ত্যাগ ও ভোগের সম্মিলনে দূরীভূত ক্লেশ

প্রকাশ : ২৪ অগাস্ট ২০২৩, ১৩:০০ , অনলাইন ভার্সন
এস এম মোজাম্মেল হক


ত্যাগ ও ভোগ দুটোই পারস্পরিক জীবনবোধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং সুন্দর ও মায়াময় পৃথিবীর জন্য খুবই আপেক্ষিক বাস্তবতা। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ভোগ অপরিহার্য হলেও ত্যাগের বিষয়টিও উপেক্ষিত নয়। কারণ একের ত্যাগের মাধ্যমে অপরের ভোগের সুযোগ তৈরি হয়। তাই ত্যাগ ও ভোগ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। নিবিড়ভাবে সম্পর্কের এই বন্ধনই পৃথিবীকে অপারসৌন্দর্যময় করে তুলছে। পৃথিবীর সকল আয়োজন ও যত নিয়মকানুন, বিধিনিষেধ, প্রেম-ভালবাসা, হিংসা-দ্বেষ সবই আবর্তিত এই দুটো বিষয়ের সঙ্গে জীবনকে ঘিরে। জীবনধারণের জন্য আহারের প্রয়োজন না থাকলে মানুষের জীবন অত্যন্ত সহজ ও নিরাভরণ থাকত। মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রয়োজন থাকলেও আহারের প্রয়োজনই মূল। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ার কারণে অন্য প্রাণী থেকে চাহিদা ও তার জোগানের জন্য বাড়তি আয়োজন।

বিশ্বের সকল প্রাণীর একটি ক্ষুদ্র অংশ মানুষ, যাদের জীবনযাপনের জন্য কত কি প্রয়োজন, অথচ মানুষ ব্যতীত বহুগুণ বেশি অন্যান্য প্রাণী প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন করে টিকে আছে। আমরা তাদের ভাষা বুঝি না বলে হয়তো তাদের দুঃখ-দুর্দশার খবর জানি না কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তাদের টিকে থাকার বিষয়টি তো স্পষ্ট। অতি বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষগুলো যদি বিষয়টি উপলব্ধি করে বিলাসিতা কমিয়ে সাশ্রয়ী অর্থ নিরন্ন মানুষের আহার জোগাতে সহায়তা করে, তাহলে ধনী-গরিবের ব্যবধান যেমন কমবে, সারা বিশ্ব হবে অধিকতর মানবিক।

অর্থবিত্তের মানদণ্ডে মানুষের সামাজিক অবস্থান নিরূপণ সব ক্ষেত্রে প্রকৃত অবস্থার বহিঃপ্রকাশের নিশ্চয়তা বহন করে না। সামাজিক অবস্থান এবং তা সমাজের কাছে মান্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বহুবিধ সূচকের মূল্যায়নে গৃহীত-বর্জিত হওয়ার প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল। অর্থ এমন একটা নিয়ামক, যা লোভের কাছে চুম্বকের আকর্ষণের জন্য খুব প্রিয় লৌহজাত বস্তুর মতো, তবে সে অর্থ লাভের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন, ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি মেনে চলার জন্য ব্যক্তির শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধ থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন হয়তো তাকে আর্থিক দিক থেকে সাবলম্বী করবে কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি থাকবেন অতি দুর্বল ও হীনম্মন্য। তাই যেনতেনভাবে অর্থ উপার্জন করে যারা জাতে উঠতে চান, তাদের জন্য এটি ভাবার বিষয়। অর্থ থাকলে তা প্রয়োজনে খরচ, অতিরিক্ত অর্থ মজুদ এবং অর্থের একটা অংশ নিজের জন্য অপরিহার্য খরচের মতোই দানের জন্য বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। কারণ, সব মানুষের পক্ষে যেমন সমান দক্ষতা অর্জন ও অর্থ উপার্জন সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের সহায়তা করা নৈতিক দায়িত্ব।
প্রতিটি ধর্মেই দানকে একটি মহৎ গুণ হিসেবে মনে করা হয়। তবে ইসলাম ধর্মে অর্থের নির্দিষ্ট পরিমাণ দানকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়েছে। বিধানটি যারা জানেন, তাদের জন্য পালন করা খুব সহজ। তবে অনেক কঞ্জুস লোক আছেন, জেনেও যারা অর্থ কমে যাওয়ার ভয়ে দান করা থেকে বিরত থাকেন। অথচ দান এমন একটা নিয়ামত, যা অর্থকে পরিশুদ্ধ করে এবং অর্থবিত্ত বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। উন্নত বিশ্বে বিলিয়নিয়াররা দানকে তাদের জীবনের একটি মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তাদের ওপর অর্পিত হিস্যার অনেক বেশি তারা দাতব্য কাজে দেশ-বিদেশে দান করে থাকেন, যা থেকে উপকৃত হয় নিরন্ন মানুষ ও রোগব্যাধিতে পর্যুদস্ত অসহায় সেবাগ্রহীতারা। উন্নত বিশ্বে বেশির ভাগ নাগরিক আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য বহু সেবা রাষ্ট্রীয়ভাবে সহজলভ্য হওয়ার কারণে ত্যাগ ও ভোগের বিষয়টি সেখানে যতটা প্রযোজ্য, সে তুলনায় দারিদ্র্যপীড়িত দেশসমূহের ক্ষেত্রে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

আইনগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যখন আইন মান্য করা হয় ও দায়িত্ব পালনের সময় সেবার মানসিকতা উজ্জীবিত থাকে এবং সে অনুযায়ী সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণের মাধ্যমে সবার সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব হয়, সে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে যথাযথ প্রতিদান পেলেও দায়িত্বকালীন সময়টি সেবায় রূপান্তরিত হয় এবং এ জন্য মানুষের নিকট থেকে যেমন পাওয়া যায় সম্মান, শ্রদ্ধা ও প্রশংসা; পক্ষান্তরে প্রতিষ্ঠানের নিকটও গর্বিত কর্মী হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হন। স্রষ্টার নিকটও পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন এবং এ জন্য ইহকাল ও পরকালে পুরস্কারের আশা পোষণ কোনো বাড়তি প্রত্যাশা নয়।

মানুষ যদি একটা কথা সব সময় মনে রাখে, তবে তার পক্ষে কখনো অন্যায় আচরণ করা সম্ভব নয়। যারা ন্যায়ানুগ কর্মে লিপ্ত, তাদের কথা ভিন্ন কিন্তু যারা বুঝে বা না বুঝে অন্যায় কাজে লিপ্ত এবং তার মাধ্যমে অপরের হক নষ্ট কওে নিজ আয়ত্তে নেন, একবার ভেবে দেখুন তো এর কতটুকু আপনি দুনিয়ায় ভোগ করতে পারবেন এবং রেখে যাওয়া সম্পদের যারা দাবিদার তারাই-বা এর কতটুকু ভোগ করতে পারবে এবং রেখে যাওয়া সম্পদ কোনো ভালো কাজে ব্যয় হবে কি না। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আপনি যাদের স্বার্থত্যাগে বাধ্য করে নিজের ভোগের জন্য আয়ত্তে এনেছেন, আপনারও কিন্তু তা অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্যের ভোগের জন্য ত্যাগ করতে হচ্ছে এবং এ ত্যাগকৃত সম্পদ আপনার প্রস্থানের পর কে ভোগ করবে, সে বিষয় কিন্তু আপনি অনিশ্চিত। সুতরাং ত্যাগ ও ভোগের বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে যিনি ভোগের জন্য সংগ্রহ করেন তিনি ভোগ করতে পারবেন কি না বা যাদের কল্যাণের জন্য ত্যাগ করে যাবেন, তাদের ভোগে তা লাগবে কি না তা অনিশ্চিত। ত্যাগ ও ভোগের এই জটিল হিসাব মাথায় থাকলে বিশ্বের অন্যায়, অত্যাচার বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং পৃথিবী হয়ে উঠবে শান্তির লীলাভূমি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক। কুইন্স ভিলেজ, নিউইয়র্ক।
M M Shahin, Chairman Board of Editors, Thikana

Corporate Headquarter :

THIKANA : 7409 37th Ave suite 403

Jackson Heights, NY 11372

Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806



Bangladesh Bureau : THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath),
5th Floor, Dhaka- 1205, Bangladesh.
Mobile: 01711238078