‘রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা বসে নেই’—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকাশ্যে এমন বার্তা দিলেও সতর্কতা সেই মাত্রায় নেই সরকারেও, দলেও। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার পেছনে তাদের বেশ সম্পৃক্ততা। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিনের কাউন্ট ডাউন এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এ সময়ে অর্থনীতি, প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে নানা উদ্যোগ নিলেও দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সংঘাতের অভিযোগ এবং কয়েক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের রাজনীতিতে একটি কাকতালীয় মিল নিয়ে এখন নতুন করে জোর আলোচনা।
প্রশ্ন ঘুরছে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই কেন জ্বালানির জ্বালা দেখা দেয়? তা ১৯৯১, ২০০১ এবং এবার ২০২৬ সালেও। ৯১-তে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রথম বিএনপি সরকার গঠনের সময় ছিল উপসাগরীয় যুদ্ধের অভিঘাত। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পরবর্তী সময়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ২০২৬ সালে এসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দেয়। ঘটনা বা ব্যাখ্যা যা-ই হোক, তা সরকারকে বেশ চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অন্যদিকে নিজেরা উতরাতে না পারলেও সরকারকে নাস্তানাবুদের চেষ্টায় অন্ত নেই আওয়ামী লীগের। রীতিমতো ট্যাম্পু তোলার অবস্থা। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ইস্যুতে শিগগিরই দেশ গরম করে দেওয়ার প্রস্তুতি ব্যাপক। রাজধানী থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তুলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করা মাত্রই ঘটাবে অবিশ্বাস্য বিস্ফোরণ। কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা ট্রাফিক আইন না মেনে অটোরিকশা হুটহাট মূল সড়কে দানবের ভূমিকায়। এদের বেশির ভাগই বিভিন্ন এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশে থাকায় ঢাকায় তাদের চেনার উপায় নেই। সংকেত পাওয়া মাত্র তারা ঢাকায় অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা এরই মধ্যে অর্জন করেছে।
বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর আয়োজনও চলছে পুরোদমে। সরকারের দিক থেকে ১৮০ দিনের সাফল্য প্রচার হলেও ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ চলছে। আইনশৃঙ্খলা, বাজার মূল্য, বিদ্যুৎ, দলীয় কোন্দলসহ সামাজিক বিশৃঙ্খলায় মানুষ ফুঁসছে। পরে কী হবে না হবে; আপাতত এ সুযোগটাই নিতে চায় আওয়ামী লীগ। দলের নেতাদের একটি অংশ অপেক্ষমাণ বিএনপি সরকার তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে বলে। জামায়াত-এনসিপিকে রুখতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগও তৈরি করে দেবে। যে কারণে এরই মধ্যে দলের ভেতরে বাতিল হয়ে গেছে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর ধারণা। তাই এগোচ্ছে শেখ হাসিনাকে ছায়ায় রেখে তুলনামূলক কম বিতর্কিত নেতাদের প্রকাশ্য নেতৃত্বে আনার ছক। ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তা একটি কাঠামোতে দাঁড়াবে। জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূলেও গোপনে সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে একসময়ের প্রভাবশালী কিছু নেতাকে বাদ দিয়ে একটি চমক তৈরি করা হবে। দুর্দিনে দলের কাজে সক্রিয় থাকা কয়েকজনকে নতুন দায়িত্বে এনে তৈরি করা হবে চমকের ওপর চমক। কলকাতা ও দিল্লি থেকে দলের একাধিক ইউনিট এসব কার্যক্রম নজরদারিতে রাখছে।
লন্ডন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড ও পর্তুগালে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রাখছেন। তার নির্দেশনা ও তদারকিতে নেতৃত্বের একাধিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি কাঠামোতেই ভিন্ন ভিন্ন নেতাকে সামনে রাখা হচ্ছে। দেশ ও বিদেশ থেকে কারা দলীয় নির্দেশনা দেবেন, সেই পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ডা. হাবিবে মিল্লাত, মোহাম্মদ এ আরাফাত, মৃণাল কান্তি দাস, সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, যুবলীগের মাইনুল হোসেন নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাদ্দাম ও ইনান নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে ও ফোনে যোগাযোগ করছেন। তারা নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা দিচ্ছেন।
কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকার কারণে জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ডা. হাবিবে মিল্লাত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। দলীয় দিবস ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অনিয়মিত হলেও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। অনলাইনে হঠাৎ সক্রিয় হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শেখ হেলাল উদ্দিন, ফজলে শামস পরশ, এস এম কামাল, ড. হাছান মাহমুদ, আলাউদ্দিন নাসিম, লিয়াকত শিকদার, নজরুল ইসলাম বাবু, এনামুল হক শামীম, আমিনুল ইসলাম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুজিত রায় নন্দী, অসীম কুমার উকিল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের গাজী মেজবাহ সাচ্চু ও আফজাল বাবুসহ কয়েকজন নেতা অনলাইনের বিভিন্ন আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সক্রিয়। তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে বিদেশি দূতাবাসগুলোর নজরে আসতে সচেষ্ট। বাংলাদেশকে আবার জঙ্গি-ইসলামি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার যত তৎপরতা আছে, তার সবই করছেন তারা। গত কয়েক দিন ওয়াশিংটন ডিসিতেও তাদের বেশ তৎপরতা। সাম্প্রদায়িক হত্যা, বাংলাদেশে নাটক-সিনেমা বন্ধ, গান-নৌকাবাইচ বন্ধ ধরনের ঘটনাকে রং মাখিয়ে প্রচার করছে। মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বেশ কিছু অসত্য তথ্য সরবরাহের কাজে তারা ভালো সাড়া পাচ্ছেন। তাই ৫ আগস্টের পর মাজার ভাঙা, বাউলদের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশকে জঙ্গি-মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার তারা আশাবাদী।
আর শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা তো রয়েছেই। সেই হিসেবে তার কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে। এমন অবস্থায় ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, মন্ত্রী, নেতা ও কর্মীদের বেশ বড় একটা অংশ আছেন দোটানায়। এদের কেউ কেউ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশসহ মালয়েশিয়ার মতো দেশে বিশাল সম্পদ গড়েছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। এরা কোনোভাবেই চলতি বছর কেন আগামী কয়েক বছরেও দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক। অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নাগরিকত্বও নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেই দলটির বেশ কিছু নেতাকর্মী এবং সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী খুবই গোপনে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি দেশ, যেমন ডোমিনিকা, গ্রানাডা, বাহামাস, বার্বাডোস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, জ্যামাইকাসহ ভানুয়াতু, নাউরু, পর্তুগাল, গ্রিস, মাল্টা, সাও টমে অ্যান্ড প্রন্সিপে, সাইপ্রাস, লাতভিয়া, পানামা, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশের নাগরিকত্ব কিনেছেন, যাদের অনেকেই ২০২৪ সালের ৫ মে পরবর্তী সময়ে ওইসব দেশে চলে যান। সেখানে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছেন স্থানীয়দের মাধ্যমে। নিজেরা থাকছেন ছদ্মনাম ব্যবহার করে। এ মানসিকতার ভারতে অবস্থানকারী কেউ কেউ বিকল্প চিন্তা করছেন, যাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরতে না হয়। এমনকি এরা যেকোনো মূল্যে ভারতীয় পাসপোর্ট সংগ্রহ করে গোপনে তৃতীয় কোনো দেশে চম্পট দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এ রকম সময়ে নয়াদিল্লিতে ২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েক বক্তার অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে আরেক বাঁক। প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগের প্রতি দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও ভারত কি এখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোচ্ছে? নাকি কেবল কূটনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল?
নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া বা এফসিসিতে ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া : ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রসপারিটি’ শিরোনামের সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। বেলজিয়ামভিত্তিক ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ ও এফসিসি যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, নয়াদিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটি করতে দেয়নি। পুলিশের পাঠানো একটি চিঠিতেও বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বিতর্কের সৃষ্টি হওয়ায়’ কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর ২৪ দিন আগে, ৫ আগস্ট, একই এফসিসি মঞ্চে শেখ হাসিনার একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করছে।
৪ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ৫ আগস্ট অনুষ্ঠান হওয়ার পরও ভারত জানায়, সেখানে শেখ হাসিনা বা অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলেছেন, ভারত সরকার তার কোনো অংশকে সমর্থন করে না। কিন্তু ঢাকার কাছে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশে প্রশ্ন ওঠে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ভারত কেন শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে? সেখানে ২৯ আগস্টের সেমিনার বাতিলের ঘটনাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মানে আওয়ামী লীগের বিষয়ে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে?
প্রশ্ন ঘুরছে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই কেন জ্বালানির জ্বালা দেখা দেয়? তা ১৯৯১, ২০০১ এবং এবার ২০২৬ সালেও। ৯১-তে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রথম বিএনপি সরকার গঠনের সময় ছিল উপসাগরীয় যুদ্ধের অভিঘাত। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পরবর্তী সময়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ২০২৬ সালে এসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দেয়। ঘটনা বা ব্যাখ্যা যা-ই হোক, তা সরকারকে বেশ চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অন্যদিকে নিজেরা উতরাতে না পারলেও সরকারকে নাস্তানাবুদের চেষ্টায় অন্ত নেই আওয়ামী লীগের। রীতিমতো ট্যাম্পু তোলার অবস্থা। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ইস্যুতে শিগগিরই দেশ গরম করে দেওয়ার প্রস্তুতি ব্যাপক। রাজধানী থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তুলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করা মাত্রই ঘটাবে অবিশ্বাস্য বিস্ফোরণ। কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা ট্রাফিক আইন না মেনে অটোরিকশা হুটহাট মূল সড়কে দানবের ভূমিকায়। এদের বেশির ভাগই বিভিন্ন এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশে থাকায় ঢাকায় তাদের চেনার উপায় নেই। সংকেত পাওয়া মাত্র তারা ঢাকায় অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা এরই মধ্যে অর্জন করেছে।
বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর আয়োজনও চলছে পুরোদমে। সরকারের দিক থেকে ১৮০ দিনের সাফল্য প্রচার হলেও ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ চলছে। আইনশৃঙ্খলা, বাজার মূল্য, বিদ্যুৎ, দলীয় কোন্দলসহ সামাজিক বিশৃঙ্খলায় মানুষ ফুঁসছে। পরে কী হবে না হবে; আপাতত এ সুযোগটাই নিতে চায় আওয়ামী লীগ। দলের নেতাদের একটি অংশ অপেক্ষমাণ বিএনপি সরকার তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে বলে। জামায়াত-এনসিপিকে রুখতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগও তৈরি করে দেবে। যে কারণে এরই মধ্যে দলের ভেতরে বাতিল হয়ে গেছে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর ধারণা। তাই এগোচ্ছে শেখ হাসিনাকে ছায়ায় রেখে তুলনামূলক কম বিতর্কিত নেতাদের প্রকাশ্য নেতৃত্বে আনার ছক। ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তা একটি কাঠামোতে দাঁড়াবে। জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূলেও গোপনে সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে একসময়ের প্রভাবশালী কিছু নেতাকে বাদ দিয়ে একটি চমক তৈরি করা হবে। দুর্দিনে দলের কাজে সক্রিয় থাকা কয়েকজনকে নতুন দায়িত্বে এনে তৈরি করা হবে চমকের ওপর চমক। কলকাতা ও দিল্লি থেকে দলের একাধিক ইউনিট এসব কার্যক্রম নজরদারিতে রাখছে।
লন্ডন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড ও পর্তুগালে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রাখছেন। তার নির্দেশনা ও তদারকিতে নেতৃত্বের একাধিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি কাঠামোতেই ভিন্ন ভিন্ন নেতাকে সামনে রাখা হচ্ছে। দেশ ও বিদেশ থেকে কারা দলীয় নির্দেশনা দেবেন, সেই পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ডা. হাবিবে মিল্লাত, মোহাম্মদ এ আরাফাত, মৃণাল কান্তি দাস, সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, যুবলীগের মাইনুল হোসেন নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাদ্দাম ও ইনান নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে ও ফোনে যোগাযোগ করছেন। তারা নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা দিচ্ছেন।
কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকার কারণে জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শ ম রেজাউল করিম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ডা. হাবিবে মিল্লাত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। দলীয় দিবস ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অনিয়মিত হলেও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। অনলাইনে হঠাৎ সক্রিয় হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শেখ হেলাল উদ্দিন, ফজলে শামস পরশ, এস এম কামাল, ড. হাছান মাহমুদ, আলাউদ্দিন নাসিম, লিয়াকত শিকদার, নজরুল ইসলাম বাবু, এনামুল হক শামীম, আমিনুল ইসলাম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুজিত রায় নন্দী, অসীম কুমার উকিল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের গাজী মেজবাহ সাচ্চু ও আফজাল বাবুসহ কয়েকজন নেতা অনলাইনের বিভিন্ন আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সক্রিয়। তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে বিদেশি দূতাবাসগুলোর নজরে আসতে সচেষ্ট। বাংলাদেশকে আবার জঙ্গি-ইসলামি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার যত তৎপরতা আছে, তার সবই করছেন তারা। গত কয়েক দিন ওয়াশিংটন ডিসিতেও তাদের বেশ তৎপরতা। সাম্প্রদায়িক হত্যা, বাংলাদেশে নাটক-সিনেমা বন্ধ, গান-নৌকাবাইচ বন্ধ ধরনের ঘটনাকে রং মাখিয়ে প্রচার করছে। মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বেশ কিছু অসত্য তথ্য সরবরাহের কাজে তারা ভালো সাড়া পাচ্ছেন। তাই ৫ আগস্টের পর মাজার ভাঙা, বাউলদের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশকে জঙ্গি-মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার তারা আশাবাদী।
আর শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা তো রয়েছেই। সেই হিসেবে তার কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে। এমন অবস্থায় ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, মন্ত্রী, নেতা ও কর্মীদের বেশ বড় একটা অংশ আছেন দোটানায়। এদের কেউ কেউ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশসহ মালয়েশিয়ার মতো দেশে বিশাল সম্পদ গড়েছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। এরা কোনোভাবেই চলতি বছর কেন আগামী কয়েক বছরেও দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক। অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নাগরিকত্বও নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেই দলটির বেশ কিছু নেতাকর্মী এবং সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী খুবই গোপনে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি দেশ, যেমন ডোমিনিকা, গ্রানাডা, বাহামাস, বার্বাডোস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, জ্যামাইকাসহ ভানুয়াতু, নাউরু, পর্তুগাল, গ্রিস, মাল্টা, সাও টমে অ্যান্ড প্রন্সিপে, সাইপ্রাস, লাতভিয়া, পানামা, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশের নাগরিকত্ব কিনেছেন, যাদের অনেকেই ২০২৪ সালের ৫ মে পরবর্তী সময়ে ওইসব দেশে চলে যান। সেখানে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছেন স্থানীয়দের মাধ্যমে। নিজেরা থাকছেন ছদ্মনাম ব্যবহার করে। এ মানসিকতার ভারতে অবস্থানকারী কেউ কেউ বিকল্প চিন্তা করছেন, যাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরতে না হয়। এমনকি এরা যেকোনো মূল্যে ভারতীয় পাসপোর্ট সংগ্রহ করে গোপনে তৃতীয় কোনো দেশে চম্পট দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এ রকম সময়ে নয়াদিল্লিতে ২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েক বক্তার অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে আরেক বাঁক। প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগের প্রতি দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও ভারত কি এখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোচ্ছে? নাকি কেবল কূটনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল?
নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া বা এফসিসিতে ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া : ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রসপারিটি’ শিরোনামের সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। বেলজিয়ামভিত্তিক ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ ও এফসিসি যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, নয়াদিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটি করতে দেয়নি। পুলিশের পাঠানো একটি চিঠিতেও বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বিতর্কের সৃষ্টি হওয়ায়’ কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর ২৪ দিন আগে, ৫ আগস্ট, একই এফসিসি মঞ্চে শেখ হাসিনার একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করছে।
৪ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ৫ আগস্ট অনুষ্ঠান হওয়ার পরও ভারত জানায়, সেখানে শেখ হাসিনা বা অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলেছেন, ভারত সরকার তার কোনো অংশকে সমর্থন করে না। কিন্তু ঢাকার কাছে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশে প্রশ্ন ওঠে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ভারত কেন শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে? সেখানে ২৯ আগস্টের সেমিনার বাতিলের ঘটনাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মানে আওয়ামী লীগের বিষয়ে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে?