বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলা করে অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কানতেইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে শিল্পের মূল্য সংযোজন, সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় জাপানের বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবে অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকল্প চূড়ান্তকরণ, অর্থায়ন, বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর।
চার অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে সহযোগিতা
‘বিগ-বি’ উদ্যোগের আওতায় চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে কাজ করবে বাংলাদেশ ও জাপান। প্রথমত, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন, বাণিজ্য এবং শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, সামুদ্রিক যোগাযোগপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল পরিবেশ মোকাবিলায় এ ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো হবে। এর মাধ্যমে জাপানি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে দুই পক্ষ।
মাতারবাড়ী–মহেশখালী হবে শিল্প ও জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের বড় কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ অঞ্চলকে ঘিরে বন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পণ্য পরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরকে শিল্পাঞ্চল ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুবিধা বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ কার্যক্রমের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। এতে দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্বের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
নতুন ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের মাধ্যমে এসব অবকাঠামোকে বৃহত্তর শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে মাতারবাড়ী–মহেশখালীকে কার্যকর অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করতে বন্দর, সড়ক, রেল, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি, শিল্পের উপযোগী জমি এবং দক্ষ জনশক্তির সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।
পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। জাপানের বেসরকারি খাতের এ সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্সও বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনের তথ্য রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগের পুরো অর্থ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত বা অনুমোদিত হয়েছে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের জন্য এ বিনিয়োগের সম্ভাব্য সুফল নির্ভর করবে অর্থের কতটা বাস্তবে বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং কোন কোন খাতে প্রকল্প গড়ে উঠছে, তার ওপর। উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠলে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা স্থানান্তরের পথও প্রশস্ত হতে পারে। তবে বিনিয়োগের সুফল বিস্তৃত করতে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থার সংযোগস্থল হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর সমন্বয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে শিল্প উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। এ চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুধু বন্দর বা অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শুল্ক ও কাস্টমস কার্যক্রমের দক্ষতা, পণ্য পরিবহনের নির্ভরযোগ্যতা, বিনিয়োগ অনুমোদনের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা
‘বিগ-বি’ উদ্যোগের নতুন কাঠামোয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিভিন্ন বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহপথে বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
জাপানের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থার টেকসই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিও উদ্যোগটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন অবকাঠামোকে দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি, পূর্বাভাসব্যবস্থা এবং জরুরি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা কার্যকর হতে পারে।
উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব
জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। তবে নতুন ‘বিগ-বি’ উদ্যোগে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে ‘বেই অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ কর্মসূচি চালু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।
বর্তমান উদ্যোগে সেই কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করে জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনায় কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে অংশীদারত্বটি শুধু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ও জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নের ওপর। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ এবং দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অর্জনে প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনা, অর্থায়ন, সময়সীমা নির্ধারণ এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিনিয়োগের সুফল যেন শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং দক্ষ জনশক্তিকে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে নতুন শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর ঘোষিত সিদ্ধান্ত দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর, মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানো।
সফরের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়িত হলে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঠিকানা/এসআর
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কানতেইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে শিল্পের মূল্য সংযোজন, সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় জাপানের বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবে অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকল্প চূড়ান্তকরণ, অর্থায়ন, বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর।
চার অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে সহযোগিতা
‘বিগ-বি’ উদ্যোগের আওতায় চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে কাজ করবে বাংলাদেশ ও জাপান। প্রথমত, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন, বাণিজ্য এবং শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, সামুদ্রিক যোগাযোগপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল পরিবেশ মোকাবিলায় এ ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো হবে। এর মাধ্যমে জাপানি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে দুই পক্ষ।
মাতারবাড়ী–মহেশখালী হবে শিল্প ও জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের বড় কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ অঞ্চলকে ঘিরে বন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পণ্য পরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরকে শিল্পাঞ্চল ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুবিধা বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ কার্যক্রমের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। এতে দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্বের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
নতুন ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের মাধ্যমে এসব অবকাঠামোকে বৃহত্তর শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে মাতারবাড়ী–মহেশখালীকে কার্যকর অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করতে বন্দর, সড়ক, রেল, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি, শিল্পের উপযোগী জমি এবং দক্ষ জনশক্তির সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।
পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। জাপানের বেসরকারি খাতের এ সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্সও বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনের তথ্য রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগের পুরো অর্থ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত বা অনুমোদিত হয়েছে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের জন্য এ বিনিয়োগের সম্ভাব্য সুফল নির্ভর করবে অর্থের কতটা বাস্তবে বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং কোন কোন খাতে প্রকল্প গড়ে উঠছে, তার ওপর। উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠলে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা স্থানান্তরের পথও প্রশস্ত হতে পারে। তবে বিনিয়োগের সুফল বিস্তৃত করতে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থার সংযোগস্থল হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর সমন্বয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে শিল্প উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। এ চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুধু বন্দর বা অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শুল্ক ও কাস্টমস কার্যক্রমের দক্ষতা, পণ্য পরিবহনের নির্ভরযোগ্যতা, বিনিয়োগ অনুমোদনের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা
‘বিগ-বি’ উদ্যোগের নতুন কাঠামোয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিভিন্ন বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহপথে বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
জাপানের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থার টেকসই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিও উদ্যোগটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন অবকাঠামোকে দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি, পূর্বাভাসব্যবস্থা এবং জরুরি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা কার্যকর হতে পারে।
উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব
জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। তবে নতুন ‘বিগ-বি’ উদ্যোগে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে ‘বেই অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ কর্মসূচি চালু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।
বর্তমান উদ্যোগে সেই কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করে জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনায় কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে অংশীদারত্বটি শুধু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ও জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নের ওপর। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ এবং দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অর্জনে প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনা, অর্থায়ন, সময়সীমা নির্ধারণ এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিনিয়োগের সুফল যেন শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং দক্ষ জনশক্তিকে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে নতুন শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর ঘোষিত সিদ্ধান্ত দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর, মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানো।
সফরের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়িত হলে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঠিকানা/এসআর