​প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিউইয়র্কে সু-স্বাগতম

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৭ , অনলাইন ভার্সন
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভবের পর এ পর্যন্ত দেশে যত নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল সামগ্রিক বিচারে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ র্নিাচন, যা দেশি-বিদেশি কমবেশি সকল নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের মতামতে ফুটে উঠতে দেখা যায়। এই নির্বাচনেই প্রথমবার দেশের ৬০ হাজারের বেশি নির্বাচনী কেন্দ্রের একটিও সহিংসতা বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ বা স্থগিত করতে হয়নি, যদিও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের কারণে অনেকেই নির্বাচনে ব্যাপক সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা করেছিলেন। জাতীয় নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করলে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র জনাব তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পথিকৃৎ বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হন জনাব তারেক রহমান। গত ১৭ আগস্ট নতুন সরকারের ছয় মাস পূর্তি হয়। নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়কে এককথায় গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক বলা যায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সূচনা করেন, যার মূলমন্ত্র হলো ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত হবেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদের অভিন্ন চিন্তা-চেতনায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশগড়ার কাজে সম্পৃক্ত করা। স্পষ্টত এটা ছিল ১৯৭৫ পূর্ববর্তী সরকারের বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিন্তাধারা থেকে ভিন্ন।

বাংলাদেশে বাঙালি জাতিগোষ্ঠী ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা, গারো, হাজং ইত্যাদি) বসতি রয়েছে। নৃতাত্ত্বিকভাবে ভিন্ন সেসব জনগোষ্ঠীর মানুষকে স্বীয় আত্মপরিচয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি ভুলে বাঙালি বানানোর চেষ্টা তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নতুন মন্ত্র তাদের সেই অসন্তোষ ও ক্ষোভ বহুলাংশে প্রশমিত ও দূরীভূত করে তাদেরকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতি বজায় রেখে একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশি হিসেবে বসবাসের পথ খুলে দেয়, যাকে দেশের সকল মানুষের মহামিলনের এক মাইলফলক বলা যায়।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সেই সুমহান আদর্শ ও মন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই আদর্শ ও মন্ত্রকে সাদরে গ্রহণ করেছেন বলেই এর ধারক-বাহক নেতৃবৃন্দ জনমানুষের এতটা প্রিয়। জনাব তারেক রহমানের পূর্বে শহীদ জিয়া এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া জনমানুষের অন্তরে কতটা গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্থান করে নিতে পেরেছিলেন, তা তাদের প্রয়াণোত্তর শেষকৃত্যে লাখো শোকাতুর মানুষের উপস্থিতি ও অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়।

বাংলাদেশের বিগত ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে জনাব তারেক রহমানকে নিজ দেশ ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর বাধ্য হয়ে সুদূর ইংল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। বিদেশে থাকাকালে স্বৈরশাসক একাধিকবার ‘বাপের বেটা’ হলে তাকে দেশে ফিরতে বলেন, যদিও সেটা ছিল তাকে হত্যা করার এক বিকৃত মনোবাসনা। স্বৈরশাসক জাতীয়তাবাদী এই নেতার বিপুল জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। সে কারণে তার পারিবারিক শাসন কায়েমের পথে বাধা হওয়া এই নেতাকে যেকোনোভাবে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা তার নিত্যদিনের ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে জনাব তারেক রহমানের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তাকে কালিমালিপ্ত করতে তাকে মহাদুর্নীতিবাজ, কুলাঙ্গার, সন্ত্রাসী ইত্যাকার মনগড়া নানা কুরুচিপূর্ণ বিশেষণে ভূষিত করে তাকে জনগণের কাছে নীচ, খাটো ও অপ্রিয় করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। এটা করে নিজের মান-সম্মান বৃদ্ধি না পেলেও স্বীয় প্রতিহিংসা জাহির করতে পেরে স্বৈরশাসককে অপার অনাবিল আনন্দ পেতে দেখা যায়, যাকে বিকৃত মানসিকতার এক ক্ল্যাসিক দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কীই-বা বলা যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বৈরশাসকের পিতা শেখ মুজিব কর্তৃক জিয়াউর রহমান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত হলেও স্বৈরশাসক তাকে ‘রাজাকার’, ‘পাকিস্তানের চর’ বলতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। শুনেছি, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ডে পড়ার সময় পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর গোলাপি গাত্রবর্ণের জন্য তার বন্ধুবান্ধবেরা তাকে ভালোবেসে ‘পিংকি’ বলে ডাকতেন। অথচ অনেকটা একই কারণে স্বৈরশাসক হাসিনা বেগম জিয়াকে ‘গোলাপি’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। মোদ্দা কথা, শেখ মুজিব ও তার পরিবারের কোনো সদস্য ছাড়া অন্য কেউ মর্যাদা ও সম্মান পান, সেটা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। সে কারণে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব নোবেলজয়ী ড. ইউনূসও তার চোখের বালি হয়ে ওঠেন।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, জিয়াউর রহমান, বেগম জিয়া, তারেক রহমান তাদের দেশপ্রেম, মার্জিত, বিনয়ী, মানসিক আচার-আচরণের কারণে জনমানুষের নয়নের মণি হয়েছেন আর স্বৈরশাসক ও তার পরিবারের সদস্যরা মানুষের ঘৃণা নিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।
নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর জনাব তারেক রহমানের সরকারের ছয় মাস পূর্তির অব্যবহিত পর ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এসেছেন, যে অধিবেশনের সভাপতি হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব খালিলুর রহমান। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে অধিবেশনের জেনারেল ডিবেট শুরু হবে। এই প্রেক্ষাপটে অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ও ভাষণ দান বাংলাদেশের জন্য যে কতটা গৌরবের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা বৃদ্ধি, বিশ্বে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সৃষ্ট সংকট লাঘবে এসব দেশে বর্ধিত আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা দান, যুদ্ধের আশু অবসানপূর্বক শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জলবায়ু পরিবর্তন তথা সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সহায়তার প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে জাপান, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ভেনেজুয়েলায় সংঘটিত ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি চিত্র বিশ্ববাসীর নজরে আনা হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিশেষ ট্যারিফ সুবিধা ও বর্ধিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ভাষণে গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ দেশবাসীর সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হলেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তার সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এটা ছাড়াও চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ হৃাস পাচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটাও সত্য, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া জঞ্জাল ও দুঃশাসনের চিত্র রাতারাতি বা ছয়-নয় মাসে পুরোপুরি বদলে দেওয়া যাবে, সেটা আশা করাও ঠিক হবে না। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে অন্তত প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নেই, এটা স্বীকার করতেই হবে।
বিগত সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নিউইয়র্ক সফরকালে যে ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির (ডিম ছোড়া, অশ্রাব্য গালিগালাজ ইত্যাদি) সৃষ্টি করা হয়, এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকলে সে ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কে স্বাগত জানাই।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]