একসময় বাংলাদেশের তারকাদের নিউইয়র্কেএনে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। কমিউনিটির নানা আয়োজনে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। পরিচিতজনদের বিপদে-আপদেও এগিয়ে আসতেন। অথচ সেই এনামুল হক ইনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা—আইসের হাতে আটক।
তাঁর মুক্তির দাবিতে নেই কোনো সমাবেশ, নেই মানববন্ধন, এমনকি প্রকাশ্য প্রতিবাদের উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। একসময় যাঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাঁদের অনেকেই এখন নীরব। কমিউনিটির পরিচিত এই মুখের আটকের ঘটনা যেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সমাজের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে—বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও অনেকের মনে এখন ভয়।
গত ১৪ অক্টোবর বুধবার নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো এলাকায় এনামুল হক ইনামকে আটক করা হয় বলে কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিচিতজনেরা। কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বহিষ্কার আদেশ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আইসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
প্রায় ৪২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এনামুল হক। দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন নিউইয়র্কের জামাইকায়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন পরিচিত নাম। বাংলাদেশ থেকে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। তাঁর আমন্ত্রণে ফেরদৌস ওয়াহিদ ও কুমার বিশ্বজিতের মতো তারকারাও নিউইয়র্কে এসেছিলেন। একসময় প্রবাসী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় এই প্রমোটার কয়েক বছর আগে ভার্জিনিয়ায় চলে যান। পরে বসবাস শুরু করেন বাফেলোতে।
এনামুল হকের অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে পরিচিতজনদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও তাঁর প্রয়োজনীয় অভিবাসন নথিপত্রে জটিলতা ছিল। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। শুধু আটকের ঘটনা থেকে তাঁর অভিবাসনগত অবস্থান বা কোনো আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এনামুল হকের আটকের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশি কমিউনিটির নীরবতা। অতীতে কোনো বাংলাদেশি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন ও কমিউনিটি নেতাদের প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও সমাবেশের নজির রয়েছে। কখনো আইনজীবী নিয়োগে সহযোগিতা, কখনো পরিবারের জন্য অর্থ সংগ্রহ, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং আইসের ক্রমবর্ধমান অভিযানের কারণে কমিউনিটির অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলে নিজের কিংবা পরিবারের অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হতে পারে কি না, এমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মনে।
এনামুল হকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন, “এনাম বহু বাংলাদেশির বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সময় এখন ভালো নয়। মানুষ এতটাই আতঙ্কিত যে তাঁর বা তাঁর পরিবারের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহসও পাচ্ছে না। এটা খুবই দুঃখজনক।”
তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে কমিউনিটির বর্তমান উদ্বেগের চিত্র। তবে এনামুল হকের পরিবার ব্যক্তিগতভাবে কী ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি না থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ সহযোগিতা করছেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, অভিবাসন অভিযান নিয়ে আতঙ্ক কি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে? একজন পরিচিত মানুষ আটক হওয়ার পরও যখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদের উদ্যোগ দেখা যায় না, তখন তা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; কমিউনিটির সামাজিক সংহতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
শুধু এনামুল হক নন, সাম্প্রতিক সময়ে বাফেলো এলাকায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আইসের হাতে আটক হয়েছেন বলে স্থানীয় কমিউনিটি সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি বাবু নামে পরিচিত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। বাফেলোর ক্যানমোর অ্যাভিনিউয়ে তাঁর একটি বাঙালি রেস্তোরাঁ রয়েছে। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি ঢাকার মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায়। পরিচিতজনদের তথ্য অনুযায়ী, আটকের পর তাঁর রেস্তোরাঁর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থা এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকার কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এর আগে বাফেলো থেকে জাকির হোসেন নামে আরেক বাংলাদেশিকে আটক করার খবর পাওয়া যায়। পরিচিতজনদের দাবি, তাঁর গ্রিন কার্ড থাকলেও আটকের সময় সেটি সঙ্গে ছিল না। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আটকের প্রকৃত কারণ কিংবা মুক্তির শর্ত সম্পর্কে সরকারি কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
একের পর এক এমন ঘটনায় বাফেলোর বাংলাদেশি পরিবার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানের খবর এখন শুধু অনিয়মিত অভিবাসীদের নয়, বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা মানুষের মধ্যেও উৎকণ্ঠা তৈরি করছে।
এই উদ্বেগ যে একেবারেই ভিত্তিহীন নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণেও।
ওয়েস্টার্ন নিউইয়র্কের সংবাদমাধ্যম ডব্লিউএক্সএক্সআই নিউজ এবং বাফেলো টরন্টো পাবলিক মিডিয়ার ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই আপস্টেট নিউইয়র্কে আইসের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬০০-এর বেশি মানুষ। একই মাসে পুরো নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০-তে পৌঁছায়, যা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ।
আইসের সরবরাহ করা তথ্য নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং ইউসিএলএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপস্টেট নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় চারজনেরই কোনো অপরাধমূলক ইতিহাস ছিল না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে সারা যুক্তরাষ্ট্রে আইস প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে। আরও দেখা যায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার সময় আপস্টেট নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বহিষ্কার আদেশ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এই হার নেমে আসে প্রায় ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ আইসের অভিযান এখন শুধু আগে থেকে বহিষ্কারের আদেশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। যাঁদের অভিবাসনসংক্রান্ত মামলা বা আইনি প্রক্রিয়া চলমান, তাঁরাও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এসব তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিভাগটির দাবি, তাদের অভিযান মূলত অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত অনিয়মিত অভিবাসীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকাশিত সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণে অপরাধমূলক ইতিহাসবিহীন ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় গ্রেপ্তারের চিত্র উঠে এসেছে।
আইসের কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টিও সামনে এসেছে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। বাফেলোর কাছে বাটাভিয়ায় অবস্থিত বাফেলো সার্ভিস প্রসেসিং সেন্টারে অতিরিক্ত ১০০ জনকে রাখার মতো অস্থায়ী অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ডব্লিউএক্সএক্সআই নিউজ।
এ ধরনের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং গ্রেপ্তার বৃদ্ধির ফলে অভিবাসী পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ আটক হলে শুধু তাঁর আইনি লড়াই নয়, বাসাভাড়া, ব্যবসা পরিচালনা, সন্তানদের দেখাশোনা এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের প্রশ্নও সামনে আসে।
অভিবাসন মামলায় আটক ব্যক্তিদের অবস্থান জানতে আইসের অনলাইন ডিটেইনি লোকেটর ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সেখানে খোঁজ নিতে পারেন। তবে আটক হওয়ার পর তথ্য হালনাগাদ হতে সময় লাগতে পারে। অভিবাসন আইনজীবীর সহায়তায় আটকের কারণ, আদালতের কার্যক্রম এবং মুক্তির সম্ভাব্য আইনি পথ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় শক্তি ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা। প্রবাসে কেউ বিপদে পড়লে পরিচিত-অপরিচিত মানুষও অনেক ক্ষেত্রে পাশে এসে দাঁড়াতেন। অভিবাসনসংক্রান্ত সংকটে সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ছিল সেই সহযোগিতারই অংশ। কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই এখন সতর্ক। অভিবাসন আইন প্রয়োগের কঠোরতা, আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমিউনিটির মধ্যে একধরনের নীরবতা তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যিনি একসময় বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে মঞ্চ আলোকিত করেছেন, প্রবাসীদের আনন্দ দিয়েছেন, অন্যের বিপদে এগিয়ে এসেছেন—আজ তাঁর নিজের জীবনেই অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তাঁর আটকের কারণ ও আইনি পরিণতি নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায়। কিন্তু পরিচিতজনদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, একজন মানুষের দুর্দিনে কমিউনিটির ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং বিপদগ্রস্ত একজন মানুষ ও তাঁর পরিবারকে মানবিক সহায়তা দেওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। আইনি সহযোগিতা, পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগের জন্য সব সময় রাজপথে নামারও প্রয়োজন হয় না।
এনামুল হক কবে মুক্তি পাবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তাঁর আটকের ঘটনায় আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, যে কমিউনিটি একসময় বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াত, সেই কমিউনিটি কি আজ নিজের ভয়েই নীরব হয়ে যাচ্ছে?
তাঁর মুক্তির দাবিতে নেই কোনো সমাবেশ, নেই মানববন্ধন, এমনকি প্রকাশ্য প্রতিবাদের উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। একসময় যাঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাঁদের অনেকেই এখন নীরব। কমিউনিটির পরিচিত এই মুখের আটকের ঘটনা যেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সমাজের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে—বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও অনেকের মনে এখন ভয়।
গত ১৪ অক্টোবর বুধবার নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো এলাকায় এনামুল হক ইনামকে আটক করা হয় বলে কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিচিতজনেরা। কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বহিষ্কার আদেশ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আইসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
প্রায় ৪২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এনামুল হক। দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন নিউইয়র্কের জামাইকায়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন পরিচিত নাম। বাংলাদেশ থেকে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। তাঁর আমন্ত্রণে ফেরদৌস ওয়াহিদ ও কুমার বিশ্বজিতের মতো তারকারাও নিউইয়র্কে এসেছিলেন। একসময় প্রবাসী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় এই প্রমোটার কয়েক বছর আগে ভার্জিনিয়ায় চলে যান। পরে বসবাস শুরু করেন বাফেলোতে।
এনামুল হকের অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে পরিচিতজনদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও তাঁর প্রয়োজনীয় অভিবাসন নথিপত্রে জটিলতা ছিল। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। শুধু আটকের ঘটনা থেকে তাঁর অভিবাসনগত অবস্থান বা কোনো আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এনামুল হকের আটকের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশি কমিউনিটির নীরবতা। অতীতে কোনো বাংলাদেশি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন ও কমিউনিটি নেতাদের প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও সমাবেশের নজির রয়েছে। কখনো আইনজীবী নিয়োগে সহযোগিতা, কখনো পরিবারের জন্য অর্থ সংগ্রহ, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং আইসের ক্রমবর্ধমান অভিযানের কারণে কমিউনিটির অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলে নিজের কিংবা পরিবারের অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হতে পারে কি না, এমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মনে।
এনামুল হকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন, “এনাম বহু বাংলাদেশির বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সময় এখন ভালো নয়। মানুষ এতটাই আতঙ্কিত যে তাঁর বা তাঁর পরিবারের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহসও পাচ্ছে না। এটা খুবই দুঃখজনক।”
তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে কমিউনিটির বর্তমান উদ্বেগের চিত্র। তবে এনামুল হকের পরিবার ব্যক্তিগতভাবে কী ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি না থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ সহযোগিতা করছেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, অভিবাসন অভিযান নিয়ে আতঙ্ক কি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে? একজন পরিচিত মানুষ আটক হওয়ার পরও যখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদের উদ্যোগ দেখা যায় না, তখন তা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; কমিউনিটির সামাজিক সংহতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
শুধু এনামুল হক নন, সাম্প্রতিক সময়ে বাফেলো এলাকায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আইসের হাতে আটক হয়েছেন বলে স্থানীয় কমিউনিটি সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি বাবু নামে পরিচিত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। বাফেলোর ক্যানমোর অ্যাভিনিউয়ে তাঁর একটি বাঙালি রেস্তোরাঁ রয়েছে। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি ঢাকার মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায়। পরিচিতজনদের তথ্য অনুযায়ী, আটকের পর তাঁর রেস্তোরাঁর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থা এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকার কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এর আগে বাফেলো থেকে জাকির হোসেন নামে আরেক বাংলাদেশিকে আটক করার খবর পাওয়া যায়। পরিচিতজনদের দাবি, তাঁর গ্রিন কার্ড থাকলেও আটকের সময় সেটি সঙ্গে ছিল না। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আটকের প্রকৃত কারণ কিংবা মুক্তির শর্ত সম্পর্কে সরকারি কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
একের পর এক এমন ঘটনায় বাফেলোর বাংলাদেশি পরিবার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানের খবর এখন শুধু অনিয়মিত অভিবাসীদের নয়, বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা মানুষের মধ্যেও উৎকণ্ঠা তৈরি করছে।
এই উদ্বেগ যে একেবারেই ভিত্তিহীন নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণেও।
ওয়েস্টার্ন নিউইয়র্কের সংবাদমাধ্যম ডব্লিউএক্সএক্সআই নিউজ এবং বাফেলো টরন্টো পাবলিক মিডিয়ার ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই আপস্টেট নিউইয়র্কে আইসের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬০০-এর বেশি মানুষ। একই মাসে পুরো নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০-তে পৌঁছায়, যা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ।
আইসের সরবরাহ করা তথ্য নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং ইউসিএলএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপস্টেট নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় চারজনেরই কোনো অপরাধমূলক ইতিহাস ছিল না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে সারা যুক্তরাষ্ট্রে আইস প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে। আরও দেখা যায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার সময় আপস্টেট নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বহিষ্কার আদেশ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এই হার নেমে আসে প্রায় ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ আইসের অভিযান এখন শুধু আগে থেকে বহিষ্কারের আদেশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। যাঁদের অভিবাসনসংক্রান্ত মামলা বা আইনি প্রক্রিয়া চলমান, তাঁরাও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এসব তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিভাগটির দাবি, তাদের অভিযান মূলত অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত অনিয়মিত অভিবাসীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকাশিত সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণে অপরাধমূলক ইতিহাসবিহীন ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় গ্রেপ্তারের চিত্র উঠে এসেছে।
আইসের কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টিও সামনে এসেছে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। বাফেলোর কাছে বাটাভিয়ায় অবস্থিত বাফেলো সার্ভিস প্রসেসিং সেন্টারে অতিরিক্ত ১০০ জনকে রাখার মতো অস্থায়ী অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ডব্লিউএক্সএক্সআই নিউজ।
এ ধরনের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং গ্রেপ্তার বৃদ্ধির ফলে অভিবাসী পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ আটক হলে শুধু তাঁর আইনি লড়াই নয়, বাসাভাড়া, ব্যবসা পরিচালনা, সন্তানদের দেখাশোনা এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের প্রশ্নও সামনে আসে।
অভিবাসন মামলায় আটক ব্যক্তিদের অবস্থান জানতে আইসের অনলাইন ডিটেইনি লোকেটর ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সেখানে খোঁজ নিতে পারেন। তবে আটক হওয়ার পর তথ্য হালনাগাদ হতে সময় লাগতে পারে। অভিবাসন আইনজীবীর সহায়তায় আটকের কারণ, আদালতের কার্যক্রম এবং মুক্তির সম্ভাব্য আইনি পথ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় শক্তি ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা। প্রবাসে কেউ বিপদে পড়লে পরিচিত-অপরিচিত মানুষও অনেক ক্ষেত্রে পাশে এসে দাঁড়াতেন। অভিবাসনসংক্রান্ত সংকটে সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ছিল সেই সহযোগিতারই অংশ। কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই এখন সতর্ক। অভিবাসন আইন প্রয়োগের কঠোরতা, আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমিউনিটির মধ্যে একধরনের নীরবতা তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যিনি একসময় বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে মঞ্চ আলোকিত করেছেন, প্রবাসীদের আনন্দ দিয়েছেন, অন্যের বিপদে এগিয়ে এসেছেন—আজ তাঁর নিজের জীবনেই অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তাঁর আটকের কারণ ও আইনি পরিণতি নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায়। কিন্তু পরিচিতজনদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, একজন মানুষের দুর্দিনে কমিউনিটির ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং বিপদগ্রস্ত একজন মানুষ ও তাঁর পরিবারকে মানবিক সহায়তা দেওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। আইনি সহযোগিতা, পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগের জন্য সব সময় রাজপথে নামারও প্রয়োজন হয় না।
এনামুল হক কবে মুক্তি পাবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তাঁর আটকের ঘটনায় আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, যে কমিউনিটি একসময় বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াত, সেই কমিউনিটি কি আজ নিজের ভয়েই নীরব হয়ে যাচ্ছে?