​জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব

বাংলাদেশের জন্য গৌরব, প্রবাসীদের জন্যও বার্তা

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ , অনলাইন ভার্সন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক মঞ্চের সভাপতির আসনে একজন বাংলাদেশির বসা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারও একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামী এক বছরে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তার ওপর।
ড. খলিলুর রহমান ২ জুনের নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিসকে পরাজিত করে এই দায়িত্ব পান। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এবারের মূল প্রতিপাদ্য—আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বে সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ। এই প্রতিপাদ্যই বলে দেয়, তাঁর সামনে কাজটি কতটা কঠিন।

আজকের বিশ্ব গভীর বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যুদ্ধ ও সংঘাত, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও বৈষম্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, ভুয়া তথ্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। এসব সমস্যার কোনো একক সমাধান নেই। তাই সাধারণ পরিষদের সভাপতির সবচেয়ে বড় শক্তি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা।
এখানেই খলিলুর রহমানের বড় পরীক্ষা। সভাপতি হিসেবে তাঁকে সবার আগে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর জাতীয় দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তাঁকে ১৯৩টি দেশের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে হবে। বড় শক্তিধর রাষ্ট্রের পাশাপাশি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র, স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ ও সংঘাতপ্রবণ রাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে শোনার চেষ্টা করতে হবে।

এই নিরপেক্ষতা শুধু কথায় নয়, কাজেও দৃশ্যমান হতে হবে। কোনো সংকট বা রাজনৈতিক বিরোধে একটি পক্ষের ভাষা গ্রহণ করে অন্য পক্ষকে দূরে সরিয়ে দিলে সভাপতির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং তাঁর দায়িত্ব হবে মতপার্থক্যকে স্বীকার করেও অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করা।
বিশ্বের চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি একা কোনো যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবেন না, কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবেন না কিংবা কোনো রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করতে পারবেন না। কিন্তু আলোচনার দরজা খোলা রাখা, মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা থাকতে পারে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো জাতিসংঘের প্রতি মানুষের ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনা। বহু ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ এবং নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা বিশ্ববাসীর মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। ফলে শুধু নতুন নতুন ঘোষণা দিলেই আস্থা ফিরবে না। কোন সিদ্ধান্তের পর কী অগ্রগতি হলো, সেটিও স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও তাঁর সভাপতিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ঋণের চাপ, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও তিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারেন।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য জরুরি। বাংলাদেশের অর্জন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা ভালো; কিন্তু জাতিসংঘের সভাপতির পদকে বাংলাদেশের প্রচারের মঞ্চে পরিণত করা উচিত হবে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে বরং অন্য দেশগুলোর জন্য কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই আলোচনাই বেশি কার্যকর হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির বিষয়টিও তাঁর মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তি যেমন উন্নয়নের নতুন দরজা খুলছে, তেমনি গোপনীয়তা, কর্মসংস্থান, ভুয়া তথ্য, সাইবার নিরাপত্তা ও বৈষম্যের নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন প্রযুক্তির সুফল পায়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তাঁর রয়েছে।
জাতিসংঘের সংস্কার নিয়েও তাঁর সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে। তিনি একা নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বদলে দিতে পারবেন না। কিন্তু সাধারণ পরিষদে সংস্কার নিয়ে আলোচনা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ফলপ্রসূ করতে পারেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতার বিষয়গুলো সামনে আনা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে মহাসচিব নির্বাচন। তাঁর সভাপতিত্বের সময় বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হবে। নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সভাপতির নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য পক্ষপাতের অভিযোগও তাঁর পুরো সভাপতিত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই দায়িত্বের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আমাদের দেশের ইতিহাসে এর আগে প্রয়াত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর আবার একজন বাংলাদেশি এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষাও রয়েছে। দেশের বাইরে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু বাংলাদেশি আছেন, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহী। তাদের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের সম্পদ হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই সক্ষমতাকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি। দেশের জন্য বিনা পারিশ্রমিকেও কাজ করতে চাওয়া অনেক যোগ্য প্রবাসী যথাযথ সুযোগ পাননি। অথচ প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠান না; তাঁরা জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগও দিতে পারেন। খলিলুর রহমানের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব পাওয়া আমাদের সেই সম্ভাবনার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
তবে ব্যক্তিকে নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাঁর কাজের সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু একজন বাংলাদেশি যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন একটি সম্মানজনক দায়িত্ব পান, তখন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের বৃহত্তর স্বার্থটিও দেখা দরকার। তাঁর সাফল্য মানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সাফল্যও।

তবে শুধু নির্বাচিত হওয়াই শেষ কথা নয়। বরং এখন শুরু হয়েছে আসল পরীক্ষা। তিনি কতগুলো বক্তৃতা দিলেন, কতগুলো সভায় সভাপতিত্ব করলেন—তা দিয়ে তাঁর সাফল্য মাপা উচিত নয়। প্রশ্ন হবে, তিনি কতটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেন, কতটা সংলাপের সুযোগ তৈরি করলেন, ছোট রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ কতটা সামনে আনতে পারলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তব অগ্রগতির দিকে কতটা নিতে পারলেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও তাই প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা এই দায়িত্বকে বাংলাদেশের একটি অর্জন হিসেবে দেখবেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে ভূমিকা রাখবেন—এটাই প্রত্যাশিত।
ড. খলিলুর রহমানের সামনে পথ সহজ নয়। বিশ্ব রাজনীতির বিভাজন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু বিপর্যয় এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তাঁকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কিন্তু কঠিন সময়েই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।

বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন গৌরবের মুহূর্ত, তেমনি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও। নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা, ধৈর্য, স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে ড. খলিলুর রহমান তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারলে এই এক বছর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য হয়ে থাকবে না—বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]