বাঙালির ইতিহাসে রক্তের অভাব নেই, কান্নার অভাব নেই, বীরত্বের অভাব নেই; অভাব শুধু আত্মসমালোচনার। এই জাতি বারবার বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাসের পাতা লিখেছে, তারপর আশ্চর্য দক্ষতায় সেই পাতার শিক্ষা মুছে দিয়ে পুরোনো ভুলের নতুন সংস্করণ মঞ্চস্থ করেছে। যে শাসকের বিরুদ্ধে একদিন স্লোগানে আকাশ কাঁপিয়েছে, তারই মতো ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে পরদিন। যে অন্যায় তাকে রাজপথে নামিয়েছে, ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে সেই অন্যায়েরই সুবিধাভোগী হতে চেয়েছে। যে নিপীড়কের পতন দেখে উল্লাসে মেতেছে, সুযোগ পেলে তার আসনে বসা নতুন নিপীড়কের প্রশংসায় কণ্ঠ মিলিয়েছে। তারপর আবার নির্যাতিত হয়েছে, কেঁদেছে, রক্ত দিয়েছে, স্লোগান তুলেছে। এ যেন ইতিহাস নয়, একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতিভ্রংশের দীর্ঘস্থায়ী মহড়া।
প্রশ্ন হলো, বাঙালি কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, নাকি ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার কৌশল শেখে? তার বিজয় কি মুক্তির দরজা খোলে, নাকি কেবল ক্ষমতার ঘরে নতুন মালিক প্রবেশ করে? আর যে জনগণ প্রতিবার মুক্তির স্বপ্ন দেখে, তারা কেন বারবার এমন বাস্তবতা তৈরি হতে দেয়, যেখানে মুক্তির জন্য আবারও রাস্তায় নামতে হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাঙালিকে জন্মগতভাবে কাপুরুষ, আবেগপ্রবণ কিংবা আত্মবিস্মৃত জাতি বলে গালি দিলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, সত্য পাওয়া যায় না। জাতির চরিত্র কোনো বংশগত রোগ নয়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার ধরন এবং সামাজিক পুরস্কার—শাস্তির কাঠামো মানুষের আচরণ তৈরি করে। বাঙালির সংকটও তাই তার রক্তে নয়; সংকট তার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, নাগরিক নৈতিকতায় এবং সেই স্ববিরোধী মানসিকতায়, যেখানে মানুষ ব্যক্তিজীবনে ন্যায় চায়, অথচ নিজের স্বার্থে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে দ্বিধা করে না।
১৯৫২ সালে বাঙালি বুঝেছিল, ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। ১৯৭১ সালে বুঝেছিল, রাজনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। ১৯৯০ সালে বুঝেছিল, স্বৈরশাসনের পতন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু এসব অর্জনের পর রাষ্ট্রের চরিত্র কতটা বদলেছে, ক্ষমতার জবাবদিহি কতটা স্থায়ী হয়েছে, নাগরিকের অধিকার কতটা দলনিরপেক্ষ হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলোই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়। কারণ শাসক বদলানো এবং শাসনের চরিত্র বদলানো এক বিষয় নয়। প্রথমটি একটি রাজনৈতিক ঘটনা; দ্বিতীয়টি একটি সভ্যতাগত অর্জন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহুবার ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে। কখনো সামরিক শাসন, কখনো নির্বাচনী রাজনীতি, কখনো গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি, কখনো উন্নয়নের বয়ান—নানা পোশাকে ক্ষমতা এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে তোলার কাজটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যখন চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা নিরাপত্তা পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক ধীরে ধীরে অধিকারপ্রত্যাশী মানুষ থেকে ক্ষমতার অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওঠে। সে আর জিজ্ঞেস করে না, আমার অধিকার কোথায়; সে জিজ্ঞেস করে, আমার লোক কোথায়?
এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাঙালির রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির একটি বড় অংশ। যে মানুষ অফিসে ঘুষের শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ হয়, সুযোগ পেলে নিজেই ঘুষ দিতে বা নিতে প্রস্তুত হতে পারে। যে ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, রাজনৈতিক আশ্রয় পেলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করার সুবিধা খোঁজে। যে অভিভাবক সন্তানের জন্য ন্যায়সংগত সমাজ চায়, সে-ই কখনো সন্তানের চাকরির জন্য নিয়ম ভাঙার সুপারিশ খোঁজে। যে নাগরিক নিজের বাড়িতে ব্যক্তিস্বাধীনতা দাবি করে, রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতিবেশীর স্বাধীনতা অস্বীকার করে। যে মানুষ নিজের প্রতি অপমানকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন মনে করে, অন্যের অপমানকে দলীয় প্রয়োজনের যুক্তিতে বৈধতা দেয়।
এখানে রাজনীতির চেয়ে গভীর একটি সমস্যা প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচার যেমন নাগরিককে নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে, তেমনি নাগরিকের সুবিধাবাদ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারকে টিকিয়ে রাখে। রাষ্ট্র ও সমাজ পরস্পরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। শাসক ভাবে, ক্ষমতা মানেই অধিকার; অনুসারী ভাবে, ক্ষমতাবানের কাছাকাছি থাকাই যোগ্যতা; সাধারণ মানুষ ভাবে, নিয়ম মানলে পিছিয়ে পড়তে হবে। এভাবে অন্যায় কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা থাকে না, নিচ থেকেও সামাজিক অনুমোদন পেতে থাকে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়। জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হলেও দ্রুত তা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা ও ক্ষোভের বৃহত্তর বিস্ফোরণে রূপ নেয়। নানান বিতর্ক থাকলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন; প্রতিবেদনে সাবেক সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস ব্যক্তিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে সরকার পতনের সময় প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় দমন যেমন অপরাধ, প্রতিশোধের নামে সংঘটিত সহিংসতাও অপরাধ। একটির নিন্দা করে অন্যটিকে নীরবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। (জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক দপ্তর, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।)
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পতনকে শুধু বিজয়ের চশমায় দেখলে পরবর্তী ইতিহাসের বিপজ্জনক প্রশ্নগুলো আড়াল হয়ে যায়। আমার কাছে এই ঘটনাকে নিঃশর্তভাবে গণতান্ত্রিক বিজয় বলে উদ্যাপন করার চেয়ে একটি জাতির আত্মঘাতী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বেশি। এখানে ‘আত্মহত্যা’ কোনো মৃত মানুষের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার শব্দ নয়, কিংবা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার মানুষের ওপর দায় চাপানোর যুক্তিও নয়। এটি একটি রাজনৈতিক রূপক—যে জাতি নিজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বদলে প্রতিহিংসা, নাগরিক অধিকারের বদলে দলীয় আধিপত্য, মব জাস্টিসের প্রচলন, ইনডেমনিটি এবং ন্যায়বিচারের বদলে বিজয়ীর প্রতিশোধ প্রাধান্য পায়, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করে।
কোনো স্বৈরাচারী শাসনের পতন নিজে আত্মঘাতী নয়। বরং স্বৈরাচারের পতন প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে সেই রাজনৈতিক মানসিকতা, যা পতনকেই পূর্ণ মুক্তি মনে করে, কিন্তু পরবর্তী রাষ্ট্র কেমন হবে তার উত্তর খোঁজে না। যে জনতা শাসকের পতন দেখে আনন্দিত হয়, কিন্তু নতুন ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার অধিকার নিজের হাতে রাখতে চায় না, সে স্বাধীনতার ভিত্তি দুর্বল করে। যে আন্দোলন ন্যায়বিচারের দাবি তোলে, কিন্তু নিজের পক্ষের অপরাধীর বিচার চাইতে লজ্জা পায়, সে ন্যায়বিচার নয়, ক্ষমতার হাতবদলকে সমর্থন করে। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে ক্ষমতার দরজায় পৌঁছায়, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী মতকে শত্রু মনে করে, সে পুরোনো ব্যবস্থার নাম বদলায়, চরিত্র বদলায় না।
এখানে ২০২৪ সালের ঘটনাকে ঘিরে একটি কঠিন প্রশ্ন জরুরি : আমরা কি একটি রাষ্ট্রের অন্যায় থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম, নাকি কেবল অন্যায় করার অধিকারটি অন্য কারও হাতে তুলে দিয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে কোনো নেতার বক্তৃতায় নয়, নির্ধারিত হবে বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, সংখ্যালঘু কতটা নিরাপদ, রাজনৈতিক বিরোধী কতটা অধিকারসম্পন্ন এবং সাধারণ মানুষ কতটা নির্ভয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে—সেই বাস্তবতায়।
২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৪-২০২৫ সালের ধারাবাহিক জরিপে প্রাথমিক আশাবাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এই তথ্য একা কোনো ঐতিহাসিক রায় প্রতিষ্ঠা করে না; কিন্তু এটি মনে করিয়ে দেয়, শাসক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে বিজয়ের উল্লাস দ্রুত অনিশ্চয়তায় পরিণত হতে পারে। (বিআইজিডি, বাংলাদেশ আ ইয়ার আফটার দ্য আপরাইজিং, ২০২৫।)
তবু বাঙালির রাজনৈতিক স্মৃতিতে বিজয়ীর প্রতি আনুগত্যের জায়গাটি এত শক্তিশালী কেন? কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আদর্শের চেয়ে পরিচয়, নীতির চেয়ে নেতা এবং নাগরিকত্বের চেয়ে দলীয় সংশ্লিষ্টতা প্রায়ই বেশি গুরুত্ব পায়। আমরা নেতাকে ভালোবাসি, কিন্তু নেতার ভুল ধরতে শিখি না। আমরা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করি, কিন্তু দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিকতা অর্জন করি না। ফলে রাজনীতি নাগরিকের বিবেককে শাণিত করার বদলে অনেক সময় তাকে দলীয় আনুগত্যের শিকলে বেঁধে ফেলে।
এই শিকল ভাঙতে হলে প্রথমে নিজেদের নির্দোষ ভাবার অভ্যাস ভাঙতে হবে। রাষ্ট্রের সব ব্যর্থতার দায় শুধু শাসকের, সমাজের কোনো দায় নেই—এমন ধারণা আত্মপ্রবঞ্চনা। অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায় বেশি, কারণ রাষ্ট্রের হাতে আইন, অস্ত্র, প্রশাসন ও নাগরিকের জীবন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে। কিন্তু নাগরিক যদি অন্যায়ের সুবিধাভোগী হয়, যদি দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অপরাধের বিচার করে, যদি সত্যকে নিজের পক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করে, তবে গণতন্ত্রের ভিত নাগরিকের হাতেই দুর্বল হয়।
বাঙালির প্রয়োজন আরও একটি বিজয় নয়; প্রয়োজন বিজয়ের অর্থ বদলে দেওয়া। বিজয় মানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং প্রতিপক্ষের অধিকারও নিশ্চিত করা। বিজয় মানে নিজের নেতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলা নয়, বরং তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা। বিজয় মানে রাষ্ট্রের চাবি হাতে পাওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়া। আর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে অতীতের শত্রুর অপরাধ মনে রাখা নয় শুধু; নিজের পক্ষের অপরাধের বিরুদ্ধেও একই নৈতিক সাহস দেখানো।
বাঙালি শিখে জেতে, নাকি জিতে শেখে—এই প্রশ্নের উত্তর কোনো জাতিগত ভাগ্যে লেখা নেই। তা লেখা হবে আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে, নাগরিক সাহসে, রাজনৈতিক আচরণে এবং রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে। আমরা যদি প্রতিবার পতনের পর নতুন প্রতিমা গড়ি, নতুন সেøাগান লিখি, নতুন আনুগত্যের শপথ নিই, অথচ পুরোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই রকম নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের বিজয়ী বলবে না; বলবে, আমরা একই ভুলকে বিভিন্ন নামে পুনরাবৃত্তি করেছি।
একটি জাতি একদিনে আত্মঘাতী হয় না। সে ধীরে ধীরে নিজের বিবেককে দলীয় আনুগত্যের কাছে, নিজের ন্যায়বোধকে ব্যক্তিগত সুবিধার কাছে এবং নিজের ভবিষ্যৎকে ক্ষণিকের উল্লাসের কাছে সমর্পণ করে। তারপর একদিন আবিষ্কার করে, যে মুক্তির জন্য এত রক্ত, এত কান্না, এত আত্মত্যাগ—তার প্রতিষ্ঠান নেই, তার নৈতিক ভিত্তি নেই, তার স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। তখন আবার নতুন সেøাগান, নতুন মিছিল, নতুন পতাকা। ইতিহাস আবার শুরু হয়, অথচ জাতি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।
সবচেয়ে বড় আত্মহত্যা তাই প্রাণ হারানো নয়; একটি জাতির নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। কারণ যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারে না। আর যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেবল অন্যায়কারীর পরিচয় বদলাতে চায়, সে মুক্তি অর্জন করে না—মুক্তির সম্ভাবনাকে হত্যা করে। বাঙালির সামনে আজও সেই কঠিন পরীক্ষা : সে কি ক্ষমতার পতনকে ইতিহাসের শেষ অধ্যায় ভাববে, নাকি বুঝবে—সত্যিকারের ইতিহাস শুরু হয় পতনের পর, যখন বিজয়ীকে প্রথমবার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াতে হয়?
লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও কবি। ব্র্যান্ড মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি প্ল্যানার।
প্রশ্ন হলো, বাঙালি কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, নাকি ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার কৌশল শেখে? তার বিজয় কি মুক্তির দরজা খোলে, নাকি কেবল ক্ষমতার ঘরে নতুন মালিক প্রবেশ করে? আর যে জনগণ প্রতিবার মুক্তির স্বপ্ন দেখে, তারা কেন বারবার এমন বাস্তবতা তৈরি হতে দেয়, যেখানে মুক্তির জন্য আবারও রাস্তায় নামতে হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাঙালিকে জন্মগতভাবে কাপুরুষ, আবেগপ্রবণ কিংবা আত্মবিস্মৃত জাতি বলে গালি দিলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, সত্য পাওয়া যায় না। জাতির চরিত্র কোনো বংশগত রোগ নয়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার ধরন এবং সামাজিক পুরস্কার—শাস্তির কাঠামো মানুষের আচরণ তৈরি করে। বাঙালির সংকটও তাই তার রক্তে নয়; সংকট তার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, নাগরিক নৈতিকতায় এবং সেই স্ববিরোধী মানসিকতায়, যেখানে মানুষ ব্যক্তিজীবনে ন্যায় চায়, অথচ নিজের স্বার্থে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে দ্বিধা করে না।
১৯৫২ সালে বাঙালি বুঝেছিল, ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। ১৯৭১ সালে বুঝেছিল, রাজনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। ১৯৯০ সালে বুঝেছিল, স্বৈরশাসনের পতন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু এসব অর্জনের পর রাষ্ট্রের চরিত্র কতটা বদলেছে, ক্ষমতার জবাবদিহি কতটা স্থায়ী হয়েছে, নাগরিকের অধিকার কতটা দলনিরপেক্ষ হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলোই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়। কারণ শাসক বদলানো এবং শাসনের চরিত্র বদলানো এক বিষয় নয়। প্রথমটি একটি রাজনৈতিক ঘটনা; দ্বিতীয়টি একটি সভ্যতাগত অর্জন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহুবার ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে। কখনো সামরিক শাসন, কখনো নির্বাচনী রাজনীতি, কখনো গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি, কখনো উন্নয়নের বয়ান—নানা পোশাকে ক্ষমতা এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে তোলার কাজটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যখন চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা নিরাপত্তা পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক ধীরে ধীরে অধিকারপ্রত্যাশী মানুষ থেকে ক্ষমতার অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওঠে। সে আর জিজ্ঞেস করে না, আমার অধিকার কোথায়; সে জিজ্ঞেস করে, আমার লোক কোথায়?
এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাঙালির রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির একটি বড় অংশ। যে মানুষ অফিসে ঘুষের শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ হয়, সুযোগ পেলে নিজেই ঘুষ দিতে বা নিতে প্রস্তুত হতে পারে। যে ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, রাজনৈতিক আশ্রয় পেলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করার সুবিধা খোঁজে। যে অভিভাবক সন্তানের জন্য ন্যায়সংগত সমাজ চায়, সে-ই কখনো সন্তানের চাকরির জন্য নিয়ম ভাঙার সুপারিশ খোঁজে। যে নাগরিক নিজের বাড়িতে ব্যক্তিস্বাধীনতা দাবি করে, রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতিবেশীর স্বাধীনতা অস্বীকার করে। যে মানুষ নিজের প্রতি অপমানকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন মনে করে, অন্যের অপমানকে দলীয় প্রয়োজনের যুক্তিতে বৈধতা দেয়।
এখানে রাজনীতির চেয়ে গভীর একটি সমস্যা প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচার যেমন নাগরিককে নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে, তেমনি নাগরিকের সুবিধাবাদ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারকে টিকিয়ে রাখে। রাষ্ট্র ও সমাজ পরস্পরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। শাসক ভাবে, ক্ষমতা মানেই অধিকার; অনুসারী ভাবে, ক্ষমতাবানের কাছাকাছি থাকাই যোগ্যতা; সাধারণ মানুষ ভাবে, নিয়ম মানলে পিছিয়ে পড়তে হবে। এভাবে অন্যায় কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা থাকে না, নিচ থেকেও সামাজিক অনুমোদন পেতে থাকে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়। জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হলেও দ্রুত তা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা ও ক্ষোভের বৃহত্তর বিস্ফোরণে রূপ নেয়। নানান বিতর্ক থাকলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন; প্রতিবেদনে সাবেক সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস ব্যক্তিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে সরকার পতনের সময় প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় দমন যেমন অপরাধ, প্রতিশোধের নামে সংঘটিত সহিংসতাও অপরাধ। একটির নিন্দা করে অন্যটিকে নীরবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। (জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক দপ্তর, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।)
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পতনকে শুধু বিজয়ের চশমায় দেখলে পরবর্তী ইতিহাসের বিপজ্জনক প্রশ্নগুলো আড়াল হয়ে যায়। আমার কাছে এই ঘটনাকে নিঃশর্তভাবে গণতান্ত্রিক বিজয় বলে উদ্যাপন করার চেয়ে একটি জাতির আত্মঘাতী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বেশি। এখানে ‘আত্মহত্যা’ কোনো মৃত মানুষের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার শব্দ নয়, কিংবা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার মানুষের ওপর দায় চাপানোর যুক্তিও নয়। এটি একটি রাজনৈতিক রূপক—যে জাতি নিজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বদলে প্রতিহিংসা, নাগরিক অধিকারের বদলে দলীয় আধিপত্য, মব জাস্টিসের প্রচলন, ইনডেমনিটি এবং ন্যায়বিচারের বদলে বিজয়ীর প্রতিশোধ প্রাধান্য পায়, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করে।
কোনো স্বৈরাচারী শাসনের পতন নিজে আত্মঘাতী নয়। বরং স্বৈরাচারের পতন প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে সেই রাজনৈতিক মানসিকতা, যা পতনকেই পূর্ণ মুক্তি মনে করে, কিন্তু পরবর্তী রাষ্ট্র কেমন হবে তার উত্তর খোঁজে না। যে জনতা শাসকের পতন দেখে আনন্দিত হয়, কিন্তু নতুন ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার অধিকার নিজের হাতে রাখতে চায় না, সে স্বাধীনতার ভিত্তি দুর্বল করে। যে আন্দোলন ন্যায়বিচারের দাবি তোলে, কিন্তু নিজের পক্ষের অপরাধীর বিচার চাইতে লজ্জা পায়, সে ন্যায়বিচার নয়, ক্ষমতার হাতবদলকে সমর্থন করে। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে ক্ষমতার দরজায় পৌঁছায়, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী মতকে শত্রু মনে করে, সে পুরোনো ব্যবস্থার নাম বদলায়, চরিত্র বদলায় না।
এখানে ২০২৪ সালের ঘটনাকে ঘিরে একটি কঠিন প্রশ্ন জরুরি : আমরা কি একটি রাষ্ট্রের অন্যায় থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম, নাকি কেবল অন্যায় করার অধিকারটি অন্য কারও হাতে তুলে দিয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে কোনো নেতার বক্তৃতায় নয়, নির্ধারিত হবে বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, সংখ্যালঘু কতটা নিরাপদ, রাজনৈতিক বিরোধী কতটা অধিকারসম্পন্ন এবং সাধারণ মানুষ কতটা নির্ভয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে—সেই বাস্তবতায়।
২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৪-২০২৫ সালের ধারাবাহিক জরিপে প্রাথমিক আশাবাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এই তথ্য একা কোনো ঐতিহাসিক রায় প্রতিষ্ঠা করে না; কিন্তু এটি মনে করিয়ে দেয়, শাসক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে বিজয়ের উল্লাস দ্রুত অনিশ্চয়তায় পরিণত হতে পারে। (বিআইজিডি, বাংলাদেশ আ ইয়ার আফটার দ্য আপরাইজিং, ২০২৫।)
তবু বাঙালির রাজনৈতিক স্মৃতিতে বিজয়ীর প্রতি আনুগত্যের জায়গাটি এত শক্তিশালী কেন? কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আদর্শের চেয়ে পরিচয়, নীতির চেয়ে নেতা এবং নাগরিকত্বের চেয়ে দলীয় সংশ্লিষ্টতা প্রায়ই বেশি গুরুত্ব পায়। আমরা নেতাকে ভালোবাসি, কিন্তু নেতার ভুল ধরতে শিখি না। আমরা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করি, কিন্তু দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিকতা অর্জন করি না। ফলে রাজনীতি নাগরিকের বিবেককে শাণিত করার বদলে অনেক সময় তাকে দলীয় আনুগত্যের শিকলে বেঁধে ফেলে।
এই শিকল ভাঙতে হলে প্রথমে নিজেদের নির্দোষ ভাবার অভ্যাস ভাঙতে হবে। রাষ্ট্রের সব ব্যর্থতার দায় শুধু শাসকের, সমাজের কোনো দায় নেই—এমন ধারণা আত্মপ্রবঞ্চনা। অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায় বেশি, কারণ রাষ্ট্রের হাতে আইন, অস্ত্র, প্রশাসন ও নাগরিকের জীবন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে। কিন্তু নাগরিক যদি অন্যায়ের সুবিধাভোগী হয়, যদি দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অপরাধের বিচার করে, যদি সত্যকে নিজের পক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করে, তবে গণতন্ত্রের ভিত নাগরিকের হাতেই দুর্বল হয়।
বাঙালির প্রয়োজন আরও একটি বিজয় নয়; প্রয়োজন বিজয়ের অর্থ বদলে দেওয়া। বিজয় মানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং প্রতিপক্ষের অধিকারও নিশ্চিত করা। বিজয় মানে নিজের নেতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলা নয়, বরং তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা। বিজয় মানে রাষ্ট্রের চাবি হাতে পাওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়া। আর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে অতীতের শত্রুর অপরাধ মনে রাখা নয় শুধু; নিজের পক্ষের অপরাধের বিরুদ্ধেও একই নৈতিক সাহস দেখানো।
বাঙালি শিখে জেতে, নাকি জিতে শেখে—এই প্রশ্নের উত্তর কোনো জাতিগত ভাগ্যে লেখা নেই। তা লেখা হবে আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে, নাগরিক সাহসে, রাজনৈতিক আচরণে এবং রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে। আমরা যদি প্রতিবার পতনের পর নতুন প্রতিমা গড়ি, নতুন সেøাগান লিখি, নতুন আনুগত্যের শপথ নিই, অথচ পুরোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই রকম নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের বিজয়ী বলবে না; বলবে, আমরা একই ভুলকে বিভিন্ন নামে পুনরাবৃত্তি করেছি।
একটি জাতি একদিনে আত্মঘাতী হয় না। সে ধীরে ধীরে নিজের বিবেককে দলীয় আনুগত্যের কাছে, নিজের ন্যায়বোধকে ব্যক্তিগত সুবিধার কাছে এবং নিজের ভবিষ্যৎকে ক্ষণিকের উল্লাসের কাছে সমর্পণ করে। তারপর একদিন আবিষ্কার করে, যে মুক্তির জন্য এত রক্ত, এত কান্না, এত আত্মত্যাগ—তার প্রতিষ্ঠান নেই, তার নৈতিক ভিত্তি নেই, তার স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। তখন আবার নতুন সেøাগান, নতুন মিছিল, নতুন পতাকা। ইতিহাস আবার শুরু হয়, অথচ জাতি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।
সবচেয়ে বড় আত্মহত্যা তাই প্রাণ হারানো নয়; একটি জাতির নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। কারণ যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারে না। আর যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেবল অন্যায়কারীর পরিচয় বদলাতে চায়, সে মুক্তি অর্জন করে না—মুক্তির সম্ভাবনাকে হত্যা করে। বাঙালির সামনে আজও সেই কঠিন পরীক্ষা : সে কি ক্ষমতার পতনকে ইতিহাসের শেষ অধ্যায় ভাববে, নাকি বুঝবে—সত্যিকারের ইতিহাস শুরু হয় পতনের পর, যখন বিজয়ীকে প্রথমবার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াতে হয়?
লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও কবি। ব্র্যান্ড মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি প্ল্যানার।