ডেমোক্রেটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কে এবারের গভর্নর নির্বাচন কি অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে? নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে। এর মধ্যেই নিজ রাজ্য নিউইয়র্কে এসে গভর্নর ক্যাথি হোকুলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস
ব্লেকম্যানের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৪ আগস্ট শুক্রবার লং আইল্যান্ডের গার্ডেন সিটিতে নাসাউ কাউন্টি পুলিশ একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হোকুল ও নিউইয়র্কের ‘র্যাডিক্যাল লেফট’ বা কট্টর বামপন্থী নীতিই রাজ্যটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে নাসাউ কাউন্টি এক্সিকিউটিভ ব্রুস ব্লেকম্যানকে গভর্নর নির্বাচনে জয়ী করতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “ব্রুসকে আমাদের ক্ষমতায় আনতেই হবে।” হোকুলের নীতি নিয়ে ব্লেকম্যানকে উদ্দেশ করে একপর্যায়ে তিনি বলেন, “এমন প্রতিপক্ষের কাছে তুমি কীভাবে হারতে পারো?” এরপর রসিকতার সুরে যোগ করেন, হারলে ব্লেকম্যানকে সারাজীবন লজ্জিত থাকতে হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের বড় অংশজুড়েই ছিল অপরাধ, আইনশৃঙ্খলা, অভিবাসন এবং নিউইয়র্কের ডেমোক্রেট নেতৃত্বের সমালোচনা। বিশেষ করে ২০২০ সালে কার্যকর হওয়া নিউইয়র্কের বেইল সংস্কার এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা সীমিত করার নীতির বিরুদ্ধে তিনি সরব হন।
হোকুলের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ, অপরাধ দমন এবং অভিবাসন ইস্যুতে বর্তমান গভর্নর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। ট্রাম্প দাবি করেন, রিপাবলিকানরা ‘কঠোর পরিশ্রমী নিউইয়র্কবাসীর’ পক্ষে অবস্থান করছে।
নাসাউ কাউন্টির দুই মেয়াদের এক্সিকিউটিভ ব্রুস ব্লেকম্যানও অনুষ্ঠানে তাঁর প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা ও অভিবাসন নীতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন।
ব্লেকম্যান বলেন, নাসাউ কাউন্টির সঙ্গে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—ওঈঊ-এর একটি বিস্তৃত সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। তাঁর দাবি, গত এক বছরে অপরাধের রেকর্ড থাকা প্রায় দুই হাজার অনথিভুক্ত অভিবাসীকে এই সহযোগিতার মাধ্যমে আটক বা অপসারণ করা হয়েছে।
তবে এই আইসকে সহযোগিতা নিয়েই হোকুল প্রশাসন এবং ব্লেকম্যানের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ চলছে। মে মাসে হোকুল স্বাক্ষরিত একটি নতুন রাজ্য আইনে নাসাউসহ স্থানীয় সরকারগুলোর আইস-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করার বিধান রাখা হয়েছে। হোকুল প্রশাসনের বক্তব্য, স্থানীয় পুলিশের সম্পদ ফেডারেল অভিবাসন প্রয়োগে ব্যবহার করলে অন্য গুরুত্বপূর্ণ পুলিশি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্লেকম্যানের দাবি ঠিক উল্টো—এই সহযোগিতা জননিরাপত্তা বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসের পেছনে সাম্প্রতিক জনমত জরিপও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।
আগস্টের শুরুতে পরিচালিত সিয়েনা কলেজের এক জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে হোকুল পেয়েছেন **৪৯ শতাংশ** সমর্থন, আর ব্লেকম্যান ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান এখন ১০ শতাংশ পয়েন্ট।
চার বছর আগে একই সময়ে রিপাবলিকান প্রার্থী লি জেলডিনের তুলনায় ব্লেকম্যান এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছেন। ২০২২ সালের আগস্টে হোকুল জেলডিনের চেয়ে ১৪ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে হোকুল জয় পান মাত্র প্রায় ছয় পয়েন্টের ব্যবধানে।
সিয়েনার জরিপে আরও দেখা যায়, নিউইয়র্ক সিটিতে হোকুলের বড় ব্যবধান থাকলেও শহরতলিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে নিউইয়র্ক সিটিতে হোকুলের সমর্থন ৬৪ শতাংশ বনাম ব্লেকম্যানের ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরতলিতে ব্লেকম্যান ৪৯ শতাংশ বনাম হোকুলের ৪১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন।
ব্লেকম্যানের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন যেমন রিপাবলিকান ভোটারদের উজ্জীবিত করতে পারে, তেমনি এর রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সিয়েনা জরিপ অনুযায়ী নিউইয়র্কের সম্ভাব্য ভোটারদের ৬০ শতাংশ ট্রাম্পকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলে ট্রাম্পের সমর্থন ব্লেকম্যানের রিপাবলিকান ভিত্তিকে শক্তিশালী করলেও ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্লেকম্যান অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁর যুক্তি, একজন গভর্নরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরাসরি যোগাযোগ ও কার্যকর সম্পর্ক থাকা নিউইয়র্কের জন্যই ইতিবাচক হতে পারে।
ট্রাম্পের আক্রমণের আগেই হোকুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজ্যের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নিজের রেকর্ড তুলে ধরেন। তাঁর প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়, নিউইয়র্কে সাম্প্রতিক সময়ে গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ৬২ শতাংশ, হত্যাকাণ্ড ৫৭ শতাংশ এবং সামগ্রিক অপরাধ ১০ শতাংশ কমেছে। তিনি লিখেছেন, বাস্তব তথ্য হলো- রাজ্যজুড়ে অপরাধের হার কমছে।
এদিকে একই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প জাতীয় পর্যায়ে সদ্য প্রকাশিত ঋইও-এর অপরাধ পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধ আগের বছরের তুলনায় ৯.৩ শতাংশ কমেছে এবং হত্যার হার ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে সহিংস অপরাধ ২০২২ সাল থেকেই কমছে এবং এই পতনের পেছনে একক কোনো কারণ নির্ধারণ করা কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে নিউইয়র্ক ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো রিপাবলিকান নিউইয়র্কে রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয়ী হননি। তবে ২০২২ সালে লি জেলডিন হোকুলের সঙ্গে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করেছিলেন।
এবার ব্লেকম্যান সেই ব্যবধান আরও কমিয়ে আনতে পারবেন কি না, সেটিই আগামী কয়েক মাসে নিউইয়র্কের রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য শুক্রবার কোনো সংশয় রাখেননি।
ব্লেকম্যানকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন ছিল- “তিনি একজন বিজয়ী।”
আগামী ৩ নভেম্বর নিউইয়র্কবাসী ঠিক করবেন, ট্রাম্পের সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয় কি না।