আমাদের মিলন ভাই

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৩ , অনলাইন ভার্সন
এক.
আমাদের কাছে তিনি মিলন ভাই। মহল্লার মিলন ভাই। মহল্লা ঠিক নয়, পাশের মহল্লা। আমি ফরিদাবাদ-মিলব্যারাক এলাকার। মিলন ভাই গেন্ডারিয়ার। কিন্তু আমরা গর্ব করে মিলন ভাইকে নিজের মহল্লার বলেই চালিয়ে দিতাম। চালিয়ে দেওয়ার কারণ দূরের বন্ধুদের কাছে একটা সমীহ আদায় করে নেওয়া। মিলন ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে, এই সুবিধা নিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে চা-পানিসহ নানা রকম সুবিধা আদায় করেছি। এটা উনিশ’শ ছিয়াশি কি সাতাশি সালের কথা। আমি তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। পাঠকমহলে কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন একটি জনপ্রিয় ও ঈর্ষণীয় নাম। মিলন ভাই কোন ব্যান্ডের প্যান্ট-শার্ট পরেন, পারফিউম কোনটা ব্যবহার করেন, আমরা তাঁকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। খুব মনে আছে, কী করে জানলাম মিলন ভাই ‘কোবরা’ পারফিউম ব্যবহার করেন, জলদি গিয়ে ‘কোবরা’ কিনে নিয়ে এলাম। এরপর বন্ধুদের মাঝে সুযোগ পেলেই জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, মিলন ভাই যে পারফিউম ব্যবহার করেন, আমিও তা-ই করছি। তিনি সাহিত্যের মহাতারকা। শিল্প-সাহিত্যের লোকজনের কাছে আলোচিত। প্রকাশকেরা তাঁর পাণ্ডুলিপি পাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ইমদাদুল হক মিলনের বই মানে বিজনেস। প্রকাশনা জাতে ওঠা।

দুই.
দিগন্ত মজলিস ও তরুণ ঐক্যজোট নামে দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল মিলব্যারাক, আলমগঞ্জে। দিগন্ত মজলিস পুরোনো সংগঠন। তরুণ ঐক্যজোট নতুন। দুই সংগঠনেই ছিল আমার যাতায়াত। আমি একটু-আধটু লেখার চেষ্টা করছি। বিশেষ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করছি। অনুষ্ঠানের কর্মী হয়ে কাজ করছি। সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ম্যাগাজিন প্রকাশের কথা ভাবলেই প্রথম লেখকের নামের জায়গায় চলে আসত মিলন ভাইয়ের নাম। প্রথমত আমাদের মহল্লার লেখক। দ্বিতীয়ত, ম্যাগাজিনের ওজন বাড়ানো। লেখা চাইতে কে কে যাবে? কথা শেষ হওয়ার আগেই হাত তুলতাম। লেখা চাওয়ার অছিলায় জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলনের দর্শন পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

তিন.
বিরানব্বই সালের কথা। লেখালেখির পাশাপাশি আমি প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেলাম। লেখালেখি নেশা। প্রকাশনা পেশা। পেশার কারণে ‘চারদিক’ নামক একটা প্রকাশনার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারলাম, একদা ‘চারদিক’ প্রকাশনা সংস্থাটির সঙ্গে মিলন ভাই জড়িত ছিলেন। এই কথা শুনে কাজের স্পিড বেড়ে গেল। এখন চারদিকের প্রকাশক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ।

চারদিকের দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিলাম, ইমদাদুল হক মিলনের পাণ্ডুলিপি নেব। প্রেমের উপন্যাস। কারণ, প্রেমের উপন্যাসে তখন ইমদাদুল হক মিলন অদ্বিতীয়। এখনো। ভাবনা অনুযায়ী যথারীতি মিলন ভাইয়ের বাসায় গিয়ে প্রস্তাব দিলাম। সঙ্গে দিলাম অগ্রিম বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা। অনেকে আরও বেশি অগ্রিম দিয়ে ইমদাদুল হক মিলনের পাণ্ডুলিপির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন। আমিও ওয়েটিং লিস্টে আছি। মিলন ভাই বইয়ের নাম দিলেন ‘সুচরিতাসু’। একটা এ ফোর সাইজের সাদা কাগজে উপন্যাসের নাম ‘সুচরিতাসু’ লিখে নিচে লিখলেন ইমদাদুল হক মিলন। আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই মিয়া ধরো। প্রচ্ছদ করিয়ে ফেলো। পাণ্ডুলিপি কয়েক দিনের মধ্যে পেয়ে যাবে।’

সমর মজুমদার প্রচ্ছদ করলেন। পাণ্ডুলিপি পেতে প্রায় প্রতিদিন বাসায় ঢুঁ মারি। প্রয়োজন ছাড়াও যাই। পাণ্ডুলিপির ছুতোয় মিলন ভাইয়ের সঙ্গ পেতে চলে যেতাম। মাঝে মাঝে অবশ্য মিলন ভাই বুঝতে পারতেন। তবুও চার তলার সিঁড়ি ভেঙে কলিংবেল চাপ দিই। যথারীতি দরজা খুলেই মিলন ভাই চেনা ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেন, ‘কি মিয়া ঢালী, আইছ? তোমার কি আইজ আসার কথা?’
মিথ্যা বলি মিলন ভাইকে, ‘জি ভাই।’

মিলন ভাই প্রমাণে যেতেন না, বলতেন, ‘ভেতরে আসো।’
বাসায় গিয়ে বসি। সঙ্গে সঙ্গে গৃহকর্মীকে মিলন ভাইয়ের নির্দেশ, ‘এই কুসুম, ঢালীরে নাশতা দে।’
এরপর মিলন ভাই বসে সাহিত্যের নানা গল্প বলতেন। আমার লেখালেখি নিয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতেন।
‘এই মিয়া তুমি নামের শেষে ঢালীটা রাখছ ক্যান? শুধু হুমায়ূন কবীরই তো যথেষ্ট। তোমার লেখা আমি পড়ছি। তুমি তো মিয়া ভালোই লেখো।’

তখন আমার প্রেমের উপন্যাস ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ প্রকাশ হয়েছে। একজন ইমদাদুল হক মিলনের মুখে এই কথা শুনে আপ্লুত হই। মনে মনে ভাবি, আমার লেখালেখি সার্থক।
আমাদের কথার মাঝে মিষ্টি ও চা নিয়ে হাজির কুসুম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মিলন ভাইয়ের বাসায় গিয়ে কেউ মিষ্টি না খেয়ে ফিরে এসেছেন এমন কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। মিলন ভাই নিজেও একজন মিষ্টিপ্রেমী মানুষ। যাহোক, চামচ দিয়ে মিষ্টি কেটে কেটে খাচ্ছি আর মিলন ভাইয়ের মিষ্টি কথা হজম করছি। এটাও সত্য, মিলন ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতে ঘোরে বন্দি না হয়ে উপায় নেই। প্রসঙ্গটা যখন এল বলেই ফেলি। মিলন ভাই লেখক হিসেবেই শুধু জনপ্রিয় নন, একজন ভালো বক্তা ও উপস্থাপকও। শুধু মিলন ভাইয়ের বক্তৃতা শুনতে অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। উপন্যাসের কাহিনির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বক্তৃতা দিলেও দর্শককে দেখেছি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে।


চার.
জীবনসংগ্রাম আর মেধার জোরে গড়ে ওঠা ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যিক ক্যানভাস অত্যন্ত বিশাল। প্রেমের উপন্যাস বা জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি হাত দিয়েছেন শেকড়সন্ধানী ও ক্ল্যাসিক ধারার উপন্যাসে। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল দীপ্তি। তাঁর লেখা ‘যাবজ্জীবন’, ‘নূরজাহান’, ‘অধিবাস’, ‘বাঁকাজল’, ‘পরাধীনতা’, ‘দেশভাগের পর’, ‘কালাকাল’, ‘নিঝুম নিশিরাতে’, ‘ভূমিপুত্র’, ‘যে জীবন আমার ছিল’, ‘কেমন আছ সবুজপাতা’, ‘জীবনপুর’, কিংবা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনন্য সৃষ্টি ‘কালোঘোড়া’, ‘নয় মাস’, ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’, বা ‘মাটি ও মানুষের উপাখ্যান’ বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, নিখাদ পল্লিপ্রকৃতি আর মানুষের ভেতরের মনস্তত্ত্ব তাঁর কলমে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। দুই বাংলাতেই তাঁর সৃষ্টি সমাদৃত।

পাঁচ.
শুধু সৃজনশীল কথাসাহিত্যেই নয়, সাংবাদিকতা জগতেও মিলন ভাই এক উজ্জ্বল ও বরেণ্য নাম। একসময় তিনি কাজ করেছেন ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকায়; যেখানে সাহসিকতার সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখার কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছিল; যা তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আপসহীন ও সত্যনিষ্ঠ সত্তারই প্রমাণ দেয়। দীর্ঘ পেশাজীবী জীবনের নানা পথপরিক্রমা পেরিয়ে পরবর্তীতে তিনি জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। প্রমাণ করেছেন একজন সফল কথাসাহিত্যিক কতখানি মুনশিয়ানার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। লেখার পাশাপাশি একজন লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তাঁর ভালো পাঠক হওয়া। ইমদাদুল হক মিলন কেবল একজন সফল লেখকই নন, অসাধারণ এক নিবেদিতপ্রাণ পাঠকও বটে। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখক ও গ্রন্থ তাঁর বিপুল পরিমাণে পড়া রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে যে কজন সফল লেখককে আমরা উঁচুমাপের পাঠক হিসেবে জানি, ইমদাদুল হক মিলন তাঁদের অন্যতম। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় স্বীকৃতি তাঁর মুকুটে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় ও চিরচেনা পরিচয়—তিনি আমাদের প্রাণের ‘মিলন ভাই’। ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ৭১তম জন্মদিবস। জন্মদিবসে বিনীত শ্রদ্ধা আর গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করি আমাদের শৈশব- সেই প্রেরণার উৎসকে। মিলন ভাই, আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]