ভূমিকা : ক্ষমতার গোলকধাঁধায় বিশ্বসভ্যতা। বিশ্ব রাজনীতি কোনো সরলরৈখিক ঘটনাপ্রবাহ নয়; এটি ক্ষমতা, স্বার্থ, আদর্শ, প্রতিহিংসা, কূটকৌশল ও ইতিহাসের পারস্পরিক সংঘাতজাত এক দুর্বোধ্য মহাকাব্য। এখানে প্রতিপত্তির সিংহাসন যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি পরাজয়ের অন্ধকারও কোনো রাষ্ট্রের অনিবার্য নিয়তি নয়। যে সাম্রাজ্য একদিন বিশ্ব মানচিত্রে নিজের আধিপত্যের অমোচনীয় স্বাক্ষর এঁকে দেয়, কালপ্রবাহের নির্মম অভিঘাতে সেই সাম্রাজ্যই কখনো ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপে পর্যবসিত হয়। আবার যে শক্তিকে একসময় উপেক্ষার প্রান্তরে নির্বাসিত করা হয়েছিল, তারই পুনরুত্থান আন্তর্জাতিক ক্ষমতাকাঠামোর ভিত্তিমূলে কম্পন সৃষ্টি করে।
বিশ্ব রাজনীতির বিস্ময় নিহিত রয়েছে এই বৈপরীত্যের অন্তঃসারশূন্যতায় নয়, বরং তার অন্তর্গত কার্যকারণ-শৃঙ্খলে। রাষ্ট্রের উত্থান-পতন, পরাশক্তির মেরুকরণ, যুদ্ধের অনভিপ্রেত পরিণতি, গণতান্ত্রিক জনরায়ের আকস্মিক অভিঘাত এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় সম্প্রসারণ—সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এমন এক পরিবর্তনশীল সমীকরণে আবদ্ধ, যার কোনো চূড়ান্ত সমাধান নেই।
একুশ শতকের বিশ্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার পুরোনো রাজনৈতিক অভিধানকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি ন্যায়সংগত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অভ্যুদয়, নাকি আধিপত্যের পুরোনো ব্যাকরণে নতুন শক্তির অনুপ্রবেশ? এই অনুসন্ধানই বিশ্ব রাজনীতির বিস্ময়কে গভীরতরভাবে উপলব্ধি করার প্রধান অবলম্বন।
১. ইতিহাসের অমোঘ পরিহাস : পরাশক্তির উত্থান ও অবক্ষয়
ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হলো, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু কোনো রাষ্ট্রের জন্য চিরস্থায়ী আবাসভূমি নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দীর্ঘকাল নিয়ন্ত্রণ করেছে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের আদর্শগত সংঘাত সামরিক প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং প্রভাববলয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতিকে বিভক্ত করেছিল।
কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি সেই ক্ষমতাকাঠামোর ভিত উপড়ে দেয়। যে রাষ্ট্র একসময় পশ্চিমা আধিপত্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তার ভাঙন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যকে সুদৃঢ় করে। এই ঘটনাকে ইতিহাসের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচনা করা ছিল দূরদৃষ্টির সীমাবদ্ধতা। কারণ কোনো পরাশক্তির পতন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবস্থার চূড়ান্ত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। বরং ক্ষমতার শূন্যস্থান নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নতুন মৈত্রী এবং নতুন সংঘাতের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
সোভিয়েত-পরবর্তী বিশ্বে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার কৌশলগত পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা প্রমাণ করেছে, ইতিহাস কখনো বিজয়ীর ঘোষণাপত্র অনুযায়ী অগ্রসর হয় না। ইতিহাসের নিজস্ব অন্তর্গত দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত ধারণার প্রাচীর ভেঙে নতুন বাস্তবতার জন্ম দেয়।
২. যুক্তরাষ্ট্র : আধিপত্যের মহিমা ও নেতৃত্বের সংকট
যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি। সামরিক সক্ষমতা, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে দেশটি বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু আধিপত্যের বহিরাবরণ যতই দৃঢ় হোক, তার অন্তর্গত কাঠামো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত নয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন এবং স্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাসমীকরণের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জাতীয়তাবাদী অবস্থান, অভিবাসননীতি, বাণিজ্যিক দর-কষাকষি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা মার্কিন রাজনীতিতে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের কাছে এই রাজনীতি জাতীয় স্বার্থের পুনঃপ্রতিষ্ঠা; সমালোচকদের কাছে এর কিছু উপাদান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য উদ্বেগজনক। এখানে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটিতেও নেতৃত্বের বৈধতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা নিয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে অবলীলায় অবসিত বলে ঘোষণা করাও বিশ্লেষণগত অপরিপক্বতা। প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার, সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব দেশটিকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।
অতএব, প্রকৃত প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটবে কি না, তা নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বে দেশটি তার শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করবে এবং নেতৃত্বকে কতটা দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবে।
৩. চীনের উত্থান : ক্ষমতার নতুন ব্যাকরণ
চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর সমকালীন ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়। শিল্পায়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, উৎপাদনক্ষমতা, রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের সমন্বয়ে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
চীনের উত্থান প্রচলিত ক্ষমতাতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে : অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। তবে এই উত্থানের সঙ্গে আবাসন খাতের দুর্বলতা, জনসংখ্যার বার্ধক্য, ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিরোধও যুক্ত। সুতরাং চীনের ভবিষ্যৎকে অনিবার্য বিজয়ের কিংবা নিশ্চিত অবক্ষয়ের কোনো একমাত্রিক বয়ানে আবদ্ধ করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তির মানদণ্ড এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি কেবল দুই রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণের সংগ্রাম। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় মধ্যবর্তী ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে। নিরাপত্তায় এক পক্ষের সহযোগিতা এবং অর্থনীতিতে অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরতা তাদের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে জটিল করে তোলে।
এখানেই বিশ্ব রাজনীতির প্রকৃত বিস্ময়—পরাশক্তির দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে কেবল বৃহৎ রাষ্ট্র নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি রাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৪. যুদ্ধের অন্তর্লীন বৈপরীত্য : রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর ইউরোপীয় নিরাপত্তা, সামরিক জোট, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যবাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। এই সংঘাতের তাৎপর্য কেবল ভূখণ্ডগত বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখিয়েছে, সামরিক শক্তির বিপুল সমাবেশ সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্রুত অর্জন নিশ্চিত নয়। প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের গতিপথকে জটিল করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও সর্বাংশে নিশ্চিত নয়। বিকল্প বাজার, বাণিজ্যপথ এবং আর্থিক সম্পর্কের মাধ্যমে লক্ষ্যরাষ্ট্র চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর করার কৌশলও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়কে গৌণ করে দেখা অনৈতিক। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ এবং ভবিষ্যৎবঞ্চিত প্রজন্মের দুর্দশায়।
সামরিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈপরীত্য হলো, এক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্যোগ অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে। এই চক্রকে নিরাপত্তা-দ্বিধা বলা হয়।
অতএব, স্থায়ী শান্তির জন্য সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য।
৫. গণতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও জনরায়ের বিস্ময়
গণতন্ত্রের বিস্ময় নিহিত রয়েছে তার অনিশ্চিত জনরায়ে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি কখনো জনগণের আস্থাহীনতায় পর্যুদস্ত হয়; আবার প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে আসা কোনো নেতৃত্ব ব্যাপক সমর্থন অর্জন করে ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করতে পারে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, অভিবাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা ভোটারদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রচলিত পূর্বাভাস অনেক সময় বাস্তবতার অভিঘাতে ভেঙে পড়ে।
জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি জনগণের বঞ্চনা ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারে। কিন্তু কোনো নেতা নিজেকেই জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ বিপন্ন হয়। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; এটি সংখ্যালঘুর অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার জবাবদিহির সমন্বিত কাঠামো।
সুতরাং কোনো নেতার জনপ্রিয়তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হতে পারে না। নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতা অর্জনে নয়, ক্ষমতার সীমা মেনে চলার মধ্যে নিহিত।
৬. জাতিসংঘ : বিশ্ববিবেকের সীমাবদ্ধতা
জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এর অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাঠামোগত বৈষম্য সৃষ্টি করে। বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাতের কারণে কোনো কোনো সংকটে কার্যকর সম্মিলিত পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হয়।
এখানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিহাসটি স্পষ্ট: বিশ্বশান্তি রক্ষার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে, তার কার্যকারিতাই অনেক সময় নির্ভর করে প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলোর সম্মতির ওপর।
তবু জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করা বাস্তবতাবিবর্জিত। এর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি কূটনৈতিক যোগাযোগ, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অপরিহার্য ক্ষেত্র। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, প্রতিনিধিত্বের সম্প্রসারণ, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমান প্রয়োগ বিশ্বব্যবস্থাকে অধিকতর ন্যায়সংগত করতে পারে।
৭. বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগক্ষেত্রে। বঙ্গোপসাগর, বৃহৎ জনসংখ্যা, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রেখেছে। চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং উন্নয়নের বিভিন্ন মাত্রায় তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা কৌশলগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে। তাই বহুমুখী বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মোকাবিলা ছাড়া ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনাকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা কঠিন।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু ভৌগোলিক অবস্থানে নয়; বরং জনগণের দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সক্ষমতায় নিহিত।
৮. প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন আধিপত্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল নজরদারি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাতত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করতে পারে। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে; ব্যাপক নজরদারি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে।
একই প্রযুক্তি যেমন অপপ্রচারের অস্ত্র, তেমনি সত্য যাচাইয়ের উপকরণও হতে পারে। অতএব, প্রযুক্তির ফলাফল নির্ভর করে তার নৈতিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তখনই মানবকল্যাণে অবদান রাখবে, যখন উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় ঘটবে।
উপসংহার : আধিপত্যের ঊর্ধ্বে মানবতার জয়
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস মূলত ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ইতিহাস। কোনো রাষ্ট্র চিরকাল আধিপত্য বজায় রাখতে পারে না; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে না। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক প্রমাণ করে, শক্তির স্থায়িত্ব নির্ভর করে আত্মসংশোধন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ওপর।
কিন্তু ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—মানুষের জন্য রাজনীতির প্রকৃত অর্থ কী? যে রাজনীতি মানুষের জীবনকে কৌশলগত উপকরণে পরিণত করে, যে কূটনীতি মানবিক বিপর্যয়কে সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের আড়ালে লুকিয়ে রাখে এবং যে আধিপত্য দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করে, তা দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারে না।
বিশ্বের সামনে আজ প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যা জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করবে না; এমন এক কূটনৈতিক সংস্কৃতি, যা শক্তির পাশাপাশি ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেবে এবং এমন এক নেতৃত্ব, যা ক্ষমতার বিস্তার নয়, মানবিক মর্যাদার সুরক্ষাকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এই উপলব্ধি অপরিহার্য। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কার্যকর অবস্থান অর্জন করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় কোনো সাম্রাজ্যের পতন কিংবা কোনো পরাশক্তির উত্থান নয়; বরং ধ্বংসের বিপরীতে মানুষের পুনর্গঠন, বৈরিতার বিপরীতে সহযোগিতা এবং অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অবিরাম আকাঙ্ক্ষা।
‘ক্ষমতার মুকুট ইতিহাসের হাতে বারবার স্থানান্তরিত হয়; কিন্তু মানবতার বিচারসভায় কোনো আধিপত্যই চিরস্থায়ী অব্যাহতি পায় না। বিশ্ব রাজনীতির চূড়ান্ত সার্থকতা তাই আধিপত্যের প্রতিষ্ঠায় নয়; ন্যায়বিচার, শান্তি ও মানবিক মর্যাদার বিজয়ে।’
লেখক : প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, গবেষক ও সমাজসেবক।
বিশ্ব রাজনীতির বিস্ময় নিহিত রয়েছে এই বৈপরীত্যের অন্তঃসারশূন্যতায় নয়, বরং তার অন্তর্গত কার্যকারণ-শৃঙ্খলে। রাষ্ট্রের উত্থান-পতন, পরাশক্তির মেরুকরণ, যুদ্ধের অনভিপ্রেত পরিণতি, গণতান্ত্রিক জনরায়ের আকস্মিক অভিঘাত এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় সম্প্রসারণ—সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এমন এক পরিবর্তনশীল সমীকরণে আবদ্ধ, যার কোনো চূড়ান্ত সমাধান নেই।
একুশ শতকের বিশ্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার পুরোনো রাজনৈতিক অভিধানকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি ন্যায়সংগত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অভ্যুদয়, নাকি আধিপত্যের পুরোনো ব্যাকরণে নতুন শক্তির অনুপ্রবেশ? এই অনুসন্ধানই বিশ্ব রাজনীতির বিস্ময়কে গভীরতরভাবে উপলব্ধি করার প্রধান অবলম্বন।
১. ইতিহাসের অমোঘ পরিহাস : পরাশক্তির উত্থান ও অবক্ষয়
ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হলো, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু কোনো রাষ্ট্রের জন্য চিরস্থায়ী আবাসভূমি নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দীর্ঘকাল নিয়ন্ত্রণ করেছে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের আদর্শগত সংঘাত সামরিক প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং প্রভাববলয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতিকে বিভক্ত করেছিল।
কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি সেই ক্ষমতাকাঠামোর ভিত উপড়ে দেয়। যে রাষ্ট্র একসময় পশ্চিমা আধিপত্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তার ভাঙন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যকে সুদৃঢ় করে। এই ঘটনাকে ইতিহাসের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচনা করা ছিল দূরদৃষ্টির সীমাবদ্ধতা। কারণ কোনো পরাশক্তির পতন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবস্থার চূড়ান্ত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। বরং ক্ষমতার শূন্যস্থান নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নতুন মৈত্রী এবং নতুন সংঘাতের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
সোভিয়েত-পরবর্তী বিশ্বে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার কৌশলগত পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা প্রমাণ করেছে, ইতিহাস কখনো বিজয়ীর ঘোষণাপত্র অনুযায়ী অগ্রসর হয় না। ইতিহাসের নিজস্ব অন্তর্গত দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত ধারণার প্রাচীর ভেঙে নতুন বাস্তবতার জন্ম দেয়।
২. যুক্তরাষ্ট্র : আধিপত্যের মহিমা ও নেতৃত্বের সংকট
যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি। সামরিক সক্ষমতা, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে দেশটি বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু আধিপত্যের বহিরাবরণ যতই দৃঢ় হোক, তার অন্তর্গত কাঠামো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত নয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন এবং স্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাসমীকরণের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জাতীয়তাবাদী অবস্থান, অভিবাসননীতি, বাণিজ্যিক দর-কষাকষি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা মার্কিন রাজনীতিতে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের কাছে এই রাজনীতি জাতীয় স্বার্থের পুনঃপ্রতিষ্ঠা; সমালোচকদের কাছে এর কিছু উপাদান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য উদ্বেগজনক। এখানে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটিতেও নেতৃত্বের বৈধতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা নিয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে অবলীলায় অবসিত বলে ঘোষণা করাও বিশ্লেষণগত অপরিপক্বতা। প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার, সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব দেশটিকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।
অতএব, প্রকৃত প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটবে কি না, তা নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বে দেশটি তার শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করবে এবং নেতৃত্বকে কতটা দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবে।
৩. চীনের উত্থান : ক্ষমতার নতুন ব্যাকরণ
চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর সমকালীন ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়। শিল্পায়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, উৎপাদনক্ষমতা, রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের সমন্বয়ে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
চীনের উত্থান প্রচলিত ক্ষমতাতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে : অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। তবে এই উত্থানের সঙ্গে আবাসন খাতের দুর্বলতা, জনসংখ্যার বার্ধক্য, ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিরোধও যুক্ত। সুতরাং চীনের ভবিষ্যৎকে অনিবার্য বিজয়ের কিংবা নিশ্চিত অবক্ষয়ের কোনো একমাত্রিক বয়ানে আবদ্ধ করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তির মানদণ্ড এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি কেবল দুই রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণের সংগ্রাম। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় মধ্যবর্তী ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে। নিরাপত্তায় এক পক্ষের সহযোগিতা এবং অর্থনীতিতে অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরতা তাদের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে জটিল করে তোলে।
এখানেই বিশ্ব রাজনীতির প্রকৃত বিস্ময়—পরাশক্তির দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে কেবল বৃহৎ রাষ্ট্র নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি রাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৪. যুদ্ধের অন্তর্লীন বৈপরীত্য : রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর ইউরোপীয় নিরাপত্তা, সামরিক জোট, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যবাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। এই সংঘাতের তাৎপর্য কেবল ভূখণ্ডগত বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখিয়েছে, সামরিক শক্তির বিপুল সমাবেশ সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্রুত অর্জন নিশ্চিত নয়। প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের গতিপথকে জটিল করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও সর্বাংশে নিশ্চিত নয়। বিকল্প বাজার, বাণিজ্যপথ এবং আর্থিক সম্পর্কের মাধ্যমে লক্ষ্যরাষ্ট্র চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর করার কৌশলও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়কে গৌণ করে দেখা অনৈতিক। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ এবং ভবিষ্যৎবঞ্চিত প্রজন্মের দুর্দশায়।
সামরিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈপরীত্য হলো, এক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্যোগ অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে। এই চক্রকে নিরাপত্তা-দ্বিধা বলা হয়।
অতএব, স্থায়ী শান্তির জন্য সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য।
৫. গণতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও জনরায়ের বিস্ময়
গণতন্ত্রের বিস্ময় নিহিত রয়েছে তার অনিশ্চিত জনরায়ে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি কখনো জনগণের আস্থাহীনতায় পর্যুদস্ত হয়; আবার প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে আসা কোনো নেতৃত্ব ব্যাপক সমর্থন অর্জন করে ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করতে পারে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, অভিবাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা ভোটারদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রচলিত পূর্বাভাস অনেক সময় বাস্তবতার অভিঘাতে ভেঙে পড়ে।
জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি জনগণের বঞ্চনা ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারে। কিন্তু কোনো নেতা নিজেকেই জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ বিপন্ন হয়। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; এটি সংখ্যালঘুর অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার জবাবদিহির সমন্বিত কাঠামো।
সুতরাং কোনো নেতার জনপ্রিয়তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হতে পারে না। নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতা অর্জনে নয়, ক্ষমতার সীমা মেনে চলার মধ্যে নিহিত।
৬. জাতিসংঘ : বিশ্ববিবেকের সীমাবদ্ধতা
জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এর অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাঠামোগত বৈষম্য সৃষ্টি করে। বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাতের কারণে কোনো কোনো সংকটে কার্যকর সম্মিলিত পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হয়।
এখানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিহাসটি স্পষ্ট: বিশ্বশান্তি রক্ষার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে, তার কার্যকারিতাই অনেক সময় নির্ভর করে প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলোর সম্মতির ওপর।
তবু জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করা বাস্তবতাবিবর্জিত। এর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি কূটনৈতিক যোগাযোগ, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অপরিহার্য ক্ষেত্র। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, প্রতিনিধিত্বের সম্প্রসারণ, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমান প্রয়োগ বিশ্বব্যবস্থাকে অধিকতর ন্যায়সংগত করতে পারে।
৭. বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগক্ষেত্রে। বঙ্গোপসাগর, বৃহৎ জনসংখ্যা, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রেখেছে। চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং উন্নয়নের বিভিন্ন মাত্রায় তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা কৌশলগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে। তাই বহুমুখী বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মোকাবিলা ছাড়া ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনাকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা কঠিন।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু ভৌগোলিক অবস্থানে নয়; বরং জনগণের দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সক্ষমতায় নিহিত।
৮. প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন আধিপত্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল নজরদারি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাতত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করতে পারে। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে; ব্যাপক নজরদারি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে।
একই প্রযুক্তি যেমন অপপ্রচারের অস্ত্র, তেমনি সত্য যাচাইয়ের উপকরণও হতে পারে। অতএব, প্রযুক্তির ফলাফল নির্ভর করে তার নৈতিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তখনই মানবকল্যাণে অবদান রাখবে, যখন উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় ঘটবে।
উপসংহার : আধিপত্যের ঊর্ধ্বে মানবতার জয়
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস মূলত ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ইতিহাস। কোনো রাষ্ট্র চিরকাল আধিপত্য বজায় রাখতে পারে না; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে না। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক প্রমাণ করে, শক্তির স্থায়িত্ব নির্ভর করে আত্মসংশোধন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ওপর।
কিন্তু ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—মানুষের জন্য রাজনীতির প্রকৃত অর্থ কী? যে রাজনীতি মানুষের জীবনকে কৌশলগত উপকরণে পরিণত করে, যে কূটনীতি মানবিক বিপর্যয়কে সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের আড়ালে লুকিয়ে রাখে এবং যে আধিপত্য দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করে, তা দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারে না।
বিশ্বের সামনে আজ প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যা জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করবে না; এমন এক কূটনৈতিক সংস্কৃতি, যা শক্তির পাশাপাশি ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেবে এবং এমন এক নেতৃত্ব, যা ক্ষমতার বিস্তার নয়, মানবিক মর্যাদার সুরক্ষাকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এই উপলব্ধি অপরিহার্য। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কার্যকর অবস্থান অর্জন করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় কোনো সাম্রাজ্যের পতন কিংবা কোনো পরাশক্তির উত্থান নয়; বরং ধ্বংসের বিপরীতে মানুষের পুনর্গঠন, বৈরিতার বিপরীতে সহযোগিতা এবং অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অবিরাম আকাঙ্ক্ষা।
‘ক্ষমতার মুকুট ইতিহাসের হাতে বারবার স্থানান্তরিত হয়; কিন্তু মানবতার বিচারসভায় কোনো আধিপত্যই চিরস্থায়ী অব্যাহতি পায় না। বিশ্ব রাজনীতির চূড়ান্ত সার্থকতা তাই আধিপত্যের প্রতিষ্ঠায় নয়; ন্যায়বিচার, শান্তি ও মানবিক মর্যাদার বিজয়ে।’
লেখক : প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, গবেষক ও সমাজসেবক।