​প্রেম ও বিরহের কবি ওমর খৈয়াম এবং তাঁর রুবাইয়াৎ

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫১ , অনলাইন ভার্সন
‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে
থাকবে শুধু বই, —সে তো অনন্ত যৌবনা।’
এই বিখ্যাত কবিতার চরণের স্রষ্টা পারস্যের কবি, প্রেম ও বিরহের কবি ওমর খৈয়াম (১৮ মে ১০৪৮—৪ ডিসেম্বর ১১৩১)। পুরো নাম গিয়াসউদিন আবুল‌ ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরি। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর বিখ্যাত গণিতবিদ, দার্শনিক ও একজন খ্যাতিমান জ্যোতির্বিদ।

ওমর খৈয়াম ১০৪৮ সালের ১৮ মে ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তাঁবুর কারিগর ও মৃৎশিল্পী। ছোটবেলায় তিনি বালি শহরে সে সময়কার বিখ্যাত পণ্ডিত শেখ মুহাম্মদ মানসুরীর তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। যুবক বয়সেই তিনি সমরখন্দে চলে যান এবং সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর বুখারায় নিজেকে মধ্যযুগের একজন প্রধান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বীজগণিতের গুরুত্বপূর্ণ ‘Treatise on Demonstration of Problems of Algebra’ গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের একটি পদ্ধতি বর্ণনা করেন। এই পদ্ধতিতে একটি পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক বানিয়ে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করা হয়। ইসলামি বর্ষপঞ্জি সংস্কারেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর কবিতা সমগ্র ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ নামে পরিচিত।
তবে সুউজ্জ্বল কাব্য-প্রতিভার আড়ালে তাঁর গাণিতিক ও দার্শনিকতার ভূমিকা অনেকখানি ঢাকা পড়ে আছে। এমনও জনশ্রুতি রয়েছে, ‘রনে দেকার্ত’-এর আগে ওমরই বিশ্লেষণী জ্যামিতি এবং স্বাধীনভাবে গণিতের দ্বিপদী উপপাদ্য আবিষ্কার করেন। বীজগণিতে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান তিনিই আবিষ্কার করেন।

বহুমুখী প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিতে বলা হলে বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যাদের নাম উপেক্ষা করা কঠিন, ওমর খৈয়াম তাদের মধ্যে অন্যতম ও শীর্ষস্থানীয়। মধ্যযুগের মুসলিম মনীষা জামাখশারি ওমর খৈয়ামকে ‘বিশ্ব দার্শনিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইরান ও পারস্যের বাইরে ওমরের বড় পরিচয় কবি হিসেবে। তাঁর বিশাল কাব্যসম্ভার বিখ্যাত রুবাইয়াৎ। এই রুবাইয়াৎ বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত হওয়ার ফলে ওমর খৈয়ামের পরিচিতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে, আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে তাঁর কবিতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইংরেজ মনীষী ‘টমাস হাইড’, যিনি প্রথম ওমর খৈয়ামের সাহিত্য-প্রতিভা সম্পর্কে গবেষণা করেন। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, বহির্বিশ্বে তাঁকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করে তোলেন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড। তিনিই প্রথম খৈয়ামের ছোট ছোট কবিতা বা রুবাই ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম নামে প্রকাশ করেন।

জীবনের পুরো সময় ওমর খৈয়ামের কর্তব্যপরায়ণতা ও একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক এবং জ্ঞানবিশারদ হিসেবে নিজেকে খ‍্যাতিমান করে গেছেন। দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়ানো, সন্ধ্যায় ইরানের রাজা মালিক শাহের দরবারে পরামর্শ প্রদান করতেন। আর রাতে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি জালালি বর্ষপঞ্জি সংশোধনের মাধ্যমে নিষ্ঠার সঙ্গে সেটি সম্পন্ন করেন। তার সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক তাঁর বিখ্যাত কাজগুলো সম্পন্ন করেন। তিনি এবং আরও দুজন মিলে তিনজনেই জালালি ক‍্যালেন্ডার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটিকে অবলম্বন করেই সৌরবর্ষের আবিষ্কারক হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেন।

ইসফাহান শহরে ওমরের দিনগুলো খুবই কার্যকর ছিল। কিন্তু আততায়ীর হাতে সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা পত্নী ওমরের ওপর রুষ্ট হলে ওমর হজ করার জন্য মক্কা ও মদিনায় চলে যান। পরে তাঁকে নিশাপুরে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। নিশাপুরে ওমর গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক তাঁর বিখ্যাত কাজগুলো সম্পন্ন করেন।

জীবদ্দশায় ওমরের খ্যাতি ছিল গণিতবিদ হিসেবে। ইসলামি সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সোনালি যুগে তথা এখন থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে বীজগণিতের যেসব উপপাদ্য এবং জ্যোতির্বিদ্যার তত্ত্ব ওমর খৈয়াম দিয়ে গেছেন, সেগুলো এখনো গণিতবিদ এবং মহাকাশ গবেষক বা জ্যোতির্বিদদের গবেষণায় যথাযথ সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওমরের আরেকটি বড় অবদান হলো ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা, যা পরবর্তী সময়ে অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সূচনা করা হয়। ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে এই বিষয়ের ওপর তাঁর গ্রন্থ ‘মাকালাত ফি আল জার্ব আল মুকাবিলা’ প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে তিনি ঘাত হিসেবে সমীকরণের শ্রেণিকরণ করেন এবং দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন।

ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ হিসেবেও সমধিক পরিচিত ছিলেন। ইরানের খোরাসানে বাদশাহ জালাল উদ্দিন মালিক শাহ একটি মানমন্দির নির্মাণের জন্য ১০৭৩ সালে আরও কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে ওমরকেও আমন্ত্রণ জানান। ওমর তখন অত্যন্ত সফলভাবে (দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত) সৌর বছরের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেন। ১০৭৯ সালের ১৫ মার্চ সুলতান জালাল আল-‌দিন মালিক শাহ সালজুক ওমরের সংশোধিত বর্ষপঞ্জি চালু করেন। সুলতানের মৃত্যুর বহু আগেই সেই বর্ষপঞ্জি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হয় এবং সুলতানের নামানুসারেই এটিকে জালালি বর্ষপঞ্জি নামকরণ করা হয়। তখন সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে একেকটি ক্রান্তীয় রাশির সংখ্যানুপাতে এই বর্ষপঞ্জিতে মাস গণনা করা হতো। ওমরের আরও অনেক কীর্তির মধ্যে তারাচিত্র অথবা খণ্ডচিত্র উদ্ভাবনও ছিল একটি বিশেষ অবদান।

ফারসি কাব্য-জগতে ওমর খৈয়াম এক বিশেষ চিন্তাধারা ও বিশ্বদৃষ্টির পথিকৃৎ। তিনি এমন সব চিন্তাবিদ ও নীরব কবিদের মনের কথা বলেছেন, যাঁরা সেসব বিষয়ে কথা বলতে চেয়েও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তা বিশদভাবে প্রকাশ করতে পারেননি।

মার্কিন কবি জেমস রাসেল লোয়েল (James Russell Lowell) তাঁর বিখ্যাত কবিতা In a Copy of Omar Khayyam-এ ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলোকে ‘পারস্য উপসাগরের চিন্তার মণিমুক্তা’ বলে অভিহিত করেছেন। ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলো প্রথমবারের মতো ইংরেজিতে অনূদিত হয় খ্রিষ্টীয় ১৮৫৯ সালে। এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের এই অনুবাদের সুবাদেই ওমর খৈয়াম বিশ্বব্যাপী কবি হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। এ অনুবাদের মাধ্যমে ফিটজেরাল্ড নিজেও খ্যাতিমান হয়েছেন।

যুক্তি ও আবেগের করুণ রসের প্রভাবে ওমর খৈয়ামের চার লাইনবিশিষ্ট কবিতাগুলো কবিতা-জগতে হয়ে উঠেছে অনন্য। দার্শনিকেরা একটি বই লিখেও যে ভাব পুরোপুরি হৃদয়গ্রাহী করতে পারেন না, গভীর অর্থবহ চার লাইনের একটি কবিতার মধ্য দিয়ে ওমর খৈয়াম তা সহজেই তুলে ধরেছেন।

যেহেতু ওমরের রুবাইয়াৎ শরাব ও মদের ওপর বিস্তর উপাত্ত রয়েছে। যার ফলে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন মহল ওমর খৈয়ামকে Epicurean মাদকাসক্ত কিংবা ভোগবাদীর দলভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলীসহ বিশ্বের সেরা ব্যক্তিদের মতামত হলো, ওমর খৈয়াম কোনো ধরনের মাদকাসক্ত কিংবা উচ্ছন্নে যাওয়ার মতো কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। ওমরকে নিয়ে যারা এ ধরনের মন্তব্য করেছেন, তাদেরকে স্পষ্টত বুঝতে হবে তিনি কখনোই সেটি ছিলেন না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্থূল বুদ্ধি ও জ্ঞানহীনভাবে অথবা সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে বড়কে জয় করা যায় না। ওমর খৈয়ামের বিজ্ঞানমনস্কতা ও জীবনদর্শন তাঁকে চিরকালের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এখানে নজরুল অনূদিত আরেকটি রুবাইয়াৎ এমন :
‘কারুর প্রাণে দুঃখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ
পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িও না আর মনস্তাপ।
অমর-আশিস্ লাভের আশা রয় যদি হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব‍্যথা, মুছো পরের বুকের ব‍্যথার চাপ।’
ওমর খৈয়াম জীবন এবং জগতের ও পারলৌকিক জীবনের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্ন শুধু তাঁর মনেই নয়, যুগে যুগে জ্ঞান-তৃষ্ণার্ত অনুসন্ধানী মানুষের মনের খোরাক সৃষ্টি করেছে।

ব‍্যক্তিগতভাবে বিশ্বের অন‍্যতম জ্ঞানতাপস ওমর খৈয়ামের বিশাল জ্ঞানভিত্তিক কর্মযজ্ঞ, জীবনদর্শন ও তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। কারও দ্বারাই তাঁর সম্পূর্ণ জীবনদর্শন ও সৃজনশীলতার বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পারস্যের এমন বহুসংখ্যক কবি, দার্শনিক জ্ঞানতাপস রয়েছে। ওমর খৈয়াম, শেখ সাদি, রুমি, হাফিজ এবং ফেরদৌসীর মতো পারসে‍্য এমন অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক ছিলেন, যাঁদের সম্পর্কে আমাদের অনেকের ধারণা নেই।

একইভাবে রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের শিল্পসাহিত্য ও জীবনদর্শনের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করাও অসম্ভব। নজরুলের শিল্পকর্ম, শিল্পসাহিত্য ও বিশাল সাংস্কৃতিক দর্শনকে বুঝতে হলে তাঁর জীবনদর্শনের প্রতি ধারণা থাকতে হবে। নজরুলের বিস্ময়কর মেধা ও মননশীলতার পাশাপাশি তাঁর উত্থান-পতন এবং সাফল্য-ব‍্যর্থতার সামগ্রিক জীবনের চৈতন্যের নানা বৈচিত্র্যের বর্ণনা করা কঠিন। বেশির ভাগ জীবনীকার নজরুলের পারিবারিক, সাংসারিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবনের নানা দিক সম্পর্কে মোটামুটি রচনা লিখেছেন, কিন্তু কেউই কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গবেষণা সম্পন্ন করতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে নজরুলের শিল্পসাহিত্য গীত সৃষ্টি ও সাংগীতিক জীবন, সাংস্কৃতিক জীবন এবং তাঁর অনুবাদ সাহিত্য সম্পর্কে আলোকপাত করার বিরাট ক্ষেত্র রয়েছে, সেসবের আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের অনুবাদ করা ও তা সাহিত্যে সংযোজিত করার মধ্য দিয়ে তাঁর ভাষাজ্ঞানের দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের সংখ্যা কী পরিমাণ, তা নির্ণয় করা যায়নি। তবে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা থেকে জানা যায়, ছয়শত অথবা তারও অধিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশের মতে, ওমর রচিত রুবাইয়াতের সংখ্যা সহস্রাধিক বা তারও অনেক বেশি।
কাজী নজরুল ইসলাম ‘রুবাইয়াত-ই ওমর খৈয়াম’ নামে কিছু কবিতা অনুবাদ করেন। এই অসাধারণ কাজটি নজরুলের দ্বারা কীভাবে সম্ভব হয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। শুধু তা-ই নয়, এই অনুবাদের মাধ্যমে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে। অনুবাদটি করার পর তিনি এ সম্পর্কে একটি দীর্ঘ ভূমিকা দিয়েছেন।

ওমর খৈয়াম সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের মন্তব্য হলো : “ওমরকে ঊঢ়রপঁৎবধহ কতকটা বলা যায় শুধু তাঁর ‘কুফুরিয়া’ শ্রেণির কবিতার জন্য। এ ছাড়া ওমর যা, তা ওমর ছাড়া আর কারুর সঙ্গে তুলনা হয় না। ওমরের কাব্যে শারাব-সাকির ছড়াছড়ি থাকলেও তিনি জীবনে ছিলেন আশ্চর্য রকমের সংযমী। তাঁর কবিতায় যেমন ভাবের প্রগাঢ়তা, অথচ সংযমের আঁটসাঁট বাঁধুনি, তাঁর জীবনও ছিল তেমনি।”
ভূমিকায় নজরুল আরও বলেন, ‘আমি ওমরের রুবাইয়াৎ বলে প্রচলিত প্রায় এক হাজার থেকে কিঞ্চিদধিক রুবাই থেকে বেছে নিয়েছি; এবং তা ফার্সি ভাষার রুবাইয়াৎ থেকে।’

শুধু তা-ই নয়, নজরুল খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ওস্তাদি দেখাবার জন্য ওমর খৈয়ামের ভাব-ভাষা বা স্টাইলকে বিকৃত করিনি—অবশ্য আমার সাধ্যমতো। এর জন্য আমার অজস্র পরিশ্রম করতে হয়েছে, বেগ পেতে হয়েছে। কাগজ-পেন্সিলের, যাকে বলে আদ‍্যশ্রাদ্ধ, তা-ই করে ছেড়েছি। ওমরের রুবাইয়াতের সবচেয়ে বড় জিনিস ওর প্রকাশের ভঙ্গি ও ঢঙ্।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওমরের রুবাইয়াৎ বা চতুষ্পদী হলেও তার চারটি পদই ছুটেছে আরবি ঘোড়ার মতো দৃপ্ত তেজে সম-তালে—ভণ্ডামি, মিথ্যা বিশ্বাস, সংস্কার, বিধিনিষেধের পথে ধূলি উড়িয়ে তাদের বুক চূর্ণ করে।’

নজরুল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রুবাইয়াতের অনুবাদ করেছেন। যেমন :
“মুগ্ধ করো নিখিল হৃদয় প্রেম নিবেদন কৌশলে,
হৃদয়-জয়ী হে বীর, উড়াও নিশান প্রিয়ার অঞ্চলে!
এক হৃদয়ের সমান নহে লক্ষ মসজিদ আর ‘কাবা’;
কি হবে তোর তীর্থে ‘কাবা’র শান্তি খোঁজ হৃদয়-তলে।”

“দুঃখে আমি মগ্ন প্রভু, দুয়ার খোলো করুণার! আমায় করো তোমার জে‍্যাতি, অন্তর মোর অন্ধকার।
স্বর্গ যদি অর্জিতে হয় একই পরিশ্রম করে—
সে ত আমার পারিশ্রমিক, নয় সে দয়ার দান তোমার।”
আশ্চর্যের বিষয়, নজরুল কীভাবে এই ফারসি ভাষার ওপর এতটা পারদর্শী হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর চাকরিতে (মাত্র সতেরো বছর বয়সে) বাঙালি পল্টনে থাকাকালীন (মাত্র তিন মাস বা তারও অধিক সময়) তিনি নিজে নিজে ইংরেজি, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষা চর্চা করেন এবং যথেষ্ট দক্ষতা ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

মূল ফারসি থেকে নজরুলই শুধু রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেননি। এ ছাড়া ‘সতে‍্যন দত্ত’ ও ‘কান্তি ঘোষ’ প্রচুর রুবাইয়াৎ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তাঁদের অনুবাদও বেশ পোক্ত। যেমন :
‘সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে
শীতল ছায়/ খাদ‍্য কিছু পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়।
মৌন ভঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর—
সেই তো সখী স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর।’
(কান্তি ঘোষের রুবাইয়াৎ অনুবাদ : ৬৪)।

ওমর খৈয়াম যে একজন বড়মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন, বিশেষ করে গণিত ও জ্যোতিষচর্চার ওমর কাব্যে পাওয়া যায়। সত্যেন দত্তের অনুবাদের ধরন এমন :
‘প্রথম মাটিতে গড়া হয়ে গেছে শেষ মানুষের কায়
শেষ নবান্ন হবে যে ধানে‍্য তারো বীজ আছে তায়।
সৃষ্টির সেই আদিম প্রভাতে লিখে রেখে গেছে তাই
বিচার-কত্রী প্রলয় রাত্রি পাঠ যা করিবে ভাই।’

একইভাবে সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেও কয়েকটি রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন। যেমন :
অর্থহীন, অর্থহীন সমস্তই অর্থহীন। তাই ওমরের বারবার কাতর রোদন, দরদী ফরিয়াদ—
‘হেথায় আমার আসাতে প্রভু হননি তো লাভবান
চলে যাবো যবে হবেন না তিনি কোনো মতে গরীয়ান।
এ কর্ণে আমি শুনিনি কভু কোনো মানবের কাছে
এই আসা-যাওয়া কি এর অর্থ-খামাখা পোড়েন টানা।’

হাজার বছর আগেই ওমর খৈয়ামের জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ইতিহাসের পাতায় তিনি অক্ষয়। তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত‍্য পৃথিবীতে অনাগত মানুষের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীর বাইরেও তাঁর সাহিত্য ও কাব্যপ্রতিভা তা-ই প্রমাণ করে। তিনি অবিস্মরণীয়। চির অনির্বাণ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]