রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সামনে কঠিন সমীকরণ

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:১৬ , অনলাইন ভার্সন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সৃষ্টি হয়েছে নতুন শূন্যতা। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিছক একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকছে না। বরং ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য এটি হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দর্শন, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত।

তবে মূল প্রশ্ন হলো—দলটি কি অভিজ্ঞ কোনো রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করবে, নাকি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিত্বকে বেছে নেবে? এই প্রশ্ন ঘিরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোর আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও নেপথ্য তৎপরতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সে বিবেচনায় নতুন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্ব, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে শুধু একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং সরকারের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি দলীয় হবেন নাকি দলের বাইরের কেউ—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে। তিনি বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

দলের একাধিক সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে না পৌঁছাতে পারলে বিএনপির ভেতরেই মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। এতে নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং বিরোধী দলগুলোও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সরকারকে চাপে ফেলতে পারে। ফলে দলীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের আগ্রহ ও প্রত্যাশা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তার মতে, অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতার পর এবার এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করা প্রয়োজন, যিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারেন।

সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সরকারকে একযোগে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে, বহুমাত্রিক রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব মোকাবিলাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সে হিসাবে আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যে এই নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, এ জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজনীয়তা এখনো দেখা দেয়নি। আগামী সংসদ অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে অতীতে রাজনৈতিক বিতর্কের নজির রয়েছে। তাই এবারের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইতোমধ্যে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিদের একটি দীর্ঘ তালিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে।

রাজনীতির বাইরের ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মাহবুব উল্লাহ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদ, কেবিনেট সেক্রেটারি নাসিমুল গনি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আইরিন খান।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, দলের ভেতরে মূলত দুটি ধারা নিয়ে আলোচনা চলছে—একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে, অন্যটি অরাজনৈতিক ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বের পক্ষে। তবে দলের অধিকাংশ নেতার ঝোঁক অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের দিকে। তাদের যুক্তি, দেশের সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাষ্ট্রপতিরাই অতীতে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক—উভয় ধরনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রশংসিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সময়ে দেশ ওয়ান-ইলেভেনের মতো অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই অধিক উপযোগী হতে পারেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে স্বস্তি বজায় রাখা, রাজনৈতিক গুঞ্জন ও অপপ্রচার মোকাবিলা করা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সরকারের বড় দায়িত্ব। একই সঙ্গে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন আর কেবল বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় পরীক্ষা। বিএনপি কাকে বেছে নেয়, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হবে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক বার্তা। দলীয় আনুগত্য, জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার এই ত্রিমুখী সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কার নাম উঠে আসে, এখন সেটিই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের ধারণা, পরিস্থিতি জটিল হলে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার প্রার্থী হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম সামনে আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—বঙ্গভবনের পথে শেষ পর্যন্ত কে হাঁটবেন?

ঠিকানা/এনআই
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]