বিশ্ব মুসলিমের জীবনে ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রকাশ : ২০ অগাস্ট ২০২৬, ১৬:৪১ , অনলাইন ভার্সন
শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী বিশ্ব মুসলিম বর্তমানে হতাশা ও দুর্যোগের মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। মুসলিম নেতাদের অহংবোধ, সাংঘর্ষিক এবং উন্নাসিক মনোবৃত্তির সুযোগকে হাতিয়ার করে পরাশক্তির অধীশ্বররা ইসলাম এবং মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোড়া ইসরায়েলি বর্বর বাহিনী ও তার দুষ্কর্মের দোসরদের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে গোটা মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিক এবং সার্বিক বিচারে মুষ্টিমেয় রাষ্ট্রনায়ক গোটা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ৮০% জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে বললে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হবে না। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় বিধি-বিধানকে উপজীব্য করে ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে আসমান আড়ালকরা ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমানই ব্যক্তিস্বার্থ, গিবত, লোভ-লালসা ও পাপপঙ্কিলতার সাগরে ডুবে আছে। ফিতনা (ভ্রান্ত মতবাদ) কাতেলের (নরহত্যার) চেয়েও জঘন্য পাপাচার-এটি প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। অথচ ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে আমরা প্রত্যেকেই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিত্য-নতুন ফিতনায় ইন্ধন জোগাচ্ছি। এমনতর শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতায় বিশ্ব মুসলিমের জন্য আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমার বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবারও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। উত্তর আমেরিকা-কানাডাসহ অন্যান্য স্টেটের মুসলমানরা ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদ্্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্মর্তব্য, সৌভাগ্যমণ্ডিত ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), ১২ রবিউল আউয়ালের সঙ্গে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ধরাপৃষ্ঠে আগমন এবং ৬৩ বছরের জাগতিক জীবন শেষে মহাপ্রয়াণের যোগরূঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান। আইয়ামে জাহেলিয়াত বা চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ব্যভিচারের যুগে ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার পবিত্র মক্কা নগরীর ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ পরিবারের হাসেমি বংশে লোকান্তরিত পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনার ঘরে অনাথ-এতিম শিশু মোহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। আখেরি নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ধরাধামে আগমন ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে বিশ্ব মুসলিমের অন্যতম পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) এর মহান আল্লাহর নিকট সানুনয় মিনতি, হজরত ঈসা (আ.) এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং প্রয়াত আব্দুল্লাহর বিধবা পত্নী বিবি আমিনার স্বপ্ন। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, বিবি আমিনার গর্ভে ভ্রুণ সঞ্চারের পর হজরত আদম (আ.) থেকে বিভিন্ন নবীগণ পর্যায়ক্রমে ১০ মাসে আমিনার পর্ণ কুটিরে সশরীরে হাজির হয়েছিলেন। তাঁরা বিবি আমিনাকে সালাম দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল (সা.) এর ধরাধামে আগমনের সুখবর প্রদান করেছিলেন। তাই মোহাম্মদ (সা.) এর ভূপৃষ্ঠে আগমনের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় রাখার খাতিরেই বিশ্ব মুসলিম নানা আয়োজনে প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন করে থাকেন। অবশ্য অতি সম্প্রতি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়েও বিভেদ বিসংবাদের দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তৈরি হয়েছে। হে বিশ্ব মহান রাব্বুল আলামিন, তুমি আমাদের সঠিক পথের সন্ধান দাও, আমিন!

হজরত ঈসাকে (রুহুল্লাহ) হত্যার জন্য পাপিষ্ঠ সম্প্রদায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার পটভূমিতে বিশ্বপ্রতিপালক স্বয়ং তাঁর প্রিয় নবী ঈসা (আ.)-কে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন। এর পরবর্তী প্রায় ৫০০ বছর সমগ্র বিশ্বে কোনো প্রেরিত পুরুষের অস্তিত্ব ছিল না। সেই দুর্যোগঘন মুহূর্তে আরব-অনারব নির্বিশেষে বিশ্বের সিংহভাগ আদম সন্তান আল্লাহর একত্ববাদ পরিহার করে পৌত্তলিকতা, চন্দ্র-সূর্য-অগ্নিপূজা, দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। এমনকি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত কাবাগৃহে স্থান পেয়েছিল ৩৬০টি মূর্তি। নানা ছলছুতোয় যুদ্ধলিপ্সু আরব গোত্রগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত এবং বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেত। আবার অভাব-অনটন এবং দায়গ্রস্ততার অজুহাতে সদ্যোজাত কন্যা সন্ততিদের জীবন্ত কবর দিতে আরব বেদুইনরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হতো না। একই মহিলার নিকট একাধিক পুরুষের গমন সামাজিক প্রথাসিদ্ধ ছিল। জুয়া, মদ্যপান, চুরি-ডাকাতি-লুণ্ঠন সামাজিক ব্যভিচার ও মাৎস্যন্যায় দশা পুরো আরবকে আচ্ছন্ন করায় সেই যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়া বা চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলা হতো। অথচ ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভের পর হজরত মোহাম্মদ (সা.) মরণপণ প্রচেষ্টায় সেই বর্বর-রক্তলিপ্সু-পৌত্তলিক মক্কাবাসীকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান করেন। কাবাগৃহ থেকে মূর্তি অপসারণ এবং পৌত্তলিকতার সমূল উৎপাটনপূর্বক পবিত্র কাবাকে বিশ্ব মুসলিমের মিলনকেন্দ্রে পরিণত করেন। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে নবদীক্ষিত মুসলমানগণ সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সুশৃঙ্খল, পরহিতৈষী, মানবিক ও অতিমানবিক গুণাবলিসম্পন্ন আদর্শ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রবর্তিত ঐতিহাসিক মদিনা সনদ রাষ্ট্র পরিচালনা-সমর কৌশল-সাম্যবাদ-গণতন্ত্র-ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দিগ্্দর্শন যন্ত্র বা ম্যাগনাকাটা হিসেবে সমগ্র বিশ্বে অদ্যাবধি অনুসৃত ও অনুকরণীয়। ঐতিহাসিক হুদায়বিয়া চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মহানবী মোহাম্মদ (সা.) বিনাযুদ্ধে মক্কা বিজয়ের যে অবিস্মরণীয় প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন, তা বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিবিদদের তাক লাগিয়ে দেয়। বিনা রক্তপাতে অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর আজন্মের শত্রু মক্কার প্রতিষ্ঠিত পৌত্তলিকদের অকাতরে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি অবিস্মরণীয় দলিল হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে। প্রায় ১৪০০ বছর আগে দশম হিজরিতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা.) পারলৌকিক জীবনের শেষ হজব্রত পালন করেন। বিদায় হজের ভাষণে হজরত মোহাম্মদ (সা.) ১ লাখ ২৫ সহস্রাধিক সমবেত মুসলিম জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, আমি বিশ্ব মুসলিম তথা তোমাদের পার্থিব সাফল্য এবং পারলৌকিক কল্যাণের জন্য দুটি সুমহান দলিল রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হচ্ছে পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ পবিত্র আসমানি কিতাব আল কোরআন। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমার জীবনাচরণ-কর্মপদ্ধতি ও বর্ণনা সংবলিত হাদিস গ্রন্থ। যত দিন পর্যন্ত আমার উম্মতগণ এই দুটি মহাগ্রন্থের অবিনশ্বর বাণী ও নির্দেশনা হুবহু অনুকরণ ও অনুসরণ করবে এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে, তত দিন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো শক্তি তাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। সোয়া লক্ষাধিক হজব্রত পালনকারীর উদ্দেশে হজরত মোহাম্মদ (সা.) আরও বলেছিলেন, তাঁর সেদিনের বাণী অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছে দিতে। বিদায় হজের অবিনশ্বর ভাষণে বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) আরও বলেছিলেন, বিশ্ব মুসলমানের মধ্যে আরব-অনাব, আশরাফ-আফতার, ধনী-নির্ধন, সাদা-কালো ইত্যাদি শ্রেণিবৈষম্যের স্থান নেই। এমনকি একজন কাফ্রী ক্রীতদাসও নেতৃত্বদানের সক্ষমতা অর্জন করলে বিনা বাক্যব্যয়ে তার নেতৃত্ব অন্যদের মেনে নিতে হবে। আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেছিলেন, পুত্রের অপরাধে পিতাকে, পিতার অপরাধে পুত্রকে, ভাইয়ের অপরাধে ভাইকে অপরাধী করা যাবে না এবং একের অপরাধের জন্য অন্যকে বেআইনিভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে না। আরাফার সেই ময়দানেই পবিত্র কোরআনের সর্বশেষ আয়াত : আল ইয়ামো মা আকমালতো লুকুম দ্বিনাকুম, ওয়া আতমামতো আলাইকুম নে’মাতি ওয়া রাজিতু লাকুমাল ইসলামো দ্বীনান (ইসলামকে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম এবং কোরআনের পরিপূর্ণতা ঘোষণাকারী আয়াতটি) অবতীর্ণ হয়েছিল। অতঃপর উপস্থিত মুসলিম জনতাকে নিয়ে ঊর্ধাকাশে দুই হাত তুলে ধরে আখেরি নবী মোহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, হে রাব্বুল আলামিন, আমি হয়তো-বা আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। তুমি দয়া করে আমার অক্ষমতাজনিত অপরাধ ও ভুলত্রুটি ক্ষমা করিয়ো। অশ্রুসিক্ত নয়নে ও জলদগম্ভীর কণ্ঠে সোয়া লাখ উপস্থিত হাজি গগনবিদারী চিৎকারে বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথার্থই পালন করেছেন। প্রণিধানযোগ্য, পবিত্র কোরআনের সর্বশেষ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর এই ধরাধাম ত্যাগের পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বিষয়টি সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন নবদীক্ষিত প্রথম মুসলিম এবং প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.) এর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)। মহান আল্লাহর পরোক্ষ ইঙ্গিত হৃদয়ঙ্গম করার পর হজরত আবু বকর (রা.) নিতান্ত শিশুর মতো হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলে বিশাল মুসলিম জনতাও মেদিনী কাঁপিয়ে রোদন শুরু করলেন। ফলে সমগ্র মক্কা ও আশপাশের আকাশ-বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির রথে আরোহণকারী বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক বিশ্বে অহর্নিশ অনবরত বিবর্তন এবং অভিনবত্বের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ইসলামকে নিয়েও ঊর্ণনাভের মতো বিভ্রান্তির মতবাদ ও আদর্শ প্রতিনিয়ত ছড়ানো হচ্ছে। ফলে মুসলিম সমাজে নিত্যনতুন বিভেদ-বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই এবারের পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) সুমহান আদর্শ বিশ্ব মুসলিমের ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের ভিত্তিকে সজোরে নাড়া দিক-এই মিনতি রইল। হে বিশ্ব প্রতিপালক, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে তোমার প্রিয় হাবিব হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর অসিলায় আমাদের যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করো। আমিন!
লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক, গ্রন্থকার ও সহযোগী সম্পাদক, নিউইয়র্ক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]