
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যা চিরকাল অক্ষয়-অব্যয় হয়ে থাকবে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মৌলিক চেতনা হলো মাতৃভাষার প্রতি অটুট প্রেম-ভালোবাসা। মাতৃভাষাপ্রীতি স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। দুনিয়ার কোনো জাতিকে এর জন্য জীবন দিতে হয়নি। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার তরুণেরা প্রাণ দিয়ে হলেও মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করেছে। বাংলা তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তান সরকার একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। অথচ জনমিতির বিবেচনায় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ছিল সর্ববৃহৎ। এর বিপরীতে উর্দু ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মৌখিক ও লেখ্য ভাষা। বাংলাদেশের তরুণ ছাত্রসমাজ সরকারের এরূপ অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে, কোনো রূপ অন্যায়-অবিচার মানতে চায় না। তারা আন্দোলন করে, পুলিশের গুলিতে জীবন দেয়, তবু কারও নতি স্বীকার করেনি। তাই ভাষা আন্দোলনের অপর চেতনা হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নতি স্বীকার না করা।
শুধু মাতৃভাষা নয়, অন্য সব ভাষাকে সম্মান দেওয়াও এর চেতনার অঙ্গ ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন উর্দুর বিরুদ্ধে নয়, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। উর্দু বাদ দিয়ে নয়, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে। এতে উর্দুবিদ্বেষ প্রমাণিত হয় না। দৃষ্টিভঙ্গির এই উদারতা থেকে বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে স্বীকৃতি দান করে (১৭ নভেম্বর ১৯৯৯)। ভাষার জন্য একটি জাতির ত্যাগ যেমন অনেক বড়, পাওনাও তেমনি অনেক বড়। জাতির জন্য তা অত্যন্ত গর্ব, গৌরব, শ্লাঘার বিষয়।
মাতৃভাষার মুক্তি ও মর্যাদার জন্য যেমন ভাষা আন্দোলন, মাতৃভূমির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরিসর অনেক বড়, চেতনাও বৃহৎ ও মহৎ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবলে পড়ে নতুন ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের শিকার হয় বাংলাদেশ। এর প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সারা জাতি। নয় মাসের এক সশস্ত্র সংগ্রাম করে মহান বিজয় অর্জিত হয়। সুতরাং এখানেও আছে প্রতিবাদ, প্রতিকার, প্রতিরোধের চেতনা, আছে অনির্বাণ দেশপ্রেম, স্বাধীনতাপ্রীতি ও বন্ধনমুক্তি কামনা। এসবের মূলে আছে বাঙালি/বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রেরণা। যে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের আলোকে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তা টিকল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বিজয়লাভ। এ থেকে অসাম্প্রদায়িকতা বোধের উপলব্ধি ও বিকাশ। মুক্তিযুদ্ধের অপরাপর চেতনা হলো উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠন ও শোষণহীন সমাজপ্রতিষ্ঠা। জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রÑমুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত এই চার নীতি দেশের গঠনতন্ত্রের ভিত্তিমূল রচনা করে। মুক্তিযুদ্ধই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে জাতির চেতনা ও প্রত্যাশা কী? এর একটি সহজ উত্তর রয়েছে ওই ‘বৈষম্যবিরোধী’ শব্দবন্ধের মধ্যে। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে ‘২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবি’ লিখিত ব্যানারে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলেও ৫ দিনের মাথায় তা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ লিখিত ব্যানারে পরিণত হয়, যা পরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে’র মাধ্যমে বিজয় ও পরিসমাপ্তি লাভ করে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্মৃতিচারণা করে বলেন, আন্দোলনের ‘এমন একটা নাম আমরা দিতে চেয়েছি, যাতে নামের মধ্যেই একটা নীতি প্রতিফলিত হয়। শুধু চাকরি নয়, এ আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতি বিতাড়ন, ভালো আমলাতন্ত্রÑএসবও যুক্ত করতে চেয়েছিলাম।’ তিনি এ কথাও বলেন, ফেসবুক গ্রুপে মতামত চেয়ে সর্বাধিক ভোটের মাধ্যমে তা নির্বাচন করেছেন। তার কথার সূত্রে বলা যায়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি তো ছিলই, তার অতিরিক্ত ‘দুর্নীতির বিতাড়ন’ ও ‘ভালো আমলাতন্ত্র’র প্রত্যাশা ছিল। দুর্নীতির বিতাড়ন শব্দগুচ্ছ দ্বারা যদি শেখ হাসিনা রেজিমের দুর্নীতি, গুম-খুন দুঃশাসনের বিতাড়ন বা অবসান ধরা যায়, তবে তা ঘটেছে। ‘ভালো আমলাতন্ত্র’ শব্দগুচ্ছ দ্বারা বিদ্যমান শাসনকাঠামোর মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন রাষ্ট্রব্যবস্থা অভিলাষের কথাই ব্যক্ত হয়। তিনি রাষ্ট্রসংস্কার চেয়েছেন, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লব চাননি। অবশ্য এটা ছিল তার আন্দোলনের প্রথম দিকের ভাবনা। আন্দোলন চলাকালে এবং উত্তরকালে তার ও সহযোগীদের কণ্ঠে বিভিন্ন সময়ে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’, ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’, ‘নতুন বাংলাদেশ’, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’, ‘বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো’, ‘মানবিক রাষ্ট্র’, ‘দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা’ ইত্যাদি পদগুচ্ছ উচ্চারিত হয়, যা শিক্ষার্থী ও জনগণের স্লোগান, প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, গ্রাফিতি, কার্টুন, গণসংগীত, কবিতা-ছড়া ইত্যাদির মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। আর এসবের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব স্বপ্ন, ভাব-ভাবনা, চেতনা, প্রত্যাশা, আকাক্সক্ষার বীজ নিহিত রয়েছে।
এ কথা সত্য, চাকরির প্রত্যাশায় পেশাজীবী-শ্রমজীবী মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হননি। রিকশাওয়ালা, পোশাকশিল্পীরা তা চিন্তাও করেননি। তারা ন্যায্য মজুরি, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন। পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ চাকরি ও পেশায় নিয়োজিত থেকেও আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন ও যোগদান করেছেন বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নীতি, নৈতিকতা ও মানবতার দায়বদ্ধতা থেকে। সুতরাং আন্দোলনের চেতনা ও প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। এখানে কতক সুনির্দিষ্ট চেতনা চিহ্নিত করে পাঠকের অবগতির জন্য উল্লেখ করা হলো :
স্বদেশচিন্তা ও স্বাধীনতাস্পৃহা : ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না।’ ‘ভালো মানুষ, ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ।’ ‘এই দেশ আমার আপনার আমাদের, এক দাবি এক দফা স্বাধীনতা।’ ‘দেশের জন্য মরতে রাজি আছি।’ ‘বাংলার জন্য মরব, বাংলাকে গড়ব।’ ‘আমরাই ছাত্র আমরাই বল/ বাংলাদেশ গড়ব চল।’ ‘দেশ আমার, দায়িত্ব আমার।’ ‘ছাড় ভারত ভক্তি, পেতে চাইলে মুক্তি।’ ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।’ ‘DEATH OR FREEDOM.’ ‘SAVE BANGLADESH.’ বিভিন্ন স্লোগান ও দেয়াললিখন থেকে উক্তিগুলো উদ্ধৃত করা হলো। শেখ হাসিনা অন্ধ ভারতপ্রীতি ও দুর্বল নীতির কারণে দেশ প্রায় বিক্রি করে ফেলেছিলেন, বৈদেশিক আধিপত্যবাদ প্রায় গ্রাস করতে বসেছিল। আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশরক্ষা, দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। উক্তিগুলোতে স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী চেতনা : বৈষম্যের বিপরীত শব্দ সাম্য। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য নয়, সমতার দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের। ‘সংবিধানের বারতা, সুযোগের সমতা’, ‘দাবি এক কোটা বৈষম্য নিপাত যাক’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগান আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। শুরুতে ‘কোটাবৈষম্যে’র কথা থাকলেও পরে তা বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে। তবে মূল দুটি ক্ষেত্র প্রাধান্য পায়, তা হলো রাষ্ট্রনীতিতে ও সমাজব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য। এ জন্য পরবর্তীকালে রাষ্ট্রসংস্কার, নয়া বন্দোবস্ত, মানবিক গণতন্ত্র ইত্যাদির কথা বেশি করে বলা হয়েছে। সমাজে ধনী-দরিদ্র অর্থাৎ আর্থিক বৈষম্য, নারী-পুরুষ অর্থাৎ লিঙ্গবৈষম্য, হিন্দু-মুসলমান অর্থাৎ ধর্মবৈষম্য বিষয়ও স্লোগানে-গ্রাফিতিতে উচ্চারিত হয়েছে। যেমন ‘সমতল থেকে পাহাড়, এবারের মুক্তি সবার’, ধর্ম যার যার, দেশ সবার’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ‘গণতন্ত্রের হাত ধরে সুবোধ তুই ফিরে আয়’। একটি দেয়াললিখন ছিল ‘আমাদের নতুন সেক্যুলার বাংলাদেশ’। একটি গ্রাফিতির কথা ‘স্বাধীনতা গণতন্ত্র ন্যায়বিচার সহনশীলতা দেশপ্রেম’। এখানে প্রতিটি শব্দই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে। এসব স্লোগান-গ্রাফিতিতে জনমনের মিশ্র ভাবনা ও চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে।
দুরন্ত সাহস : জুলাই আন্দোলনের একটি দেয়াললিখনের ভাষা ছিল : ‘ছাত্র যদি ভয় পাইত বন্দুকের গুলি,/ উর্দু থাকত রাষ্ট্রভাষা, উর্দু থাকত বুলি।’ ভাষা আন্দোলনের ছাত্ররা বন্দুকের গুলিকে ভয় করেননি। তারা ভয়কে জয় করে দুরন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় অনুরূপ ছাত্র-জনতা দুরন্ত দুর্জয় সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদ বলেন, ‘বুকের মধ্যে অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ কী দুরন্ত সাহস, নির্ভীক চিত্ত! সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ নিজেরা প্রাণ বলি দিয়ে অন্যদের বলে গেলেন সাহসী হতে, প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী হতে। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, শিক্ষার্থীরা যদি তাদের ক্যাম্পাসে থাকতে না পারে, বাসস্থানে থাকতে না পারে, তাহলে আপনার গণভবনেও তারা আপনাকে থাকতে দেবে না। নিজের বাসভবনে যদি থাকতে চান, শিক্ষার্থীদের বাসভবনের অধিকারও আপনি ঠিক রাখুন।’ (প্রথম আলো, ১-৮-২৪) ওইদিন হাইকোর্টের সামনে এক ছাত্রী পুলিশ ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, গ্রেপ্তার করে তার ভাইকে (শিক্ষার্থী) নিয়ে যেতে দেবেন না। যেতে হলে বুকের ওপর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। পরে জানা গেছে, এ ছাত্রীর নাম নুসরাত হক। তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। এই সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি ‘জুলাই-কন্যা’ নামে অভিহিত হন। কার্টুনিস্ট মেহেদী হক বলেন, তৎকালীন সরকার এমন একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তিনি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি কার্টুন আঁকতে পারেন এবং নিয়মিত আঁকেনও। তিনি বলেন, ‘একটা সময় আমাদের দেশে কার্টুনের খরা যাচ্ছিল, মানুষ আঁকতে ভয় পেত। তবে এবার তরুণেরা যেমন সেই ভয় থেকে বের হয়ে এসেছে, অন্যদেরও বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছে। ...তরুণেরা এবার বুঝিয়ে দিয়েছে, সাহস করে আঁকলে কিছু হয় না। কজনকে গুলি করে মারবে?’ (ডেইলি স্টার, অনলাইন রিপোর্ট, ২০-৮-২৪)।
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ : ‘সকল লাশের হিসাব কর, গ্রেপ্তার-নির্যাতন বন্ধ কর’, ‘সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই, হত্যাকারীর ক্ষমা নাই’, ‘যেখানে অন্যায়ের রেশ, আওয়াজ ওঠা বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
দুঃশাসন-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ : ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তুমিই বাংলাদেশ’, ‘দুর্নীতির বিষদাঁত, ভেঙে দিবে ছাত্রসমাজ’। একটি দেয়াল লিখন এরূপ : ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’। ক্যানভাসে ‘দুর্নীতি ঘুষ লুটপাট চাঁদাবাজ সুদ মাদক যৌতুক স্বৈরাচারী’ ইত্যাদি শব্দ বিন্যস্ত রয়েছে। এসব স্লোগান-দেয়াললিখনের মধ্যে দ্রোহভাব, দ্রোহচেতনার প্রপঞ্চ রয়েছে।
সর্বজনীন মিলন ও ঐক্য : আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে ‘ছাত্র’ বলতে যেমন সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্ররা ছিলেন, ‘জনতা’ বলতে তেমনি দেশের বুদ্ধিজীবী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, অভিভাবক সর্বস্তরের মানুষ ছিলেন, কেউ বাদ যাননি। লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে সব বয়সের, সব জাতের, সব ধর্মের মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি, ভয়ও পাননি। এমনকি বিরোধীপক্ষের অনেক ছাত্র ও ব্যক্তি আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তারা মৃত্যুকে ভৃত্যজ্ঞান করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মিছিল-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুলি বন্ধ হয়নি, হতাহতের সংখ্যাও কমেনি; তার পরও দিনে দিনে জনতার সংখ্যা বেড়ে শেষে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। একটি বিপথগামী গ্রুপ ব্যতীত মুক্তিযুদ্ধে যে মিলন ও ঐক্য তৈরি হয়েছিল, এখানেও সেরূপ মহামিলন ও ঐকমত্য তৈরি হয়। এই সর্বজনীন ঐক্যচেতনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত ও সাফল্যমণ্ডিত করেছে। [চলবে]
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তান সরকার একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। অথচ জনমিতির বিবেচনায় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ছিল সর্ববৃহৎ। এর বিপরীতে উর্দু ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মৌখিক ও লেখ্য ভাষা। বাংলাদেশের তরুণ ছাত্রসমাজ সরকারের এরূপ অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে, কোনো রূপ অন্যায়-অবিচার মানতে চায় না। তারা আন্দোলন করে, পুলিশের গুলিতে জীবন দেয়, তবু কারও নতি স্বীকার করেনি। তাই ভাষা আন্দোলনের অপর চেতনা হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নতি স্বীকার না করা।
শুধু মাতৃভাষা নয়, অন্য সব ভাষাকে সম্মান দেওয়াও এর চেতনার অঙ্গ ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন উর্দুর বিরুদ্ধে নয়, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। উর্দু বাদ দিয়ে নয়, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে। এতে উর্দুবিদ্বেষ প্রমাণিত হয় না। দৃষ্টিভঙ্গির এই উদারতা থেকে বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে স্বীকৃতি দান করে (১৭ নভেম্বর ১৯৯৯)। ভাষার জন্য একটি জাতির ত্যাগ যেমন অনেক বড়, পাওনাও তেমনি অনেক বড়। জাতির জন্য তা অত্যন্ত গর্ব, গৌরব, শ্লাঘার বিষয়।
মাতৃভাষার মুক্তি ও মর্যাদার জন্য যেমন ভাষা আন্দোলন, মাতৃভূমির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরিসর অনেক বড়, চেতনাও বৃহৎ ও মহৎ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবলে পড়ে নতুন ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের শিকার হয় বাংলাদেশ। এর প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সারা জাতি। নয় মাসের এক সশস্ত্র সংগ্রাম করে মহান বিজয় অর্জিত হয়। সুতরাং এখানেও আছে প্রতিবাদ, প্রতিকার, প্রতিরোধের চেতনা, আছে অনির্বাণ দেশপ্রেম, স্বাধীনতাপ্রীতি ও বন্ধনমুক্তি কামনা। এসবের মূলে আছে বাঙালি/বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রেরণা। যে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের আলোকে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তা টিকল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বিজয়লাভ। এ থেকে অসাম্প্রদায়িকতা বোধের উপলব্ধি ও বিকাশ। মুক্তিযুদ্ধের অপরাপর চেতনা হলো উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠন ও শোষণহীন সমাজপ্রতিষ্ঠা। জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রÑমুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত এই চার নীতি দেশের গঠনতন্ত্রের ভিত্তিমূল রচনা করে। মুক্তিযুদ্ধই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে জাতির চেতনা ও প্রত্যাশা কী? এর একটি সহজ উত্তর রয়েছে ওই ‘বৈষম্যবিরোধী’ শব্দবন্ধের মধ্যে। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে ‘২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবি’ লিখিত ব্যানারে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলেও ৫ দিনের মাথায় তা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ লিখিত ব্যানারে পরিণত হয়, যা পরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে’র মাধ্যমে বিজয় ও পরিসমাপ্তি লাভ করে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্মৃতিচারণা করে বলেন, আন্দোলনের ‘এমন একটা নাম আমরা দিতে চেয়েছি, যাতে নামের মধ্যেই একটা নীতি প্রতিফলিত হয়। শুধু চাকরি নয়, এ আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতি বিতাড়ন, ভালো আমলাতন্ত্রÑএসবও যুক্ত করতে চেয়েছিলাম।’ তিনি এ কথাও বলেন, ফেসবুক গ্রুপে মতামত চেয়ে সর্বাধিক ভোটের মাধ্যমে তা নির্বাচন করেছেন। তার কথার সূত্রে বলা যায়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি তো ছিলই, তার অতিরিক্ত ‘দুর্নীতির বিতাড়ন’ ও ‘ভালো আমলাতন্ত্র’র প্রত্যাশা ছিল। দুর্নীতির বিতাড়ন শব্দগুচ্ছ দ্বারা যদি শেখ হাসিনা রেজিমের দুর্নীতি, গুম-খুন দুঃশাসনের বিতাড়ন বা অবসান ধরা যায়, তবে তা ঘটেছে। ‘ভালো আমলাতন্ত্র’ শব্দগুচ্ছ দ্বারা বিদ্যমান শাসনকাঠামোর মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন রাষ্ট্রব্যবস্থা অভিলাষের কথাই ব্যক্ত হয়। তিনি রাষ্ট্রসংস্কার চেয়েছেন, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লব চাননি। অবশ্য এটা ছিল তার আন্দোলনের প্রথম দিকের ভাবনা। আন্দোলন চলাকালে এবং উত্তরকালে তার ও সহযোগীদের কণ্ঠে বিভিন্ন সময়ে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’, ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’, ‘নতুন বাংলাদেশ’, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’, ‘বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো’, ‘মানবিক রাষ্ট্র’, ‘দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা’ ইত্যাদি পদগুচ্ছ উচ্চারিত হয়, যা শিক্ষার্থী ও জনগণের স্লোগান, প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, গ্রাফিতি, কার্টুন, গণসংগীত, কবিতা-ছড়া ইত্যাদির মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। আর এসবের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব স্বপ্ন, ভাব-ভাবনা, চেতনা, প্রত্যাশা, আকাক্সক্ষার বীজ নিহিত রয়েছে।
এ কথা সত্য, চাকরির প্রত্যাশায় পেশাজীবী-শ্রমজীবী মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হননি। রিকশাওয়ালা, পোশাকশিল্পীরা তা চিন্তাও করেননি। তারা ন্যায্য মজুরি, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন। পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ চাকরি ও পেশায় নিয়োজিত থেকেও আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন ও যোগদান করেছেন বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নীতি, নৈতিকতা ও মানবতার দায়বদ্ধতা থেকে। সুতরাং আন্দোলনের চেতনা ও প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। এখানে কতক সুনির্দিষ্ট চেতনা চিহ্নিত করে পাঠকের অবগতির জন্য উল্লেখ করা হলো :
স্বদেশচিন্তা ও স্বাধীনতাস্পৃহা : ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না।’ ‘ভালো মানুষ, ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ।’ ‘এই দেশ আমার আপনার আমাদের, এক দাবি এক দফা স্বাধীনতা।’ ‘দেশের জন্য মরতে রাজি আছি।’ ‘বাংলার জন্য মরব, বাংলাকে গড়ব।’ ‘আমরাই ছাত্র আমরাই বল/ বাংলাদেশ গড়ব চল।’ ‘দেশ আমার, দায়িত্ব আমার।’ ‘ছাড় ভারত ভক্তি, পেতে চাইলে মুক্তি।’ ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।’ ‘DEATH OR FREEDOM.’ ‘SAVE BANGLADESH.’ বিভিন্ন স্লোগান ও দেয়াললিখন থেকে উক্তিগুলো উদ্ধৃত করা হলো। শেখ হাসিনা অন্ধ ভারতপ্রীতি ও দুর্বল নীতির কারণে দেশ প্রায় বিক্রি করে ফেলেছিলেন, বৈদেশিক আধিপত্যবাদ প্রায় গ্রাস করতে বসেছিল। আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশরক্ষা, দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। উক্তিগুলোতে স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী চেতনা : বৈষম্যের বিপরীত শব্দ সাম্য। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য নয়, সমতার দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের। ‘সংবিধানের বারতা, সুযোগের সমতা’, ‘দাবি এক কোটা বৈষম্য নিপাত যাক’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগান আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। শুরুতে ‘কোটাবৈষম্যে’র কথা থাকলেও পরে তা বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে। তবে মূল দুটি ক্ষেত্র প্রাধান্য পায়, তা হলো রাষ্ট্রনীতিতে ও সমাজব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য। এ জন্য পরবর্তীকালে রাষ্ট্রসংস্কার, নয়া বন্দোবস্ত, মানবিক গণতন্ত্র ইত্যাদির কথা বেশি করে বলা হয়েছে। সমাজে ধনী-দরিদ্র অর্থাৎ আর্থিক বৈষম্য, নারী-পুরুষ অর্থাৎ লিঙ্গবৈষম্য, হিন্দু-মুসলমান অর্থাৎ ধর্মবৈষম্য বিষয়ও স্লোগানে-গ্রাফিতিতে উচ্চারিত হয়েছে। যেমন ‘সমতল থেকে পাহাড়, এবারের মুক্তি সবার’, ধর্ম যার যার, দেশ সবার’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ‘গণতন্ত্রের হাত ধরে সুবোধ তুই ফিরে আয়’। একটি দেয়াললিখন ছিল ‘আমাদের নতুন সেক্যুলার বাংলাদেশ’। একটি গ্রাফিতির কথা ‘স্বাধীনতা গণতন্ত্র ন্যায়বিচার সহনশীলতা দেশপ্রেম’। এখানে প্রতিটি শব্দই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে। এসব স্লোগান-গ্রাফিতিতে জনমনের মিশ্র ভাবনা ও চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে।
দুরন্ত সাহস : জুলাই আন্দোলনের একটি দেয়াললিখনের ভাষা ছিল : ‘ছাত্র যদি ভয় পাইত বন্দুকের গুলি,/ উর্দু থাকত রাষ্ট্রভাষা, উর্দু থাকত বুলি।’ ভাষা আন্দোলনের ছাত্ররা বন্দুকের গুলিকে ভয় করেননি। তারা ভয়কে জয় করে দুরন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় অনুরূপ ছাত্র-জনতা দুরন্ত দুর্জয় সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদ বলেন, ‘বুকের মধ্যে অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ কী দুরন্ত সাহস, নির্ভীক চিত্ত! সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ নিজেরা প্রাণ বলি দিয়ে অন্যদের বলে গেলেন সাহসী হতে, প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী হতে। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, শিক্ষার্থীরা যদি তাদের ক্যাম্পাসে থাকতে না পারে, বাসস্থানে থাকতে না পারে, তাহলে আপনার গণভবনেও তারা আপনাকে থাকতে দেবে না। নিজের বাসভবনে যদি থাকতে চান, শিক্ষার্থীদের বাসভবনের অধিকারও আপনি ঠিক রাখুন।’ (প্রথম আলো, ১-৮-২৪) ওইদিন হাইকোর্টের সামনে এক ছাত্রী পুলিশ ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, গ্রেপ্তার করে তার ভাইকে (শিক্ষার্থী) নিয়ে যেতে দেবেন না। যেতে হলে বুকের ওপর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। পরে জানা গেছে, এ ছাত্রীর নাম নুসরাত হক। তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। এই সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি ‘জুলাই-কন্যা’ নামে অভিহিত হন। কার্টুনিস্ট মেহেদী হক বলেন, তৎকালীন সরকার এমন একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তিনি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি কার্টুন আঁকতে পারেন এবং নিয়মিত আঁকেনও। তিনি বলেন, ‘একটা সময় আমাদের দেশে কার্টুনের খরা যাচ্ছিল, মানুষ আঁকতে ভয় পেত। তবে এবার তরুণেরা যেমন সেই ভয় থেকে বের হয়ে এসেছে, অন্যদেরও বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছে। ...তরুণেরা এবার বুঝিয়ে দিয়েছে, সাহস করে আঁকলে কিছু হয় না। কজনকে গুলি করে মারবে?’ (ডেইলি স্টার, অনলাইন রিপোর্ট, ২০-৮-২৪)।
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ : ‘সকল লাশের হিসাব কর, গ্রেপ্তার-নির্যাতন বন্ধ কর’, ‘সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই, হত্যাকারীর ক্ষমা নাই’, ‘যেখানে অন্যায়ের রেশ, আওয়াজ ওঠা বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
দুঃশাসন-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ : ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তুমিই বাংলাদেশ’, ‘দুর্নীতির বিষদাঁত, ভেঙে দিবে ছাত্রসমাজ’। একটি দেয়াল লিখন এরূপ : ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’। ক্যানভাসে ‘দুর্নীতি ঘুষ লুটপাট চাঁদাবাজ সুদ মাদক যৌতুক স্বৈরাচারী’ ইত্যাদি শব্দ বিন্যস্ত রয়েছে। এসব স্লোগান-দেয়াললিখনের মধ্যে দ্রোহভাব, দ্রোহচেতনার প্রপঞ্চ রয়েছে।
সর্বজনীন মিলন ও ঐক্য : আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে ‘ছাত্র’ বলতে যেমন সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্ররা ছিলেন, ‘জনতা’ বলতে তেমনি দেশের বুদ্ধিজীবী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, অভিভাবক সর্বস্তরের মানুষ ছিলেন, কেউ বাদ যাননি। লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে সব বয়সের, সব জাতের, সব ধর্মের মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি, ভয়ও পাননি। এমনকি বিরোধীপক্ষের অনেক ছাত্র ও ব্যক্তি আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তারা মৃত্যুকে ভৃত্যজ্ঞান করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মিছিল-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুলি বন্ধ হয়নি, হতাহতের সংখ্যাও কমেনি; তার পরও দিনে দিনে জনতার সংখ্যা বেড়ে শেষে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। একটি বিপথগামী গ্রুপ ব্যতীত মুক্তিযুদ্ধে যে মিলন ও ঐক্য তৈরি হয়েছিল, এখানেও সেরূপ মহামিলন ও ঐকমত্য তৈরি হয়। এই সর্বজনীন ঐক্যচেতনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত ও সাফল্যমণ্ডিত করেছে। [চলবে]