​বাংলা সাহিত্যে ছড়ার ইতিহাস ও গুরুত্ব

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫৬ , অনলাইন ভার্সন
ছড়া হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্য। ছড়া সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত হয়। এটি সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম শাখা। যিনি ছড়া লেখেন, তাকে ছড়াকার বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের কবিদের অনেকেই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন। যাঁদের অধিকাংশ ছড়া সাহিত্য এবং শিশুতোষ সাহিত্য রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ছড়াকার হিসেবে আলাদাভাবে পরিচিতি না ঘটলেও তাঁদের অনেকের শিশুতোষ লেখা ও ছড়া বহুজন পঠিত এবং জনপ্রিয়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ ছড়াকারকে কবি থেকে আলাদা চোখে দেখেন। এ ক্ষেত্রে আমার দ্বিমত রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, একজন কবি ইচ্ছে করলে শুধু ছড়াই নয়, সাহিত্যের সকল শাখায় তার মননশীলতার পরিচয় দিতে পারেন। কাউকে আলাদা করে দেখা উচিত নয়।

শিশুসাহিত্যে ‘ছেলেভুলানো ছড়া’ কিংবা ‘ঘুমপাড়ানি ছড়া’র সঙ্গে অনেক শিক্ষণীয় বহুল পঠিত ছড়া ছোটদের উপযোগী এবং বড়দের জন্যে লিখিত। বাংলাদেশে ছড়াসাহিত্যের সেই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলা ভাষায় ছড়া এবং একই আদলের পুঁথিমালা ও ছন্দময় পদ্য বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। ছড়ার মধ্যে ধ্বনিময়তা, সুরঝংকার ও অর্থময়তা আছে। সুরের সাথে আছে ধ্বনি, তাল ও ঝংকারের নানা রকম লয়। একজন কবি অথবা দক্ষ ছড়াকার তার লেখার মধ্য দিয়ে মনমাতানো ঝংকার, তাল ও সুরের লহমায় ছড়াটিকে অর্থময়রূপে সাজিয়ে পাঠকের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

ছড়া বাংলা সাহিত্যের একটি সর্বালোচিত শাখা। ছড়ার আদিসৃষ্ট চর্যাপদ বা চর্যাগীতি থেকে উৎপত্তি। যার মূল পদটি স্বরবৃত্তে, ছন্দময় ছড়ার মতো করে লিখিত। ছড়া কিংবা পদ্যের মতো বাংলার লোকসাহিত্যের ছন্দময়তার পথ ধরে বাংলাদেশের ছড়া বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সেই সুবাদে ছড়াসাহিত্য বাংলাদেশে ক্রমে ক্রমে আরও বেশি বেগবান হয়ে উঠছে।

ইতিহাসের নিরিখে বাংলা ভাষায় লিখিত ছড়ার রয়েছে প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাস। ১৯৪৭ এর পর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন কাসিমপুরী, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, আলমগীর জলিল, রওশন ইজদানী, খোদেজা খাতুন, আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখ গবেষক প্রাচীনকালের লোকজ ছড়া সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
ছড়া হচ্ছে শিশু-কিশোরসহ সর্বস্তরের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত খোলামেলা কাব্য। পাঠককে আন্দোলিত করার জন্য ছড়া একটি উপযুক্ত হাতিয়ার। যাতে পাঠকের মনোরঞ্জন ও মনমাতানোর ছন্দময়তাকে বেগবান করে। যার সংঘবদ্ধ ঝংকার পাঠককে জাগিয়ে তোলে।
প্রাচীনকালে লোকসমাজে ছড়ার মাধ্যমে মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতেন। একসময় পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছড়ার আদলে পঙ্্ক্তিমালার সাথে বাদ্য-বাজনাও যোগ হতো। সাহিত্যে ভিন্ন স্বাদের আনন্দের খোরাক হিসেবে ছড়ার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে এমন ছড়াও আছে, যা অনেক সময় গণ-আন্দোলনের স্লোগানেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। যা দ্বারা স্বাধীনতার পক্ষে এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হয়।

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যোগীন্দ্রনাথ সরকার লৌকিক ছড়াকে প্রথম গ্রন্থভুক্ত করেন এবং গ্রন্থটির নাম দেন ‘খুকুমণির ছড়া’। এই গ্রন্থটির ভূমিকায় সর্বপ্রথম রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ছড়াকে সাহিত্যের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। পরবর্তীতে সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) এবং বাংলা সাহিত্যের অনেক কবির মাধ্যমে ছড়ার গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি জোরালো হয়। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে সুকুমার রায়ের ছড়া সংকলিত করার মাধ্যমে ছড়ার গ্রহণযোগ্যতাকে মজবুত করে তোলেন। 
এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সুদীর্ঘকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাব্য (ছড়া) যারা আউড়িয়েছে এবং যারা শুনেছে তারা অর্থেও অতীত রস পেয়েছে। ছন্দতে ঝংকার তুলে একটা মোহময়তা এনে দিয়েছে। সেইজন্য অনেক নামজাদা কবিতার চেয়ে এর (ছড়া) আয়ু বেড়ে চলেছে।’
একসময় ছড়াকে মনে করা হতো শুধুই শিশুসাহিত্য হিসেবে। আসলে তা নয়। বাংলা সাহিত্যে ছড়া বড় ছোট সব বয়সের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত এবং নিজস্ব স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত। কখনো ছড়া বিপ্লবী স্লোগানের কাজেও রূপান্তরিত হয়।
এখানে রবীন্দ্রনাথের দুটো ছড়ার উদ্ধৃতি দেওয়া হলো :
আমাদের ছোটো নদী
‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।’

‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।
আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।’

‘বোঝাপড়া’
মনেরে আজ কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে।
কেউ বা তোমায় ভালোবাসে
কেউ বা বাসতে পারে না যে,
কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা
সিকি পয়সা ধারে না যে,
কতকটা যে স্বভাব তাদের
কতকটা বা তোমারো ভাই,
কতকটা এ ভবের গতিকÑ
সবার তরে নহে সবাই।
সুকুমার রায়ের ছড়ার সংখ্যা এত বেশি, যা আদ্যক্ষারিক অনুপাতে পড়তে হয়। বেঁচেছিলেন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর। বাংলা সাহিত্যভুবনে তিনি এখনো জনপ্রিয়। ছড়ায় তাঁর সমতুল্য এখনো কাউকে পাওয়া যায়নি। নিচে সুকুমার রায়ের একটি ছড়া তুলে ধরা হলো :
আয়রে আলো আয়
‘পুব গগনে রাত পোহাল,
ভোরের কোণে লাজুক আলো
 নয়ন মেলে চায়।
আকাশতলে ঝলক জ্বলে,
মেঘের শিশু খেলার ছলে
আলোক মাখে গায়।
সোনার আলো, রঙিন আলো,
স্বপ্নে আঁকা নবীন আলো-
আয়রে আলো আয়।
আয়রে নেমে আঁধার পরে,
পাষাণ কালো ধৌত ক’রে
আলোর ঝরণায়।
ঘুম ভাঙান পাখির তানে
জাগ্রে আলো আকুল গানে
অকূল নীলিমায়।
আলসভরা আঁখির কোণে,
দুঃখ ভয়ে আঁধার মনে,
আয়রে আলো আয়।’

বিষম চিন্তা
‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তারÑ
সবাই বলে, “মিথ্যে বাজে বকিস্নে
আর খবরদার !”
অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব?
বলবে সবাই, “মুখ্যু ছেলে”, বলবে
আমায় “গো গর্ধভ!”’
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) তাঁর ছড়ার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে ঝংকার তুলে দিয়েছেন; তা বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ। বাংলা কবিতা ও ছড়ার ঝংকারের ক্ষেত্রে নজরুল-প্রতিভার সমকক্ষ যে নেই, তা নজরুল বিদ্বেষীরাও স্বীকার করবেন। শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি যে স্বাক্ষর রেখেছেন, তার তুলনা বিরল। তাঁর অনেক গান, কবিতা ও ছড়া হারিয়ে গেছে। অথচ অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছিলেন সমাজের সবচেয়ে সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
বাংলা সাহিত্যের কবিতাপ্রিয় অধিকাংশ মানুষ দৃঢ়ভাবে মনে করেন, ‘নজরুল বাকরুদ্ধ না হলে এবং যদি নিষ্কণ্টক জীবনযাপন করতে পারতেন, সাহিত্যে তিনি নোবেল পুরস্কার পেতেন, তা সহজেই বলা যায়।’
নজরুলের অনেক ছড়া অসাধারণ এবং এখনো জনপ্রিয়। যেমন ‘ঝিঙে ফুল’, ‘খুকী ও কাঠবিড়ালী’, ‘মা’, ‘খাঁদু-দাদু’, ‘খোকার বুদ্ধি’, ‘খোকার গল্প বলা’, ‘চিঠি’, ‘লিচু চোর’, ‘ঠ্যাংফুলী ও পিলে-পটকা’, ‘হোঁদল-কুঁৎকুতের বিজ্ঞাপন’, ‘প্রভাতী’ ইত্যাদি ছোটদের জন্য এমন অনেক লেখা জনপ্রিয়। প্রভাতী কবিতায় প্রভাতের বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর। শিল্প-সাহিত্যে চির অনির্বাণ কাজী নজরুল ইসলামের তিনটি জনপ্রিয় ছড়ার উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো :
‘ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠরে!
ঐ ডাকে যুঁই শাখে ফুল-খুকী ছোটরে।’...
এই প্রভাতী কবিতাটি তাঁর ‘ঝিঙেফুল’ কাব্যগ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য পদ্য কবিতা, যা মূলত একটি জনপ্রিয় ছড়া।
একইভাবে ঝিঙে ফুল’ কবিতাটিও একটি মিষ্টি কবিতা। এটিকে ছড়াও বলা যায় :
‘ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল!
সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া
ফিঙে ফুল/ঝিঙে ফুল!
গুল্মে পর্ণে
ঢল ঢল স্বর্ণে
ঝলমলে দোল দুল
ঝিঙে ফুল।’

লিচু চোর
‘বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস্ করলে তাড়া,
বলি থাম্ একটু দাঁড়া।
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গ্যে যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,
ও বাবা, মড়াৎ করে
পড়েছি সড়াৎ জোরে!’

মা
‘যেখানেতে দেখি যাহা
মায়ের মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনখানে কেহ পাইবে ভাই।
হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যাওয়া সব দুঃখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মতো বুকটি ভরান।’...
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) ছিলেন সুশিক্ষিত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন অখণ্ড ভারতে তিরিশের উপান্তের অন্যতম প্রধান কবি। কবিতার প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন এবং বাক্প্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এই কবির কবিতায় আধুনিকতার ব্যাপ্তি আছে। আছে ধর্মবোধ ও রোমান্টিকতা। সাহিত্যের সকল শাখায় রয়েছে তাঁর দোর্দণ্ড বিচরণ। শিশুসাহিত্যেও রয়েছে তাঁর অবদান। বাংলা বর্ণমালায় এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য লিখে তাদের অন্তর জয় করেছেন। আদ্যক্ষারিক নিয়মে ছড়া লেখায় তাঁর মননশীলতা ও পাণ্ডিত্বের ছাপ রয়েছে। যেমন :
‘অ যে অতসী-তিসির মাঠ,
অশত গাছের সামনে হাট
অলি গলি শহর চাই
অলি গলি শহর পাই।’...
অন্য একটি শিশুতোষ ছড়ায় ফররুখ আহমদ রচনা করেন :
‘আয়রে ঘোড়া পরেন দা
পাখনা মেলে উড়ে যা
কিসসা শুনি রোজ আমি
করি যে তার খোঁজ আমি।’...

ঝুমকো জবা
‘ঝুমকো জবা বনের দুল
উঠল ফুটে বনের ফুল।
সবুজ পাতা ঘোমটা খোলে,
ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে।
সেই দুলুনির তালে তালে,
মন উড়ে যায় ডালে ডালে।’

জসীম উদ্্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) : বাংলার গাছপালা, লতাপাতা, ফল-ফুল ও ছায়াঘন বন-বনানী, মাঠ-ঘাট ও নদী নিয়ে যাঁর আকুলতার কোমল স্পর্শে অসংখ্য পদ্মময় ছড়া, মাটি ও মানুষের সাথে মিশে আছে; তিনি হলেন পল্লিকবি জসীম উদ্্দীন। নিচে তাঁর দুটি ছড়ার উদ্ধৃতি দেওয়া হলো :
মামার বাড়ি
‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামা বাড়ি যাই।’...

আমার বাড়ি
‘আমার বাড়ি যাইও ভোমর
বসতে দেব পিঁড়ে
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।’...

সবার সুখে
‘সবার সুখে হাসব আমি
কাঁদব সবার দুখে,
নিজের খাবার বিলিয়ে দেব
অনাহারীর মুখে।
আমার বাড়ির ফুল-বাগিচা,
ফুল সকলের হবে,
আমার ঘরে মাটির প্রদীপ
আলোক দিবে সবে।
আমার বাড়ি বাজবে বাঁশি,
সবার বাড়ির সুর,
আমার বাড়ি সবার বাড়ি
রইবে না ক দুর।’
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যেরও রয়েছে বিরাট ভূমিকা। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) সাহিত্যের সকল শাখার মতো ছড়া লিখনেও বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। এখানে মাকে নিয়ে তিনি দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। তেমনই তাঁর বেশ কিছু ছড়া ও শিশুতোষ সাহিত্য রয়েছে। এখানে তাঁর দু’টি ছড়া তুলে ধরা হলো :
মাগো তুমি
‘মাগো তুমি কোথায় গেলে
অচিন কোনো সাগর তীরে?
আমায় ফেলে কোথায় গেলে?
মেঘ-মুলুকে? তারার ভিড়ে?
মাগো তোমায় ডেকে ডেকে
ভাইবোনেরা হলাম সারা।
তবে তুমি এমন কেন?
একটুও আজ দাও না সাড়া।
স্বপ্নে দেখি, রূপালি এক
পালকি থেকে নামলে তুমি;
জানি না হায় কোন সে মুলুক,
আঁধার ছাওয়া কোন সে ভূমি?
যখন আমি পড়তে বসি,
কিংবা রাতে ঘুমোতে যাই,
হঠাৎ যেন আমার মাথায়
তোমার হাতের ছোঁয়াটি পাই।
পড়ার ঘরের চেয়ার থেকে
তাকাই যখন শূন্য খাটে,
হয় যে মনে শুয়ে আছো,
সূর্যিমামা যাচ্ছে পাটে।
তোমার কোরান, চশমা তোমার,
শাড়িগুলো তেমনি আছে,
আলমারিটা কেমন নিঝুম,
কেবল তুমি নেই যে কাছে।
মাগো যদি একটি বার আজ
দেখি তোমার মুখের জ্যোতি,
দিচ্ছি কথাÑকাঁদবো না আর,
করবো না আর চোখের ক্ষতি!
এখন কে আর বলবে আমায়,
আয়রে বাচ্চু আমার কাছে?
দমকা হাওয়ায় পর্দা কাঁপে,
পাতা নড়ে একলা গাছে।’

কাকের ছায়া
‘কাঠফাটা সেই দুপুরে
কাকটা গেল পুকুরে।
পানি খাওয়ার আমেজে
পুকুরপাড়ে নামে যে।
সরিয়ে ঝরা পাতাটা
দেখে কাকের মাথাটা।
কে এল ফের দুপুরে
ভাগ বসাতে পুকুরে?
ঠুকরে মজা পানিকে
নিজের ছায়াখানিকে
তাড়িয়ে দিয়ে ঘুসিতে
নেচে ওঠে খুশিতে!’
আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি ছিলেন বিচরণশীল ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি শিশুতোষসহ সব বয়সের পাঠকের জন্য অনেক নন্দিত ছড়া রচনা করেছেন। তাঁর ছড়াগুলো জনপ্রিয়। নিচে তাঁর দু’টি ছড়া তুলে ধরা হলো :
একুশের কবিতা
‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!
প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে?
পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।
প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।’

পাখির মতো
‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলীর কূলটায়,
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়।
তখন কেবল ভাবতে থাকি
কেমন করে উড়বো,
কেমন করে শহর ছেড়ে
সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো!
তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হবো,
পাখির মতো বন্য।’
সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলাদেশের অন্যতম কবি ও সব্যসাচী লেখক। শিল্প-সাহিত্যে অসংখ্য রচনাসমগ্রের মধ্যে শিশুদের জন্যেও তিনি নানা রকম ছড়া লিখেছেন। কাব্যভুবনে তাঁর শিশুতোষ বই ও বেশ কিছু অসাধারণ ছড়া আছে। একটি ছড়ার কয়েকটি লাইন 
এমন :
‘একটি দুটি পাতার ফাঁকে ভোরের আলো পড়ছে।
রাতের কালো লোহার গায়ে একটু একটু মর্চে।
সেই মর্চের গা ঘষবে সূর্যমামা কামার।
সোনার মতো ফুটে উঠবে। ঘুম ভাঙবে আমার।
ঘুম ভাঙবে জেগে উঠবে এক্ষুনি রাজধানী।
ভরবে কলরবে শহর, কলে আসবে পানি।
বাজার জমে উঠবে, ঘড়ি বেজে উঠবে টং।
জানালাতে ফুটে উঠবে সোনার মতো রং।’

বলাবাহুল্য, ছড়াসাহিত্যে বাংলাদেশের অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক রয়েছেন, যাঁদের কবিতা ও ছড়া অনেকেরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। তিক্ত হলেও সত্যি, তাঁদের সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের খুব একটা মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নেই। সাহিত্যভুবনে মুষ্টিমেয় কবি-সাহিত্যিক সংস্কৃতির ধারকদের একচ্ছত্র আধিপত্য এ জন্য দায়ী। সাহিত্যের শাখায় শাখায় একটা অনুচ্চারিত আধিপত্যবাদীদের দৌরাত্ম্যের ফলে সেই সব অনেক সাহিত্য অবলুপ্তির পথে! বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশাল প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শনের ফলে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস সমৃদ্ধ হতে আরও অনেক সময় লাগবে। নিচে সাহিত্যে প্রতিভাবান দুয়েকজন সাহিত্যিকের ছড়া তুলে ধরা হলো :
সিরাজুল হক (১৯৪৭-২০২৫), যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাংলা সাহিত্যে) সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী অন্যতম মেধাবী সাহিত্যিক। আত্মপ্রচার বিমুখ সাদাসিধে জীবনযাপনকারী অধ্যাপক সিরাজুল হকের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। বাংলা, ইংরেজিসহ সাতটি ভাষায় সমান পারদর্শী গুণী সাহিত্যিক ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, প্রবীণ সাংবাদিক ও দক্ষ অনুবাদক।
একটা সময় শিক্ষকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে চাকরি করেছেন। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সাংবাদিকতার প্রাণকেন্দ্র জাতীয় প্রেসক্লাবের জীবন সদস্য এই বরেণ্য সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন।
গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্য ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছড়ার বই রচিত হয়েছে। তাঁর ছড়াগুলোর মাধ্যমে ষড়ঋতুর কথাসহ বাংলাদেশের নানাবিধ ঐতিহ্যের কথাÑমানুষের জীবনবোধের কথা তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে তাঁর ছড়াগ্রন্থ ‘হরেক রকম মজা’ থেকে দুয়েকটি ছড়া তুলে ধরা হলো :
বারো মাসে ছয় ঋতু
‘গ্রীষ্মের খরতাপে হয় দগ্ধ প্রাণ,
আম খাই দাম খাই দুঃখ অবসান।
বর্ষায় ছলছল্ জোয়ারের জল,
চারিদিকে ডুবুডুবু পাহাড়ের ঢল।
শর্তে শেফালী ফুটে সৌরভে ভরা,
মেঘ-মুক্ত আকাশে খাঁ খাঁ খরা।
হেমন্তে ভরা ক্ষেত মউমউ গন্ধ,
বাঙালার ঘরে ঘরে নবান্ন-আনন্দ।
...
বারো মাসে ছয় ঋতু কোন্ দেশে পাই,
আছে শুধু এইখানে অন্য কোথাও নাই।’
একইভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জেলার ঐতিহ্যবাহী খাদ্য-খাবারের ওপর চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।
হরেক রকম মজা
‘বাংলাদেশে আছে মোদের
হরেক রকম মজা
গৌরনদীর রসমালাই
চরফ্যাশনের গজা
পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘি,
নাটোরের কাঁচাগোল্লা
ভাবনা যে আর কি?
পোড়া বাড়ীর চমচম
বগুড়ার দই,
খুলনায় আছে পান-সুপারি
যশোরের কই।
দিনাজপুরে চিড়া-মুড়ি
ঢাকায় আছে পুরি,
রাজশাহীর ফজলি আম
কিনবো কুড়ি কুড়ি।
...
আনারসের মিষ্টি স্বাদ
সিলেটেতে পাই,
বরিশালের আমড়া-পেয়ারা
মজা করে খাই।
কুষ্টিয়াতে আখের রসে
শীতল করি প্রাণ,
মধুর সুরে নিত্য শুনি
লালন শাহের গান।’
একইভাবে বাংলার কুলি-মজুর, কৃষক-শ্রমিকসহ প্রান্তিক মানুষের জীবনবোধের ওপরও তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর একটি ছড়া এমন :
আমরা চাষী
‘আমরা কৃষক/আমরা চাষী
আমরা জাতির প্রাণ,
জগতবাসীর অন্ন যোগাই
আমরা বিশ্বের মান...।’
পৃথিবীতে কোনো সৃষ্টিই মূল্যহীন নয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন অনেক শ্রেষ্ঠতম সৃজনশীল কর্মকাণ্ড রয়েছে, যার মূল্যায়ন করতে দেশের বুদ্ধিজীবীরা কার্পণ্য করেন। তবুও আমাদের অবহেলিত বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে অনেকই তাঁদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকেন।

বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে কবিতা ও ছড়ার জয়জয়কার। স্বাধীনতার পর ছড়া ও কবিতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন শিল্প-সাহিত্যের বিপ্লবে রূপান্তরিত হয়। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের মধ্য থেকে এই লেখায় কয়েকজন বিখ্যাত (প্রয়াত) কবির ছড়ার উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাংলাদেশে নবীন ও প্রবীণের মেলবন্ধনে আমরা গণঝংকারের পদধ্বনি শুনতে পাই। সেটি হচ্ছে ছড়াসাহিত্যের ছন্দময় জাগরণ। বাংলাদেশে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক আছেন, যাঁদের সকলের পরিসংখ্যান করা সহজ নয় এবং তা রীতিমতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। এই কবিদের অনেকের ছড়া কবিতার মতোই পরিব্যাপ্ত। তাঁদের ছড়ার মান অন্যান্য দেশের কবিদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কবি ও ছড়াকারদের আন্তরিকতা এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকলে ছড়া ও পদ্য কবিতা সাহিত্যজগতে আরও বেগবান হয়ে উঠবে। দেশের কবি-সাহিত্যিকের নিষ্ঠাবোধের সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যের সমন্বিত এবং তাদের ভাবনাবৃত্তের মিলিত প্রয়াস থাকলে বাংলা কবিতা ও ছড়াসাহিত্যের উন্নয়নের পথ আরও সম্প্রসারিত হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাবে।

একইভাবে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকের গুণমান ছড়া ও কাব্যসৃষ্টির ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বিশ্বসাহিত্যে বাংলা কবিতা ও ছড়ার একটি অবস্থান তৈরি হতে পারে। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত কবি-সাহিত্যিকের ছড়া ও কাব্যসৃষ্টির ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম এবং শিল্প-সংস্কৃতির যোগসূত্রতা আরও বিস্তৃত ও প্রসারিত হোক। লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]