জাতিগতভাবে আমরা বাঙালি, ভাষার নাম বাংলা। একজন মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে ভাষা শিখে আসে না, শিখে পরিবার, সমাজ ও পরিবেশগত অবস্থান থেকে। তবে ভাষাজ্ঞান অর্জনের জন্য ‘মা’ প্রতিটি মানুষের প্রথম ও প্রধান পথপ্রদর্শক। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার সমন্বয়ে বাংলা। উভয় বাংলায় ভিন্ন ভিন্ন জেলায় বাংলার উচ্চারণ ও শ্রুতি ভিন্নতর। বাংলা বানানের মধ্যেও শত চেষ্টা করেও সমান্তরাল একটি সীমারেখায় আনা যাচ্ছে না। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও সফলতা আকাশচুম্বী হলেও এর শুদ্ধতা অর্জন ও সমান্তরালে পৌঁছার জন্য আমরা ততটুকু উদ্গ্রীব হতে পেরেছি? গোটা বাঙালি জাতিকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টা ছিল বা আছে কি?
বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার শুরু অনেক আগে থেকেই-প্রাচীন ও মধ্যযুগে পুঁথিতে বাংলা ভাষা লিপিবদ্ধ হওয়ার সময়ে। স্বভাবতই তখন সর্বজনসম্মত কোনো মানরূপ ছিল না। ফলে শব্দের বানান-ভিন্নতা তখন থেকেই গড়ে উঠতে শুরু করে। সেদিক থেকে ছাপাখানার মাধ্যমে বাংলা ভাষা মুদ্রণ ও প্রকাশনার যুগে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার মূলে ছিল লিপিকরদের ইচ্ছেমতো বানান ব্যবহার। উনিশ শতকের প্রথম দিকে আধুনিক বাংলা গদ্য ভাষা ও সাহিত্য গড়ে ওঠার কালে লেখা ও মুদ্রণে বাংলা ভাষার একটি মানরূপ দেওয়ার চেষ্টা চলে। তখন তৎসম শব্দের বানানের বিশৃঙ্খলা দূর করে মোটামুটি একটি প্রমিত রূপ গড়া সম্ভব হলেও অতৎসম শব্দে বানানরীতির বিশৃঙ্খলা থেকেই যায়। সে কারণেই বিশ শতকের শুরুতে বাংলা ভাষার অভিধান রচনা করতে গিয়ে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিধান-সংকলক জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হন এবং তার বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (১৯১৭)-এর ভূমিকায় বাংলা বানানের কিছু সমস্যার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে এই সমস্যার স্বরূপ অনেকাংশে চিহ্নিত করেন। বাংলার আরেকজন শ্রেষ্ঠ অভিধানকার হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার বঙ্গীয় শব্দকোষ (১৯৩২)-এর ভূমিকায় বাংলা বানানের সমস্যা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছিলেন, ‘বাঙলায় শব্দের বানান এক বিষম সমস্যা; এখনও ইহার সমাধান হয় নাই, হইবে কিনা জানি না।’
এই প্রেক্ষাপটে বাংলা বানানের সমতাবিধানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারই অনুরোধে বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলা দূর করা, বাংলা বানান সংস্কার ও বাংলা বানানরীতি মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বপ্রথম সক্রিয় ভূমিকা পালন করে । ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষাকে মাধ্যমিক শিক্ষার বাহন বলে ঘোষণা করে এবং রাজশেখর বসুকে সভাপতি ও চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক করে বাংলা বানানের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এ সম্পর্কে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৮ মে।
কিছু রক্ষণশীল পণ্ডিত প্রস্তাবিত ওই বানান-কাঠামোর নিরঙ্কুশ বিরোধিতা করেন। কেউ কেউ অবশ্য প্রস্তাবগুলোকে পুরোপুরি নাকচ না করে তার কোনো কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম সম্পর্কে ভিন্নমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ওই সুপারিশ অনুযায়ী বানান লিখতে সম্মত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ওই নিয়ম চালু করার পক্ষে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত কিছু মতামত ও ভিন্নমত বিবেচনায় নিয়ে সামান্য পরিবর্তন করে ১৯৩৭ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের নিয়ম-এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বানান-বিধির কিছু কিছু বিরোধিতা ছিল। সবই সর্বোতভাবে তা মেনে না নিলেও পরবর্তীকালে ওই বানান-বিধিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান (১৯০৬), রাজশেখর বসুর চলন্তিকা (১৯৩০), কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ (১৯৫৩) সহ সব অভিধানে ১৯৩৭ সালের ওই বানান-বিধি গৃহীত হয়েছে।
কিন্তু তাই বলে বানানের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। কারণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবিত বানান-বিধির কোনো কোনো নিয়ম ও উদাহরণের মধ্যে বিরোধ রয়ে গেছে; অসংস্কৃত শব্দের বানানে রয়ে গেছে প্রচুর বিকল্প ব্যবস্থা। অন্যদিকে বিশ্বভারতীও ১৯৩৬-৩৭ সালের দিকে ‘চলতি ভাষার বানান’-এর নিয়ম প্রণয়ন করেছিল, যার সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানানের নিয়মের পার্থক্য ছিল। পরে বিশ্বভারতীর বানানের নিয়মেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানের নিয়ম পুরোপুরি মেনে চলেননি। পরবর্তীকালে বহু লেখকও নতুনত্বের আকর্ষণে বানানের প্রচলিত বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করেননি।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলা ভাষার ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও তার বিরোধিতার সূত্রে বাংলা বানান ও বর্ণমালা সংস্কার সম্পর্কে বেশ কিছু প্রস্তাব রচিত হয়। তবে ওই সব প্রস্তাব গৃহীত বা কার্যকর হয়নি এবং প্রস্তাবকারীদের প্রায় সবাই পরে নিজেদের প্রস্তাবকে আর সমর্থন করেননি।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একটি রূপ ছিল বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের চেষ্টা। এ চেষ্টা ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল এবং এর প্রধান প্রবক্তা ছিলেন পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমান। নানা বক্তৃতা, বিবৃতি, সভা-সমিতির মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ক্রমাগত প্রচার করতে থাকেন-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি এবং দুই অংশের জনগণের মধ্যে অর্থপূর্ণ ঐক্য গড়ে তোলা ও সুদৃঢ় করার জন্য পাকিস্তানের সকল ভাষার অক্ষর এক রকম হওয়া উচিত। হরফ পরিবর্তনের এই চক্রান্ত ভালোভাবে দানা বাঁধে ১৯৪৯ সালে। এরপর ১৯৫০ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় ২০টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার কাজ শুরু হয়। একটি সরকারি সূত্র থেকে বলা হয়, প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে ২৫ থেকে ৩৫ জন ছাত্র ওইভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে এবং ছয় মাসকাল তারা ওই কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষালাভে নিযুক্ত থাকবে। ১৯৪৯ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষাদান পরিকল্পনা খাতে কেন্দ্রীয় সরকার মোট ৩৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করে। কিন্তু ১৯৫০ সালে সেই টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে এই খাতে ব্যয় বরাদ্দ করা হয় ৬৭ হাজার ৭৬৪ টাকা, যা পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে খরচ হয় আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের কর্মসূচিতে। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ীভাবে গৃহীত পাঠ্যতালিকা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় খরচে আরবি হরফে বাংলা বই ছাপানো হয় এবং সেই সব বই বিনামূল্যে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া আরবি হরফে বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনাকারীদেরকে পুরস্কার প্রদান করা হবে এই মর্মে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রচার করা হয়। ভাষা আন্দোলনের জোয়ারে পাকিস্তান সরকারের ওই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে।
বর্তমানে বহু ভষার সংমিশ্রণে বাংলা এখন বহুমাত্রিক ভাষার সম্মিলনস্থল। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সকল শব্দের সমষ্টিকে বাংলা শব্দসম্ভার (Vocabulary of Bengali Language) বলা হয়। বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা থেকে আগত শব্দও বাংলা শব্দসম্ভারের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত দেশি, তম্ভব, তৎসম, অর্ধ-তৎসম, বিদেশি ও নবগঠিত শব্দসমূহের সমষ্টিই বাংলা শব্দসম্ভার বলে বিবেচিত।
বাংলা শব্দসম্ভার মূলত নিম্নবর্ণিত কয়েকটি উৎস থেকে গঠিত :
১. তৎসম শব্দ : সংস্কৃত ভাষা থেকে অবিকৃতভাবে গৃহীত শব্দ। উদাহরণ : সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যালয়, মানব।
২. তদ্ভব শব্দ : সংস্কৃত শব্দের রূপান্তরিত রূপ। উদাহরণ : হাত (হস্ত), কান (কর্ণ), দাঁত (দন্ত)।
৩. অর্ধ-তৎসম শব্দ : সংস্কৃত শব্দের আংশিক পরিবর্তিত রূপ। উদাহরণ : নিমন্ত্রণ, কেষ্ট, গিন্নি।
৪. দেশি শব্দ : বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও অনার্য ভাষা থেকে আগত শব্দ। উদাহরণ : ঢেঁকি, কুঁড়ে, টং।
৫. বিদেশি শব্দ : আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে আগত শব্দ। উদাহরণ : আদালত, খবর, আলমারি, স্কুল, অফিস।
৬. নবগঠিত শব্দ : আধুনিক প্রয়োজন অনুসারে সৃষ্ট নতুন শব্দ। উদাহরণ : তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, দূরশিক্ষণ।
উপসংহার : বাংলা শব্দসম্ভার বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের প্রধান ভিত্তি। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবের ফলে বাংলা শব্দভান্ডার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
উপরিউক্ত তথ্য-উপাত্ত বাংলা ভাষা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের প্রকাশিত মন্তব্য; বিশেষ করে ড. মাহবুবুল হকের ‘বাংলা বানানের নিয়ম’, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’, বদরুদ্দীন উমারের ‘ভাষা আন্দোলন’ এবং বাংলা একাডেমী প্রকাশিত বিভিন্ন লেখকের মন্তব্য থেকে সংগৃহীত হয়েছে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য এ-জাতি রক্ত ঝরিয়েছে, জীবন দিয়েছে, কিন্তু আন্দোলনটি ‘৮ই ফাল্গুন’ বাংলা দিনপঞ্জি মোতাবেক প্রতিষ্ঠা পায়নি; বরং প্রতিষ্ঠা পেল ইংরেজি দিনপঞ্জি মোতাবেক, যা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে পরিচিত। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ জন্য প্রয়োজন আরও গবেষণা, আরও একাগ্রতা ও একনিষ্ঠ সাধনা। পর্যায়ক্রমে বর্ণিত বিষয়ে আরও তথ্যমূলক আর্টিকেল বাঙালির সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশিত হবে। (চলবে)
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।
বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার শুরু অনেক আগে থেকেই-প্রাচীন ও মধ্যযুগে পুঁথিতে বাংলা ভাষা লিপিবদ্ধ হওয়ার সময়ে। স্বভাবতই তখন সর্বজনসম্মত কোনো মানরূপ ছিল না। ফলে শব্দের বানান-ভিন্নতা তখন থেকেই গড়ে উঠতে শুরু করে। সেদিক থেকে ছাপাখানার মাধ্যমে বাংলা ভাষা মুদ্রণ ও প্রকাশনার যুগে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার মূলে ছিল লিপিকরদের ইচ্ছেমতো বানান ব্যবহার। উনিশ শতকের প্রথম দিকে আধুনিক বাংলা গদ্য ভাষা ও সাহিত্য গড়ে ওঠার কালে লেখা ও মুদ্রণে বাংলা ভাষার একটি মানরূপ দেওয়ার চেষ্টা চলে। তখন তৎসম শব্দের বানানের বিশৃঙ্খলা দূর করে মোটামুটি একটি প্রমিত রূপ গড়া সম্ভব হলেও অতৎসম শব্দে বানানরীতির বিশৃঙ্খলা থেকেই যায়। সে কারণেই বিশ শতকের শুরুতে বাংলা ভাষার অভিধান রচনা করতে গিয়ে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিধান-সংকলক জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হন এবং তার বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (১৯১৭)-এর ভূমিকায় বাংলা বানানের কিছু সমস্যার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে এই সমস্যার স্বরূপ অনেকাংশে চিহ্নিত করেন। বাংলার আরেকজন শ্রেষ্ঠ অভিধানকার হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার বঙ্গীয় শব্দকোষ (১৯৩২)-এর ভূমিকায় বাংলা বানানের সমস্যা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছিলেন, ‘বাঙলায় শব্দের বানান এক বিষম সমস্যা; এখনও ইহার সমাধান হয় নাই, হইবে কিনা জানি না।’
এই প্রেক্ষাপটে বাংলা বানানের সমতাবিধানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারই অনুরোধে বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলা দূর করা, বাংলা বানান সংস্কার ও বাংলা বানানরীতি মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বপ্রথম সক্রিয় ভূমিকা পালন করে । ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষাকে মাধ্যমিক শিক্ষার বাহন বলে ঘোষণা করে এবং রাজশেখর বসুকে সভাপতি ও চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক করে বাংলা বানানের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এ সম্পর্কে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৮ মে।
কিছু রক্ষণশীল পণ্ডিত প্রস্তাবিত ওই বানান-কাঠামোর নিরঙ্কুশ বিরোধিতা করেন। কেউ কেউ অবশ্য প্রস্তাবগুলোকে পুরোপুরি নাকচ না করে তার কোনো কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম সম্পর্কে ভিন্নমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ওই সুপারিশ অনুযায়ী বানান লিখতে সম্মত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ওই নিয়ম চালু করার পক্ষে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত কিছু মতামত ও ভিন্নমত বিবেচনায় নিয়ে সামান্য পরিবর্তন করে ১৯৩৭ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের নিয়ম-এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বানান-বিধির কিছু কিছু বিরোধিতা ছিল। সবই সর্বোতভাবে তা মেনে না নিলেও পরবর্তীকালে ওই বানান-বিধিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান (১৯০৬), রাজশেখর বসুর চলন্তিকা (১৯৩০), কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ (১৯৫৩) সহ সব অভিধানে ১৯৩৭ সালের ওই বানান-বিধি গৃহীত হয়েছে।
কিন্তু তাই বলে বানানের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। কারণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবিত বানান-বিধির কোনো কোনো নিয়ম ও উদাহরণের মধ্যে বিরোধ রয়ে গেছে; অসংস্কৃত শব্দের বানানে রয়ে গেছে প্রচুর বিকল্প ব্যবস্থা। অন্যদিকে বিশ্বভারতীও ১৯৩৬-৩৭ সালের দিকে ‘চলতি ভাষার বানান’-এর নিয়ম প্রণয়ন করেছিল, যার সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানানের নিয়মের পার্থক্য ছিল। পরে বিশ্বভারতীর বানানের নিয়মেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানের নিয়ম পুরোপুরি মেনে চলেননি। পরবর্তীকালে বহু লেখকও নতুনত্বের আকর্ষণে বানানের প্রচলিত বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করেননি।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলা ভাষার ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও তার বিরোধিতার সূত্রে বাংলা বানান ও বর্ণমালা সংস্কার সম্পর্কে বেশ কিছু প্রস্তাব রচিত হয়। তবে ওই সব প্রস্তাব গৃহীত বা কার্যকর হয়নি এবং প্রস্তাবকারীদের প্রায় সবাই পরে নিজেদের প্রস্তাবকে আর সমর্থন করেননি।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একটি রূপ ছিল বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের চেষ্টা। এ চেষ্টা ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল এবং এর প্রধান প্রবক্তা ছিলেন পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমান। নানা বক্তৃতা, বিবৃতি, সভা-সমিতির মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ক্রমাগত প্রচার করতে থাকেন-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি এবং দুই অংশের জনগণের মধ্যে অর্থপূর্ণ ঐক্য গড়ে তোলা ও সুদৃঢ় করার জন্য পাকিস্তানের সকল ভাষার অক্ষর এক রকম হওয়া উচিত। হরফ পরিবর্তনের এই চক্রান্ত ভালোভাবে দানা বাঁধে ১৯৪৯ সালে। এরপর ১৯৫০ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় ২০টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার কাজ শুরু হয়। একটি সরকারি সূত্র থেকে বলা হয়, প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে ২৫ থেকে ৩৫ জন ছাত্র ওইভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে এবং ছয় মাসকাল তারা ওই কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষালাভে নিযুক্ত থাকবে। ১৯৪৯ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষাদান পরিকল্পনা খাতে কেন্দ্রীয় সরকার মোট ৩৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করে। কিন্তু ১৯৫০ সালে সেই টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে এই খাতে ব্যয় বরাদ্দ করা হয় ৬৭ হাজার ৭৬৪ টাকা, যা পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে খরচ হয় আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের কর্মসূচিতে। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ীভাবে গৃহীত পাঠ্যতালিকা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় খরচে আরবি হরফে বাংলা বই ছাপানো হয় এবং সেই সব বই বিনামূল্যে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া আরবি হরফে বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনাকারীদেরকে পুরস্কার প্রদান করা হবে এই মর্মে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রচার করা হয়। ভাষা আন্দোলনের জোয়ারে পাকিস্তান সরকারের ওই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে।
বর্তমানে বহু ভষার সংমিশ্রণে বাংলা এখন বহুমাত্রিক ভাষার সম্মিলনস্থল। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সকল শব্দের সমষ্টিকে বাংলা শব্দসম্ভার (Vocabulary of Bengali Language) বলা হয়। বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা থেকে আগত শব্দও বাংলা শব্দসম্ভারের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত দেশি, তম্ভব, তৎসম, অর্ধ-তৎসম, বিদেশি ও নবগঠিত শব্দসমূহের সমষ্টিই বাংলা শব্দসম্ভার বলে বিবেচিত।
বাংলা শব্দসম্ভার মূলত নিম্নবর্ণিত কয়েকটি উৎস থেকে গঠিত :
১. তৎসম শব্দ : সংস্কৃত ভাষা থেকে অবিকৃতভাবে গৃহীত শব্দ। উদাহরণ : সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যালয়, মানব।
২. তদ্ভব শব্দ : সংস্কৃত শব্দের রূপান্তরিত রূপ। উদাহরণ : হাত (হস্ত), কান (কর্ণ), দাঁত (দন্ত)।
৩. অর্ধ-তৎসম শব্দ : সংস্কৃত শব্দের আংশিক পরিবর্তিত রূপ। উদাহরণ : নিমন্ত্রণ, কেষ্ট, গিন্নি।
৪. দেশি শব্দ : বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও অনার্য ভাষা থেকে আগত শব্দ। উদাহরণ : ঢেঁকি, কুঁড়ে, টং।
৫. বিদেশি শব্দ : আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে আগত শব্দ। উদাহরণ : আদালত, খবর, আলমারি, স্কুল, অফিস।
৬. নবগঠিত শব্দ : আধুনিক প্রয়োজন অনুসারে সৃষ্ট নতুন শব্দ। উদাহরণ : তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, দূরশিক্ষণ।
উপসংহার : বাংলা শব্দসম্ভার বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের প্রধান ভিত্তি। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবের ফলে বাংলা শব্দভান্ডার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
উপরিউক্ত তথ্য-উপাত্ত বাংলা ভাষা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের প্রকাশিত মন্তব্য; বিশেষ করে ড. মাহবুবুল হকের ‘বাংলা বানানের নিয়ম’, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’, বদরুদ্দীন উমারের ‘ভাষা আন্দোলন’ এবং বাংলা একাডেমী প্রকাশিত বিভিন্ন লেখকের মন্তব্য থেকে সংগৃহীত হয়েছে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য এ-জাতি রক্ত ঝরিয়েছে, জীবন দিয়েছে, কিন্তু আন্দোলনটি ‘৮ই ফাল্গুন’ বাংলা দিনপঞ্জি মোতাবেক প্রতিষ্ঠা পায়নি; বরং প্রতিষ্ঠা পেল ইংরেজি দিনপঞ্জি মোতাবেক, যা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে পরিচিত। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ জন্য প্রয়োজন আরও গবেষণা, আরও একাগ্রতা ও একনিষ্ঠ সাধনা। পর্যায়ক্রমে বর্ণিত বিষয়ে আরও তথ্যমূলক আর্টিকেল বাঙালির সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশিত হবে। (চলবে)
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।