প্রসঙ্গ : রুমিন ফারহানার বিতর্কিত রাজনীতি

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ২২:১৯ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি জোটের প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগে-পরে তার বেশ কিছু কর্মকাণ্ড, বক্তব্য-বিবৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বিতর্কিত হওয়ায় সমাজ মাধ্যম ও মিডিয়ায় তাকে ঘন ঘন খবর হতে দেখা যায়।
 
বিগত ক্ষমতাচ্যুত স্বৈর শাসকের দেড় যুগ সময়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশোতে তার নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। বলা যায়, সে সময় তিনি টিভি টকশোর এক অপরিহার্য Fixture হয়ে ওঠেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে সেসব শোতে বিভিন্ন ইস্যুতে দলের ভাষ্য দিতে তাকে ডাকা হলেও অনেক সময় তাকে আওয়ামী সরকারের বিভিন্ন গণবিরোধী নীতি-পদক্ষেপের (গুম-খুন, হত্যা, গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম ইত্যাদি) নিন্দা ও সমালোচনা না করে কায়দা করে নিজ দলের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনায় সরব থাকতে দেখা যায়, যা স্বাভাবিকভাবে দলের অনেকে সহজভাবে নিতে পারেননি এবং সরকারের সঙ্গে তার আঁতাতের গন্ধ পান। এ কারণে নিজ দলের মধ্যে তিনি বেশ বিতর্কিত হয়ে উঠলেও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেত্রীর প্রিয়ভাজন হতে সক্ষম হন। যার পুরস্কারস্বরূপ, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নির্বাচিত সাতজন এমপির বিপরীতে তাকে একমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেয় দলটি। এমপি হয়ে তিনি ঢাকার পূর্বাচল মডেল টাউনে ১০ কাঠার প্লট চেয়ে আবেদন করেন। ঢাকায় তার প্রাসাদোপম ফ্ল্যাট থাকলেও আবেদনে এই শহরে তার কোনো বাড়িঘর নেই উল্লেখ করে অসত্য হলফনামা দেন। প্লট পেতে তিনি শেখ হাসিনার কাছে একাধিকবার ধরনা দেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি প্লট পাননি বলে শোনা যায়। প্লট চেয়ে তার আবেদনের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়।
 
একজন আইনজীবী এবং বিএনপির নেতা হিসেবে চৌকস বাক্যবাগীশ রুমিন ফারহানাকে বিগত দেড় যুগে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠের রাজনীতিতে কোথাও তেমনভাবে দেখা না গেলেও বিভিন্ন ফোরাম ও টকশোতে তার বিএনপিবিরোধী কুৎসা ও বয়ানদান বন্ধ থাকেনি। সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলার যখন পূর্ণগতিতে চলমান এবং গ্রেপ্তার ও জেল-জুলুম এড়াতে তারা যখন একপ্রকার ঘরছাড়া যাযাবরের জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন, তখন তিনি শাসকদের শেখানো মন্ত্র ও বয়ান উপস্থাপন করে আন্দোলনকে পণ্ড এবং নেতাকর্মী ও সংগ্রামী জনতাকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করার কাজে লিপ্ত থাকেন। এ কারণে ২০২৫ সালে আরও কয়েকজনের সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সিদ্ধান্ত অমান্যের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতদের আর কাউকে তেমনভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা না গেলেও রুমিন ফারহানা ছিলেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বহিষ্কারের কারণে তার মধ্যে সৃষ্ট রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশে তাকে কোনোরূপ রাখঢাক করতে দেখা যায়নি, যা তাকে নিয়মিতভাবে মিডিয়ায় খবর হয়ে আসতে সহায়তা করে।
 
তার নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত শুনানিতে যোগ দিতে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি ঢাকার নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গেলে তার কিছু সমর্থকের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত এনসিপি সমর্থকদের মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাকেও হেনস্তা করা হয় অভিযোগ করে রুমিন ফারহানা ঘটনার জন্য এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহকে দায়ী করে তাকে ‘ফকিন্নির পুত্র’ জাতীয় অশোভন শব্দ ব্যবহার করে বিবৃতি দেন। প্রতিবাদে পাল্টা বিবৃতিতে হাসনাত আবদুল্লাহ তাকে বিএনপির ‘আওয়ামী লীগ বিষয়ক সম্পাদক’ উল্লেখ করেন, যা রাজনীতির ময়দানে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ির এক কদর্য নমুনা হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিজের বিজয়ের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে রুমিন ফারহানাকে বেশ দুর্বিনীত হয়ে উঠতে দেখা যায়। প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর নির্ধারিত তারিখের পূর্বে তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় (সরাইল-আশুগঞ্জ) নির্বাচনী প্রচারকাজ শুরু করেন, যদিও বিএনপির প্রধান তারেক রহমান এ কারণে তার নির্ধারিত উত্তরবঙ্গ সফর কর্মসূচি বাতিল করে দেন। অনুরূপ একটি নির্বাচনী প্রচার সমাবেশ আয়োজনের কারণে জনৈক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার এক সমর্থককে জরিমানা করলে রুমিন ফারহানা ম্যাজিস্ট্রেটকে হম্বিতম্বি করে তর্জনী উঠিয়ে চোখ রাঙিয়ে শাসান, যে কারণে পরে তাকে জেলা প্রকাশকের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
 
রুমিন ফারহানা নিজেকে একজন বিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক মনে করে তাকে সরিয়ে দিয়ে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ভেবে থাকেন। যদিও এটা সর্বজনবিদিত, রাজনীতি বা অন্য কিছু এবং অন্য কোনো ক্ষেত্রে কেউ কখনো অপরিহার্য নন (No one is indispensable)। মার্কিন রাজনীতিতে অধুনা রাইনো (Rhina) শব্দ দিয়ে কোনো দল বা সংগঠনের বিদ্রোহী ও অবিশ্বস্ত কাউকে বোঝানো হয় (উইথ অ্যাপোলজিস টু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, রিপাবলিকান দলে অনুরূপ কয়েকজন রাইনো হলেন সাবেক মার্কিন সিনেটর মিট রমনি, মিচ ম্যাককলেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ও তার কন্যা সাবেক কংগ্রেস সদস্য লিজ চেনি প্রমুখ।
 
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রুমিন ফারহানা জয়ী হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে তার মধ্যে একধরনের গর্ব ও দম্ভভাব প্রকাশ পেতে দেখা যায়, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের আগামী দিনের সাফল্য ও পথচলার জন্য কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হতে দেখা যায়। সম্প্রতি তিনি দল থেকে বহিষ্কারের জন্য দম্ভভরে বিএনপিকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে এই মর্মে বক্তব্য দেন, বহিষ্কারের কারণে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এলাকার বহু মানুষের ভালোবাসা পেতে সক্ষম হয়েছেন, যেটা বিএনপিতে থাকলে পাওয়া সম্ভব হতো না। অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে ব্যঙ্গোক্তি করেন, ‘যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে, পর হয়েছি আমি।’
 
যদিও আজকে তার যতটুকু নামডাক বা পরিচিতি, সেটা তিনি বিএনপিতে ছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রবীণ রাজনীতিক সাবেক স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজের একটি উক্তি মনে পড়ছে। ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় এক পথসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শাহ মোয়াজ্জেম, ওবায়দুর রহমানসহ আরও কয়েকজন বিএনপি নেতার দলত্যাগ করে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগদানের বিষয়ে তিনি তাদের দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিএনপির কোনো ক্ষতি হয়নি বলে মতপ্রকাশ করেন।
 
বিএনপি একটি বটবৃক্ষসম মহিরুহ রাজনৈতিক দল, যেখান থেকে কয়েকটি পাতা ঝরে পড়লে বটবৃক্ষের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং পুরোনো কিছু পাতার ঝরে পড়া বটবৃক্ষের জন্য ভালোই হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উচ্চ পর্যায় থেকে রুমিনকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী এবং ভাবমূর্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার অবদান যৎসামান্য। তার সাম্প্রতিক বিএনপিবিরোধী কথাবার্তা চটকদার হলেও তা যে নেহাত বাগাড়ম্বর ও সারবত্তাহীনÑসেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]