ঝাঁঝ কমছে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩০ , অনলাইন ভার্সন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জারি করা নির্বাহী আদেশ ও প্রেসিডেনশিয়াল পদক্ষেপগুলো ক্রমেই বড় ধরনের আইনি পরীক্ষার মুখে পড়ছে। অভিবাসন, নির্বাচন, সরকারি ব্যয়, ফেডারেল কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইন সংস্থাকে লক্ষ্য করে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শত শত মামলা হয়েছে। নিম্ন আদালতের অনেক নিষেধাজ্ঞা আপিলে প্রত্যাহার করা হলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আদালত বলেছে, প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ বড় ধাক্কা এসেছে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত এইচ-১বি ভিসার নতুন আবেদনে এক লাখ ডলার অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পরিকল্পনায়।
বোস্টনভিত্তিক ফার্স্ট ইউএস সার্কিট কোর্ট অব আপিলস ২৪ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে নিম্ন আদালতের রায় কার্যকর থাকার পথ খুলে দিয়েছে। এর ফলে নতুন এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে এক লাখ ডলার আদায়ের নীতি আপাতত কার্যকর করা যাবে না। আপিল আদালত বলেছে, নিম্ন আদালতের রায় স্থগিত করানোর জন্য প্রশাসন আপিলে সাফল্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখাতে পারেনি। 
এর আগে গত ৮ জুন ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট জজ লিও সোরোকিন এক লাখ ডলারের অর্থ প্রদানের শর্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। বিচারকের মতে, এটি সাধারণ প্রশাসনিক ফি বা কোনো বেআইনি কাজের শাস্তিমূলক জরিমানা নয়; বরং কার্যত একটি কর। আর নতুন কর আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নয়, কংগ্রেসের।
আদালত আরও বলেন, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের অধীনে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করার যে ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে ভিসা আবেদনকারীদের নিয়োগদাতার ওপর নতুন কর আরোপ করা যায় না। জজ সোরোকিন নীতিটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেন এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসকে অর্থটি আদায় থেকে বিরত রাখেন। 
এক লাখ ডলারের এই অর্থকে বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো কখনো ‘বন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে আদালতের নথি এবং নীতির ভাষা অনুযায়ী এটি কোনো ফেরতযোগ্য বন্ড ছিল না। এটি ছিল নির্দিষ্ট নতুন এইচ-১বি আবেদন প্রক্রিয়াকরণের আগে নিয়োগদাতার কাছ থেকে আদায়ের বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত অর্থ বা ফি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রেসিডেনশিয়াল প্রোক্লেমেশনের মাধ্যমে নীতিটি চালু করেছিলেন। অর্থাৎ এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ নামে জারি হয়নি; তবে এটি ছিল প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নেওয়া একটি সরাসরি নীতিগত পদক্ষেপ।
নীতিটি প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নতুন এইচ-১বি কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই অবস্থানরত অনেক শিক্ষার্থী বা বিদ্যমান এইচ-১বি কর্মীর ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রে এটি একইভাবে প্রযোজ্য ছিল না। আগে একটি সাধারণ এইচ-১বি আবেদনে বিভিন্ন সরকারি ফি মিলিয়ে নিয়োগদাতাদের প্রায় দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারত। নতুন নীতিতে এর সঙ্গে এক লাখ ডলার যোগ করার কথা ছিল। 
ক্যালিফোর্নিয়াসহ ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন ২০টি অঙ্গরাজ্য এই নীতির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, নতুন ফি শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোর বিদেশি চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও গবেষক নিয়োগও কঠিন করে তুলবে।
মামলাকারীরা বলেন, অনেক অঙ্গরাজ্যেই চিকিৎসক, শিক্ষক এবং বিশেষায়িত পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে। এক লাখ ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় ছোট হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, এইচ-১বি ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে এবং তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী এনে আমেরিকানদের চাকরি প্রতিস্থাপন বন্ধ করতে এই অর্থের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ফেডারেল আদালত বলেছে, কোনো বৈধ কর্মী নিয়োগকে শাস্তিযোগ্য কাজ হিসেবে বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট এমন অর্থ আদায় করতে পারেন না। 
আপিল আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল আপিল এখনো চলতে পারে এবং সরকার চাইলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টেও নিতে পারে।
তবে ২৪ জুলাইয়ের সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো—নিম্ন আদালতের দেওয়া নীতি বাতিলের রায় আপিল চলাকালে স্থগিত থাকবে না। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ফেডারেল সংস্থাগুলোর এক লাখ ডলার আদায় না করার কথা। যদিও অভিবাসন আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, আদালতের রায়ের সঙ্গে সরকারি ওয়েবসাইট, আবেদন নির্দেশিকা ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সামঞ্জস্য করতে কিছু সময় লাগতে পারে। 
এইচ-১বি রায়ের পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে বাধার মুখে পড়েছে। ফার্স্ট সার্কিট কোর্ট অব আপিলস সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের এমন একটি নির্বাহী আদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে, যাতে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে ভোটারদের একটি কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরিতে সহায়তা এবং ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো ও গ্রহণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২৩টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার প্রধান ক্ষমতা অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের হাতে; প্রেসিডেন্ট এককভাবে সেই ব্যবস্থা পুনর্লিখন করতে পারেন না। আপিল আদালত সেই যুক্তির ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। 
ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের নির্বাহী আদেশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে শত শত মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে কোনোটি একটি সম্পূর্ণ নির্বাহী আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে, কোনোটি শুধু একটি ধারা, আবার কোনোটি নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নে কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থার নেওয়া পদক্ষেপকে লক্ষ্য করেছে।
এ কারণে ‘কতটি নির্বাহী আদেশ আদালত বাতিল করেছে’—এর একটি একক ও সর্বজনস্বীকৃত সরকারি সংখ্যা নেই। একই আদেশের বিরুদ্ধে একাধিক আদালতে মামলা হতে পারে। আবার নিম্ন আদালত কোনো নীতি সাময়িকভাবে আটকে দিলেও আপিল আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে পারে। আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ল ফেয়ার আই জাস্ট সিকিউরিটি ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত করছে। তাদের ট্র্যাকার অনুযায়ী অভিবাসন, নির্বাচন, জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি অর্থায়ন, ফেডারেল কর্মচারী এবং নাগরিক অধিকারসহ বিস্তৃত বিষয়ে প্রশাসন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য হলো, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের সীমান্ত, অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিস্তৃত ক্ষমতা তার রয়েছে। হোয়াইট হাউজ বহু মামলায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে জাতীয় নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপের অভিযোগও করেছে।
অন্যদিকে মামলাকারী অঙ্গরাজ্য, নাগরিক অধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বিস্তৃত হলেও তা সীমাহীন নয়। কর আরোপ, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং নির্বাচন পরিচালনার মতো অনেক ক্ষমতা সংবিধান সরাসরি কংগ্রেস অথবা অঙ্গরাজ্যের হাতে দিয়েছে।
এইচ-১বি ভিসায় এক লাখ ডলারের ফি বাতিল এবং নির্বাচনী আদেশে আপিল আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার ঘটনাগুলো সেই সাংবিধানিক সীমার প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনেছে। নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে দ্রুত নীতি পরিবর্তনে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক আগ্রাসন অব্যাহত থাকলেও আদালতের একের পর এক হস্তক্ষেপে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সেই নির্দেশের ঝাঁঝ কমতে শুরু করেছে। 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]