দ্রুত বিশ্বায়নের এই সময়ে অনলাইনে যোগাযোগ এখন জীবনের এক অত্যাবশ্যকীয় অংশ হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে চাকরিক্ষেত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংবাদমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনলাইন যোগাযোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা মানুষের জীবনকে যেমন গতিশীল করেছে, তেমনি বদলে দিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ধরনও।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নেই—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম এ ক্ষেত্রে শুধু এগিয়েই নেই, বরং তারাই যেন এই ভার্চুয়াল জগতের সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক। দূরের মানুষ মুহূর্তেই কাছে চলে আসছে, অপরিচিত মানুষ পরিচিত হচ্ছে, আর কখনো কখনো সেই পরিচয় গড়াচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে।
প্রযুক্তির কল্যাণে ভালোবাসার প্রকাশও এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে একটি চিঠির উত্তরের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন একটি মেসেজের উত্তর পেতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। দূরত্ব এখানে বড় কোনো বাধা নয়। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যাচ্ছে, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যাচ্ছে, এমনকি না দেখেও কারও প্রতি গভীর টান অনুভব করা যাচ্ছে।
এভাবে অনলাইন যোগাযোগ যত সহজ হয়েছে, প্রতারণার কৌশলও তত সূক্ষ্ম হয়েছে। এখন আর প্রতারণার জন্য সব সময় অপরিচিত কোনো লিঙ্ক, সন্দেহজনক ফোনকল কিংবা ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো প্রতারণা শুরু হচ্ছে অনলাইন বন্ধুত্বের মাধ্যমে। অনলাইনে বন্ধুত্ব থেকে শুরু হচ্ছে নিয়মিত কথা বলা। নিয়মিত কথা বলা থেকে তৈরি হচ্ছে নির্ভরতা। আর সেই নির্ভরতা কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হচ্ছে, তা অনেক সময় দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারছে না। অনলাইনের এই প্রেমে কোনো সমস্যা নেই; সমস্যা তৈরি হচ্ছে একজনের অন্ধবিশ্বাস এবং অপরজনের প্রতারণার মানসিকতা থেকে। অনলাইনে পরিচয় হওয়া মানুষটাকে শুরুতেই প্রতারক হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। যখন অল্প দিনের পরিচয়ে একজন মানুষকে নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে হচ্ছে, যখন তার কথাই হয়ে উঠছে শেষ কথা; যখন ভালোবাসার কারণে তার পরিচয় যাচাই করার প্রয়োজনও বোধ করতে হচ্ছে না, তখনই তৈরি হচ্ছে বিপদের জায়গা। আর সেই জায়গাটিকেই কাজে লাগাচ্ছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র।
অনলাইনে প্রেমের মাধ্যমে প্রতারণার শুরুটা কিন্তু টাকা চাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় না। ধরুন, একজন তরুণ ও একজন তরুণীর অনলাইনে পরিচয় হয়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারা হয়তো দুজন দুই শহরে থাকে। অদূর ভবিষ্যতে একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ খুবই কম। যেকোনোভাবে তাদের অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে কয়েক মাস একে অপরের খোঁজখবর নিয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে প্রেমের সম্পর্ক মানে ঘন ঘন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটিং, অডিও কিংবা ভিডিও কলে কথা বলা। এই যোগাযোগ একপর্যায়ে প্রবলভাবে গাঢ় হতে শুরু করে। যখন দুটি মানুষ একে অপরকে কাছে পাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে, বিশ্বাস করে ওঠে, তখন উভয়েই একে অপরের যেকোনো চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
এই গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা থেকেই ভিডিও কলে উভয়ের কেউ একজন অপরজনের কাছে তার আপত্তিকর ছবি চেয়ে বসে, কখনো-বা ভিডিও কলে উলঙ্গ শরীর প্রদর্শনের আবদার করে বসে। অপর প্রান্তের জন ভেবে বসে, তাকে যেহেতু আমি ভালোবাসি, একটা সময় আমি তো তাকে বিয়ে করবই, তাই তার এমন আবদার পূরণ করতে আমার আপত্তি কিসের? আবেগতাড়িত হয়ে এভাবে সে তার অনলাইনে পরিচিত বন্ধুকে শরীর প্রদর্শন করতে থাকে, আর অপর প্রান্ত থেকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া অন্যজন তা রেকর্ড করে বা সংরক্ষণ করে।
যেকোনো সম্পর্কের দিনগুলো সমানতালে এগোয় না। সম্পর্কে যেমন গভীর ভালোবাসা লক্ষ করা যায়, তেমনি মাঝে মাঝে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও মান-অভিমান, ভুল-বোঝাবুঝি কিংবা মনোমালিন্য হতে পারে। কখনো কখনো সেই মান-অভিমানই সম্পর্কের পরিণতি টেনে আনে। আর তখনই অপর প্রান্তের মানুষটির হাতে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিও হয়ে ওঠে সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ। একসময় যে মানুষটির কাছে নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া হয়েছিল, সম্পর্কের টানাপোড়েনে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ।
মনোমালিন্যের কারণে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘আমার কথা না শুনলে তোমার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেব।’ সচরাচর এমন ঘটনাই ঘটছে। কখনো মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়, কখনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাপ দেওয়া হয়, আবার কখনো এমন কিছু করতে বাধ্য করা হয়, যা ওই মানুষটি কোনোভাবেই করতে রাজি নয়। এরপর প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতে থাকে, পরিবার যদি জানতে পারে? বন্ধুবান্ধবী যদি জানতে পারে? পরিচিতজনদের কেউ যদি দেখে ফেলে? আর এই মানসিক চাপ অনেক সময় মানুষকে ভয়াবহ এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
যে তরুণ কিংবা তরুণী কিছুদিন আগেও অনলাইনে বসে তার প্রেমিকা কিংবা প্রেমিকের সঙ্গে ভবিষ্যতের সংসারের স্বপ্ন দেখছিল, তাকেই একদিন নিজের জীবন নিয়ে ভীত হয়ে পড়তে হচ্ছে। যে মানুষটি ভেবেছিল, দূর শহরের মানুষটিই হয়তো তার জীবনের আপন মানুষ, সেই মানুষটিই কখনো তার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, তা যেন কল্পনার বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা অনেক সময় কাউকে কিছু বলতে পারে না। তারা ভাবে, বিষয়টি প্রকাশ পেলে পরিবার কী বলবে, সমাজ কী বলবে, পরিচিতজনেরা কীভাবে দেখবে। লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে অনেকে একাই এই চাপ বহন করে। কখনো কখনো এই ভয় ও মানসিক চাপ আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে, সেটিই একসময় একজন মানুষের জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অনলাইনে পরিচিত একজন মানুষকে ভালোবাসা মোটেও অপরাধ নয়। দূরের দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং প্রযুক্তির এই সময়ে এমন সম্পর্কের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখন, যখন অনলাইন পরিচয়কে বাস্তব পরিচয়ের চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া হচ্ছে; যখন কয়েক মাসের কথোপকথনই একজন মানুষের প্রতি নিঃশর্ত আস্থার কারণ হয়ে উঠছে; যখন আবেগের কাছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলো তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন প্রেমের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওতে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। প্রথমে হয়তো বলা হচ্ছে, ‘আমি একটু বিপদে পড়েছি, কিছু টাকা প্রয়োজন’, ‘আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে’, ‘পারিবারিক সমস্যার কারণে মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন’ কিংবা ‘আমার ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে কিছু টাকা ধার দরকার’—এমন নানা অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। অপরজন ভাবছে, আমার ভালোবাসার মানুষ বিপদে পড়েছে, তাকে সাহায্য না করতে পারলে তো আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে দেখা যাচ্ছে, নিজের জমানো টাকা কিংবা অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করে হলেও পাঠানো হচ্ছে অপর প্রান্তের মানুষটাকে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও সমস্যা শেষ হচ্ছে না। বরং নতুন সমস্যার জন্ম হচ্ছে। আবারও টাকা চেয়ে সেই আগের মতো অনুরোধ আসছে। সম্পর্কের আবেগ তখন অর্থের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে ভুক্তভোগী বুঝতেই পারে না, তিনি ভালোবাসার মানুষটিকে সাহায্য করছেন, নাকি ধীরে ধীরে একটি প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, যে মানুষটির জন্য এত কিছু করেছেন, তার পরিচয়ই ছিল মিথ্যা, উদ্দেশ্যই ছিল প্রতারণা করা। সাজানো নাটকের খপ্পরে পড়ে টাকা-পয়সা হারিয়ে অনেকেই তখন নিরুপায় হয়ে পড়ে। জোরালো প্রমাণ না থাকায় আইনের আশ্রয় নিয়েও কোনো লাভ হয় না। আমাদের সময়ের একটি বড় বৈপরীত্য হলো, মানুষ অনলাইনে খুব সহজে কাছাকাছি আসছে, অথচ বাস্তবে একে অপরকে জানার চেষ্টা করছে না। একটি মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা বলেও তার জীবনের অনেক সত্য অজানা থেকে যেতে পারে। কারণ ভার্চুয়াল জগতে প্রত্যেকে নিজের একটি পছন্দসই সংস্করণ উপস্থাপন করে। কেউ নিজের ভালো দিকগুলোই দেখাচ্ছে। কেউ নিজের সাফল্যের গল্প বলছে। কেউ নিজেকে নিঃসঙ্গ, অসহায় কিংবা ভালোবাসাবঞ্চিত হিসেবে তুলে ধরছে। আবার কেউ হয়তো এমন একজন মানুষের অভিনয় করছে, যাকে দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, ‘এই মানুষটিই তো আমার জন্য উপযুক্ত।’ আর মানুষ যখন সেই অভিনয়কে বাস্তব ভেবে নিচ্ছে, তখনই শুরু হচ্ছে বিপদ। অপরজনকে পাঠানো ব্যক্তিগত ছবি তখন শুধু ছবি থাকছে না, হয়ে উঠছে ব্ল্যাকমেলের ধারালো অস্ত্র। অনলাইনে ভালোবাসার সম্পর্ক তখন আর ভালোবাসার সম্পর্ক থাকছে না, হয়ে উঠছে প্রতারণার ডিজিটাল ফাঁদ, যেটিকে আমরা ‘হানিট্র্যাপ’ বলছি।
বর্তমান যুগ বিবেচনায় আমরা অনলাইন থেকে দূরে সরে যেতে পারব না। বরং আগামী দিনে আমাদের আরও বেশি অনলাইন-নির্ভর হতে হবে। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটবে, বন্ধুত্ব তৈরি হবে, প্রেম-ভালোবাসাও হবে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই বাস্তবতার সঙ্গে আরেকটি সত্যও মনে রাখা জরুরি—অনলাইনে পরিচয় হওয়া মানুষ মানেই পরিচিত মানুষ নয়। পরিচয় আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়। কথা বলা আর মানুষটিকে জানা এক জিনিস নয়। ভিডিও কলে মুখ দেখা আর তার চরিত্র জানা এক জিনিস নয়। আর ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা ও সত্যিকারের ভালোবাসা—দুটিও সব সময় এক নয়। তাই অনলাইনে কোনো সম্পর্ক যখন ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে, তখন শুধু ভালোবাসার সম্ভাবনাটিই নয়, প্রতারণার শঙ্কাটিও মাথায় রাখা দরকার। কারণ আমরা যতটা দ্রুত অনলাইনে কারও কাছে পৌঁছে যেতে পারি, ততটা দ্রুত হয়তো তার সত্যিকারের পরিচয়ের কাছে পৌঁছাতে পারি না।
একজন মানুষকে ভালোবাসতে সময় লাগতেই পারে। কিন্তু একজন মানুষকে বিশ্বাস করার আগে তাকে চেনার সময়টুকু নেওয়া আরও জরুরি। কারণ প্রেম ভেঙে গেলে মানুষ কাঁদে, কষ্ট পায়, একসময় হয়তো ঘুরেও দাঁড়ায়। কিন্তু ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে যদি হারিয়ে যায় অর্থ, ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা জীবন, তাহলে সেই ক্ষতি আর কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হয় না। অনলাইন প্রেমের ফাঁদে আটকে সর্বস্ব হারানোর আগে তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে, আবেগ-অনুভূতিকে সংযত রাখতে হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নেই—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম এ ক্ষেত্রে শুধু এগিয়েই নেই, বরং তারাই যেন এই ভার্চুয়াল জগতের সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক। দূরের মানুষ মুহূর্তেই কাছে চলে আসছে, অপরিচিত মানুষ পরিচিত হচ্ছে, আর কখনো কখনো সেই পরিচয় গড়াচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে।
প্রযুক্তির কল্যাণে ভালোবাসার প্রকাশও এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে একটি চিঠির উত্তরের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন একটি মেসেজের উত্তর পেতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। দূরত্ব এখানে বড় কোনো বাধা নয়। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যাচ্ছে, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যাচ্ছে, এমনকি না দেখেও কারও প্রতি গভীর টান অনুভব করা যাচ্ছে।
এভাবে অনলাইন যোগাযোগ যত সহজ হয়েছে, প্রতারণার কৌশলও তত সূক্ষ্ম হয়েছে। এখন আর প্রতারণার জন্য সব সময় অপরিচিত কোনো লিঙ্ক, সন্দেহজনক ফোনকল কিংবা ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো প্রতারণা শুরু হচ্ছে অনলাইন বন্ধুত্বের মাধ্যমে। অনলাইনে বন্ধুত্ব থেকে শুরু হচ্ছে নিয়মিত কথা বলা। নিয়মিত কথা বলা থেকে তৈরি হচ্ছে নির্ভরতা। আর সেই নির্ভরতা কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হচ্ছে, তা অনেক সময় দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারছে না। অনলাইনের এই প্রেমে কোনো সমস্যা নেই; সমস্যা তৈরি হচ্ছে একজনের অন্ধবিশ্বাস এবং অপরজনের প্রতারণার মানসিকতা থেকে। অনলাইনে পরিচয় হওয়া মানুষটাকে শুরুতেই প্রতারক হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। যখন অল্প দিনের পরিচয়ে একজন মানুষকে নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে হচ্ছে, যখন তার কথাই হয়ে উঠছে শেষ কথা; যখন ভালোবাসার কারণে তার পরিচয় যাচাই করার প্রয়োজনও বোধ করতে হচ্ছে না, তখনই তৈরি হচ্ছে বিপদের জায়গা। আর সেই জায়গাটিকেই কাজে লাগাচ্ছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র।
অনলাইনে প্রেমের মাধ্যমে প্রতারণার শুরুটা কিন্তু টাকা চাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় না। ধরুন, একজন তরুণ ও একজন তরুণীর অনলাইনে পরিচয় হয়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারা হয়তো দুজন দুই শহরে থাকে। অদূর ভবিষ্যতে একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ খুবই কম। যেকোনোভাবে তাদের অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে কয়েক মাস একে অপরের খোঁজখবর নিয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে প্রেমের সম্পর্ক মানে ঘন ঘন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটিং, অডিও কিংবা ভিডিও কলে কথা বলা। এই যোগাযোগ একপর্যায়ে প্রবলভাবে গাঢ় হতে শুরু করে। যখন দুটি মানুষ একে অপরকে কাছে পাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে, বিশ্বাস করে ওঠে, তখন উভয়েই একে অপরের যেকোনো চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
এই গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা থেকেই ভিডিও কলে উভয়ের কেউ একজন অপরজনের কাছে তার আপত্তিকর ছবি চেয়ে বসে, কখনো-বা ভিডিও কলে উলঙ্গ শরীর প্রদর্শনের আবদার করে বসে। অপর প্রান্তের জন ভেবে বসে, তাকে যেহেতু আমি ভালোবাসি, একটা সময় আমি তো তাকে বিয়ে করবই, তাই তার এমন আবদার পূরণ করতে আমার আপত্তি কিসের? আবেগতাড়িত হয়ে এভাবে সে তার অনলাইনে পরিচিত বন্ধুকে শরীর প্রদর্শন করতে থাকে, আর অপর প্রান্ত থেকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া অন্যজন তা রেকর্ড করে বা সংরক্ষণ করে।
যেকোনো সম্পর্কের দিনগুলো সমানতালে এগোয় না। সম্পর্কে যেমন গভীর ভালোবাসা লক্ষ করা যায়, তেমনি মাঝে মাঝে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও মান-অভিমান, ভুল-বোঝাবুঝি কিংবা মনোমালিন্য হতে পারে। কখনো কখনো সেই মান-অভিমানই সম্পর্কের পরিণতি টেনে আনে। আর তখনই অপর প্রান্তের মানুষটির হাতে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিও হয়ে ওঠে সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ। একসময় যে মানুষটির কাছে নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া হয়েছিল, সম্পর্কের টানাপোড়েনে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ।
মনোমালিন্যের কারণে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘আমার কথা না শুনলে তোমার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেব।’ সচরাচর এমন ঘটনাই ঘটছে। কখনো মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়, কখনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাপ দেওয়া হয়, আবার কখনো এমন কিছু করতে বাধ্য করা হয়, যা ওই মানুষটি কোনোভাবেই করতে রাজি নয়। এরপর প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতে থাকে, পরিবার যদি জানতে পারে? বন্ধুবান্ধবী যদি জানতে পারে? পরিচিতজনদের কেউ যদি দেখে ফেলে? আর এই মানসিক চাপ অনেক সময় মানুষকে ভয়াবহ এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
যে তরুণ কিংবা তরুণী কিছুদিন আগেও অনলাইনে বসে তার প্রেমিকা কিংবা প্রেমিকের সঙ্গে ভবিষ্যতের সংসারের স্বপ্ন দেখছিল, তাকেই একদিন নিজের জীবন নিয়ে ভীত হয়ে পড়তে হচ্ছে। যে মানুষটি ভেবেছিল, দূর শহরের মানুষটিই হয়তো তার জীবনের আপন মানুষ, সেই মানুষটিই কখনো তার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, তা যেন কল্পনার বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা অনেক সময় কাউকে কিছু বলতে পারে না। তারা ভাবে, বিষয়টি প্রকাশ পেলে পরিবার কী বলবে, সমাজ কী বলবে, পরিচিতজনেরা কীভাবে দেখবে। লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে অনেকে একাই এই চাপ বহন করে। কখনো কখনো এই ভয় ও মানসিক চাপ আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে, সেটিই একসময় একজন মানুষের জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অনলাইনে পরিচিত একজন মানুষকে ভালোবাসা মোটেও অপরাধ নয়। দূরের দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং প্রযুক্তির এই সময়ে এমন সম্পর্কের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখন, যখন অনলাইন পরিচয়কে বাস্তব পরিচয়ের চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া হচ্ছে; যখন কয়েক মাসের কথোপকথনই একজন মানুষের প্রতি নিঃশর্ত আস্থার কারণ হয়ে উঠছে; যখন আবেগের কাছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলো তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন প্রেমের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওতে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। প্রথমে হয়তো বলা হচ্ছে, ‘আমি একটু বিপদে পড়েছি, কিছু টাকা প্রয়োজন’, ‘আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে’, ‘পারিবারিক সমস্যার কারণে মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন’ কিংবা ‘আমার ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে কিছু টাকা ধার দরকার’—এমন নানা অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। অপরজন ভাবছে, আমার ভালোবাসার মানুষ বিপদে পড়েছে, তাকে সাহায্য না করতে পারলে তো আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে দেখা যাচ্ছে, নিজের জমানো টাকা কিংবা অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করে হলেও পাঠানো হচ্ছে অপর প্রান্তের মানুষটাকে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও সমস্যা শেষ হচ্ছে না। বরং নতুন সমস্যার জন্ম হচ্ছে। আবারও টাকা চেয়ে সেই আগের মতো অনুরোধ আসছে। সম্পর্কের আবেগ তখন অর্থের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে ভুক্তভোগী বুঝতেই পারে না, তিনি ভালোবাসার মানুষটিকে সাহায্য করছেন, নাকি ধীরে ধীরে একটি প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, যে মানুষটির জন্য এত কিছু করেছেন, তার পরিচয়ই ছিল মিথ্যা, উদ্দেশ্যই ছিল প্রতারণা করা। সাজানো নাটকের খপ্পরে পড়ে টাকা-পয়সা হারিয়ে অনেকেই তখন নিরুপায় হয়ে পড়ে। জোরালো প্রমাণ না থাকায় আইনের আশ্রয় নিয়েও কোনো লাভ হয় না। আমাদের সময়ের একটি বড় বৈপরীত্য হলো, মানুষ অনলাইনে খুব সহজে কাছাকাছি আসছে, অথচ বাস্তবে একে অপরকে জানার চেষ্টা করছে না। একটি মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা বলেও তার জীবনের অনেক সত্য অজানা থেকে যেতে পারে। কারণ ভার্চুয়াল জগতে প্রত্যেকে নিজের একটি পছন্দসই সংস্করণ উপস্থাপন করে। কেউ নিজের ভালো দিকগুলোই দেখাচ্ছে। কেউ নিজের সাফল্যের গল্প বলছে। কেউ নিজেকে নিঃসঙ্গ, অসহায় কিংবা ভালোবাসাবঞ্চিত হিসেবে তুলে ধরছে। আবার কেউ হয়তো এমন একজন মানুষের অভিনয় করছে, যাকে দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, ‘এই মানুষটিই তো আমার জন্য উপযুক্ত।’ আর মানুষ যখন সেই অভিনয়কে বাস্তব ভেবে নিচ্ছে, তখনই শুরু হচ্ছে বিপদ। অপরজনকে পাঠানো ব্যক্তিগত ছবি তখন শুধু ছবি থাকছে না, হয়ে উঠছে ব্ল্যাকমেলের ধারালো অস্ত্র। অনলাইনে ভালোবাসার সম্পর্ক তখন আর ভালোবাসার সম্পর্ক থাকছে না, হয়ে উঠছে প্রতারণার ডিজিটাল ফাঁদ, যেটিকে আমরা ‘হানিট্র্যাপ’ বলছি।
বর্তমান যুগ বিবেচনায় আমরা অনলাইন থেকে দূরে সরে যেতে পারব না। বরং আগামী দিনে আমাদের আরও বেশি অনলাইন-নির্ভর হতে হবে। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটবে, বন্ধুত্ব তৈরি হবে, প্রেম-ভালোবাসাও হবে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই বাস্তবতার সঙ্গে আরেকটি সত্যও মনে রাখা জরুরি—অনলাইনে পরিচয় হওয়া মানুষ মানেই পরিচিত মানুষ নয়। পরিচয় আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়। কথা বলা আর মানুষটিকে জানা এক জিনিস নয়। ভিডিও কলে মুখ দেখা আর তার চরিত্র জানা এক জিনিস নয়। আর ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা ও সত্যিকারের ভালোবাসা—দুটিও সব সময় এক নয়। তাই অনলাইনে কোনো সম্পর্ক যখন ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে, তখন শুধু ভালোবাসার সম্ভাবনাটিই নয়, প্রতারণার শঙ্কাটিও মাথায় রাখা দরকার। কারণ আমরা যতটা দ্রুত অনলাইনে কারও কাছে পৌঁছে যেতে পারি, ততটা দ্রুত হয়তো তার সত্যিকারের পরিচয়ের কাছে পৌঁছাতে পারি না।
একজন মানুষকে ভালোবাসতে সময় লাগতেই পারে। কিন্তু একজন মানুষকে বিশ্বাস করার আগে তাকে চেনার সময়টুকু নেওয়া আরও জরুরি। কারণ প্রেম ভেঙে গেলে মানুষ কাঁদে, কষ্ট পায়, একসময় হয়তো ঘুরেও দাঁড়ায়। কিন্তু ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে যদি হারিয়ে যায় অর্থ, ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা জীবন, তাহলে সেই ক্ষতি আর কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হয় না। অনলাইন প্রেমের ফাঁদে আটকে সর্বস্ব হারানোর আগে তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে, আবেগ-অনুভূতিকে সংযত রাখতে হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।