​পচে-গলে যাওয়া এক মায়ের লাশ এবং আমাদের বিবেক

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ২১:৪১ , অনলাইন ভার্সন
মা নুরজাহান বেগমের পচে-গলে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। একজন মা, যিনি হয়তো নিজের সুখ-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন, শেষ জীবনে এসে যদি এমন করুণ ও অবহেলিত মৃত্যুবরণ করেন, তবে প্রশ্ন শুধু সন্তানদের দিকে নয়, প্রশ্ন আমাদের সমাজ, পরিবার, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও।

একজন মা সন্তানের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজের ক্ষুধা ভুলে সন্তানকে খাওয়ান, নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে রাত জাগেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। অথচ সেই মায়ের শেষ পরিণতি যদি হয় নিঃসঙ্গতা, অবহেলা আর পচে-গলে যাওয়া লাশ হয়ে পড়ে থাকা, তাহলে এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি অসুস্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি।

আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখি। কোথাও বৃদ্ধ মা ঘরের এক কোণে না খেয়ে পড়ে আছেন, সন্তানেরা বিদেশে বা শহরে নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কোথাও বৃদ্ধ বাবাকে হাসপাতালের সামনে ফেলে রেখে চলে গেছে সন্তান। আবার কোথাও সম্পত্তির লোভে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগে ভারতের এক শহরে এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ কয়েক দিন ঘরে পড়ে ছিল, প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। বাংলাদেশেও এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের অবহেলায় মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। এসব ঘটনা কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়; এগুলো আমাদের মানবিক পতনের দলিল।

একসময় পরিবার মানে ছিল মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের জায়গা। এখন অনেক পরিবারে সম্পর্কগুলো হিসাব-নিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। সন্তান বড় হয়ে চাকরি পেলে, বিয়ে করলে বা আলাদা সংসার গড়লে অনেক সময় বাবা-মাকে ‘অতিরিক্ত দায়’ মনে করতে শুরু করে। অথচ এই সন্তানদের জন্যই বাবা-মা একসময় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

সমস্যার মূল শিকড় খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে পারিবারিক শিক্ষার প্রসঙ্গ। একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। বাবা-মা-ই তার প্রথম শিক্ষক। শিশুর নৈতিকতা, মানবিকতা, ধর্মীয় চেতনা এবং চরিত্রের ভিত তৈরি হয় ছোটবেলায়। কিন্তু আজকের সমাজে অনেক বাবা-মা সন্তানকে আধুনিক শিক্ষা দিতে যতটা সচেতন, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতে ততটা সচেতন নন।

অনেক পরিবারে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার শেখানো হয়, কিন্তু সালাম দেওয়া শেখানো হয় না। ইংরেজি শেখানো হয়, কিন্তু ‘বিসমিল্লাহ’ শেখানো হয় না। দামি স্কুলে ভর্তি করানো হয়, কিন্তু কোরআনের শিক্ষা বা নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা হয় না। অথচ সন্তান একটু বড় হলেই বাবা-মা আশা করেন সে ধর্মভীরু হবে, মানবিক হবে, বাবা-মায়ের সেবা করবে। বাস্তবে তখন দেখা যায়, সন্তান সেই মূল্যবোধ ধারণ করতে পারছে না। কারণ, তার ভিতটাই তৈরি হয়নি।

একটি গাছ ছোটবেলায় যেমনভাবে বাঁকানো হয়, বড় হয়ে সেটি সেভাবেই দাঁড়ায়। শিশুর মনও তেমন। ছোটবেলায় যদি তার মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রবেশ না করে, তবে বড় হয়ে হঠাৎ করে তাকে দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়ার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব এখানে অত্যন্ত গভীর। ইসলাম শুধু নামাজ-রোজার ধর্ম নয়; এটি মানবিকতার শিক্ষা দেয়। কোরআনে বারবার বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা তাদের প্রতি বিরক্তিসূচক ‘উফ’ শব্দটিও বলো না।” মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ অর্থাৎ, বাবা-মায়ের সেবা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইবাদতের অংশ।

যে সন্তান ছোটবেলা থেকে কোরআনের শিক্ষা, নামাজের গুরুত্ব, আল্লাহভীতি ও মানবিকতার চর্চার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তার মধ্যে সাধারণত দায়িত্ববোধ বেশি থাকে। সে জানে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করা শুধু অমানবিক নয়; এটি বড় গোনাহও।
আজ আমরা অনেক শিক্ষিত মানুষ দেখি, কিন্তু তাদের মধ্যে মানবিকতা নেই। কারণ শিক্ষা আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই। ডিগ্রি আছে, কিন্তু চরিত্র নেই। আধুনিকতা আছে, কিন্তু মায়া-মমতা নেই। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও মানবিক সংকট বাড়ছে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুরা কথা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে দেখে। যদি একটি শিশু দেখে তার বাবা নিজের মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে, বৃদ্ধ বাবাকে অবহেলা করছে, তাহলে সে বড় হয়ে একই আচরণ করাই স্বাভাবিক মনে করবে। কারণ পরিবারই তার বাস্তব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
অনেক বাবা-মা সন্তানকে সবকিছু দিয়ে বড় করেন, কিন্তু শাসন ও মূল্যবোধ শেখাতে ব্যর্থ হন। অতিরিক্ত আদর, অযৌক্তিক স্বাধীনতা এবং ভোগবাদী জীবনধারা সন্তানকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। তখন সে শুধু নিজের স্বার্থ বোঝে, অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখে না। বর্তমান সমাজে প্রযুক্তির অপব্যবহারও পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল করে দিয়েছে। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে। আত্মীয়তার বন্ধন কমে যাচ্ছে, পারিবারিক যোগাযোগ দুর্বল হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হওয়ায় বৃদ্ধ বাবা-মা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। কিছুদিন আগে এক সংবাদে দেখা গেল, একজন বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে আছেন, সন্তানেরা কেউ খোঁজ নিচ্ছে না। এক প্রতিবেশী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আবার এক বৃদ্ধা মা আদালতে গিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, সন্তানেরা তাকে খাবার দেয় না। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো সমাজের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্তান যেমন বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা পায়, ভবিষ্যতে সে তার সন্তানদেরও একই শিক্ষা দেবে। আজ আমরা যদি আমাদের বাবা-মাকে অবহেলা করি, আগামী প্রজন্মও একদিন আমাদের একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা শুধু বইয়ের বিষয় নয়; এটি জীবনচর্চা। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে, মানুষকে সম্মান করতে, বয়োজ্যেষ্ঠদের শ্রদ্ধা করতে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকতে এবং বাবা-মায়ের সেবা করতে।

শুধু মুখে ধর্মের কথা বললেই হবে না; পরিবারে সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাবা যদি নামাজ না পড়েন, মা যদি মিথ্যা কথা বলেন, পরিবারে যদি প্রতারণা ও অশান্তি থাকে, তাহলে সন্তানকে শুধু উপদেশ দিয়ে ভালো মানুষ বানানো সম্ভব নয়। আজ সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এতটাই বেড়েছে যে অনেক মানুষ বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করে। অথচ তারা ভুলে যায়Ñএকদিন তারাও বৃদ্ধ হবে। জীবন চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতা, অর্থ ও সৌন্দর্য সব একদিন ফুরিয়ে যাবে। তখন পাশে থাকবে শুধু মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া।
মা নুরজাহান বেগমের করুণ মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাবিহীন সমাজ কখনো মানবিক সমাজ হতে পারে না। শুধু উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে সভ্যতা তৈরি হয় না; সভ্যতা তৈরি হয় মানুষের চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার মাধ্যমে।

আজ আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু অর্থ উপার্জনের মেশিন বানাচ্ছি, নাকি সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি? আমরা কি তাদের কোরআনের শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো দিচ্ছি, নাকি শুধু প্রতিযোগিতার দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছি?
একটি সমাজ তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা নিরাপদ ও সম্মানিত থাকেন। একজন মা যেন শেষ জীবনে অবহেলায় না কাঁদেন, একজন বাবা যেন নিঃসঙ্গতায় মৃত্যুর অপেক্ষা না করেনÑএই দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়; এটি পুরো সমাজের।
নুরজাহান বেগমের মতো আর কোনো মায়ের করুণ মৃত্যু যেন আমাদের দেখতে না হয়Ñএই প্রত্যাশাই হোক আমাদের মানবিক ও নৈতিক জাগরণের সূচনা।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]