​বাবার ফাইল হারানোর গল্প

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ১৭:৩৫ , অনলাইন ভার্সন
সকল সন্তানের মতো আমার বাবাকে নিয়েও বহু মিষ্টি-মধুর স্মৃতি আমার হৃদয়-মনজুড়ে বিরাজমান। ১৯৮৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আমার বাবা এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। যখন তিনি ইন্তেকাল করেন, পরিবার ও আত্মীয়-পরিজনের অনেকে আমাকে এই বলে সান্ত্বনা দেন, বাবার মৃত্যুতে আমার মধ্যে সৃষ্ট শোক ও দুঃখবোধ ধীরে ধীরে কমে যাবে। কারণ সময় সকল কষ্ট-বেদনাকে হালকা করে দেয়। কিন্তু তার মৃত্যুর এত বছর পরেও তার বিয়োগ-ব্যথা কিছুটা প্রশমিত হলেও তার প্রস্থানে পৃথিবী আমার কাছে বহুলাংশে একপ্রকার নিষ্প্রভ ও নিস্তেজ হয়ে গেছে। আমার বাবা সেই কবে ব্রিটিশ-ভারতীয় পুলিশের চাকরিতে যোগ দিয়ে দেশভাগের পর দেশে ফিরে তদানীন্তন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন থানায় (গফরগাঁও, ফুলপুর, হালুয়াঘাট, ভালুকা, মধুপুর, নিকলী, মদন, শেরপুর টাউন ইত্যাদি) কাজ করেন। শেষোক্ত থানায় তিনি টাউন দারোগা হিসেবে শহরের আইনশৃঙ্খলা দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। চাকরিসূত্রে শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য ও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এসব ব্যক্তির মধ্যে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং অন্য অনেক পেশার মানুষ ছিলেন। তার সাময়িক ব্যক্তিমাধুর্য, পরিমিতিবোধ, মার্জিত আচার-ব্যবহারের কারণে তিনি বহু মানুষের মন জয়ে সক্ষম হন। এসব ব্যক্তির মধ্যে এই মুহূর্তে যে দুজন ব্যক্তির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে, তারা হলেন শহরের রূপকথা সিনেমা হলের মালিক পরিমল বাবু এবং আমার হাইস্কুলের (জিকে পাইলট মাল্টিলেটারেল হাইস্কুল) প্রধান শিক্ষক কামিনী কান্ত বাবু। স্কুল ছুটির সময় কখনো কখনো সিনেমা হল এলাকায় ঘুরতে গিয়ে পরিমল বাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তিনি স্নেহে আমাকে সিনেমা দেখতে চাই কি না জিজ্ঞেস করতেন। সিনেমা দেখার লোভ সংবরণ করতে না পেরে তার কথায় সাড়া দিয়ে আমার বহু ছবি দেখার সুযোগ হয়। এসবের অধিকাংশই ছিল রাজ্জাক, কবরী, আজিম, সুজাতা, জেবা, ওয়াহিদ মুরাদ ও মোহাম্মদ আলী অভিনীত ছবি। মনে পড়ে, তিনি নিজে আমার হাত ধরে হলের পেছনের দিকের একটা ফাঁকা আসনে বসিয়ে দিতেন।

একসময় শেরপুর থেকে বাবার বদলির আদেশ হলে হেডমাস্টার কামিনী বাবু বাবার কাছে এসে স্কুল হোস্টেলে তার তত্ত্বাবধানে আমাকে স্কুলে রেখে যেতে অনুরোধ করেন। ভালো ছাত্র হওয়ায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারি, এই চিন্তা থেকেই ছিল তার অনুরোধ। বাবা অবশ্য সেই অনুরোধে সাড়া দিতে পারেননি।

শেরপুরে আমাদের বাসা ছিল থানা কম্পাউন্ডের বাইরে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালত অবস্থিত হওয়ায় এই এলাকায় বহু উকিল-মোক্তারের বসবাস ছিল। কোর্ট দারোগা থাকতেন আমাদের পাশের বাসায়।

প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমার সাইকেল চালানোর বেজায় শখ। সে সময় সাইকেলের সিটে বসতে না পেরে সিট ও হ্যান্ডেলের মাঝামাঝি রডের নিচে উঠে প্যাডেল ঘুরিয়ে সাইকেল চালাতাম। বাবা প্রতিদিন সকালের দিকে সাইকেলে চড়ে শহর পরিদর্শনে যেতেন। দুপুরে কিছু পরে খাবার খেতে বাসায় নিয়ে প্রায়ই শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম। একদিন বাইরে থেকে সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফেরার পর বাবা সাইকেলের ক্যারিয়ারের দিকে তাকিয়ে সেখানে রাখা একটা ফাইলের খোঁজ জানতে চান। আমি কোনো ফাইল দেখিনি জানালে তার মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। সাইকেল নিয়ে কোথায় কোথায় গিয়েছি জানতে চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে সেসব স্থানে নিয়ে যান। কিন্তু কোথাও ফাইল না পাওয়া গেলে তার মুখে চিন্তার সঙ্গে এক বিরক্তির ভাব ফুটে ওঠে। এটা দেখে আরও এক জায়গায় যাওয়ার কথা জানালে তিনি আমাকে সেখানে নিয়ে যান। সেটা ছিল আমার এক ক্লাসফ্রেন্ডের বাসা। সেখানে যেতেই বন্ধুর বাবা এগিয়ে এসে বাবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ঘর থেকে একটা ফাইল এনে বাবার হাতে তুলে দেন। ফাইলটা হারিয়ে যেতে পারে মনে করে তিনি ক্যারিয়ার থেকে ফাইল নিয়ে ঘরে তুলে রেখেছিলেন বলে জানান।

ফাইলটিতে অফিসের কিছু জরুরি কাগজপত্র ছিল। হারিয়ে যাওয়া ফাইল ফিরে পেয়ে বাবার মুখে এক অনাবিল স্বস্তি ও প্রশান্তির ভাব ফুটে ওঠে। ফাইল হারানোর পর বাবার মুখের বিরক্তি ও হতাশার পর ফাইল ফিরে পেয়ে তার চেহারায় হাঁপ ছেড়ে বাঁচা ও প্রশান্তির দৃশ্য কখনো ভোলার নয়। বাসায় ফেরার পথে এক মিষ্টির দোকানে নেমে আমাকে চমচম ও সাদা রসগোল্লা খাইয়ে আপ্যায়নের কথা কি কখনো ভোলা যায়।

এমনিতে বাবা খুব স্নেহময় হলেও আমার পড়াশোনার বিষয়ে ছিলেন খুব কঠোর। স্কুল ছুটির পর মাঠে খেলাধুলা করে গোসল সেরে খেয়ে সন্ধ্যায় পড়তে বসার কিছুক্ষণ পর ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাবা রাতে অফিস থেকে ফিরে আমাকে ঘুমাতে দেখে মাকে বলতেন, এভাবে চললে বড় হয়ে জুতা সেলাইয়ের কাজ ছাড়া আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তবে সে কাজটাও ঠিকভাবে করতে পারব কি না, তা নিয়েও তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে তিন বছর অনুবাদকের চাকরির পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সংস্থায় (ডিজিএফআই) আমার উপ-সহকারী পরিচালকের চাকরি পাওয়ার খবরে তিনি খুব খুশি হন। যদিও পরবর্তী সময়ে সহকারী পরিচালক এবং উপ-পরিচালক পদে আমার পদোন্নতির ঘটনা তিনি দেখে যেতে পারেননি। তা দেখতে পেলে তিনি যে অতিশয় প্রীত ও আনন্দিত হতেন, সেটা জোর দিয়ে বলা যায়।

বাবার পর মায়ের মৃত্যু হলে তাদেরকে স্মরণ করে আমার প্রতিদিনের প্রার্থনা-রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা। বাবা দিবসে সকল বাবা ও বাবাতুল্য মানুষের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]