ড. ইউনূসের হেনস্থা ও ইতিহাসের শিক্ষা

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৪ , অনলাইন ভার্সন
১৩ অক্টোবর বাংলাদেশের তদানীন্তন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. ইউনূস দোহা থেকে নিউইয়র্কে এলে জেএফকে বিমানবন্দরে কয়েক ব্যক্তি তার মুখোমুখি হয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাকে উদ্দেশ করে অসভ্য ও অশিষ্ট (Vulgar and Derogatory) উক্তি করে তাকে হেনস্থার ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য ঘটনা সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন মহলে বিশেষভাবে চর্চিত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা ঘটনাকে সঠিক কাজ ও উচিত শিক্ষা বিবেচনা করে উল্লাস প্রকাশ করে একধরনের বিকৃত আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললেও বিভিন্ন সচেতন ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মহল এ ঘটনার প্রতিবাদ করে তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টাসহ প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিমান থেকে নেমে হুইলচেয়ারে করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসার সময় কয়েক ব্যক্তিকে হুইলচেয়ারের কাছে এসে রাগতস্বরে ‘আপনি এখানে কেন এসেছেন’ (Why are you, here), ‘আপনি একজন সন্ত্রাসী’ (You are a terrorist) ইত্যাকার বাক্য উচ্চারণ করে তার প্রতি তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে দেখা যায়, যা দেখে অসুস্থ অশীতিপর জ্ঞানপুরুষ ড. ইউনূস একপ্রকার হতভম্ব ও আতঙ্কিত হয়ে যান। অবস্থা খারাপ দেখে হুইলচেয়ার ও বিমানবন্দরের কর্মীরা সেসব ব্যক্তির সম্ভাব্য হামলা থেকে বাঁচাতে তাকে বাইরে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তড়িঘড়ি টার্মিনালের ভেতরে নিয়ে যান।

এই ন্যক্কারজনক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েক ব্যক্তির নাম-পরিচয় ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা। এসব নেতার নেত্রী যেভাবে বাংলাদেশকে তার ‘বাপের সম্পত্তি’ বলে মনে করতেন, জেএফকেতে তাদের উচ্চারণেও অনেকটা একই ধরনের মনোভাবের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়, যা ড. ইউনূসকে উদ্দেশ করে আপনি কেন এখানে এসেছেন উক্তির মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। যা শুনে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পৈতৃক এলাকা এবং তাদের অনুসারী ছাড়া এখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। ইংরেজিতে একটা কথা প্রচলিত আছে, Old Habits die hard, অর্থাৎ পুরোনো অভ্যাস সহজে বদলায় না। আওয়ামী স্বৈরশাসকদের দোসরদের মুখ থেকে এ-জাতীয় অভব্য বাক্য নিঃসৃত হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর পূর্বে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা নিজেও ড. ইউনূসকে পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ফেলে চোবানোর কথা বলেছিলেন।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের সঙ্গে জড়িতদের দেশে-বিদেশে আওয়ামী সমর্থক গোষ্ঠী কর্তৃক নানা অপবাদ দিয়ে হেনস্থার একটি অশুভ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের স্বনামধন্য নাট্য ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ অপবাদ দিয়ে ইতালিতে হেনস্থা করা হয়।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তার অভিনীত একটি চলচ্চিত্রের (The Difficult Bride) প্রদর্শনী উপলক্ষে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এর আগে সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও মাহফুজ আলম যথাক্রমে জেনেভা ও নিউইয়র্কে আওয়ামী সমর্থকদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হন। তা ছাড়া বিগত দিনে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য আগত ড. ইউনূস ও তার প্রতিনিধিদলের প্রতি এই চিহ্নিত মহলটির বহুলনিন্দিত আচরণের ঘটনা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়।

স্পষ্টত, যুক্তরাষ্ট্রে বসে মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদ জানানোর স্বাধীনতা এবং অধিকারের সুযোগ নিয়ে এসব আওয়ামী সমর্থক যে এহেন দেশবিরোধী কদর্য, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সাহস পেয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত সভ্য দেশে বাস করেও ভদ্রতা, শিষ্টাচার শিখতে না পারাটা তাদের দলীয় নেতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, এটা হলফ করে বলা যায়। ড. ইউনূসের সঙ্গে তাদের অভব্য আচরণের মাধ্যমে তারা দেশের ও প্রবাসের বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির ঘৃণা ও ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেননি। তাদের আচরণ আমাদের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মান-মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, যে কারণে সকলকে এই চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া সমীচীন বলে মনে করি। ইদানীং একশ্রেণির আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক ও সুবিধাভোগীকে বাংলাদেশে বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে (আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, কূটনীতি ইত্যাদি) সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সমালোচনায় মুখে রীতিমতো ফেনা তুলতে দেখা যায়। দেশ বর্তমানে একপ্রকার মরণাপন্ন এবং সব দিক থেকে খাদের কিনারায় চলে গেছে বলে তারা বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ বিরামহীনভাবে প্রচার করে যাচ্ছে, যেটা শুনে মনে হতে পারে, আওয়ামী আমলে দেশে শান্তি-প্রগতি, সুখ ও দুধের নহর বয়ে গিয়েছিল। এবং ক্ষমতায় এসে তারেক রহমানের সরকার দুধের নহর বয়ে যাওয়া সাজানো বাগানের দেশকে সব দিক দিয়ে তছনছ করে ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব জ্ঞানপাপী স্বৈরশাসকের সমর্থকদের জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই, দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনে দেশে দুধের নহর নয়; বরং গুম, খুন, হত্যা এবং নজিরবিহীন দুর্নীতির এক জমজমাট আখড়া সৃষ্টি করা হয়েছিল, যেখানে স্বৈরশাসকের পিয়ন চারশত কোটির মালিক, গণভবনে খানাপিনা বাবদ কয়েক মাসে আড়াইশত কোটি ব্যয় ছাড়াও স্বৈরশাসকের পিতার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা ও উদ্ধারে ভারতীয় চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগালকে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে হায়ার করে শতকোটি টাকা ব্যয় করে সিনেমা বানানো ছাড়াও কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তার মূর্তি ও ম্যুরাল বানানোর হিড়িক ও মহোৎসব সৃষ্টি করা হয়েছিল। তাদের প্রিয় স্বৈরশাসকের যাবতীয় কুকীর্তি ও অপকর্মের ফিরিস্তি লিখতে গেলে তা এক কলঙ্কিত মহাকাব্য হয়ে যাবে বিধায় সে পথে আর গেলাম না। তিক্ত হলেও এটা সর্বজনস্বীকৃত সত্য, তাদের নেত্রীর কোনো নেতৃত্বগুণ ছিল না, যা ছিল সেটা হলো দিল্লির দালালি (Puppet) এবং বিরোধী দল ও ভিন্নমতকে যেকোনো উপায়ে দমন করে নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করা, যেটাকে কোনোভাবেই লিডারশিপ কোয়ালিটি বলা যায় না। আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে একদিকে তারা কথিত মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর, অন্যদিকে তারা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেরা বিদেশের মাটিতে ড. ইউনূস ও তাদের বিরোধী মতের মানুষ তথা জুলাই যোদ্ধাদের হেনস্থার মাধ্যমে মব কালচারের চর্চা করে এর পক্ষে সাফাই গাইছেন, যা হিপোক্র্যাসি ও ভণ্ডামির শামিল, যা তাদের আজন্মগত সুবিধাবাদী হীনস্বার্থে রাজনীতির ধারাবাহিকতারই অংশ। আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা প্রত্যাশামাফিক তেমন উন্নত বা স্বাভাবিক না হলেও তা বিশ্বের অনেক দেশের থেকে খারাপ, সেটা বলার উপায় নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে প্রতিদিন সকালের খবর দেখলে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, খুনখারাপি, ছুরিকাঘাতে অপমৃত্যুর বহু ঘটনার খবর শোনা যায়। তথ্যমতে, এ বছরের এ পর্যন্ত সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে গোলাগুলির ৫২টি ঘটনা ঘটেছে, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ ১৫ অক্টোবর অরেগনের একটি স্কুলে গোলাগুলির ঘটনা, যেখানে চারজনের মৃত্যু হয়। এর দ্বারা আমি বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভালো, সেটা বোঝাতে চাইছি না, বরং পরিস্থিতির ন্যারেটিভ যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এসব কট্টর আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক ও ব্যক্তির কেউ কেউ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর পে-রোলতত্ত্ব (Payroll) এবং তাদের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ (খরধরংড়হ) রয়েছে বলে শুনেছি। এসব ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন, তাদের নেত্রী যদি এতটাই জনপ্রিয় ও জননন্দিত হন, তাহলে চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সামনে হাজির না হয়ে গণভবন থেকে নিজের বোন, দেবর ও বাক্সপেটরা নিয়ে পরিবহন বিমানে করে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেলেন কেন। জানি, এই প্রশ্নের সদুত্তর তারা দিতে পারবেন না। শোনা যায়, সঙ্গে নেওয়া বাক্সপেটরাগুলো অর্থকড়ি, সোনা-দানা ও বিদেশি মুদ্রায় ভর্তি ছিল।
চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে ছাত্র-জনতার প্রবল দাবি ও অনুরোধে ড. ইউনূস দীর্ঘ স্বৈরশাসনে বিপর্যস্ত দেশকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ও সম্ভাব্য সামরিক শাসন থেকে যুক্ত রেখে জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রে উত্তরণে ভূমিকা রাখার জন্য অনেকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন। তখন তিনি সেই দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে দেশে আজ গণতন্ত্রের বদলে সামরিক শাসন থাকত, সেটা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। অনেক বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূল পরিস্থিতি (ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের প্রেতাত্মাদের মাথাচাড়া দিয়ে পুনরাবির্ভাব ইত্যাদি) মোটামুটি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন সুসম্পন্ন করে পূর্ব প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন। গণতন্ত্রে উত্তরণ ও দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের যুগান্তকারী ও সাহসী ভূমিকা নিউইয়র্কে তাকে হেনস্থাকারী ও বাংলাদেশের স্বৈরশাসকের দোসররা ছাড়া বাংলাদেশের আপামর জনগণ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে।
পরিশেষে, জনৈক জার্মান দার্শনিকের একটি উক্তি উল্লেখ করে লেখার ইতি টানছি। ‘The only thing we learn from history is that we learn nothing from history, অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। বিনয়, মার্জিত আচরণ, জনকল্যাণকর কাজের মাধ্যমেই কেবল জনগণের হৃদয়ে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আসনে স্থান পাওয়া যায়, যেটা ড. ইউনূসের হেনস্থাকারীদের নেতারা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে তারা মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পাওয়ার পরিবর্তে গণবিরোধী হিসেবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আওয়ামী সমর্থকদের মনে রাখা উচিত, তাদের গণবিরোধী, হঠকারী চরিত্র ও মানসিকতার পরিবর্তন না হলে রাজনীতির মাঠে ফিরে ক্ষমতায় ফেরার তাদের প্রত্যাশা দুরাশা ও কুহেলিকা হয়েই থেকে যাবে।
 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]