শীতল যুদ্ধ বনাম আমেরিকা

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৩, ১০:২৩ , অনলাইন ভার্সন
মুহম্মদ শামসুল  হক 

ছোট-বড় ৫০টি স্টেট বা অঙ্গরাজ্য নিয়ে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পর সংলগ্ন ২৯ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪ বর্গমাইল বা ৭৬ লাখ ৬৩ হাজার ৯৪০.৬ বর্গকিলোমিটারসহ মোট আয়তন ৩৮ লাখ বর্গমাইল বা ৯৮ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ বর্গকিলোমিটার। আর আধুনিক বিশ্বের অমরাবতী যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। বিশ্ববাসীর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র রাক্ষসরাজ রাবণের মর্ত্যরে স্বর্গপুরী, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রাচুর্য-সমৃদ্ধি এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির লীলাক্ষেত্র এবং ভাগ্যান্বেষী জনগোষ্ঠীর মাথা গোঁজার ঠাঁই। অবশ্য বিশ্ব অভিবাসীর শ্রম-ঘামে গড়ে ওঠা আমেরিকাও বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে সকল অভিবাসী/নাগরিককে নিজের সুশীতল নীড়ে যথাসম্ভব নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। তবে বিগত ২৪৮ বছরে আমেরিকা বহুবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। নিম্নে শীতল যুদ্ধে আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা তুলে ধরা হলো :

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ঘৃণ্য এবং কলঙ্কজনক ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। ওই হামলার ফলে কয়েক মিনিট থেকে ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানির ঘটনাকে বিশ্ববাসী নারকীয় এবং দানবীয় হত্যাযজ্ঞ অভিধায় আখ্যায়িত করেছে। তা সত্ত্বেও আধুনিক সভ্যতার অবয়বধারী বিশ্ব মোড়লদের মনমানসিকতা ও চিন্তাচেতনায় বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, বলার সুযোগ একেবারেই সীমিত। আর জাতিসংঘ নামক বিশেষ সংস্থাটিও পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নিছক ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিত্যনতুন আবিষ্কার এবং আধুনিকায়ন যুদ্ধযাত্রার ধরনে পরিবর্তন আনয়ন করেছে এবং পরিণতিতে কোল্ড ওয়ারের (শীতল যুদ্ধের) বিষবাষ্প নতুন করে বিশ্বকে গ্রাস করেছে।

যাহোক, ঐতিহাসিক ওয়ারশ চুক্তি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সোভিয়েত রাশিয়ার অভূতপূর্ব সাফল্য আমেরিকায় শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল। ট্রুম্যান ডকট্রিন বা মতবাদ ঘোষণার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শীতল যুদ্ধের পরিকল্পনা এঁটেছিল এবং ১৯৪৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের অত্যাধুনিকায়নে বিশেষ নৈপুণ্য অর্জন করল। অগত্যা আত্মরক্ষার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রও ইন্টারসেপ্টারস এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল ব্যবহারে সোভিয়েত পারমাণবিক বোমা হামলা প্রতিহত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করল এবং আলাস্কা ও ইউরোপ বেইস থেকে সোভিয়েত এয়ারস্পেসে নিজস্ব বোম্বার ফ্লিট অভিযান চালাল। আর এই প্রতিযোগিতার রেশ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন, লং-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার মিসাইল ইত্যাদি সর্বাধুনিক ও ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রে নিজেদের ভান্ডার সমৃদ্ধ করল। এসব অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্র এতই দ্রুতগতিসম্পন্ন ও ধ্বংসাত্মক ছিল যে পূর্বের ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ১০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পরস্পরের লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানতে কিংবা অন্যের ছোড়া বোমাকে অকেজো করতে সক্ষম ছিল। অবশেষে নিউক্লিয়ার ট্রাইয়াড (ত্রয়ী বা তিন শক্তির সম্মেলন) নীতিমালা প্রণয়নের প্রেক্ষিত তৈরি হলো। ওই নীতিমালার আওতায় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র প্ল্যাটফরম (ল্যান্ড-বেইসড, সাবমেরিন এবং বোম্বার) সমন্বিত পূর্ণ মিল বা সাদৃশ্য বজায় রেখে প্রথমে ধ্বংসাত্মক হামলা এবং পরে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাবশেষ ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করার লক্ষ্যে কাউন্টার স্ট্রাইক বা প্রত্যাঘাত কাজে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার অনুমোদন করা হলো।

এদিকে আলাস্কা টেরিটরিতে ইন্টেলিজেন্সদের কাক্সিক্ষত সমাবেশ ঘটানোর লক্ষ্যে সেখানে এজেন্টদের অবস্থান নিরাপদ করা এবং আমেরিকান সেনাবাহিনীর উচ্ছেদ ও পলায়ন (ইভাসন অ্যান্ড এস্কেপ) ফ্যাসিলিটি সংরক্ষণের নিমিত্তে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স এবং দ্য ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের যৌথ পরিচালনায় অত্যন্ত সংগোপনে পরিচালিত হয়েছিল অপারেশন ওয়াশটাব। প্রধানত এফবিআই পরিচালক জে এডগার এবং তার তৎকালীন সহযোগী জোসেফ এফ ক্যারলের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হতো। ১৯৫৫ সালের ২২ জুন কামচাটকা উপসাগর এবং আলাস্কার মধ্যবর্তী বেরিং স্ট্রেটের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইন বরাবর ১১ জন ক্রুসহ যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস নেভি পিটুভি নেপচুনের ওপর দুটি সোভিয়েত এয়ারফোর্স এয়ারক্রাফট হামলা ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাত্র হামলা চালাল। আলাস্কার সেন্ট লরেন্স আইল্যান্ডের নিকটবর্তী গেমবেল গ্রামের কাছে পিটুভি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল। গুরুতর আহত সাতজনসহ সকল ক্রুকে গ্রামবাসী উদ্ধার করল।

পক্ষান্তরে কিউবার মিসাইল সংকটকালে আমেরিকান পারমাণবিক যুদ্ধের মহড়া শুরু হয়েছিল। কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার অবরোধ মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের বাস্তব প্রয়োগেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল। ওই অবরোধকালে আমেরিকা ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। বস্তুত, অপারেশন ক্রস রোডস ছিল আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও সাফল্যের দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রমাণ। যাহোক, সোভিয়েত রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতা এবং বিশ্ববাসীর অস্তিত্বের প্রতি চরম হুমকি হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭০ দশকের শেষ পাদে সোভিয়েত রাশিয়া, আমেরিকাসহ পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করায় শীতল যুদ্ধের খানিকটা আশঙ্কামুক্ত হয় বিশ্ববাসী।

একুশ শতককে বলা হয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদে বর্তমান বিশ্বকে গ্লোবাল ভিলেজও বলা হয়। অথচ সরাসরি পারমাণবিক, সন্ত্রাসী ও সাইবার হামলার ভয়ে আমেরিকা সর্বদা তটস্থ। বিশেষত, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওসামা বিন লাদেনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য ছিনতাইকৃত চারটি বাণিজ্যিক বিমানযোগে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর আত্মঘাতী হামলার পর আমেরিকানদের দুশ্চিন্তা তুঙ্গে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের যেকোনো ধরনের নতুন হামলা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা চকিতচরণ হরিণীর মতো উৎকর্ণ রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার বর্ণনা অনুসারে, চীনের প্রস্তুতকৃত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের যেকোনো দেশে সফল ও সার্থক আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, ইসরাইলসহ বিশ্বের অনেক দেশের রাজভান্ডারে পর্যাপ্ত সম্পদ জমা না থাকলেও রাশি রাশি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। তদুপরি সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কাও দিনে দিনে বাড়ছে।

বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭৫০ কোটি। এদের কমপক্ষে ৩০% ক্ষুধা-অপুষ্টিসহ নানাবিধ রোগব্যাধিতে ভুগছে এবং অভুক্ত-অর্ধভুক্তরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ক্যানসার, সাইলেন্ট ঘাতক হার্ট অ্যাটাকসহ নানাবিধ রোগব্যাধি-কবলিত লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। অথচ বিশ্ব মোড়লরা মানবতার উৎকর্ষ সাধন এবং দুঃখীদের দুর্দশা লাঘবের স্থলে নিত্যনতুন মারণাস্ত্র-ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের উৎকর্ষ সাধনে দেদার অর্থ ব্যয় করছে। তাই মনুষ্যত্বের এমনতর চরম অবক্ষয় ও দানবীয় শক্তির পরম উত্থানের পটভূমিতে জানতে আগ্রহীÑকবে নাগাদ মানবসভ্যতা ও এই বিশ্ব পুরোপুরি ধ্বংস হচ্ছে।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩
 
M M Shahin, Chairman Board of Editors, Thikana

Corporate Headquarter :

THIKANA : 7409 37th Ave suite 403

Jackson Heights, NY 11372

Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806



Bangladesh Bureau : THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath),
5th Floor, Dhaka- 1205, Bangladesh.
Mobile: 01711238078