​আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর পথ কেন কণ্টকময়

প্রকাশ : ২০ অগাস্ট ২০২৬, ১৬:৫৫ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটা নতুন ধরনের ধারা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো নারীদের রাজনীতি করাকে পরিবার, সমাজ খুব একটা পজিটিভভাবে গ্রহণ করে না। এর জন্য সিনিয়র নারী রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিসহ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর নানা ধরনের অপকর্ম মানুষকে আতঙ্কিত করে। উপরন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর নানাভাবে নারীদের রাজনীতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং নারীদের রাজনীতি করাকে অনেকটাই বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে সমাজ। ফলস্বরূপ, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন দেয়নি দলগুলো। দেশের প্রধান দলগুলো তাদের বক্তৃতায় নারীদের অধিকার ও অবস্থান নিয়ে যতটা উদারতা দেখায়, বাস্তবে ঠিক ততটা নয়। দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামের মিছিল-মিটিংয়ে নারীরা থাকে সম্মুখসারিতে। যার প্রমাণ মেলে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলন অবধি। দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে নারীরা কখনো পিছিয়ে থাকে না। বরং সহযোদ্ধা হয়ে পুরুষদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করে। কারণ দেশটা সবার। তবে দিন শেষে নারী বলে তাকে সমভাবে বিচার করে না রাজনৈতিক দলে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এটা নতুন কোনো ঘটনা নয় বলে এবারের ভোটেও অনেক যোগ্য নারীনেত্রী সরাসরি দেশের প্রধান দল বিএনপি থেকে নির্বাচন করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে সেভাবে ধরা না হলেও এনসিপি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে নারীদের যেভাবে বঞ্চিত করেছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। কারণ জুলাই আন্দোলনে ছেলেদের পাশে মেয়েরা যেভাবে দাঁড়িয়েছে, তা ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু সেই মেয়েদের বেলায় এতটাই টালবাহানা করেছে, যা কাম্য ছিল না তরুণদের কাছে।

নারীরা এখন আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নেই। তারা নিজেদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বেশ শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। তবু তাদেরকে অবদমিত করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনো নিরাপত্তার শিকল দিয়ে। যে নারী নিজের মেধা, প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করে, সেই সমাজেই স্বাধীনচেতা নারীকে কটাক্ষ করে নানাভাবে। নারীদের ক্ষেত্রে এমন সব ভাষার ব্যবহার করা হয়, তা শুনে বিধাতার ধরণিও কেঁপে ওঠে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব আর বুলিংয়ের শিকার হতে হয় কম-বেশি সবাইকে। এত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যখন নারী রাজনৈতিকভাবে সমাজের কথা বলতে চায়, সেখানে নিজের রাজনৈতিক দলই তাকে জায়গা দিতে চায় না নারী বলে।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে নারীনেত্রী, রাজনৈতিক কর্মীরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন পায় না, বিশেষ করে শিক্ষা জীবনের পর। তাই কাঠখড় পুড়িয়ে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে স্থান পাওয়াটাকেই বিশাল প্রাপ্তি মনে করে। কেন একজন নারী জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন করতে পারে না, সে ব্যাখ্যাটা সব দলের মোটামুটি একই রকম হয়। বলা হয়ে থাকে, নির্বাচনকালীন প্রচারণায় যতটা সময়, কষ্ট, অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেটা নারীদের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। এখানে থাকে নিরাপত্তার খোঁড়া যুক্তি আর অর্থনৈতিক অবস্থানও তাদের শক্তিশালী নয়। সকল নারী রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী বা ছলচাতুরীতে সম্পদশালী হয় না। সাধারণত রাজনৈতিক নীতি ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা রাজনীতিতে সময় দেয় বেশির ভাগ। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন মানে টাকার খেলা। সত্যিকারের সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন হলে নিরাপত্তার দোহাই ও অর্থের জোগান-এ দুটি কারণের একটিও থাকার কথা নয় যোগ্য প্রার্থীর বেলায়। এ যুক্তিগুলো যে কতটা দুর্বল, তা এবারের নির্বাচনে প্রমাণ করে দিয়েছেন রুমিন ফারহানা ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে। এ ছাড়া আরও লক্ষণীয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান, তার ভাইয়ের স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ও কন্যা জাইমা রহমান। এর পাশাপাশি দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে স্বামীদের নির্বাচনী প্রচারণায় স্ত্রীরা রাত-দিন জনগণের কাছে গিয়ে দৃষ্টি কেড়েছেন মানুষের। তাহলে যে নারীদেরকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়াকে অত্যাবশ্যক মনে করা হয়, সেই নারীকে সরাসরি নির্বাচনে যোগ্য না মনে করার কারণ কি কেবলই অর্থনৈতিক অবস্থান আর নিরাপত্তাহীনতা? বাংলাদেশের নির্বাচনে নির্বাচনী ব্যয় বাবদ যে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়, তা কেবল কাগজে কলমে। নির্বাচনের প্রার্থীরা তাদের পাল্লা ভারী করেন অর্থের মানদণ্ডে। সাধারণত রাজনৈতিক নীতি বিবেচনা করে মনোনয়ন দেওয়া হয় না বলে সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা মূল্যায়িত হন না। আর সে অংশে নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। ছাত্ররাজনীতি করে আসা নারীরা হয়তো জীবনের ধারাবাহিকতায় সবাই বিশাল বিত্তশালী হয়ে উঠতে পারেন না কর্মজীবন ও সংসারের কারণে। সবকিছু সামলে রাজনীতিতে নিজেকে এগিয়ে নিতে বেশ কষ্ট করতে হয়। এ চিত্র সব কালের হলেও সময়ের পরিবর্তনে নারীদের অবস্থানের পার্থক্য হয়েছে। একজন নারী যখন রাজনীতি করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন, তখন তার প্রত্যাশা থাকে সংসদ সদস্য হয়ে জনগণের সেবা করা।

জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের রাজনীতি করার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল, তা কিন্তু হয়নি। এ আন্দোলনে নারীরা যেভাবে ছেলেদের সঙ্গে সমতালে আন্দোলন করেছে, তা দেখে অনেকে বিস্মিত হয়েছে। এদের অবদমিত করার জন্য নানাভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হলেও তারা কিন্তু পিছু হটেনি। বিশেষ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা হলের তালা ভেঙে রাতের বেলায় রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। তখন কিন্তু বলা হয়নি নারীদের রাস্তায় থাকা অনিরাপদ। এখানে বিশেষভাবে ইসলামপন্থী দলগুলোর অবস্থানে বৈপরীত্য দেখা গেছে আন্দোলন-পরবর্তী নির্বাচনে। তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নারীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তবু তারা বলে, তাদের নারীনেত্রী বা কর্মীরা এখনো প্রস্তুত হয়নি সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য। বা শরিয়তের বিধানের দোহাই দিয়ে বলা হয়, তারা মেনে নিয়েছে দলের নেতৃত্বে নারী থাকবে না। তাদের মতো করেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নারীদের সাইডলাইনে রেখে এনসিপি নির্বাচন করেছে জামায়াতে ইসলামীর শরিক হয়ে। ফলে এনসিপি নারীদেরকে সরাসরি নির্বাচনে রাখতে পারেনি। যদিও জুলাই সনদ অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ থাকার কথা ছিল। তা কিন্তু কোনো দলই মানেনি। বরং নানা ধরনের টালবাহানা দেখিয়েছে।

বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দলে নারী নেতাকর্মীদের সংগ্রামের ইতিহাস পুরুষদের তুলনায় কিন্তু কম নয়। বিগত ১৬ বছরে তাদের ওপর মামলা-হামলা কম হয়নি। কিন্তু দলের বেশ কিছু ত্যাগী নেত্রীর মূল্যায়ন এখন অবধি হয়নি। বরং বিগত সময়ের বেশ কিছু সাবেক নারী সাংসদকে আবার নির্বাচিত করা হয়েছে সান্ত্বনা পুরস্কারস্বরূপ। দেশের সংসদ নির্বাচনে যেহেতু নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, সে ক্ষেত্রে নারীদের সংরক্ষিত আসনে ইলেকশনের সিলেকশন খুবই হাস্যকর মনে হয় এখনকার সময়ে।

সারা দুনিয়াতে বলা হয় নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে একটা অপ্রচলিত ধারণা রয়েছে। আমেরিকাবাসী মনে করে, একজন নারী তাদের দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অথচ এ দেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে। তারা মনে করে, পরিবার, সমাজ তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের সম অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তারা পুরুষকেই প্রাধান্য দেয়। বিগত নির্বাচনে খোদ নারীরাই কমলা হ্যারিসকে মানতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র তা নয়। তার প্রমাণ বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। যদিও পারিবারিক সূত্রে রাজনীতিতে এসেছেন এই দুই নারী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। কিন্তু সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের মানুষ তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছিল। শাসনব্যবস্থায় কার ভূমিকা কী ছিল, সে হিসাব ভিন্ন। এখানে লক্ষণীয় ছিল, তারা কিন্তু তাদের শাসনামলে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি বলে নারীদের আসন এখন অবধি সংরক্ষিত আসন হিসেবেই রয়েছে।

একসময় এই সংরক্ষিত আসনকে উপহাস করে বলা হতো, ‘৩০ সেট অলংকার।’ যদিও এখন আসন হয়েছে ৫০টি। এই সাংসদের স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার মতো তেমন কিছু নেই। একজন নারী সাংসদ নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে যখন অন্য আসনের সাংসদের সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করে, তা কেবল পোশাকি পদবি ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সেখানকার জনগণের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না। তাই সংসদ যে নারী-পুরুষের বৈষম্য, তা চোখে আঙুল দিয়ে বলে দেয়, নারী আর পুরুষ সমপর্যায়ে নেই। মিছিলের সামনে থাকে নারীরা কেবল আন্দোলনের ঢাল হয়ে যুগের পর যুগ।

সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নারীরা নিজেদেরকে কখনো দলের প্রধান হিসেবে দেখবেন না, তারা এটা মেনে নিয়েছেন শরিয়তের বিধান মনে করে। আবার এই দলের মহিলা বিভাগ ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা দলের প্রচার-প্রচারণা কিন্তু পিছিয়ে নেই পুরুষের তুলনায়। তবে জুলাই আন্দোলনের নারীদের বিষয়ে নানা আলোচনার পর জামায়াতে ইসলামী তাদের নারীদের সুযোগ করে দিয়েছে গণমাধ্যমে কথা বলার জন্য। এটা তারা করতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক চালের কারণে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া নতুন রাজনৈতিক দল নতুন বন্দোবস্তের কথার নামে নারীদের নিয়ে চিন্তা-চেতনার জায়গাতে পুরোনো ধাঁচকেই অনুসরণ করছে। তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা নারীরা হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এ ক্ষেত্রে অনেকে বলে থাকে, এরা আসলে জামায়াতে ইসলামীর বি-টিম। তাই এদের দলে নারীদের মূল্যায়ন হবে না। এর পাশাপাশি বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু করে এখন অবধি সামাজিক মাধ্যমসহ রাস্তাঘাটে নানাভাবে নারীদের বুলিং বা হেনস্তা করা এতটাই প্রকট যে, এটা দেখে পরিবার চায় না নারীরা সমাজের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হোক। নিরাপত্তাহীনতার কাছে অসহায় হয়ে নারীরা কখনো হয়ে যায় বাকরুদ্ধ কিংবা নিজেকে নিয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।

কন্যা, জায়া, জননী-এই রূপের বাইরে একজন নারী সবার আগে একজন মানুষ। তার যেমন অধিকার আছে লড়াই করা, ঠিক একইভাবে সে রাজনীতিতে ভোটের মাঠে জনগণের জন্য একজন সাধারণ সাংসদ হয়ে কথা বলতে পারে, তা প্রমাণ করার সুযোগ দিতে হবে দেশ ও সংবিধানকে। তবে এ বিষয়টা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংরক্ষিত আসনের এক সেট অলংকার হওয়ার মনোবাসনাকে পরিত্যাগ করে রাজনৈতিক দলের নারীনেত্রী ও কর্মীদের সুসংগঠিত হয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে ক্রমশ নারীদের রাজনীতির পথ আরও বন্ধুর হয়ে যাবে। আর কালগর্ভে হারিয়ে যাবে অনেক ত্যাগী, সংগ্রামী রাজনৈতিক নারীনেত্রী ও কর্মী; যা প্রকৃতপক্ষে কোনো সংগ্রামী নারীনেত্রী বা দলের জন্য কাম্য নয়। নারী তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কর্ম দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে কি না, সেটা প্রমাণ করার সুযোগ তাদের দিতে হবে। সংসদের শো পিস আইটেম বানানোর ভাবনা দূর করতে হবে নারীদেরকেই। তা না হলে আগামীর পথ হবে কণ্টকময়।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]