স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনীতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছে। জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন, নিরাপত্তা পরিষদে দুবার সদস্য নির্বাচিত হওয়া, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং জলবায়ু ও উন্নয়ন কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা—প্রতিটি পর্যায়ে বাংলাদেশের সামনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা। সেই দীর্ঘ উত্তরাধিকার নিয়েই এখন তারেক রহমান সরকারের সামনে নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় রচনার সুযোগ। তবে বর্তমান বিশ্ব আগের তুলনায় অনেক বেশি বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারত-চীন সমীকরণ, রোহিঙ্গা সংকট, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং বিশ্বব্যবস্থায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান নিশ্চিত করা। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। একই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বড় অর্জন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একদিকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার বলয়ের অন্যদিকে অবস্থানের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতেও ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব, জোটনিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণ পায় গুরুত্ব।
এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৭৯-৮০ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া। পরে ২০০০-০১ মেয়াদে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়। জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও বাংলাদেশের এই দুই মেয়াদের সদস্যপদ উল্লেখ রয়েছে।
একই সময়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ সামনে আসে, যা ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এরপর ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে সার্ক ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হয়। ঢাকায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকে। সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, হাইতিসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিভিন্ন মেয়াদে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে তারেক রহমান সরকারের সামনে এসেছে ভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। এখন আর শুধু একটি বা দুটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ভারসাম্যের কূটনীতি হবে সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ জুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। গোপন ব্যালটে তিনি ৯৯ ভোট পান, আর সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিস পান ৯১ ভোট। ১৯০টি ব্যালটের মধ্যে কোনোটি বাতিল বা বিরত ছিল না। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পালাক্রমিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে এবার এই পদে বাংলাদেশের প্রার্থী নির্বাচিত হন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং ড. খলিলুর রহমান এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সভাপতিত্বের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বাস পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে মনোনয়ন ও প্রচারণায় সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জাতিসংঘে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য সৃষ্টি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দেন ড. খলিলুর রহমান।
তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান হলেও এটিকে বাংলাদেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই সুযোগকে জাতীয় স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে বড় বিষয়।
প্রথম পরীক্ষা হবে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়াতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কারণে চীন বা অন্য অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা যেন সংকুচিত না হয়—এই সমীকরণ সামলাতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্কও ধরে রাখতে হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা কূটনীতিকে অর্থনৈতিক ফলে রূপ দেওয়া। বিদেশ সফর, বৈঠক, যৌথ বিবৃতি ও সমঝোতা স্মারকের বাইরে বাংলাদেশের প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ, নতুন বাজার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষাও অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতার মূল্যায়ন শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব ফলাফলেও করতে হবে।
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি—তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি আলোচনায় রাখা এক বিষয়; নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথ তৈরি করা আরেক বিষয়। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থায়ন—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি শক্তি বা বলয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক সংকুচিত করতে পারে। তাই বাংলাদেশের কূটনীতিতে সম্পর্কের বিস্তার যেমন প্রয়োজন, তেমনি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যও জরুরি।
তারেক রহমান সরকারের সামনে এখন সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় লেখার সুযোগ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন হবে আরও কঠিন কিছু ফলের ভিত্তিতে—রোহিঙ্গা সংকটে অগ্রগতি, নতুন বাজার ও বিনিয়োগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক, প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকা কতটা বাড়ানো গেল তার ওপর।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি গত পাঁচ দশকে বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। এখন মূল পরীক্ষা সেই উপস্থিতিকে কতটা স্থায়ী, কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রূপ দেওয়া যায়। তারেক রহমান সরকারের কূটনৈতিক অধ্যায়ের স্বাতন্ত্র্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে সেই ফলের মধ্য দিয়েই।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং বিশ্বব্যবস্থায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান নিশ্চিত করা। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। একই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বড় অর্জন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একদিকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার বলয়ের অন্যদিকে অবস্থানের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতেও ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব, জোটনিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণ পায় গুরুত্ব।
এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৭৯-৮০ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া। পরে ২০০০-০১ মেয়াদে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়। জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও বাংলাদেশের এই দুই মেয়াদের সদস্যপদ উল্লেখ রয়েছে।
একই সময়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ সামনে আসে, যা ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এরপর ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে সার্ক ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হয়। ঢাকায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকে। সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, হাইতিসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিভিন্ন মেয়াদে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে তারেক রহমান সরকারের সামনে এসেছে ভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। এখন আর শুধু একটি বা দুটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ভারসাম্যের কূটনীতি হবে সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ জুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। গোপন ব্যালটে তিনি ৯৯ ভোট পান, আর সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিস পান ৯১ ভোট। ১৯০টি ব্যালটের মধ্যে কোনোটি বাতিল বা বিরত ছিল না। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পালাক্রমিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে এবার এই পদে বাংলাদেশের প্রার্থী নির্বাচিত হন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং ড. খলিলুর রহমান এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সভাপতিত্বের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বাস পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে মনোনয়ন ও প্রচারণায় সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জাতিসংঘে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য সৃষ্টি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দেন ড. খলিলুর রহমান।
তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান হলেও এটিকে বাংলাদেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই সুযোগকে জাতীয় স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে বড় বিষয়।
প্রথম পরীক্ষা হবে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়াতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কারণে চীন বা অন্য অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা যেন সংকুচিত না হয়—এই সমীকরণ সামলাতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্কও ধরে রাখতে হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা কূটনীতিকে অর্থনৈতিক ফলে রূপ দেওয়া। বিদেশ সফর, বৈঠক, যৌথ বিবৃতি ও সমঝোতা স্মারকের বাইরে বাংলাদেশের প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ, নতুন বাজার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষাও অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতার মূল্যায়ন শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব ফলাফলেও করতে হবে।
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি—তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি আলোচনায় রাখা এক বিষয়; নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথ তৈরি করা আরেক বিষয়। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থায়ন—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি শক্তি বা বলয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক সংকুচিত করতে পারে। তাই বাংলাদেশের কূটনীতিতে সম্পর্কের বিস্তার যেমন প্রয়োজন, তেমনি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যও জরুরি।
তারেক রহমান সরকারের সামনে এখন সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় লেখার সুযোগ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন হবে আরও কঠিন কিছু ফলের ভিত্তিতে—রোহিঙ্গা সংকটে অগ্রগতি, নতুন বাজার ও বিনিয়োগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক, প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকা কতটা বাড়ানো গেল তার ওপর।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি গত পাঁচ দশকে বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। এখন মূল পরীক্ষা সেই উপস্থিতিকে কতটা স্থায়ী, কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রূপ দেওয়া যায়। তারেক রহমান সরকারের কূটনৈতিক অধ্যায়ের স্বাতন্ত্র্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে সেই ফলের মধ্য দিয়েই।