শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী,
ভূ-রাজনীতির এক জটিল মুহূর্তে, যেখানে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, বিশাল আলোচিত মক্কা প্যাক্ট, কিরগিজস্তানের সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বার্ষিক সভায় রাশিয়া, চীন এবং ভারতের আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিন্ন ভাষা, দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে আপনার অনুপস্থিতি; আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুটিল বাড়ি জাতিসংঘে ভাষণ দিতে এসেছেন। আপনার ভাষণ জাতির কতটুকু উপকার হবে, সেটা বলতে না পারলেও একটি কথা বলতে পারি, অতি আলোচিত মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া, আপনার একটি সিদ্ধান্ত ১৮ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য একটি বাঁচা-মরার প্রশ্ন। আমার প্রত্যাশার কথা বলার আগে আপনার একটি বক্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সতেরো বছরের প্রবাসজীবনে আপনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমে খুব একটা আসতেন না, কিন্তু ২০২৫ সালের ৬ ও ৭ অক্টোবর, বহুল আলোচিত বিবিসির সঙ্গে আপনার দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি আমি গভীরভাবে মনে রেখেছি। বিবিসির কাদির কল্লোল আপনাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে আপনি বলেছিলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায়।’
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী, আপনি ছয় মাসের অধিককাল ক্ষমতায়, আপনার সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কি সত্যিই দেশের স্বার্থেই পরিচালিত হচ্ছে? বাংলাদেশের স্বার্থ কোনটি, সেটা কে ঠিক করবে—আপনি, আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নাকি আপনার আমলারা? পররাষ্ট্রনীতির পরিধি অনেক বড়, কিন্তু আমি শুধু আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো তুলে ধরে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
জাতীয় নিরাপত্তা : আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসতে পারে। মিয়ানমার এবং আমরা সামরিক সক্ষমতায় প্রায় সমান সমান, কিন্তু ভারতকে নিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের সংশয় রয়েছে। এর মধ্যে আপনার দল বিএনপি এবং জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলোও রয়েছে। অবশ্য আপনার দলের ভারতবিরোধী হওয়ার কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আপনার পিতা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর ভারত সদয় ছিল না। এক-এগারোতে সামরিক হস্তক্ষেপে ভারতের ভূমিকা ছিল। গত সতেরো বছর একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ পর্যন্ত করেছিল ভারত এবং সেদেশে মুসলিম বিদ্বেষ আমাদের দেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের অন্যতম কারণ। কিন্তু এসব একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ভুল কূটনৈতিক আচরণ, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। ভারত কখনোই আমাদের দেশে সামরিক অভিযান বা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার কোনো হুমকি না আসে। প্রশ্ন আসতে পারে, এটার নিশ্চয়তা কী?
ভূ-রাজনীতিতে শতভাগ নিশ্চয়তা বলতে কিছু নেই, কিন্তু ভারত বিনা উসকানিতে আমাদের আক্রমণ করবে না কতগুলো কারণে—এ জাতিকে পরাধীন করে রাখার সাধ্য তাদের নেই, অর্থনৈতিকভাবে কিছু অর্জন করার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না, এ অঞ্চলে পাকিস্তান বা চীন স্থায়ীভাবে ঘাঁটি করার সুযোগ পাবে। তবে আমেরিকা, রাশিয়াসহ সব দেশই চায় তার প্রতিবেশী তাদের অনুগত থাকুক, ভারতও ব্যতিক্রম নয়। আমরা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে আরেকটি দেশ ডেকে আনাটা আমাদের নিরাপত্তার জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
‘মক্কা প্যাক্ট’ প্রথম মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। তাই এটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য এবং কোনো কোনো রাষ্ট্রের জন্য হয়তো আশীর্বাদও। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে আমাদের জন্য নয়। বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত হলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। আমরা যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়ে যাব। গত ৭ আগস্ট ২০২৬, পবিত্র নগরী মক্কায় ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়। কাদেরকে প্রতিপক্ষ ভেবে এই জোট গঠিত হয়, সে কথা বলা না হলেও ভারত, ইসরায়েল, গ্রিস এবং কারও কারও দৃষ্টিতে ইরান এর লক্ষ্য। এর মধ্যে পাকিস্তানের দৃষ্টি শুধু ভারত, কারণ তাদের সঙ্গে গ্রিস বা ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা ক্ষীণ। তুরস্কের দৃষ্টি গ্রিস ও ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের ইসরায়েল ও ইরান। এদের সঙ্গে ভারতের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা নেই। অন্যদিকে ভারত, ইসরায়েল, গ্রিস এবং সাইপ্রাসও বসে নেই। তারাও পাল্টা সামরিক জোট গঠনের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আরব আমিরাত ও ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিয়াকে বিভক্ত করা সোমালিল্যান্ড থাকলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে জোট গঠিত হলে সেটা মক্কা জোটের চেয়ে শক্তিশালী হবে। কারণ ইসরায়েল ও ভারতের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সক্ষমতা ব্যাপক।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা এই জোটকে কীভাবে দেখে? ইসরায়েল কিছু অপছন্দ করলে আমেরিকা কি পছন্দ করতে পারে? তবে আমেরিকা এই জোটকে আপাতত আশীর্বাদ দিচ্ছে এক বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। সে পরিকল্পনাটা গত ৪ সেপ্টেম্বর এক্সিওস নিউজের ব্যারাক রেভিড প্রকাশ করেছে, ‘ঞৎঁসঢ় ধফসরহরংঃৎধঃরড়হ ফৎধভঃরহম ঢ়ড়ংঃ-ধিৎ গরফফষব ঊধংঃ ঢ়ষধহ’, (অীরড়ং ঘবংি, ঝবঢ় ০৪, ২০২৬). ব্যারাক রেভিডের ওই খবরের বিস্তারিতে বলা হয়, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক জোটকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে এবং এ কাজে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। এখন এই মক্কা জোট যদি ইরানের বিরুদ্ধে কাজ না করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করে, তাহলে আমেরিকা কী করবে সেটা বোঝার জন্য কোনো জ্ঞানের দরকার হয় না। আরেকটি বিষয় আপনি নিশ্চয় জানবেন, আমেরিকার বড় বড় থিংকট্যাংক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অর্থজোগানদাতারা কত শক্তিশালী এবং তারা কোন দেশের পক্ষে কাজ করে। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার পরীক্ষিত বন্ধু, আর ভারত ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের, কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষের ওই ক্ষমতাশালী লোকজন পাকিস্তানকে ফেলে দিয়ে ভারতকে ওয়াশিংটনের পরম বন্ধু বানিয়ে দেয়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান পাকিস্তান-প্রেম নিছক একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, অদূর ভবিষ্যতে আবার পাকিস্তানকে ফেলে দিয়ে ভারতকে টেনে নিয়ে আসবে, সেটা শতভাগ নিশ্চিত।
আবার মক্কা জোটে একমাত্র সৌদি আরব ছাড়া বাকি দুটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে আদৌ শক্তিশালী নয়, সৌদি আরব কত দিন এককভাবে ব্যয়ভার বহন করবে, সেটাও দেখার বিষয়।
মক্কা জোটের কার্যকারিতা ইতিমধ্যেই অসাড় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ইয়েমেনের হুতিরা যেভাবে সৌদি আরবের স্থাপনাসমূহের ওপর হামলা করে ধ্বংসস্তূপ করে দিয়েছে, তাতে দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তান, সৌদি আরব বা তুরস্ক যাই অনুরোধ করুক, আমরা জোটে যোগ দেব কি না সেটা একান্ত আপনার ওপরই নির্ভর করে। আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয়গণ বলেছেন, বাংলাদেশকে জোটে আমন্ত্রণ জানালে ইতিবাচকভাবে দেখা হবে। এটা হয়তো ভারতকে চাপে রাখার কৌশল; কিন্তু আপনার দলের অনেক নেতাকর্মী, বিরোধী দল, এনসিপি, একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, কিছু গণমাধ্যম মক্কা প্যাক্টে যোগ দিতে জনমত গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সস্তা জনমত বা ভারত বিরোধিতা না করে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আপনি দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করি। আমি পক্ষ-বিপক্ষের কিছু সাধারণ আলোচনা করতে চাই :
পক্ষে : (১) আমরা একটি মুসলিম সামরিক জোটের সদস্য, সুতরাং আমাদেরকে আক্রমণ করার কেউ সাহস করতে নাও পারে, (২) ভারত আক্রমণ করলে মক্কা জোট আমাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে, (৩) আমরা তুরস্ক বা পাকিস্তান থেকে কিছু প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রযুক্তি পেতে পারি বা তারা আমাদের দেশে কিছু বিনিয়োগ করতে পারে। (৪) জোটে যোগ দেওয়ায় আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আরও কিছু শ্রমবাজারের অংশ পেতে পারি, ফলে আমাদের কিছু রেমিট্যান্স বাড়বে, (৫) আমরা ডিসকাউন্টে কিছু জ্বালানি সরবরাহ পেতে পারি, (৬) আমরা মুসলিম জাতীয়তাবাদ উন্মেষের অংশীদার হতে পারলাম।
বিপক্ষে : (১) পাকিস্তান বা তুরস্ককে আমাদের মাটিতে সামরিক ঘাঁটি করতে দিতে হবে। এতে দেশ যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ কাশ্মীর ও সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের আরেকটি যুদ্ধ অনিবার্য। (২) আমাদের সামরিক ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, যেখানে আমরা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছি। (৩) সাম-রিক আক্রমণ না করলেও দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারত তার সব অস্ত্রই ব্যবহার করবে। (৪) খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানিবণ্টন, সীমান্ত সমস্যা আরও অধিক জটিল হবে। (৫) যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের বিনিয়োগ বন্ধ এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। (৬) বিশ্বব্যাপী ইসরায়েল ও ভারতের প্রভাবে আমাদের বাণিজ্য সংকুচিত হবে। (৭) পাকিস্তানের সহায়ক হয়ে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হব না। (৮) আমাদের তিন দিকে বেষ্টিত ভারতের সঙ্গে একটা দীর্ঘ বৈরিতা নিয়েই বসবাস করতে হবে।
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী, আপনার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান মডেলটি বিবেচনায় নিতে পারেন। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত জোট নিরপেক্ষ থেকেছে এবং পণ্ডিত নেহরু ছিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম একজন নেতা। সময়ের প্রয়োজনে ভারত বড় বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতি, বাণিজ্য, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু সামরিক সংঘাতের শঙ্কার পথ থেকে দূরে থেকেছে। তবে পাকিস্তানের প্রশ্ন ভিন্ন। ২০০৬-০৭ সাল থেকে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্টে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে এবং ওইসব লেখালেখি পত্রিকাওয়ালাদের নিজস্ব কিছু নয়, পেন্টাগন বা সিআইএর অদৃশ্য নির্দেশেই লেখা হতো। তারাই চীনকে মোকাবিলা করার জন্য সহায় শক্তি হিসেবে পার্শ্ববর্তী ভারতকে বেছে নেয়। তারপরই শুরু হয় জর্জ বুশ, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, ট্রাম্পের ১.০ ভারত সফর। পুরস্কার হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি প্রযুক্তি, যৌথ সামরিক প্রকল্প, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা ইত্যাদি দিয়ে ভারতকে আয়ত্তে রাখতে চেষ্টা। তারা ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান নিয়ে কোয়াড গঠন করতে চায়, নতুন করে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি সাজায়, কিন্তু ভারত সবকিছুতে রাজি থাকলেও চীনের সঙ্গে সাম-রিক সংঘাতে জড়াতে রাজি হয়নি। তারা জানে, তাদেরকে আজীবন চীন ও পাকিস্তানের পাশাপাশিই বসবাস করতে হবে। অবশেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ডকট্রিন প্রকাশ করে। তাদের সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত না থাকলে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে যথেষ্ট মূল্য দিতে হবে। তারা সেখান থেকে সরে গিয়ে শুধু পশ্চিম গোলার্ধের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে বলে ডকট্রিনে লেখা হয়, কোয়াড গঠনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, ট্রাম্পের কোয়াড সম্মেলনে ভারত আসার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির নাম পরিবর্তন করে শুধু প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি করে তাদের কাছে ভারতের সামরিক গুরুত্ব অনেকাংশে কমে যায়। ভারতের এ নিরপেক্ষতার উদাহরণটির অর্থ এই নয় যে ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে উদার বা নিরপেক্ষ, তারা সবখানেই তাদের অনুগত সরকার ও বাণিজ্য চায়, যাতে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। আর বর্তমানে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে নিয়ে ভারত যা করছে, তা একটি টিকটক খেলা। ভারতে বসে শেখ হাসিনা যা করছেন, তা নিয়ে আপনার সরকারের এতটা মাথাব্যথা একটি অপরিপক্ পররাষ্ট্রনীতি বলে মনে হয়, যেমনটি শেখ হাসিনা আপনার লন্ডনে বসে বক্তব্য নিয়ে করেছিলেন। শেখ হাসিনার না হয় গণভিত্তি বা পায়ের তলায় মাটি ছিল না, কিন্তু আপনার সরকারের প্রতিক্রিয়াটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সবশেষে আমি আশা করি, আপনি দেশের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবেন। আপনার সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তার বিপক্ষে কিছু না করে, তাহলে আপনি অতি সহজেই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যেমন পানিবণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, খাদ্য সহায়তাসহ সবকিছু সহজেই সম-াধান করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। -নিউইয়র্ক
ভূ-রাজনীতির এক জটিল মুহূর্তে, যেখানে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, বিশাল আলোচিত মক্কা প্যাক্ট, কিরগিজস্তানের সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বার্ষিক সভায় রাশিয়া, চীন এবং ভারতের আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিন্ন ভাষা, দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে আপনার অনুপস্থিতি; আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুটিল বাড়ি জাতিসংঘে ভাষণ দিতে এসেছেন। আপনার ভাষণ জাতির কতটুকু উপকার হবে, সেটা বলতে না পারলেও একটি কথা বলতে পারি, অতি আলোচিত মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া, আপনার একটি সিদ্ধান্ত ১৮ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য একটি বাঁচা-মরার প্রশ্ন। আমার প্রত্যাশার কথা বলার আগে আপনার একটি বক্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সতেরো বছরের প্রবাসজীবনে আপনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমে খুব একটা আসতেন না, কিন্তু ২০২৫ সালের ৬ ও ৭ অক্টোবর, বহুল আলোচিত বিবিসির সঙ্গে আপনার দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি আমি গভীরভাবে মনে রেখেছি। বিবিসির কাদির কল্লোল আপনাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে আপনি বলেছিলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায়।’
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী, আপনি ছয় মাসের অধিককাল ক্ষমতায়, আপনার সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কি সত্যিই দেশের স্বার্থেই পরিচালিত হচ্ছে? বাংলাদেশের স্বার্থ কোনটি, সেটা কে ঠিক করবে—আপনি, আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নাকি আপনার আমলারা? পররাষ্ট্রনীতির পরিধি অনেক বড়, কিন্তু আমি শুধু আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো তুলে ধরে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
জাতীয় নিরাপত্তা : আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসতে পারে। মিয়ানমার এবং আমরা সামরিক সক্ষমতায় প্রায় সমান সমান, কিন্তু ভারতকে নিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের সংশয় রয়েছে। এর মধ্যে আপনার দল বিএনপি এবং জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলোও রয়েছে। অবশ্য আপনার দলের ভারতবিরোধী হওয়ার কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আপনার পিতা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর ভারত সদয় ছিল না। এক-এগারোতে সামরিক হস্তক্ষেপে ভারতের ভূমিকা ছিল। গত সতেরো বছর একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ পর্যন্ত করেছিল ভারত এবং সেদেশে মুসলিম বিদ্বেষ আমাদের দেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের অন্যতম কারণ। কিন্তু এসব একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ভুল কূটনৈতিক আচরণ, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। ভারত কখনোই আমাদের দেশে সামরিক অভিযান বা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার কোনো হুমকি না আসে। প্রশ্ন আসতে পারে, এটার নিশ্চয়তা কী?
ভূ-রাজনীতিতে শতভাগ নিশ্চয়তা বলতে কিছু নেই, কিন্তু ভারত বিনা উসকানিতে আমাদের আক্রমণ করবে না কতগুলো কারণে—এ জাতিকে পরাধীন করে রাখার সাধ্য তাদের নেই, অর্থনৈতিকভাবে কিছু অর্জন করার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না, এ অঞ্চলে পাকিস্তান বা চীন স্থায়ীভাবে ঘাঁটি করার সুযোগ পাবে। তবে আমেরিকা, রাশিয়াসহ সব দেশই চায় তার প্রতিবেশী তাদের অনুগত থাকুক, ভারতও ব্যতিক্রম নয়। আমরা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে আরেকটি দেশ ডেকে আনাটা আমাদের নিরাপত্তার জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
‘মক্কা প্যাক্ট’ প্রথম মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। তাই এটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য এবং কোনো কোনো রাষ্ট্রের জন্য হয়তো আশীর্বাদও। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে আমাদের জন্য নয়। বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত হলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। আমরা যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়ে যাব। গত ৭ আগস্ট ২০২৬, পবিত্র নগরী মক্কায় ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়। কাদেরকে প্রতিপক্ষ ভেবে এই জোট গঠিত হয়, সে কথা বলা না হলেও ভারত, ইসরায়েল, গ্রিস এবং কারও কারও দৃষ্টিতে ইরান এর লক্ষ্য। এর মধ্যে পাকিস্তানের দৃষ্টি শুধু ভারত, কারণ তাদের সঙ্গে গ্রিস বা ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা ক্ষীণ। তুরস্কের দৃষ্টি গ্রিস ও ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের ইসরায়েল ও ইরান। এদের সঙ্গে ভারতের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা নেই। অন্যদিকে ভারত, ইসরায়েল, গ্রিস এবং সাইপ্রাসও বসে নেই। তারাও পাল্টা সামরিক জোট গঠনের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আরব আমিরাত ও ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিয়াকে বিভক্ত করা সোমালিল্যান্ড থাকলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে জোট গঠিত হলে সেটা মক্কা জোটের চেয়ে শক্তিশালী হবে। কারণ ইসরায়েল ও ভারতের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সক্ষমতা ব্যাপক।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা এই জোটকে কীভাবে দেখে? ইসরায়েল কিছু অপছন্দ করলে আমেরিকা কি পছন্দ করতে পারে? তবে আমেরিকা এই জোটকে আপাতত আশীর্বাদ দিচ্ছে এক বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। সে পরিকল্পনাটা গত ৪ সেপ্টেম্বর এক্সিওস নিউজের ব্যারাক রেভিড প্রকাশ করেছে, ‘ঞৎঁসঢ় ধফসরহরংঃৎধঃরড়হ ফৎধভঃরহম ঢ়ড়ংঃ-ধিৎ গরফফষব ঊধংঃ ঢ়ষধহ’, (অীরড়ং ঘবংি, ঝবঢ় ০৪, ২০২৬). ব্যারাক রেভিডের ওই খবরের বিস্তারিতে বলা হয়, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক জোটকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে এবং এ কাজে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। এখন এই মক্কা জোট যদি ইরানের বিরুদ্ধে কাজ না করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করে, তাহলে আমেরিকা কী করবে সেটা বোঝার জন্য কোনো জ্ঞানের দরকার হয় না। আরেকটি বিষয় আপনি নিশ্চয় জানবেন, আমেরিকার বড় বড় থিংকট্যাংক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অর্থজোগানদাতারা কত শক্তিশালী এবং তারা কোন দেশের পক্ষে কাজ করে। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার পরীক্ষিত বন্ধু, আর ভারত ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের, কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষের ওই ক্ষমতাশালী লোকজন পাকিস্তানকে ফেলে দিয়ে ভারতকে ওয়াশিংটনের পরম বন্ধু বানিয়ে দেয়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান পাকিস্তান-প্রেম নিছক একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, অদূর ভবিষ্যতে আবার পাকিস্তানকে ফেলে দিয়ে ভারতকে টেনে নিয়ে আসবে, সেটা শতভাগ নিশ্চিত।
আবার মক্কা জোটে একমাত্র সৌদি আরব ছাড়া বাকি দুটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে আদৌ শক্তিশালী নয়, সৌদি আরব কত দিন এককভাবে ব্যয়ভার বহন করবে, সেটাও দেখার বিষয়।
মক্কা জোটের কার্যকারিতা ইতিমধ্যেই অসাড় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ইয়েমেনের হুতিরা যেভাবে সৌদি আরবের স্থাপনাসমূহের ওপর হামলা করে ধ্বংসস্তূপ করে দিয়েছে, তাতে দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তান, সৌদি আরব বা তুরস্ক যাই অনুরোধ করুক, আমরা জোটে যোগ দেব কি না সেটা একান্ত আপনার ওপরই নির্ভর করে। আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয়গণ বলেছেন, বাংলাদেশকে জোটে আমন্ত্রণ জানালে ইতিবাচকভাবে দেখা হবে। এটা হয়তো ভারতকে চাপে রাখার কৌশল; কিন্তু আপনার দলের অনেক নেতাকর্মী, বিরোধী দল, এনসিপি, একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, কিছু গণমাধ্যম মক্কা প্যাক্টে যোগ দিতে জনমত গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সস্তা জনমত বা ভারত বিরোধিতা না করে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আপনি দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করি। আমি পক্ষ-বিপক্ষের কিছু সাধারণ আলোচনা করতে চাই :
পক্ষে : (১) আমরা একটি মুসলিম সামরিক জোটের সদস্য, সুতরাং আমাদেরকে আক্রমণ করার কেউ সাহস করতে নাও পারে, (২) ভারত আক্রমণ করলে মক্কা জোট আমাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে, (৩) আমরা তুরস্ক বা পাকিস্তান থেকে কিছু প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রযুক্তি পেতে পারি বা তারা আমাদের দেশে কিছু বিনিয়োগ করতে পারে। (৪) জোটে যোগ দেওয়ায় আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আরও কিছু শ্রমবাজারের অংশ পেতে পারি, ফলে আমাদের কিছু রেমিট্যান্স বাড়বে, (৫) আমরা ডিসকাউন্টে কিছু জ্বালানি সরবরাহ পেতে পারি, (৬) আমরা মুসলিম জাতীয়তাবাদ উন্মেষের অংশীদার হতে পারলাম।
বিপক্ষে : (১) পাকিস্তান বা তুরস্ককে আমাদের মাটিতে সামরিক ঘাঁটি করতে দিতে হবে। এতে দেশ যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ কাশ্মীর ও সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের আরেকটি যুদ্ধ অনিবার্য। (২) আমাদের সামরিক ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, যেখানে আমরা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছি। (৩) সাম-রিক আক্রমণ না করলেও দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারত তার সব অস্ত্রই ব্যবহার করবে। (৪) খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানিবণ্টন, সীমান্ত সমস্যা আরও অধিক জটিল হবে। (৫) যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের বিনিয়োগ বন্ধ এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। (৬) বিশ্বব্যাপী ইসরায়েল ও ভারতের প্রভাবে আমাদের বাণিজ্য সংকুচিত হবে। (৭) পাকিস্তানের সহায়ক হয়ে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হব না। (৮) আমাদের তিন দিকে বেষ্টিত ভারতের সঙ্গে একটা দীর্ঘ বৈরিতা নিয়েই বসবাস করতে হবে।
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী, আপনার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান মডেলটি বিবেচনায় নিতে পারেন। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত জোট নিরপেক্ষ থেকেছে এবং পণ্ডিত নেহরু ছিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম একজন নেতা। সময়ের প্রয়োজনে ভারত বড় বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতি, বাণিজ্য, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু সামরিক সংঘাতের শঙ্কার পথ থেকে দূরে থেকেছে। তবে পাকিস্তানের প্রশ্ন ভিন্ন। ২০০৬-০৭ সাল থেকে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্টে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে এবং ওইসব লেখালেখি পত্রিকাওয়ালাদের নিজস্ব কিছু নয়, পেন্টাগন বা সিআইএর অদৃশ্য নির্দেশেই লেখা হতো। তারাই চীনকে মোকাবিলা করার জন্য সহায় শক্তি হিসেবে পার্শ্ববর্তী ভারতকে বেছে নেয়। তারপরই শুরু হয় জর্জ বুশ, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, ট্রাম্পের ১.০ ভারত সফর। পুরস্কার হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি প্রযুক্তি, যৌথ সামরিক প্রকল্প, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা ইত্যাদি দিয়ে ভারতকে আয়ত্তে রাখতে চেষ্টা। তারা ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান নিয়ে কোয়াড গঠন করতে চায়, নতুন করে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি সাজায়, কিন্তু ভারত সবকিছুতে রাজি থাকলেও চীনের সঙ্গে সাম-রিক সংঘাতে জড়াতে রাজি হয়নি। তারা জানে, তাদেরকে আজীবন চীন ও পাকিস্তানের পাশাপাশিই বসবাস করতে হবে। অবশেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ডকট্রিন প্রকাশ করে। তাদের সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত না থাকলে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে যথেষ্ট মূল্য দিতে হবে। তারা সেখান থেকে সরে গিয়ে শুধু পশ্চিম গোলার্ধের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে বলে ডকট্রিনে লেখা হয়, কোয়াড গঠনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, ট্রাম্পের কোয়াড সম্মেলনে ভারত আসার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির নাম পরিবর্তন করে শুধু প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি করে তাদের কাছে ভারতের সামরিক গুরুত্ব অনেকাংশে কমে যায়। ভারতের এ নিরপেক্ষতার উদাহরণটির অর্থ এই নয় যে ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে উদার বা নিরপেক্ষ, তারা সবখানেই তাদের অনুগত সরকার ও বাণিজ্য চায়, যাতে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। আর বর্তমানে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে নিয়ে ভারত যা করছে, তা একটি টিকটক খেলা। ভারতে বসে শেখ হাসিনা যা করছেন, তা নিয়ে আপনার সরকারের এতটা মাথাব্যথা একটি অপরিপক্ পররাষ্ট্রনীতি বলে মনে হয়, যেমনটি শেখ হাসিনা আপনার লন্ডনে বসে বক্তব্য নিয়ে করেছিলেন। শেখ হাসিনার না হয় গণভিত্তি বা পায়ের তলায় মাটি ছিল না, কিন্তু আপনার সরকারের প্রতিক্রিয়াটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সবশেষে আমি আশা করি, আপনি দেশের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবেন। আপনার সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তার বিপক্ষে কিছু না করে, তাহলে আপনি অতি সহজেই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যেমন পানিবণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, খাদ্য সহায়তাসহ সবকিছু সহজেই সম-াধান করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। -নিউইয়র্ক