​নিউইয়র্কে কৃষ্টি থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল

নতুন প্রজন্মের হাত ধরে শক্তি অর্জন করেছে মঞ্চনাটক

প্রকাশ : ২০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫:৫০ , অনলাইন ভার্সন
 আবীর আলমগীর: নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস দীর্ঘ। গান, নাটক, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে বহু বছর ধরে এই শহরে বাংলা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় একাধিক নাট্যদলকে নিয়ে টানা তিন দিনের পূর্ণাঙ্গ নাট্যোৎসব আয়োজন করে কৃষ্টি। 
গত ১৪, ১৫ ও ১৬ আগস্ট নিউইয়র্কের জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং-এ অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় কৃষ্টি থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ভয়েসেস রাইজিং থ্রু থিয়েটার’। পুরো আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয় নিউইয়র্কের বাংলা নাট্যচর্চার পরিচিত ব্যক্তিত্ব প্রয়াত জামালউদ্দিন হোসেনের স্মৃতির প্রতি। তিন দিনের উৎসব যেন আবারও প্রমাণ করলো, নিউইয়র্কে বাংলা মঞ্চনাটক শুধু টিকে নেই, নতুন প্রজন্ম ও নতুন চিন্তার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও অর্জন করছে। 
দীর্ঘদিনের নাট্যদল ড্রামা সার্কল নিউইয়র্ক উৎসবে অংশ নেয় এবং ১৬ আগস্ট রোববার মঞ্চস্থ করে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ‘স্বপ্ন’, নির্দেশনায় জহির মাহমুদ। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজের দলকে প্রতিনিধিত্ব করা ছিল বিশেষ আনন্দ ও আবেগের।
গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার উদ্বোধনী আয়োজনের পাশাপাশি ছিল গান, নৃত্য, নাট্য পরিবেশনা ও স্মৃতিচারণ। কৃষ্টির পরিবেশনায় ছিল ‘নাটকের গান’। বাফার মার্জিয়া স্মৃতির নির্দেশনা ও নৃত্য পরিকল্পনায় পরিবেশিত হয় ‘এক্সপ্রেশনস অব ইমোশন’। প্রয়াত জামালউদ্দিন হোসেনকে স্মরণ করেন লুৎফুন নাহার লতা।
অতিথি বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অভিনেত্রী, পরিচালক ও শিক্ষক নাইলা আজাদ, কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ক্যাথা ক্যাটো, প্রতিষ্ঠাতা শৈল্পিক পরিচালক ডোনাল্ড প্রেস্টন ক্যাটো এবং অভিনেত্রী ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী মেগান সিমকক্স। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবকে বাঙালি কমিউনিটির সীমানা পেরিয়ে নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক শিল্পচর্চার সঙ্গেও যুক্ত করেছে। 
প্রথম দিনের নাট্য প্রদর্শনীতে কৃষ্টির ‘হ্যামলেট অ্যান্ড ওফেলিয়া’, অভিযোজন ও নির্দেশনায় মাসুদ সুমন এবং শিল্পাঙ্গনের ‘রক্তকরবী’, নির্দেশনায় শিরীন বকুল মঞ্চস্থ হয়।
গত ১৫ আগস্ট শনিবার কৃষ্টির পরিবেশনায় ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে নাট্যপাঠ ‘ইমপ্রিজনমেন্ট ৪৬৮২’, গবেষণা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় মাসুদ সুমন। কানাডার নাট্যসংগঠন নাট্যসংঘ পরিবেশন করে সুব্রত পুরুর রচনা ও নির্দেশনায় ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড আ ডগ’।
কৃষ্টির আরেকটি প্রযোজনা ছিল সারা কেইনের মূল রচনার ভিত্তিতে ‘সাইকোসিস’, অনিকা মাহিন একার অভিযোজনে এবং রোকেয়া রাফিক বেবির নির্দেশনায়। এ ছাড়া মঞ্চে আসে মামুনুর রশীদের ‘ওমানুষ’, নির্দেশনায় জান্নাতুল তুম্পা। 
অতিথি বক্তা ছিলেন সোরায়া সাসম্যান ও মারিয়া ইসাবেলা রোহাস। লেখক ও পরিচালক সাধনা আহমেদ বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণাময় যাত্রার কথা তুলে ধরেন। ইতিহাস, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্বের সংকট—বিষয়ের এই বৈচিত্র্য দ্বিতীয় দিনের আয়োজনকে সমৃদ্ধ করে।
গত ১৬ আগস্ট রোববার উৎসবের শেষ দিনে নিউইয়র্কের ঢাকা ড্রামা পরিবেশন করে ‘নাটকের গান’। তাদের বিভিন্ন সময়ের নাটকে ব্যবহৃত গান নিয়ে সাজানো এই পরিবেশনা একদিকে ছিল নস্টালজিক, অন্যদিকে নাট্যস্মৃতিকে নতুন করে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার অভিনব প্রয়াস। 
এরপর ড্রামা সার্কল নিউইয়র্ক মঞ্চস্থ করে ‘স্বপ্ন’। দীর্ঘদিন পর নিয়মিত রিহার্সেল, সহশিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চে ফেরা এবং দর্শকের সামনে গল্পকে জীবন্ত করে তোলার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, নাটকের প্রতি পুরোনো ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।
শেষ দিনে ডিসি মেট্রো থিয়েটার পরিবেশন করে বের্টোল্ট ব্রেখটের ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’। আসাদুজ্জামান নূরের অভিযোজনে নাটকটির সেট, আলোক পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন জাফর রহমান।
এবারের উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রয়াত জামালউদ্দিন হোসেনের স্মৃতিকে ধারণ করা। নিউইয়র্কে বাংলা নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। অভিনয়, নির্দেশনা ও নাটকের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দীর্ঘদিন এই শহরের নাট্যচর্চাকে প্রভাবিত করেছে।
তাঁর নির্দেশনায় ড্রামা সার্কলের নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অংশগ্রহণে তাঁর স্মরণ শুধু একজন নাট্যজনকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং পূর্বসূরিদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি প্রয়াস। 
তিন দিনের উৎসবে নিউইয়র্কের নাট্যাঙ্গনে দীর্ঘদিন সক্রিয় আট নাট্যকর্মীকে বিশেষ সম্মাননা জানায় কৃষ্টি। তাঁরা হলেন রিপা আহমেদ, আলমগীর চঞ্চল, আনোয়ার সেলিম, শুক্লা রায় চুমকি, প্রতিমা রায় সুমি, শরীফ হোসেন, ফিলিপস লিটন এবং সোনিয়া কবির পান্না।
‘আ স্যালুট টু দ্য থিয়েটার অ্যাক্টিভিস্টস অব নিউইয়র্ক’ শিরোনামের এই পর্বে প্রবাসে বাংলা মঞ্চনাটকের চর্চা ও বিকাশে তাঁদের দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 
কৃষ্টি থিয়েটার ফেস্টিভ্যালের গুরুত্ব শুধু কতগুলো নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তাতে সীমাবদ্ধ নয়। একই ছাতার নিচে বিভিন্ন দল, প্রজন্ম ও নাট্যধারার মানুষকে একত্রিত করা, একে অন্যের কাজ দেখা এবং নতুন সম্পর্ক ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই এর বড় সাফল্য।
প্রবাসে নাটক শুধু শিল্পচর্চা নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার শক্তিশালী মাধ্যম। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও মঞ্চনাটকের আলাদা ভূমিকা রয়েছে। তাই নিউইয়র্কের বাংলা নাট্যচর্চায় কৃষ্টির এই আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। 
তিন দিনের আয়োজনের পেছনে কৃষ্টির প্রধান নির্বাহী শীতেশ ধর, সংগঠনের কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও নেপথ্যের সবার শ্রম ছিল উল্লেখযোগ্য। উৎসবের নান্দনিক পোস্টার ডিজাইন করেছেন মিথুন আহমেদ।
তিন দিনের উৎসব শেষ হয়েছে, মঞ্চের আলো নিভেছে। কিন্তু একটি নাট্যোৎসবের প্রভাব শেষ পর্দা নামার সঙ্গে শেষ হয় না। কিছু সংলাপ, কিছু চরিত্র, কিছু স্মৃতি থেকে যায়। তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক, জাগে নতুন নাটক করার ইচ্ছা।
মঞ্চের আলো বারবার জ্বলুক। নতুন প্রজন্ম মঞ্চে আসুক। পুরোনো ও নতুনের মধ্যে সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হোক। আর নিউইয়র্কে বাংলা নাটকের এই দীর্ঘ যাত্রা আরও সমৃদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে যাক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]