​কাফকার শহর প্রাগে রবীন্দ্রনাথ ও কাফকা

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২২ , অনলাইন ভার্সন
‘ভ্রমণ শুধু চোখের জন্য নয়; এটি মন, আত্মা আর হৃদয়ের জন্যও এক বিশাল উপহার।’
প্রাগ অনেক দিন ধরেই আমাদের বাকেট লিস্টে ছিল। নিউইয়র্ক টু হেলসিংকি, হেলসিংকি থেকে বুদাপেস্ট খুব ভালো ডিলে ফ্লাইট পাওয়া গেল। আর বুদাপেস্ট থেকে ট্রেনে চড়ে খুবই কম খরচে প্রাগে আসা যায়। অনলাইনে সব বুকিং প্রায় মাস চারেক আগে করা হয়েছে। আগস্ট মাসের ১২ তারিখ জন এফ কেনেডি থেকে হেলসিংকি হয়ে বুদাপেস্ট পৌঁছে হোটেলে রেস্ট নিয়ে পরদিন বুদা আর পেস্টের কিছু স্পট ঘুরলাম। পরের দিন ১৪ তারিখ সকাল ১১টায় আমরা বুদাপেস্ট সেন্ট্রাল রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলাম। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে ট্রেনে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে যাচ্ছি। বহুদিন আগে স্বপ্ন দেখেছি, আজ তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। একদম সময়মতো ট্রেন ছেড়ে দিল। দানিউব নদী, পাহাড় আর লোকালয় ছেড়ে সর্পিল গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রেন। পাশে পাশে বয়ে চলছে দানিউব। একসময় দেখলাম মাইলের পর মাইল শুধু সূর্যমুখীর বাগান। বিকালে আমরা প্রাগে পৌঁছে হোটেলে পৌঁছালাম। হোটেল শহরের প্রান্তে। একদম হোটেলের সামনে থেকেই ট্রাম ছাড়ে।

প্রাগে এসে ১৫ আগস্ট সকালে যে কাজটা করলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খোঁজে চলে গেলাম ঠাকুরোভা রোড। ফেসবুকের বন্ধু ডাক্তার অঞ্জনা দিদির কাছে শুনেছি ট্রাম থেকে নেমে অল্প হেঁটে পৌঁছে যেতে পারব। হোটেলের সামনে থেকে ট্রামে উঠলাম। ঠাকুরোভা স্ট্রিটে মাথার উপর ঝলমলে রোদ নিয়েই ট্রামে এসে নামলাম। নেমে রাস্তা পার হয়ে একদিকে হাঁটছিলাম। উল্টো দিকে চলে গিয়েছিলাম। একটি মেয়ে আমাদের সাহায্য করল। মেয়েটি মনে হয় জিমে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলে নিজের ফোনে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির ছবি নিয়ে আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিল। ঠাকুরোভা স্ট্রিটের পাশেই পার্কের ঠিক মধ্যিখানে রবীন্দ্র ভাস্কর্য। এই পার্কটি একেবারে প্রাগের টেকনিক্যাল ইউনির্ভাসিটির দুয়ারে। দু’পাশে সারি সারি বনবীথিকা আর মাঝখানে বেদিতে ব্রোঞ্জনির্মিত বাস্ট। ছয় ফুট উঁচু বেদিতে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। একসময় দেখলাম, ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঁড়িয়ে। টাগোর না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখা। গাছেরা সেখানে পাতা দুলিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। প্রাগের ঠাকুরোভা স্ট্রিটের নামকরণ করা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত কবি এবং নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে। ঠাকুরোভা স্ট্রিট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির প্রতি একটি বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন। চেক বানানরীতি অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘রাবিন্দ্রনাথ থাকুর’ (Rabíndranáth Thákúr) বলা হয় এবং তাঁর নামেই এই রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ‘গীতাঞ্জলি’ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘুচিয়ে চেক বুদ্ধিজীবীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এই রাস্তাটি ১৯২১ এবং ১৯২৮ সালে প্রাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সফরকে স্মরণ করে, যা চেকোস্লোভাকিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল।

‘তুমি একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে
আমায় একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে।
আমি হাত জোড় করে রবো তোমার মুখোমুখি,
আমার এই যা কিছু কাজ আছে।’
মনে মনে গুনগুন করে কবির চারপাশে ঘুরলাম খানিক। ছবিও তুললাম। ভিডিও করলাম। তারপর চললাম অন‍্য প্রান্তে।

এ শহর কাফকার শহর, একদিকে এই শহরটা মোটামুটি একটা ফেইরি টেইলের মতো। প্রাগ ক্যাসেল থেকে যখন পুরো শহরটা দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম, কেন এই শহর প্রেমের শহর হিসেবে পরিচিত। এই সৌন্দর্য শুধু চোখের জন্য নয়, এটা এক অনুভূতির ব্যাপার। এই শহর দেখলে, অনুভব করলে মনে হয় যেন একটা মোহে আটকে যায়। প্রাগের প্রতিটি ইটে, প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি আকাশে যেন লুকানো আছে এক অজানা প্রেমের গল্প। কোবল স্টোনের পুরোনো পাথরের রাস্তা, মাথার উপর গথিক চূড়া, আর কোথাও থেকে ভেসে আসা কফির উষ্ণ ঘ্রাণ—এসব যেন এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। ক্যাসেল আর ক্যাসেল। প্রাগ ক্যাসেলের শহর। আজ রোদ বেশ কড়া। তাই হোটেলে ফিরে রেস্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। হোটেলের পাশের রেস্টুরেন্টে ডিনার করে নিলাম কিছুটা বিকেলবেলা।

পরদিন সকালে ট্রাম ছুটে চলল পুরোনো শহরে। প্রথমে কাফকার ওল্ডটাউনে ‘মাথাবিহীন কাফকা’র ভাস্কর্য দেখতে গেলাম। ওল্ডটাউনে তখনো পর্যটকদের ভিড় লাগেনি। কফির ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। তবে ফ্রানৎস কাফকাকে নিয়ে সবচেয়ে মোক্ষম ভাস্কর্যটির শিল্পী ইউরোস্যাভ রোনা। এটি রয়েছে প্রাগের ওল্ডটাউন আর ইহুদি কোয়ার্টারের একদম মাঝামাঝি জায়গায়। একপাশে স্প্যানিশ সিনেগগ। অন্য পাশে চার্চ অব দ্য হোলি স্পিরিট। এর ভেতর মাথাবিহীন একটা দেহের কাঁধে বসে আছেন মাথাওয়ালা কাফকা। ক্লান্ত চোখ। ডান হাতের তর্জনী কিছু নির্দেশ করছে। ১৯১২ সালে লেখা কাফকার ছোটগল্প ‘ডেসক্রিপশন অব অ্যা স্ট্রাগল’ গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী রোনা এ ভাস্কর্য গড়েছেন।

ওল্ডটাউনে ‘মাথাবিহীন কাফকা’র ভাস্কর্য : যে শহরে আছে চার্লস ব্রিজ, ক্লক টাওয়ার, আলবার্ট আইনস্টাইনের আবাসস্থল। ঘড়িটি জোডিয়াক ক্যালেন্ডার ও ঘড়ি দুটিই প্রদর্শন করে। প্রাগের এই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়ি পৃথিবীর একমাত্র ঘড়ি, যা আজও সময়, দিন, সপ্তাহ ও বছর প্রদর্শন করে আসছে। আমরা যখন ঘড়ির কাছে এসে দাঁড়ালাম, তখন বেলা ১২টা বাজার কয়েক মিনিট বাকি। হাজার হাজার উৎসুক ভ্রমণকারী ঘড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। ঠিক এগারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ঘড়ির পার্ট খুলে গেল। টুংটুং শব্দ করতে করতে পাখি, কঙ্কাল, বিভিন্ন পশুপাখি ও নারী-পুরুষের মূর্তি চক্রাকারে গান গাইতে লাগল। সে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।

ওল্ডটাউনের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটি বড় দরজার দেয়ালে চোখ আটকে গেল। দেয়ালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মুখচ্ছবি ও কিছু উক্তি খোদাই করা। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে এখানে দেখা হতো বিখ্যাত ফ্রানস্‌ৎ কাফকার।

আর এই ঘড়ির মতোই বিস্ময়কর প্রাগ শহরটিও, যেখানে ওল্ডটাউনের মধ্যযুগীয় দুর্গ আর প্রাসাদ থেকে শুরু করে আধুনিক কাচের অট্টালিকা পর্যন্ত সবই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আর এর রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবছর হাজারো মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। আজ হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় আবহাওয়া চেক করে ছাতা সাথে নিইনি। এখন হঠাৎই দেখি বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা ওল্ডটাউন স্কয়ার থেকে হোটেলে ফিরে ছাতা নিয়ে আবার বের হই। প্রাগের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট দুর্দান্ত। এই যাওয়া-আসা আমাদের চল্লিশ মিনিট পিছিয়ে দেয়, তবু আমরা পুষিয়ে নিতে পারি। ট্রাম প্রাগের মনোরম বাহন। রাস্তা আর ট্রামলাইন চলেছে পাশাপাশি। কী অপূর্ব এই স্ট্রিটকারের মায়াবী নেটওয়ার্ক। সারা শহরের অলিগলি, রাজপথ থেকে ক্রিসক্রসভাবে রঙিন সুন্দর সুন্দর ট্রাম চলে যাচ্ছে অনবরত। আর এরা কত সুন্দরভাবে এই যানটিকে ব্যবহার করে, সেটাই দেখার বিষয়। প্রাগের ট্রামের নেটওয়ার্ক চেক রিপাবলিকের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে বৃহৎ। প্রাগ হয়ে গেছে ‘দ্য সিটি অব কে’। শহরটি প্রাহা নামেও পরিচিত। এই শহরের ভেতর দিয়ে ৩১ কিলোমিটার পথে বয়ে গেছে ভালতাভা নদী, আর এপার ওপারের যোগসূত্র হিসেবে ভালতাভার ওপর দিয়ে চলে গেছে ষোলোটি মোহনীয় ব্রিজ।
শহরের কোয়াদ্রিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত ডেভিড চের্নির তৈরি কাইনেটিক, যা আধুনিক ১১ মিটার উঁচু ভাস্কর্য নিখুঁতভাবে কাফকার অবয়ব ফুটিয়ে তোলে, আবার কখনো কখনো এলোমেলো হয়ে যায়। ৩৯ টন ওজনের এই চলমান শিল্পকর্মটি ৪২টি স্টেইনলেস স্টিলের ঘূর্ণায়মান অংশ দিয়ে নির্মিত, যা সুনিপুণ গতিশীলতা সৃষ্টি করে ফ্রানৎস কাফকার মানসিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি। অন্য পর্যটকদের মতো বারবার বিস্ময়ভরে তাকিয়ে থাকি এর দিকে। খুঁজে পাই প্রিয় লেখকের পুনর্গঠিত চেহারা, যেখানে একদিকে ভঙ্গুরতা, অন্যদিকে দৃঢ়তা যেন একসঙ্গে লুকিয়ে আছে, একজন মানুষের মনোভাব, যা কাফকার লেখনীর মতোই জটিল এবং গভীর। মুহূর্তে মুহূর্তে কাফকার মুখটি ভেঙে যায়, আবার গড়ে ওঠে। ‘ভয়ংকর এক পৃথিবী আমি বয়ে চলেছি আমার মাথার মধ্যে। আমার নিজের ভেতর ওগুলো ধরে রাখার চেয়ে হাজার গুণ ভালো হয় মাথা ছিঁড়ে-কেটে টুকরো করে ফেলা।’

এই স্থাপত্যের নির্মাতা এই ডায়ালগ মাথায় নিয়েই এটি তৈরি করেছেন মনে হয়। এই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে তার মেটামরফোসিসের আরশোলায় রূপান্তরিত গ্রেগর সামসা ধীরে ধীরে অনিবার্যভাবে তার চেনা জগৎ থেকে, তার স্নেহশীল পারিবারিক বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ট্র্যাজেডি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে এই কারণে যে গ্রেগর নিজে সব বুঝতে পারে, অন্যের প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তীক্ষè হয়ে তার চেতনায় ধরা পড়ে, কিন্তু প্রবল ইচ্ছা ও চেষ্টা সত্ত্বেও সে তার নিজের মনোভাব, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও আবেগ-অনুভূতি কাউকে বোঝাতে সক্ষম হয় না। চিন্তা করে পাই না কীভাবে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি লিখেছেন। ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এ যেন শুধু একজন লেখকের মুখ নয়, তাঁর ভেতরের অস্থিরতারও একটি প্রতীক। পরিচিত মুখটি বারবার ভেঙে গিয়ে আবার তৈরি হচ্ছে, ঠিক যেন কাফকার নিজের সাহিত্যজগৎ। বাস্তবতা আছে, অথচ বাস্তবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত স্বপ্ন, ভয়, অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

ফ্রানৎস কাফকা, ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই প্রাগের এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক। ১৯০৬ সালের ১৮ জুলাই আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। কাফকার প্রিয় বিষয় ছিল দর্শন ও ধর্ম। ৪০ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া এই লেখককে বলা হয় সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের প্রবর্তক। তিনটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, কিছু ছোটগল্প, কিছু চিঠি ও দিনপঞ্জি—এত কম লিখে এবং বেঁচে থাকতে একটা উপন্যাসও সমাপ্ত না করার পরও কাফকা বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রধান চিরায়ত লেখকের স্থান পেয়ে গেছেন। আধুনিক সাহিত্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়ার কাজে আর পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য খ্যাতনামা লেখক সৃষ্টিতে তাঁর সমান আর কেউই নেই। এখন পর্যন্ত প্রায় ১২৫ জন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের এক-তৃতীয়াংশই তাঁদের লেখায় কাফকার প্রভাবের কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। শেক্‌সপিয়ারের পর আর কোনো লেখককে নিয়ে এতটা লেখালেখি হয়নি, যতটা হয়েছে কাফকাকে নিয়। কাফকা নিজেই বলেছেন, ‘ভয়ংকর’ এক পৃথিবী, এমন এক দুনিয়া, যেখানে ‘একটা খাঁচা আছে একটা পাখির সন্ধানে’। আমাদের মুক্তি ও বন্দিত্ব নিয়ে লেখা তাঁর এই ছোট প্রবচনের মধ্যেই ইঙ্গিত আছে এ জগৎ কোন অর্থে ভয়ংকর। মনে হয়, এখানেই হয়তো একদিন ঘুম ভেঙে গ্রেগর সামসা নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন এক বীভৎস পোকায় রূপান্তরিত হয়ে। ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর স্রষ্টা কাফকার জন্মভূমি প্রাহার প্রতি আমার মেয়ের আগ্রহ জন্মে ও যখন ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্ল্যাসিক লিটারেচার ক্লাস নিয়েছিল তখন।

বৃষ্টির পর রোদ উঠলে চার্লস ব্রিজে হাঁটছিলাম। হেঁটে হেঁটেই পার হলাম চার্লস ব্রিজ। পর্যটকদের ভিড়, ভলতাভা নদীর শান্ত জল, দূরে পুরোনো চার্চের চূড়া—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা ছিল অসাধারণ। অপর পাড়ে এসে চিমনি কেকের দোকানে ঢুকে নিলাম একটি চিমনি কেক। আর ভিডিও করলাম তাদের বানানোর কায়দা।

বিকেলের সোনাঝরা রোদে প্রাগের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে চার্লস ব্রিজে তখন এক অজানা শিল্পী সুরে মুগ্ধ করছিল সবাইকে। চোখের পলকে সময় ফুরিয়ে গেল, রাত নেমে এল। রাতের প্রাগের দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর। ঐতিহ্যবাহী চেক খাবার মুখে রুচল না। হোটেলের রিসেপশনিস্ট মেয়েটি যে রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিয়েছিল, সেখানে মজাদার পাস্তা খেল আমার মেয়ে ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে আর স‍্যামন ফিশের মজাদার ডিশ নিলাম আমি।

কাফকার জীবনের নানা মোড়ে এসেছেন অনেক নারী। তাদের কাউকেই তিনি স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারেননি। প্রেমিকাদের মধ্যে ফেলিস বাউয়ার ছিল তাঁর বিশেষ একজন, যাকে তিনি প্রায় পাঁচশটি চিঠি লিখেছেন। দুবার বাগদান হয়েছিল, দুবারই তা ভেঙে গেছে। মৃত্যুর পর তার লেখা সেই চিঠিগুলোর সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যার নাম ‘লেটারস টু ফেলিস’। এই চিঠিগুলো প্রেমের গভীরতা, আকুতি ও বিভ্রান্তির জটিলতা ফুটিয়ে তোলে, যা প্রেমের অমোঘ জালছবির মতো।

আরেক প্রেমিকা ছিলেন মিলেনা জেসেন্সকা, পেশায় যিনি একজন সাংবাদিক। তাঁর জন্যও তিনি শয়ে শয়ে চিঠি লিখেছেন, যেখানে প্রেম, অনুরাগ, অভিযোগ, প্রত্যাশা—সবকিছুই প্রকাশ পেত। সেই চিঠিগুলোর সংগ্রহ এবং প্রকাশিত হয়েছে ‘লেটারস টু মিলেনা’ নামে, যা একসঙ্গে প্রেমের গভীরতা ও ব্যক্তিত্বের অনন্য দিকগুলো তুলে ধরা এক বেস্টসেলিং বই। এই প্রেমের ইতিহাসগুলো প্রেমিকের মানবিকতা, দুর্বলতা ও অপ্রতিরোধ্য আবেগের সাক্ষ্য বহন করে, যা পাঠকদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। কাফকার ব্যক্তিজীবনও ছিল প্রেম ও দ্বিধায় ভরা। এই চিঠিগুলো কাফকার ব্যক্তিমানুষটিকে আরও কাছে থেকে চেনার সুযোগ দেয়, একজন প্রেমিক, একজন দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে সংবেদনশীল এক লেখক হিসেবে।
সম্পর্ক, ভালোবাসা ও নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব—সবকিছু মিলিয়ে কাফকার জীবনও যেন তাঁর সাহিত্যের মতোই জটিল ছিল।

প্রেমিকা ডোরা ডিয়ামান্ট, যার সাথে ছয় মাসের একত্র জীবনযাপন করেন কাফকা। কাফকার চিত্ত ছিল অস্থির। তাই বিয়ে এবং বন্ধনে জড়িয়ে পড়তেও তার দ্বিধা ছিল। মনে করা হয়, ডোরা কাফকাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু উপহার দেন। ১৯২৪ সালে কাফকার মৃত্যুর সময় ডোরা তার পাশে ছিলেন।

একসময়ের প্রাহা এখন প্রাগ, রূপসী শহর। প্রাহা শহরের কেন্দ্রের বুকের ওপর শান্ত ভাসমান ভালতাভা নদী। কেউ কেউ এই শহরকে ডাকে ‘কাফকার প্রাগ’। শুধু নামের জন্য নয়, এর ঐতিহ্য, ইতিহাস আর মনীষীদের ছায়া যেন এখনো জ্বলজ্বল করছে। প্রাগে বেড়াতে এলে চার্লস ব্রিজ না দেখে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। প্রায় সাড়ে ছয়শ বছরের এই পাথরের সেতুটি ত্রিশটি ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো। যদিও সেগুলো আসল নয়, নকল। আসল ভাস্কর্যগুলো রাখা আছে চার্লস ব্রিজ মিউজিয়ামে। বলা হয়ে থাকে, প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন এই ব্রিজ দিয়ে হেঁটে যান, যার বেশির ভাগই পর্যটক। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ভালতাভা নদী। নদীর ওপর আছে ষোলোটি সেতু, চার্লস ব্রিজ যার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো। ৫০০ মিটার লম্বা এই সেতুটি ইউরোপের দীর্ঘতম গথিক স্থাপত্যের ব্রিজ। ১৩৫৭ সালে সম্রাট চতুর্থ চার্লস এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁরই নামে এই সেতু। চার্চ, চার্লস ব্রিজ আর বিকেলের সোনালি আকাশের আভা—সব মিলিয়ে কাফকার পরাবাস্তব জগৎ যেন ছড়িয়ে আছে এই শহরে। সেই কাফকার জগতের খোঁজ শহরজুড়ে। মেট্রো স্টেশনে যেতে যেতে ফ্রানসৎ কাফকা মিউজিয়ামের পাশে এসে দাঁড়ালাম। বিখ্যাত লেখক ফ্রানস‌ৎ কাফকার জন্ম পুরোনো শহরে। দুটো ধারায় জীবনকে প্রবাহিত করতেন কাফকা, দিনের বেলায় নম্র-ভদ্র ইন্স্যুরেন্সের অফিস সহকারী আর রাতের বেলায় কঠোর নিষ্ঠাবান লেখক। ভালতাভা নদী ছুঁয়ে কাফকা মিউজিয়াম আর স্যুভেনির শপের পরতে পরতে কাফকা আর তাঁর সাহিত্যকর্ম। কত ভাষায়, কত বিন্যাসে তাঁর লেখা সব বই।
কাফকার মৃত্যুর আগে তার শেষ চিঠিতে তাঁর লেখা সব পাণ্ডুলিপি, খসড়া, নোটবই এবং অসমাপ্ত লেখাগুলো পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ ছিল বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে। তিনি শুধু অনুরোধ করেননি, বরং নিজেও হাতের আশপাশে থাকা নিজের কাজের বড় অংশ নিজেই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। শরীরে শক্তি থাকলেও তিনি হয়তো মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিলেন, বড় পাণ্ডুলিপির ভারে। এমন দৃশ্যমান যন্ত্রণাকর মুহূর্তে একজন লেখকের মনোভাব ও আত্মসমর্পণের গভীরতা বোঝা যায়। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের শেষ সময়ে একজন শিল্পী বা লেখকের মন কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং কীভাবে তিনি নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে একধরনের বিমুখতা প্রকাশ করেন। ১৯২৪ সালের ৩ জুন, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ‘তাঁর আত্মা মিলনে আবদ্ধ হোক’।

কাফকার সমাধিতে হিব্রু ভাষায় লেখা আছে। প্রাহার কবরস্থানে, শহরের বাসের যেখানে লাস্ট স্টপ শেষ গন্তব্য, ইহুদিদের জন্য তৈরি এক নতুন কবরস্থানে, বাবা হারমান কাফকা ও মা জুলিয়ে কাফকার সঙ্গে একই পারিবারিক সমাধিতে শুয়ে আছেন প্রিয় কাফকা। সমাধিফলকে হিব্রু ভাষার একটি আশীর্বাদও লেখা রয়েছে, ‘তাঁর আত্মা যেন জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে।’

একজন মানুষ, যিনি জীবদ্দশায় নিজের লেখাকে ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর সেই লেখাই তাঁকে পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত সাহিত্যিক করে তুলেছে—বিষয়টি ভাবলে সত্যিই অদ্ভুত লাগে। কাফকা তাঁর বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে মৃত্যুর আগে তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, খসড়া ও অসমাপ্ত লেখাগুলো ধ্বংস করে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন। ব্রড সেই অনুরোধ পালন করেননি। তাঁর এই কাজের মাধ্যমেই পৃথিবী কাফকার কালজয়ী সাহিত্যকর্মগুলো লাভ করে। তাঁর সংরক্ষণ করা লেখাগুলোর কারণেই আজ আমরা ‘দ‍্য ট্রায়াল’, ‘দ‍্য ক‍্যাসল’সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়তে পারি।

ঠিক তখনই একজন অচেনা শিল্পী অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতে শুরু করলেন। সুরটা যেন চারপাশের কোলাহলকে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল। মানুষ দাঁড়িয়ে শুনছিল, কেউ ছবি তুলছিল, কেউ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। কখন যে বিকেল ফুরিয়ে রাত নেমে এল, বুঝতেই পারিনি। দুটো দিন ফুরিয়ে গেল যেন চোখের পলকে। প্রাগের ঐতিহ্যবাহী চেক খাবার না খেয়ে হোটেলে ফিরে পাশের রেস্টুরেন্টে পটেটো উইথ চিকেন অ্যান্ড পাস্তা খেয়ে নিলাম।

ইউরোপের কিছু শহর আছে, যেগুলো শুধু চোখে দেখা যায় না, সেগুলো অনুভব করতে হয়। প্রাগ তেমনি একটা শহর। এখানে হাঁটতে হাঁটতে যেন আমি ইতিহাসের সাথে এক হয়ে গেলাম, অনুভব করলাম এই শহরের গভীরতা আর সৌন্দর্য। এই শহর শুধু দেখার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য। এখানে প্রতিটি মুহূর্তে লুকানো আছে এক অজানা রোমাঞ্চ, এক অদ্ভুত ভালোবাসা। কিন্তু সাহিত্য, নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও অস্তিত্বের অস্থিরতার সঙ্গে প্রাগের এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে। প্রাগের পুরোনো গলি আর ছায়াময় স্থাপত্যের ভেতর হাঁটলে কখনো কখনো মনে হয়, সেই জগতেরই কোনো এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]