​এক দোকান থেকে ৮০: প্রবাসে আল-আমিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ , অনলাইন ভার্সন
একটি ছোট দোকান। সীমিত পুঁজি। অচেনা দেশ। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পেছনে ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—নিজের পায়ে দাঁড়ানো।
সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে কেটে গেছে ১৯ বছর। মালয়েশিয়া থেকে পর্তুগাল, পর্তুগাল থেকে স্পেন—দেশ বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে, জীবনের হিসাবও বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি লক্ষ্য।
একটি দোকান দিয়ে শুরু করা সেই যাত্রা আজ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত এক বিস্তৃত ব্যবসায়িক পরিসরে। মাদ্রিদের ফলমূল ও খাদ্যপণ্যের বাজারে ‘Dhaka Frutas’ নামটি এখন তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রম ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পের পরিচায়ক।
তিনি আল-আমিন।
প্রবাসের মাটিতে শূন্য থেকে নিজের অবস্থান তৈরি করা এই বাংলাদেশি উদ্যোক্তার গল্প কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়; এটি ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক সহযোগিতা এবং কঠিন সময়ে হাল না ছাড়ার গল্প।
স্বপ্নের শুরু ছোট্ট এক দোকানে
প্রবাসে ব্যবসা শুরু করার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না আল-আমিনের জন্য। সীমিত সামর্থ্য, নতুন পরিবেশ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার—সবকিছুর মধ্যেই তাঁকে পথ তৈরি করতে হয়েছে নিজের শ্রম দিয়ে।
ফলমূল ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় শুরুতে হয়তো পরিসর ছিল ছোট। কিন্তু লক্ষ্য ছিল বড়। বাজারকে বুঝেছেন, ক্রেতার চাহিদা জেনেছেন, সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন।
২০০৮ সালে শুরু হয় Dhaka Frutas y Verduras Alimentacion SL-এর কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার মূল ক্ষেত্র ফল, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য, বিপণন ও বিতরণ।
একসময়ের ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। আজ প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যে অবস্থানে তিনি পৌঁছেছেন, তার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্ন শ্রম।
‘স্বপ্ন দেখলেই হবে না’
আল-আমিনের কাছে উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু ব্যবসা শুরু করা নয়। তাঁর কাছে উদ্যোক্তা হওয়া মানে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্যের প্রতি প্রতিদিন দায়বদ্ধ থাকা।
তাঁর ভাষায়,

“শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না। নিজের একটি লক্ষ্য ঠিক করতে হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। মানুষ যখন নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং লক্ষ্য থেকে সরে না যায়, তখন সাফল্য একদিন তার কাছে আসবেই।”
এই দর্শনই যেন তাঁর দীর্ঘ প্রবাসজীবনের মূলমন্ত্র।
দ্রুত সাফল্যের পেছনে ছোটা নয়—বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজকে গুরুত্ব দেওয়া, মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং সময়ের সঙ্গে ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়াকেই তিনি সাফল্যের পথ হিসেবে দেখেন।

মাদ্রিদের বাজারে ‘Dhaka Frutas’
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা গড়ে তোলা সহজ নয়। প্রতিযোগিতা, বাজারের নিয়ম, ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ‘Dhaka Frutas’ ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছে।
২০২৬ সালে স্পেনের প্রভাবশালী সংবাদপত্র El País মাদ্রিদের অভিবাসী উদ্যোক্তাদের ফলমূল ব্যবসা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘Dhaka Frutas’-এর নাম গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে।
এটি আল-আমিনের জন্য শুধু ব্যবসায়িক স্বীকৃতি নয়; প্রবাসে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনারও একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

সাফল্যের মাঝেও মনে থাকে কঠিন সময়
আল-আমিনের কাছে আজকের অবস্থান কেবল নিজের অর্জন নয়। বরং তাঁর পথচলায় যারা পাশে ছিলেন, তাঁদের অবদানও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেন।
তাঁর বিশ্বাস, কোনো মানুষের সাফল্য একার নয়। পরিবারের সহযোগিতা, বন্ধুদের সমর্থন, সহকর্মীদের শ্রম এবং দুঃসময়ে পাশে থাকা মানুষের বিশ্বাস—সবকিছু মিলেই একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের ভিত তৈরি হয়।
তাই সাফল্যের সময় অতীতকে ভুলে যেতে চান না তিনি।
“যারা কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন, তাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সাফল্যের সময় তাদের কথা মনে রাখা এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা মানুষের দায়িত্ব।”
এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর বিশেষ আয়োজন করেন আল-আমিন। এবারও বিশেষ ছুটির দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একত্র হয়েছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনেরা।
ব্যবসার হিসাবের বাইরে এটি ছিল সম্পর্কের হিসাব মেলানোর দিন—যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল স্মৃতি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

পাশে ছিল পরিবার
একজন উদ্যোক্তার দীর্ঘ পথচলায় পরিবারের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আল-আমিনের গল্পে তারও প্রতিফলন রয়েছে।
তাঁর সহোদর আবু বকর ব্যবসার কঠিন সময় থেকে সাফল্যের পর্যায় পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলায় পারিবারিক সহযোগিতা দিয়ে পাশে ছিলেন। এই সহযোগিতা আল-আমিনকে কঠিন সময় অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বেও সেই পারিবারিক অংশীদারিত্বের ছাপ রয়েছে। ২০২১ সালে আল-আমিন প্রশাসকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আবু বকর প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
ব্যবসা তাই তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়; এটি পারিবারিক আস্থা ও সহযোগিতারও একটি দীর্ঘ গল্প।
তরুণদের জন্য একটাই বার্তা
প্রবাসে এসে ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখেন অনেক তরুণ। কেউ দ্রুত সফল হতে চান, কেউ অল্প সময়ে বড় কিছু করার প্রত্যাশা করেন।
আল-আমিনের অভিজ্ঞতা অবশ্য ভিন্ন কথা বলে।
তাঁর মতে, উদ্যোক্তার প্রথম কাজ নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা। এরপর প্রতিদিন সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা। কারণ বড় সাফল্য হঠাৎ আসে না—ছোট ছোট অর্জন ও ধারাবাহিক পরিশ্রমই একসময় বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর উপলব্ধি পরিষ্কার—ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে শুধু পুঁজি নয়, দরকার ধৈর্য, সততা, মানুষের আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।

একটি দোকান থেকে একটি দৃষ্টান্ত
মালয়েশিয়ায় শুরু হওয়া প্রবাসজীবন। এরপর পর্তুগাল। শেষ পর্যন্ত স্পেনের মাদ্রিদে থিতু হওয়া।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আল-আমিনের সামনে এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি নিজের লক্ষ্যটিকে ধরে রেখেছেন।
একটি ছোট দোকান থেকে প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া—এটি নিছক সংখ্যার গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে ১৯ বছরের ঘাম, অপেক্ষা, ঝুঁকি, ভুল থেকে শেখা এবং আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।
এটি প্রমাণ করে, প্রবাসে বাংলাদেশিরা শুধু শ্রমজীবী হিসেবেই নয়—উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
আল-আমিনের গল্প তাই শেষ পর্যন্ত শুধু তাঁর নিজের গল্প নয়। এটি হাজারো প্রবাসী তরুণের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
কারণ ভাগ্য দরজায় কড়া নাড়বে—এই অপেক্ষায় বসে থাকেননি তিনি।
বরং নিজের শ্রম, সততা ও অধ্যবসায় দিয়ে তৈরি করেছেন সেই দরজা।
একটি দোকান থেকে ৮০—আল-আমিনের এই পথচলা তাই বলে দেয়, সুযোগ সবসময় পাওয়া যায় না; কখনো কখনো সুযোগ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]