হাসিনা ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি ঐক্য

জাতিসংঘের অনুমোদনেই তারেকের ভারতযাত্রা

প্রকাশ : ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৫ , অনলাইন ভার্সন
ভারত দুই পা এগোলেও বাংলাদেশ তিন পা পিছিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপাতত দিল্লি সফরে যাচ্ছেন না। তবে সফরের দরজা পুরোপুরি বন্ধও করেননি। তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে ভারত সফরে যেতে আগ্রহী তিনি। শেখ হাসিনা ও ভারতে অবস্থানরত অন্য পলাতক আসামিদের ফেরত পাঠানো, সফরের অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি এবং ভিসা জটিলতা ও বাণিজ্যিক সমঝোতায় অগ্রগতি- প্রকাশ্যে আলোচনায় রয়েছে এসব শর্ত। তবে নেপথ্যে রয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর শেখ হাসিনা ইস্যু। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রাণহানি এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের বিচার এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের আইনি কাঠামো অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারত তারেক রহমানকে টানছে হাসিনা ইস্যুতে। কিন্তু জাতিসংঘের কালো তালিকায় শেখ হাসিনা। ১৪০০ শিক্ষার্থী, মানুষ হত্যার অভিযোগ। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পাপ মোচিত হয়নি। হাসিনাবাদীরা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। বরং ভারতে বসে জিঘাংসা চরিতার্থ করতে চায়। সেই ভারতে যাওয়ার আগে জাতিসংঘ প্রতিশ্রুতি চায় যে, শহীদদের চাওয়া-পাওয়ার বরখেলাপ হবে না। অর্থাৎ ভারত সফরে জাতিসংঘের নৈতিক অনুমোদন প্রয়োজন।
ফলে দিল্লি সফরের আগে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় ঢাকা। শুধু শেখ হাসিনা নন, ভারতে অবস্থানরত অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নতুন করে সামনে এসেছে। গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও শেখ হাসিনা ও হাদী হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এই পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের নিউইয়র্ক সফর হয়ে উঠছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হবে। উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। এই অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গত ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলাদেশের জন্য এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়েছিলেন। চার দশক পর আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলো বাংলাদেশ। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের নিউইয়র্ক সফরও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও বৈঠক হতে পারে। বাণিজ্যিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অভিবাসন এবং দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর রাজনীতি সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এবারের নিউইয়র্ক সফর তাই কেবল জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক সফর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতের সাথে হাসিনা, পাঁচ জেনারেল প্রত্যার্পণ ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ হাদীর হত্যাকারীদের ভারতে আশ্রয় বিষয়েও আলোচনা। আসামী প্রত্যার্পণ চুক্তির বরখেলাপের বিষয়টিও জরুরি। এর সঙ্গে রয়েছে ফারাক্কা চুক্তির নবায়নের বিষয়। ডিসেম্বরের নবায়ন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের কোনো ধরনের প্রতিনিধিত্ব বা পর্যবেক্ষণের প্রত্যাশা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এসব বিষয়ে কাঙ্খিত অগ্রগতি হলে ভারত সফরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থানও বদলাতে পারে। অন্যদিকে হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সরকার ও বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে কিছু বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, জুলাই আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ভারতে অবস্থানরত আসামিদের ফেরত আনার প্রশ্নে মিল দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরলে এবং তারেক রহমান দিল্লির সঙ্গে কোনো সমঝোতা করে তাঁকে ফিরিয়ে আনলে তাঁরা রাজপথে থাকবেন। তাঁর দাবি, জুলাই আন্দোলনের ১ হাজার ৪০০ শহীদের পরিবার ও ৩০ হাজার আহত যোদ্ধা আন্দোলনে নামবেন।
এর আগে নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনা ও শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফেরত আনার ওপরও জোর দিয়েছেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে এসব বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।
বিএনপির ভেতরেও ভারত ও শেখ হাসিনা ইস্যুতে তৎপরতা বাড়ছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। একই সময়ে বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বৈদেশিক সম্পর্ক আরো সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। দলের চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এতে স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা রয়েছেন। তবে এটিকে এখনই আনুষ্ঠানিক বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা, জুলাই আন্দোলনের বিচার এবং ভারতে অবস্থানরত আসামিদের প্রত্যাবর্তনের মতো কয়েকটি বিষয়ে তাদের অবস্থানের মিলকে কেন্দ্র করে নতুন সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের যোগাযোগও নতুন নয়। নির্বাচনের পর তারেক রহমান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সে সময় তিনি রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে দেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এখন সেই ঐক্যের সামনে বড় পরীক্ষা শেখ হাসিনা ইস্যু। একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন। তারেক রহমানের জন্য দিল্লির দরজা খোলা থাকলেও দেশে-বিদেশে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফলে সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের হিসাবও নতুন করে কষা হচ্ছে। 
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক আলোচনা এবং ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য আসামির প্রত্যর্পণ- সবকিছু মিলিয়ে সামনে আসছে এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ।
ভারত সফরের আগে বাংলাদেশ কতটা ফল আদায় করতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শেখ হাসিনা ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। আর অগ্রগতি না হলে তারেক রহমানের ভারতযাত্রা আরো পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই জোরালো হবে।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]