​আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানাল পেন্টাগন

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০৫ , অনলাইন ভার্সন
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, অস্ত্রের ঘাটতি ও বেশ কিছু যুদ্ধবিমান ধ্বংসের কথা স্বীকার করে একটি গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) পরিদর্শক সংস্থা। স্থানীয় সময় ১৪ সেপ্টেম্বর (সোমবার) প্রকাশিত দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এই প্রতিবেদনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ক্ষয়ক্ষতি ও আর্থিক খরচের প্রথম সরকারি হিসাব সামনে আনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, মার্কিন বাহিনীর কাছে গোলাবারুদের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ও সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। যদিও এই তথ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। 

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘সীমাহীন’ গোলাবারুদ রয়েছে ও তারা ইতিহাসে সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই সামরিক অভিযানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে শুধু ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। আর এই চার মাসে মোট যুদ্ধ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কূটনৈতিক অচলাবস্থায় রয়েছে ও বৈশ্বিক তেল চলাচলের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বর্ণিত মার্কিন বাহিনী ও মার্কিন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ :

কতজন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছিলেন?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক প্রাণহানির বিবরণ তুলে ধরেছে পেন্টাগন। পরিদর্শক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন অভিযানে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক কর্মী এবং অন্যান্য অ-যুদ্ধসংক্রান্ত ঘটনায় সাতজনসহ মোট ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে ইরানি হামলায় অন্তত ছয়জন এবং একই দিনে সৌদি আরবে একজন মার্কিন সেনা নিহত হন। পরবর্তীতে ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক আল-সালতি (আল আজরাক) বিমান ঘাঁটিতে তিনজন এবং ১৯ জুলাই ইরাকের এরবিল বিমান ঘাঁটিতে একজন নিহত হন। এছাড়া অ-যুদ্ধসংক্রান্ত দুর্ঘটনার মধ্যে ১২ মার্চ ইরাকে কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার বিমান বিধ্বস্তে ছয়জন এবং ১ জুলাই আরব সাগরে এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় একজন প্রাণ হারান।

একই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতটি বিমান হারিয়েছিল?

পেন্টাগনের পরিদর্শক সংস্থার প্রতিবেদনে মার্কিন বিমানবাহিনীর অভূতপূর্ব ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে ফ্রন্টলাইন ফাইটার জেট থেকে শুরু করে রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ও হাই-টেক ড্রোনের ব্যাপক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে (প্রতিটির মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে ১ মার্চ কুয়েতে তিনটি বিমান বন্ধুভাবাপন্ন দেশের ভুলে এবং এপ্রিলে ইরানের আকাশে একটি ভূপাতিত হয়, তবে সব ক্রুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া মার্চ মাসে মার্কিন বাহিনীর অন্যতম মূল্যবান প্রাইজড স্টিল্থ ফাইটার জেট এফ-৩৫এ এবং স্থল বাহিনীকে সহায়তাকারী একটি এ-১০ আক্রমণকারী বিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভূপাতিত হয়।

আকাশপথে রিফুয়েলিং ও কমান্ড কার্যক্রমেও বড় আঘাত হেনেছে ইরানি বাহিনী। অন্তত সাতটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১২ মার্চ ইরাকে একটি দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়ে ছয়জন ক্রু নিহত হন এবং বাকি পাঁচটি সৌদি আরবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে এক হামলায় একটি ই-৩ সেনট্রি আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হেলিকপ্টার ও ড্রোনের ক্ষেত্রেও ক্ষতির তালিকা দীর্ঘ। উদ্ধার অভিযানের সময় একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ এবং ১ জুলাই আরব সাগরে একটি এমএইচ-৬০এস বিধ্বস্ত হয়ে তিনজন আহত ও একজন নিখোঁজ হন। ইরানের ভেতরে উদ্ধার করতে না পেরে চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার মার্কিন বাহিনী নিজেই ধ্বংস করে দেয় এবং ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচে ভূপাতিত হয়। ড্রোনের মধ্যে ২৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি দীর্ঘ-পরিসরের সামুদ্রিক নজরদারি ড্রোন এমকিউ-৪সি ট্রাইটন এবং অন্তত ৩০টি সশস্ত্র এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ইরানি সামরিক বাহিনী আরও একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে এবং সম্প্রতি ‘ডাইভ-এলডি’ নামের একটি মার্কিন সাবমার্সিবলও আটক করেছে।

আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি ও নৌ-লজিস্টিক সংকট

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও অবকাঠামো ইরানের হামলায় ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাশাপাশি, আয়োজক দেশগুলোর বন্দর ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়া ও অনিশ্চয়তার কারণে লজিস্টিক সহায়তা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে লজিস্টিক অবকাঠামো ‘দিয়েগো গার্সিয়া’তে স্থানান্তর করা হলেও সেখান থেকে সমুদ্রপথে যাতায়াতে ১৪ থেকে ১৮ দিন সময় লেগেছে, যা কার্যক্রমকে আরও চ্যালেঞ্জিং করেছে।

মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে ক্ষয়ক্ষতি

ইরানের হামলায় চারটি দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাস্কাটে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও কর্মী সরিয়ে নেওয়ার কারণে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত হওয়ায় প্রতি মাসে প্রায় ২৪.৫ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, জুন পর্যন্ত ইরাকের মার্কিন মিশনে ৬০০টিরও বেশি হামলা চালানো হয়েছে, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫৭ মিলিয়ন ডলার। এরবিলের নতুন কনস্যুলেট ভবন, বাগদাদের দূতাবাস ও বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ডিপ্লোমেটিক সাপোর্ট সেন্টার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে, ৫ মার্চ হামলার মুখে দূতাবাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪.৭৫ মিলিয়ন ডলার।

এছাড়া, সৌদি আরবে ৩ মার্চ রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানলে প্রায় ১১.৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

ঠিকানা/এএস 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]