প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যার প্রতি বর্তমান সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১০ , অনলাইন ভার্সন
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, তাঁদের অধিকার সংরক্ষণ এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি।

১. প্রবাসীদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করেন। তাই দেশে প্রবাসীদের মালিকানাধীন সম্পত্তি যাতে কেউ অবৈধভাবে দখল, আত্মসাৎ বা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিতে না পারে, সে জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
২. বিদেশগামী শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ : মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মাসিক ২,০০০ রিয়াল বেতন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রমিক প্রেরণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. ঢাকা বিমানবন্দরে নতুন রানওয়ে নির্মাণ : লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির স্বার্থে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি ভিত্তিতে একটি নতুন রানওয়ে নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে বিমান ওঠানামার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা আরও দ্রুত ও সহজ হবে।
৪. প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরের কাছে আধুনিক রেস্ট হাউস : ঢাকা বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসীদের সাময়িক অবস্থানের জন্য বিদ্যমান ৫০ আসনবিশিষ্ট রেস্ট হাউসকে সরকারের প্রস্তাবিত ২০০ আসনে দ্রুত উন্নীত করা এবং পূর্ণাঙ্গ কিচেন সুবিধাসহ আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সব প্রবাসী যেন প্রয়োজনে সেখানে নিরাপদে রাতযাপন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৫. রেস্ট হাউস থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ ও আধুনিক লাইটিং : রেস্ট হাউস থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণাধীন ৩০ ফুট প্রশস্ত সড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি পুরো সড়কে আধুনিক লাইটিং ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে প্রবাসী যাত্রীরা দিন-রাত নিরাপদ ও আলোকিত পরিবেশে বিমানবন্দরে যাতায়াত করতে পারবেন।
৬. সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলোর ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ : চট্টগ্রাম ও সিলেটের লাখ লাখ প্রবাসীর স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত এয়ারলাইনকে সিলেট ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে ঢাকার বিমানবন্দরে প্রবাসী যাত্রীদের অসহনীয় ভিড়, চাপ ও দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
৭. ঢাকা বিমানবন্দর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের মধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড সড়ক নির্মাণ : ঢাকা এয়ারপোর্ট ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী আন্ডারগ্রাউন্ড সড়কের নির্মাণকাজ রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা চালিয়ে দ্রুত সম্পন্ন করা হলে প্রবাসীরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সহজেই বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে যাতায়াত করতে পারবেন।
৮. দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া সহজীকরণ : দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সহজ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
৯. নিউইয়র্কে বাংলাদেশের একটি ব্যাংকিং শাখা বা ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ : প্রবাসীদের সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণের সুযোগ আরও সহজ ও কার্যকর করতে নিউইয়র্কে একটি বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা বা পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় প্রবাসীদের সঞ্চয়ী ও চলতি আমানতও বৃদ্ধি পাবে।
১০. বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন বাধ্যতামূলক করা : সরকার এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করুক, যার মাধ্যমে চাকরির উদ্দেশ্যে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের অন্তত একটি কারিগরি কাজ অথবা ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। এতে তাঁরা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে অধিক মর্যাদা ও বেশি উপার্জনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও আরও উজ্জ্বল হবে।
১১. গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি শহরে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ভবন ক্রয় : সরকারি অর্থের সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিউইয়র্কসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ৪-৫ তলা ভবন ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই ভবনে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী মিশন, কনস্যুলেট অফিস, সোনালী এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ বিমানের অফিস, ভিআইপি রেস্ট হাউস এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কার্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে। বর্তমানে ভাড়া করা ভবনগুলোর পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, নিজস্ব ভবন ক্রয় বা নির্মাণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
১২. প্রবাসীদের জন্য সংসদে আসন সংরক্ষণ ও ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ : প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক ও জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের প্রতিনিধিত্বের জন্য জাতীয় সংসদে ১০টি আসন সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১৩. ঢাকা-ম্যানচেস্টার-নিউইয়র্ক সরাসরি বিমান সার্ভিস চালু : প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা-ম্যানচেস্টার-নিউইয়র্ক রুটে সরাসরি বিমান সার্ভিস চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে।
১৪. প্রবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোতে প্লট বরাদ্দে কোটা : প্রবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ন্যায্যমূল্যে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
১৫. প্রবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় বিশেষ কোটা : প্রবাসী বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা দেশে ফিরে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতে সহজে ভর্তি হতে পারে, সে জন্য তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বা বিশেষ ভর্তি-সুবিধা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১৬. গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি শহরগুলোতে বাংলাদেশি দূতাবাস স্থাপন : বহির্বিশ্বের যেসব দেশের বড় বড় শহরে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, সেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস স্থাপনের জোর দাবি জানাচ্ছি। এতে প্রবাসীরা পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব, নথিপত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা আরও সহজে গ্রহণ করতে পারবেন।
প্রবাসীবান্ধব নীতিমালা এখন সময়ের দাবি
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ও বসবাসরত প্রবাসীরা নানা ধরনের সমস্যা ও জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা ও দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত প্রবাসীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : কমিমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]