত মানুষ। 
ভালোবাসা, অশ্রু আর গভীর শোকের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো নিউইয়র্কের পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠক এ‍্যানি ফেরদৌস এর একমাত্র কন‍্যা নৃত‍্যশিল্পী তাসিন ফেরদৌসের শেষকৃত্য। গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার নিউইয়র্কের ম্যাসপেথে অবস্থিত মাউন্ট অলিভেট সেমেটারিতে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো একটি সম্ভাবনাময় জীবনের পার্থিব অধ্যায়, কিন্তু রেখে গেলেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, স্মৃতি আর এক অপূরণীয় শূন্যতা।
এর আগে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের ফরেস্ট হিলসের ফরেস্ট পার্ক ফিউনারেল হোমে অনুষ্ঠিত হয় তাসিনের জানাজা ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন। সেখানে মানুষের ঢল যেন নীরবেই বলে দিচ্ছিল, কত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিলেন এই তরুণী। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না পুরো আয়োজনে। 
নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পী, সংগঠক, বিভিন্ন সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বন্ধু, স্বজনসহ শত শত শুভানুধ্যায়ীর উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে ভারী, আবেগঘন আর অশ্রুসিক্ত। কেউ এসেছিলেন শেষবারের মতো তাসিনকে দেখতে, কেউ এসেছিলেন তাঁর শোকাহত বাবা-মা, নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় মুখ এ্যানি ফেরদৌস ও জাফর ভাইয়ের পাশে দাঁড়াতে। কেউ নীরবে চোখের জল মুছছিলেন, কেউবা স্মৃতিচারণ করছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত আর অসম্ভব প্রতিভাবান মেয়েটির কথা। এত মানুষের উপস্থিতি, এত ভালোবাসা, অথচ যার জন্য এই আয়োজন, সেই তাসিনই নেই। এই নির্মম বাস্তবতা যেন উপস্থিত সবাইকে বারবার আবেগাপ্লুত করে তুলছিল। 
শুক্রবার সকালে ফরেস্ট পার্ক ফিউনারেল হোমে শেষকৃত্যের অবশিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর তাসিনকে নিয়ে যাওয়া হয় মাউন্ট অলিভেট সেমেটারিতে। সকাল ১১টায় সেখানে স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। প্রিয়জনকে চিরদিনের জন্য মাটির নিচে রেখে আসার সেই বেদনাবিধুর মুহূর্তটি ছিল স্বজনদের জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
তাসিনের বেড়ে ওঠা নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। ছোটবেলা থেকেই নাচ, শিল্পচর্চা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। তাঁর সহজ-সরল ব্যবহার, প্রাণবন্ত হাসি আর আন্তরিকতা তাঁকে করে তুলেছিল সবার প্রিয়।জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টাতেই থেমে গেল তাসিনের পথচলা। মাত্র কিছুদিন আগেই স্বামীকে নিয়ে কুইন্সে নতুন কেনা বাড়িতে উঠেছিলেন তিনি। নতুন ঘর, নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই নেমে এলো মৃত্যুর নির্মম ছায়া। যে ঘরে নতুন জীবনের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই স্মৃতি আর শূন্যতা।
একজন বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কতটা অসহনীয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এ্যানি ফেরদৌস ও জাফর ফেরদৌস এর জীবনে এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। তাঁদের এই গভীর শোকের মুহূর্তে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষের উপস্থিতি ও ভালোবাসা প্রমাণ করেছে, তাসিন শুধু একটি পরিবারের সন্তান ছিলেন না, তিনি ছিলেন বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবারেরও অত্যন্ত আপনজন। জীবন সত্যিই বড় অনিশ্চিত। আজ যে মানুষটি হাসছেন, স্বপ্ন দেখছেন, আগামী দিনের পরিকল্পনা করছেন, কালই হয়তো তিনি শুধুই স্মৃতি। তাসিনের এই অকালবিদায় আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিল জীবনের সেই চিরন্তন অথচ নির্মম সত্যকে। শেষকৃত্য শেষ হয়েছে, সবাই ধীরে ধীরে ফিরে গেছেন নিজ নিজ জীবনে। কিন্তু তাসিনের জন্য যে ভালোবাসা, যে অশ্রু আর যে গভীর বেদনা মানুষের হৃদয়ে জমে রইল, তার কোনো সমাপ্তি নেই। কিছু মানুষ চলে গিয়েও হারিয়ে যান না। তাঁদের হাসি, তাঁদের সৃষ্টিশীলতা, তাঁদের ভালোবাসা বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতির গভীরে। তাসিনও ছিলো তেমনই একজন।
এখানে উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তাসিন। এর আগে গত ১৬ অক্টোবর তাসিনকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক সংক্রমণের আশঙ্কা করেন। হাসপাতালে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসিন দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন। চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
তাসিনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কা করা হলেও কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটল কেন, এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত বা অটোপসির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে পরিবার আশা করছে।
 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]