ব্রিটিশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে বাণিজ্য করতে এদেশে এসে কুখ্যাত মিষ্টিভাষী ভিলেন রবার্ট ক্লাইভ এদেশে তথা বাংলা-ভারত দখলের হীন কার্যক্রম শুরু করে। ১৭৫৬ সালের প্রথম দিকে সিরাজউদ্দৌলা সবেমাত্র তার নানা আলী বর্দি খানের উত্তরাধিকারী হিসেবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্বভার নেওয়ার পর থেকেই তিনি সযত্নে দক্ষতার সঙ্গে নবাবি কার্যক্রম পরিচালনা আরম্ভ করেন। এদিকে ইংরেজ বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভ এদেশ দখলের হীন প্রচেষ্টায় কলকাতা ও কাশিমবাজার নামক স্থানে দুর্গ স্থাপন করে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সফল আক্রমণে কাশিমপুর বাজার ও কলকাতায় ইংরেজদের দুর্গ দখল করে নিতে সক্ষম হন।
১৭৫৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে রবার্ট ক্লাইভ দুটি দুর্গ উদ্ধার করে নেয় এবং ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৭৪০ জনের ট্রুপ নিয়ে নবাবের বিশাল সৈন্যবাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং নবাবের অতি কাছের মানুষ মীর জাফর, মীর কাশিম, মিরণসহ কৌশলে আরও কয়েকজনকে গোপনে হাত করে নিয়ে নবাবকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।
এভাবে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সর্বাধিপতি নবাব সিরাজউদ্দৌলা সভাসদ সদস্য আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন এবং পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সমাধি রচিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে কুখ্যাত ভিলেন রবার্ট ক্লাইভ ও ওয়ারেন হোস্টিং এই দুজনের মিলিত প্রচেষ্টায় সুকৌশলে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে এবং ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছর শাসন কায়েম করে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ফিরে যায়।
এবার আসি ইতিহাসের মিষ্টভাষী ভিলেন রবার্ট ক্লাইভের ওপর কিছুটা রেখাপাতে। ১৭২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ছোট শহর স্রোপশায়ারে বাংলা-ভারতের ইতিহাসের কুলাঙ্গার নায়ক রবার্ট ক্লাইভের জন্ম। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল সবচাইতে বড়। ছোটবেলায় সে ছিল খুবই দুষ্ট প্রকৃতির। প্রায়ই সে চার্চের ওপর উঠে পানি মুখে নিয়ে গার্গল করে নিচের মানুষজনের ওপর ফেলে দেওয়ার ভয় দেখাত। তা ছাড়া সে এলাকায় গ্যাং তৈরি করে ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র জোর করে ছিনিয়ে নিত। মার্কেট ড্রেটোন গ্রামার স্কুল, মার্চেন্ট টেইলরসহ বিভিন্ন স্কুল থেকে তিন-তিনবার সে বহিষ্কৃত হয়। যদিও সে ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল না, তবু তার লেখা কিংবা বক্তৃতা দেওয়ার স্টাইল ছিল অসাধারণ।
ক্লাইভ যখন প্রথম ইন্ডিয়ায় আসে, তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে তার রোল ছিল একজন সাধারণ লেখক। তবে যুদ্ধবিগ্রহে তার লক্ষণীয় বীরত্ব ছিল। মাদ্রাজ ব্রিটিশের সঙ্গে মুঘল বাহিনীর যুদ্ধে ক্লাইভের অসাধারণ বীরত্ব লক্ষ করা যায়।
১৭৫৩ সালে মাদ্রাজ থেকে ইংল্যান্ড ফিরে গিয়ে বন্ধু নেভিলের ছোট বোন মার্গারেট মাস্কেলাইনকে বিয়ে করে। ১৭৫৫ সালে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে আবার সে ফিরে আসে মাদ্রাজে। মাদ্রাজে এসে কিছুদিনের মধ্যে প্রমোশন পেয়ে সে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হয়।
পরবর্তীতে এদেশে দখলের হীন কার্যক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সুকৌশলে এদেশেরই কিছুসংখ্যক বিশ্বাসঘাতকের সহযোগিতায় পরাজিত করে এদেশে ইংরেজ রাজত্বের যেভাবে সূচনা করে, তা লেখার পূর্বে অংশে বর্ণিত। কুখ্যাত রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬০ সালে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যায়। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা মজবুত করার মানসে পুনরায় সে ১৭৬৫ সালে ভারতে ফিরে আসে। ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর ইতিহাসের আজন্ম এই খলনায়ক নিজেই নিজের বুকে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। ডিপ্রেশন, অতিরিক্ত আফিম সেবনই ছিল তার আত্মহনের মূল কারণ।
বাংলা-ভারতে ইংরেজ শাসনের হোতা ইতিহাসের মিষ্টভাষী ভিলেন কুখ্যাত রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে সমঝোতার বিশ্বাসঘাতকদের শেষ পরিণতিও একইভাবে সংঘটিত হয়।
সেই সব বিশ্বাসঘাতকের নাম :
১। মীর জাফর—কুষ্ঠ রোগে মৃত্যু
২। মীর কাসেম—অনাহারে দিল্লির রাস্তায় মৃত্যু
৩। মিরণ—বজ্রপাতে মৃত্যু
৪। ঘসেটি বেগম—জলে ডুবে মৃত্যু
৫৷ মোহাম্মদী বেগ—পাগল হয়ে কূপে পড়ে গিয়ে মৃত্যু
৬। উর্মিচাঁদ—জলে পচে মৃত্যু
৭। রামনারায়ণ—গঙ্গা নদীতে পড়ে মৃত্যু
৮। ওয়াটসন—মহামারিতে মৃত্যু
৯। কৃষ্ণচন্দ্র—অনাহারে মৃত্যু
উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, বর্তমান সমাজেও সব আপনজন বিশ্বাসঘাতকদের জন্য এটা একটা বিশেষ শিক্ষা, সাধু সাবধান।
লেখক : ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট। বাফেলো, নিউইয়র্ক।
১৭৫৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে রবার্ট ক্লাইভ দুটি দুর্গ উদ্ধার করে নেয় এবং ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৭৪০ জনের ট্রুপ নিয়ে নবাবের বিশাল সৈন্যবাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং নবাবের অতি কাছের মানুষ মীর জাফর, মীর কাশিম, মিরণসহ কৌশলে আরও কয়েকজনকে গোপনে হাত করে নিয়ে নবাবকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।
এভাবে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সর্বাধিপতি নবাব সিরাজউদ্দৌলা সভাসদ সদস্য আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন এবং পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সমাধি রচিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে কুখ্যাত ভিলেন রবার্ট ক্লাইভ ও ওয়ারেন হোস্টিং এই দুজনের মিলিত প্রচেষ্টায় সুকৌশলে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে এবং ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছর শাসন কায়েম করে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ফিরে যায়।
এবার আসি ইতিহাসের মিষ্টভাষী ভিলেন রবার্ট ক্লাইভের ওপর কিছুটা রেখাপাতে। ১৭২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ছোট শহর স্রোপশায়ারে বাংলা-ভারতের ইতিহাসের কুলাঙ্গার নায়ক রবার্ট ক্লাইভের জন্ম। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল সবচাইতে বড়। ছোটবেলায় সে ছিল খুবই দুষ্ট প্রকৃতির। প্রায়ই সে চার্চের ওপর উঠে পানি মুখে নিয়ে গার্গল করে নিচের মানুষজনের ওপর ফেলে দেওয়ার ভয় দেখাত। তা ছাড়া সে এলাকায় গ্যাং তৈরি করে ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র জোর করে ছিনিয়ে নিত। মার্কেট ড্রেটোন গ্রামার স্কুল, মার্চেন্ট টেইলরসহ বিভিন্ন স্কুল থেকে তিন-তিনবার সে বহিষ্কৃত হয়। যদিও সে ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল না, তবু তার লেখা কিংবা বক্তৃতা দেওয়ার স্টাইল ছিল অসাধারণ।
ক্লাইভ যখন প্রথম ইন্ডিয়ায় আসে, তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে তার রোল ছিল একজন সাধারণ লেখক। তবে যুদ্ধবিগ্রহে তার লক্ষণীয় বীরত্ব ছিল। মাদ্রাজ ব্রিটিশের সঙ্গে মুঘল বাহিনীর যুদ্ধে ক্লাইভের অসাধারণ বীরত্ব লক্ষ করা যায়।
১৭৫৩ সালে মাদ্রাজ থেকে ইংল্যান্ড ফিরে গিয়ে বন্ধু নেভিলের ছোট বোন মার্গারেট মাস্কেলাইনকে বিয়ে করে। ১৭৫৫ সালে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে আবার সে ফিরে আসে মাদ্রাজে। মাদ্রাজে এসে কিছুদিনের মধ্যে প্রমোশন পেয়ে সে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হয়।
পরবর্তীতে এদেশে দখলের হীন কার্যক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সুকৌশলে এদেশেরই কিছুসংখ্যক বিশ্বাসঘাতকের সহযোগিতায় পরাজিত করে এদেশে ইংরেজ রাজত্বের যেভাবে সূচনা করে, তা লেখার পূর্বে অংশে বর্ণিত। কুখ্যাত রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬০ সালে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যায়। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা মজবুত করার মানসে পুনরায় সে ১৭৬৫ সালে ভারতে ফিরে আসে। ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর ইতিহাসের আজন্ম এই খলনায়ক নিজেই নিজের বুকে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। ডিপ্রেশন, অতিরিক্ত আফিম সেবনই ছিল তার আত্মহনের মূল কারণ।
বাংলা-ভারতে ইংরেজ শাসনের হোতা ইতিহাসের মিষ্টভাষী ভিলেন কুখ্যাত রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে সমঝোতার বিশ্বাসঘাতকদের শেষ পরিণতিও একইভাবে সংঘটিত হয়।
সেই সব বিশ্বাসঘাতকের নাম :
১। মীর জাফর—কুষ্ঠ রোগে মৃত্যু
২। মীর কাসেম—অনাহারে দিল্লির রাস্তায় মৃত্যু
৩। মিরণ—বজ্রপাতে মৃত্যু
৪। ঘসেটি বেগম—জলে ডুবে মৃত্যু
৫৷ মোহাম্মদী বেগ—পাগল হয়ে কূপে পড়ে গিয়ে মৃত্যু
৬। উর্মিচাঁদ—জলে পচে মৃত্যু
৭। রামনারায়ণ—গঙ্গা নদীতে পড়ে মৃত্যু
৮। ওয়াটসন—মহামারিতে মৃত্যু
৯। কৃষ্ণচন্দ্র—অনাহারে মৃত্যু
উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, বর্তমান সমাজেও সব আপনজন বিশ্বাসঘাতকদের জন্য এটা একটা বিশেষ শিক্ষা, সাধু সাবধান।
লেখক : ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট। বাফেলো, নিউইয়র্ক।