জে-১ ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি, হার্ভার্ড-ইয়েলসহ ৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ , অনলাইন ভার্সন
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি গবেষক নিয়োগ, বেতন কাঠামো ও ভিসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তদন্তের আওতায় রয়েছে হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিসহ (এমআইটি) দেশটির বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জে-১ ভিসার অপব্যবহার, বিদেশি গবেষকদের তুলনামূলক কম বেতনে নিয়োগ এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন পাঠিয়েছে মার্কিন শ্রম বিভাগ।

তদন্তে বিদেশি সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব, গবেষণার অর্থায়ন এবং সংবেদনশীল গবেষণার তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জে-১ ভিসায় অবস্থানরত বাংলাদেশি গবেষকদের ক্ষেত্রে নিয়োগ, ভিসা স্পনসরশিপ ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তদন্তাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিস ক্যাম্পাস, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক) এবং অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, হোয়াইট হাউসে তদন্তের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর অভিযোগ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জে-১ ভিসা কর্মসূচির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদেশি গবেষকদের তুলনামূলক কম বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। এতে মার্কিন গবেষক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বেতন কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভ্যান্সের দাবি, একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে মার্কিন গবেষকেরা জে-১ ভিসায় আসা বিদেশি গবেষকদের তুলনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার ডলার বেশি আয় করেন।

মার্কিন শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তাধীন নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত পোস্টডক্টরাল গবেষকদের প্রায় ৬১ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি গবেষকদের সংখ্যা বেশি হওয়া নিজে থেকেই কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ নয়। তদন্তের মাধ্যমে নিয়োগের শর্ত, বেতন এবং ভিসা কর্মসূচির নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।

মার্কিন শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শক অ্যান্থনি ডি’এসপোসিতো জানিয়েছেন, তদন্তাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন পাঠিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া, বেতন, ভিসা স্পনসরশিপ এবং গবেষণার অর্থায়নসংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, জে-১ ভিসার আওতায় গবেষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত কর্মসংস্থান ও বেতনসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে কি না। পাশাপাশি বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংবেদনশীল গবেষণার তথ্য সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করতে শ্রম বিভাগ ‘ভিসা ফ্রড স্ট্রাইক টিম’ নামে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বিচার বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্ত থাকবেন। জে-১ ও এইচ-১বি ভিসাসহ কর্মসংস্থানসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভিসা কর্মসূচিতে সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

এদিকে তদন্তের বিষয়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন ও কর্মসংস্থান আইন মেনেই বিদেশি গবেষকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। স্ট্যানফোর্ড, ইয়েল, ব্রাউন এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিস ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে। এমআইটির বক্তব্য, তাদের প্রতিষ্ঠানে জে-১ ভিসায় আসা গবেষকেরা মার্কিন সরকারের অনুমোদন নিয়েই গবেষণায় অংশ নেন। আন্তর্জাতিক গবেষকদের অবদান যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে।

জে-১ ভিসা কেন গুরুত্বপূর্ণ
জে-১ ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ভিত্তিক একটি ভিসা কর্মসূচি। এর আওতায় বিদেশি শিক্ষার্থী, অধ্যাপক, গবেষক, পোস্টডক্টরাল ফেলো এবং প্রশিক্ষণার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশটিতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পান। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গবেষকদের অংশগ্রহণের জন্য এ কর্মসূচি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা এই ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান। ফলে নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শুরু হওয়া তদন্তের প্রভাব শুধু মার্কিন গবেষক নিয়োগনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আন্তর্জাতিক গবেষকদের সুযোগ-সুবিধার ওপরও পড়বে—সেদিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি নাগরিকেরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের একটি অংশ জে-১ ভিসায় অবস্থান করছেন। তদন্তের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন গবেষক নিয়োগ, ভিসা স্পনসরশিপ, গবেষণা চুক্তি নবায়ন কিংবা নিয়োগের শর্ত যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় বাড়তি সতর্কতা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত তদন্তাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জে-১ ভিসা কর্মসূচি স্থগিত করা কিংবা বৈধ ভিসাধারীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই তদন্ত শুরু হওয়াকে বিদ্যমান ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের জন্য ভিসার মেয়াদ, ডিএস-২০১৯ ফরম, নিয়োগপত্র এবং গবেষণা কর্মসূচির শর্তাবলি হালনাগাদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই তদন্তের উদ্দেশ্য নয়। বরং ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার বন্ধ করা, মার্কিন কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং সরকারি অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। প্রশাসনের দাবি, সরকারি অনুদান ও ভিসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনের সুযোগ থাকলে তা বন্ধ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাসংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে, অতিরিক্ত কড়াকড়ি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক মেধাবীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে। গবেষণার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। নিয়োগ ও ভিসা প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত বাধা তৈরি হলে গবেষণা কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এখন পর্যন্ত তদন্তাধীন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্ত শেষে কী ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।

তবে এই তদন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশি গবেষকদের ভূমিকা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, সরকারি অর্থায়নের জবাবদিহি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তদন্তের পরিধি ও ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এর বাস্তব প্রভাবও আরও পরিষ্কার হবে।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]