​ভিসা স্থগিতে প্রিয়জনকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে

‘কবে আমরা একসঙ্গে থাকতে পারবো?’

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৬:২৯ , অনলাইন ভার্সন
একই শহরে থেকেও কেউ যেন সংসারে নেই। ঘরে সাজানো নতুন আসবাব, আলমারিতে স্ত্রীর জন্য কেনা পোশাক, দেয়ালে বিয়ের ছবি—সবই আছে; শুধু মানুষটি নেই। প্রতিদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে ভিডিওকলে কথা হয়। পর্দার এ পাশে স্বামী, অন্য পাশে স্ত্রী। কথা বলতে বলতে কখনো রাত গভীর হয়, কখনো অভিমান জমে, কখনো কান্নায় বন্ধ হয়ে যায় ফোন। পরদিন আবার একই অপেক্ষা, হয়তো দূতাবাস থেকে কোনো ই-মেইল আসবে, হয়তো ভিসার স্থগিতাদেশ উঠে যাবে, হয়তো তাদের সংসার অবশেষে একই ছাদের নিচে শুরু হবে। কিন্তু সেই ‘হয়তো’ দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত হাজারো বাংলাদেশি নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দার জীবনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের সদস্যদের কাছে আনতে না পারা। কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন স্ত্রীর জন্য, কেউ সন্তানকে বুকে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, কেউ অসুস্থ বাবা-মাকে শেষ বয়সে নিজের কাছে রাখতে চান। আবার কারও আবেদন আটকে আছে ভাই-বোনের জন্য, কারও বাগদান সম্পন্ন হলেও বিয়ে এগোচ্ছে না। বৈধ আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আর্থিক স্পনসরশিপ এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের পরও চূড়ান্ত ফল না পাওয়ায় প্রবাসী পরিবারগুলোতে বাড়ছে হতাশা, মানসিক চাপ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ‘পাবলিক বেনিফিট ব্যবহারের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।
তবে আবেদন জমা দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো এবং নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হতে পারে, মামলার প্রক্রিয়াও চলতে পারে; কিন্তু স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না। ফলে অনেক পরিবার সব ধাপ সম্পন্ন করেও শেষ দরজায় এসে আটকে যাচ্ছে। এই স্থগিতাদেশ কবে প্রত্যাহার করা হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। 
এই অনির্দিষ্ট অপেক্ষাই প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি বিচলিত করছে। কারণ প্রক্রিয়া ছয় মাস, এক বছর কিংবা দুই বছর দেরি হবে—এমন কোনো পূর্বানুমান থাকলে পরিবারগুলো অন্তত নিজেদের জীবন পরিকল্পনা করতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ জানেন না, অপেক্ষার শেষ কোথায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বকে এত দিন পরিবারের নিকটতম সদস্যদের দ্রুত কাছে আনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে দেখা হতো। একজন মার্কিন নাগরিকের স্ত্রী বা স্বামী, অবিবাহিত অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং বাবা-মা সাধারণত ‘ইমিডিয়েট রিলেটিভ’ শ্রেণিতে আবেদন করতে পারেন। এ শ্রেণিতে বার্ষিক সংখ্যাগত কোটার সীমাবদ্ধতাও সাধারণত থাকে না।
কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশি আমেরিকানদের অনেকে বৈধভাবে আবেদন করেও স্ত্রী, সন্তান কিংবা বাবা-মাকে কাছে পাচ্ছেন না। আবেদন অনুমোদন, ন্যাশনাল ভিসা সেন্টারের প্রক্রিয়া এবং দূতাবাসের সাক্ষাৎকার—সবকিছুর পরও ভিসা ইস্যু আটকে যেতে পারে।
অনেকের প্রশ্ন, “যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও নিজের স্ত্রী বা সন্তানকে কাছে আনার নিশ্চয়তা যদি না থাকে, তাহলে নাগরিকত্বের পারিবারিক অধিকার কোথায়?”
প্রশ্নটির সহজ উত্তর নেই। কারণ ভিসা আবেদন করার অধিকার এবং ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা আইনগতভাবে এক বিষয় নয়। কনস্যুলার কর্মকর্তা, নিরাপত্তা যাচাই, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সরকারের সামগ্রিক নীতির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। বর্তমান স্থগিতাদেশ সেই অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করেছে।
দীর্ঘ দূরত্বের দাম্পত্য এখন অনেক প্রবাসী পরিবারের নিয়মিত বাস্তবতা। স্বামী নিউইয়র্কে, স্ত্রী ঢাকায়। কেউ জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন কিংবা ব্রঙ্কসে একা থাকছেন; অন্যদিকে স্ত্রী অপেক্ষা করছেন বাংলাদেশে। বিয়ের পর কয়েক সপ্তাহ অথবা কয়েক মাস একসঙ্গে থাকার পর স্বামীকে কাজে ফিরতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর শুরু হয়েছে নথি সংগ্রহ, আবেদন, ফি, মেডিকেল পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং অনন্ত অপেক্ষা।
প্রথম দিকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ভিডিওকলে কথা হয়। একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভিনয় করা হয়—একজন নিউইয়র্কে রাতের খাবার খান, অন্যজন ঢাকায় সকালের নাশতা। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, ঈদ—সবই পর্দার মাধ্যমে উদ্‌যাপন করতে হয়।
কিন্তু সময় যত বাড়ে, সম্পর্কের ওপর চাপও তত বাড়ে। সময়ের পার্থক্য, কাজের ব্যস্ততা, আর্থিক চাপ, পরিবারের হস্তক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। একজন ভাবেন, অন্যজন যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না। অন্যজন মনে করেন, তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতির জন্য, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
একপর্যায়ে ভালোবাসার কথোপকথনের জায়গা নেয় প্রশ্ন- “আর কত দিন?” “তুমি সত্যিই আমাকে আনতে পারবে?” “আমাদের ভবিষ্যৎ কী?” “আমি কি সারা জীবন অপেক্ষা করব?”
ইমিগ্রেশন বিলম্ব শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে পারিবারিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রবাসী সমাজে এমন অভিযোগ বাড়ছে যে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা অনেক দাম্পত্য সম্পর্ককে ভেঙে দিচ্ছে। কারও মধ্যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে, কারও পরিবার চাপ দিচ্ছে সম্পর্ক শেষ করার জন্য। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে একাকিত্বে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন, কেউ বাংলাদেশে সামাজিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে যেসব বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী বিয়ের আগে খুব বেশি সময় একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাননি, তাদের ক্ষেত্রে দূরত্বের চাপ আরও বেশি। নতুন সম্পর্ক পরিণত হওয়ার আগেই তারা দুই মহাদেশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
সন্তান থাকা পরিবারগুলোর কষ্ট আরও গভীর। কোনো বাবা ভিডিওকলে দেখছেন তার শিশু প্রথমবার হাঁটছে। কেউ সন্তানের জন্মের সময় পাশে থাকতে পারেননি। আবার কেউ বছরে একবার বাংলাদেশে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ সন্তানের সঙ্গে থেকে ফিরে আসছেন। সন্তান বড় হচ্ছে, কিন্তু বাবাকে চেনে মোবাইল ফোনের পর্দায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সন্তান বাংলাদেশে থাকলে পরিস্থিতি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। কাজ, বাসস্থান ও আর্থিক স্থিতি তৈরি করার জন্য মা যুক্তরাষ্ট্রে এলেও পরবর্তীতে সন্তানকে আনতে না পারায় অপরাধবোধ, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতায় ভুগছেন অনেকে।
বর্তমান ভিসা অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে বিয়ের বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে বসবাসরত কারও বিয়ের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও থেমে যাচ্ছে। পরিবারগুলো প্রশ্ন করছে- বিয়ের পর নবদম্পতি কোথায় থাকবে? কত বছর আলাদা থাকতে হবে? ভিসা না হলে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে?
আগে অনেক পরিবার মনে করত, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে হলে স্বামী বা স্ত্রী তুলনামূলক দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন। এখন সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে। ফলে বাগদান সম্পন্ন হওয়ার পরও কেউ বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করছেন না। আবার কোথাও উভয় পক্ষের সম্মতি থাকার পরও অভিভাবকেরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে সম্পর্ক থেকে সরে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক অবিবাহিত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীও এখন বাংলাদেশে বিয়ের বিষয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, বিয়ের পর জীবনসঙ্গীকে বছরের পর বছর কাছে আনতে না পারলে সংসার শুরু হওয়ার আগেই ভেঙে যেতে পারে।
বিয়ের আগে বাগদত্তা বা বাগদত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য অনেক মার্কিন নাগরিক কে-১ (ফিয়ন্সে) ভিসার পথ বেছে নিচ্ছেন। এই ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর ৯০ দিনের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে।
তবে কে-১ কোনো নিশ্চিত বা সহজ বিকল্প নয়। আবেদনকারীদের সম্পর্কের সত্যতা, সরাসরি সাক্ষাতের প্রমাণ, আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ববর্তী বৈবাহিক ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয় কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। কোনো নথির অসংগতি, সম্পর্কের পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, সাক্ষাৎকারে উত্তরের অমিল অথবা নিরাপত্তা ও প্রতারণাসংক্রান্ত সন্দেহ দেখা দিলে আবেদন প্রত্যাখ্যান বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে যেতে পারে।
সব কে-১ আবেদন নাকচ হচ্ছে, এমন দাবি তথ্যসমর্থিত নয়। তবে একটি আবেদন ইউএসসিআইএসে অনুমোদিত হওয়া মানেই যে দূতাবাসে ভিসা নিশ্চিত, তা-ও নয়। কনস্যুলার পর্যায়ে নতুন করে যোগ্যতা যাচাই করা হয়। ফলে অনেকে মাসের পর মাস অপেক্ষা ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশিদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকায় কিছু মানুষ কে-১ ভিসাকে বিকল্প হিসেবে দেখলেও এটি পৃথক আইনি শ্রেণি এবং প্রতিটি আবেদন নিজস্ব তথ্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিবেচিত হয়। কে-১ ভিসাকে স্থগিতাদেশ পাশ কাটানোর নিশ্চয়তাপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভিসা জটিলতা যত বাড়ছে, প্রবাসী পরিবারগুলোর ব্যয়ও তত বাড়ছে। সরকারি আবেদন ফি, নথি অনুবাদ, জন্ম ও বিবাহ সনদ সংশোধন, মেডিকেল পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, কুরিয়ার এবং যাতায়াতের পাশাপাশি অনেকে অভিবাসন আইনজীবীর পেছনে হাজার হাজার ডলার ব্যয় করছেন। 
কেউ প্রথম আবেদন প্রস্তুত করতে অ্যাটর্নি নিয়েছেন। আবেদন আটকে যাওয়ার পর দ্বিতীয় অ্যাটর্নির পরামর্শ নিচ্ছেন। কেউ কংগ্রেস সদস্যের অফিসে যোগাযোগের জন্য অর্থ দিচ্ছেন। কেউ ‘ম্যান্ডামাস’ মামলা, জরুরি আবেদন, মানবিক বিবেচনা অথবা অন্য কোনো ভিসা শ্রেণিতে যাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
কিন্তু একটি বিষয় অনেক আবেদনকারী দেরিতে বুঝতে পারছেন- অ্যাটর্নি আবেদন সঠিকভাবে তৈরি করতে পারেন, আইনি যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি চিহ্নিত করতে পারেন; কিন্তু কোনো অ্যাটর্নি ভিসার অনুমোদন নিশ্চিত করতে পারেন না। বিশেষ করে একটি সামগ্রিক সরকারি স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকলে ব্যক্তিগত আইনজীবীর ক্ষমতা সীমিত।
এই অসহায়তার সুযোগে অসাধু পরামর্শদাতা ও তথাকথিত ‘ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টদের’ তৎপরতাও বাড়তে পারে। কেউ বিকল্প ভিসার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, কেউ দূতাবাসে পরিচিত লোক থাকার দাবি করছেন, কেউ মোটা অঙ্কের বিনিময়ে দ্রুত সাক্ষাৎকার বা ভিসা এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো শেষ আশ্রয় হিসেবে এসব প্রলোভনে পা দিয়ে আরও আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে পারেন।
সম্প্রতি প্রবাসীদের মধ্যে খবর ছড়িয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য এক লাখ ডলারের বন্ড আরোপের চিন্তা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বর্তমান প্রকাশিত নীতিতে বাংলাদেশিদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য এক লাখ ডলারের বন্ডের কোনো ঘোষণা নেই।
কার্যকর নীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের মধ্যে যারা অন্যভাবে বি-১/বি-২ ব্যবসা বা পর্যটন ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন, তাদের ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার ডলারের বন্ড দিতে হতে পারে। বন্ডের পরিমাণ সাক্ষাৎকারের সময় কনস্যুলার কর্মকর্তা নির্ধারণ করবেন। এটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নয়, নন-ইমিগ্র্যান্ট বি-১/বি-২ ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বন্ড দেওয়াও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। 
ভ্রমণকারী অনুমোদিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে, ভিসা নিয়ে ভ্রমণ না করলে অথবা বন্দরে প্রবেশের অনুমতি না পেলে নিয়ম অনুযায়ী বন্ড ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে, যুক্তরাষ্ট্র না ছাড়লে কিংবা নন-ইমিগ্র্যান্ট স্ট্যাটাস পরিবর্তনের কিছু পদক্ষেপ নিলে বন্ড বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। 
এক লাখ ডলারের গুজব সঠিক না হলেও ১৫ হাজার ডলারের সম্ভাব্য বন্ডও বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের জন্য বিশাল অঙ্ক। বাবা-মাকে কয়েক মাসের জন্য দেখতে আনা, সন্তানের গ্র্যাজুয়েশনে পরিবারের সদস্যকে আমন্ত্রণ জানানো কিংবা অসুস্থ আত্মীয়কে পাশে পাওয়ার চেষ্টা—সবকিছুর ওপর এটি বাড়তি আর্থিক বাধা তৈরি করতে পারে।
ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার বাবা-মা, স্ত্রী অথবা সন্তানকে ভিজিটর ভিসায় সাময়িকভাবে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বি-১/বি-২ ভিসার মূল উদ্দেশ্য অস্থায়ী ব্যবসা বা ভ্রমণ। আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে সফর শেষে তিনি নিজ দেশে ফিরে যাবেন।
যার স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন এবং যার নামে ইতিমধ্যে ইমিগ্র্যান্ট আবেদন রয়েছে, তার ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্মকর্তা স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে শুধু ইমিগ্র্যান্ট আবেদন থাকা মানেই বি-১/বি-২ ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাকচ হবে—এমন কোনো সরল নিয়ম নেই। প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচিত হয়।
সমস্যা হলো, অনেক আবেদনকারী ভিজিটর ভিসাকে স্থায়ীভাবে পরিবারের সঙ্গে থাকার গোপন পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। এতে শুধু বর্তমান আবেদন নয়, ভবিষ্যতের ইমিগ্রেশন আবেদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভিসা আবেদনে উদ্দেশ্য, বৈবাহিক অবস্থা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং পূর্ববর্তী আবেদন সম্পর্কে সত্য তথ্য দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীদের আরেকটি বড় বেদনা বৃদ্ধ বাবা-মাকে কাছে আনতে না পারা। অনেক বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে সন্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার স্বপ্ন দেখেছেন। সন্তান নাগরিক হওয়ার পর আবেদন করেছেন, প্রয়োজনীয় স্পনসরশিপ দিয়েছেন এবং সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু এখন তাদের বয়স বাড়ছে, শারীরিক অসুস্থতা বাড়ছে, অথচ অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।
কেউ আশঙ্কা করছেন-ভিসা আসার আগেই বাবা বা মা ভ্রমণের সক্ষমতা হারাবেন। কেউ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকতে পারছেন না। বছরে একবার দেশে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। চাকরি, ব্যবসা, সন্তানদের স্কুল এবং আর্থিক দায়বদ্ধতার কারণে ঘন ঘন বাংলাদেশে যাওয়াও সম্ভব হয় না।
প্রবাসজীবনের অর্থনৈতিক সাফল্যের আড়ালে এই অপরাধবোধ গভীর- “সবকিছু অর্জন করলাম, কিন্তু বাবা-মায়ের শেষ বয়সে পাশে থাকতে পারলাম না।”
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ভাই-বোনের জন্যও আবেদন করতে পারেন। তবে এই শ্রেণিতে দীর্ঘ অপেক্ষা আগে থেকেই ছিল। এখন সামগ্রিক কড়াকড়ি, নিরাপত্তা যাচাই এবং ভিসা স্থগিতাদেশ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে।
অনেক পরিবারে একজন ভাই বা বোন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু অন্যরা বাংলাদেশে রয়ে গেছেন। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর দূরত্ব আরও কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। পারিবারিক অনুষ্ঠান, অসুস্থতা, সম্পত্তির বিষয় কিংবা সন্তানদের সম্পর্ক—সবকিছু দুই মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়।
ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় ভাই-বোনের আবেদন তাৎক্ষণিক পরিবারের আবেদনের তুলনায় কম অগ্রাধিকার পেলেও আবেদনকারীদের কাছে এই সম্পর্কের আবেগ কম নয়। তাদের জীবনের একটি বড় সময় কেটে যাচ্ছে অগ্রাধিকারের তারিখ এগোনোর অপেক্ষায়।
পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নাগরিকেরা আবেদন জমা দিতে এবং সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারবেন। তাদের বর্তমান বৈধ ইমিগ্র্যান্ট ভিসাও শুধু এই নির্দেশনার কারণে বাতিল করা হয়নি। দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে যারা তালিকাভুক্ত নয়- এমন দেশের বৈধ পাসপোর্ট ব্যবহার করে আবেদন করেন, তারা স্থগিতাদেশের বাইরে থাকতে পারেন। নির্দিষ্ট দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম বিবেচিত হতে পারে। 
কিন্তু অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিবারের জন্য এসব সীমিত ব্যতিক্রম কোনো কার্যকর সমাধান নয়। তারা আবেদন চালিয়ে যাচ্ছেন, ফি দিচ্ছেন, সাক্ষাৎকারে যাচ্ছেন এবং নথি হালনাগাদ করছেন, অথচ জানেন না, চূড়ান্ত অনুমোদনের দরজা কবে খুলবে।
এ অবস্থায় অনেকে আবেদন বন্ধ করবেন কি না, তা নিয়েও দ্বিধায় আছেন। অভিবাসন আইনজীবীরা সাধারণত সতর্ক করে বলেন, স্থগিতাদেশ মানেই আবেদন প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করা নয়। কারণ নীতি পরিবর্তন হলে প্রস্তুত ও সম্পূর্ণ মামলাগুলো তুলনামূলক দ্রুত এগোনোর সুযোগ পেতে পারে। তবে প্রত্যেক মামলার অবস্থা ভিন্ন হওয়ায় আবেদনকারীকে নিজের কেস সম্পর্কে যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে।
ইমিগ্রেশন নিয়ে আলোচনা সাধারণত ফরম, ফি, সাক্ষাৎকার এবং আইনি ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে একটি বড় মানসিক স্বাস্থ্য সংকট।
দীর্ঘ একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং ব্যর্থতার অনুভূতি থেকে অনেক প্রবাসী উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও বিষণ্নতায় ভুগছেন। কেউ কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না। কেউ বন্ধু ও সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলছেন, কারণ সবাই একই প্রশ্ন করেন—“স্ত্রী কবে আসছে?” “সন্তানকে আনতে পারলে না?” “ভিসার কী খবর?”
বাংলাদেশে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের ওপরও চাপ কম নয়। তারা আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বামী বা স্ত্রী যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না। আবার কেউ আশঙ্কা করেন, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাবে।
ইমিগ্রেশন মামলার অগ্রগতি না থাকলেও পারিবারিক যোগাযোগ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত কথা বলা জরুরি। প্রয়োজনে দম্পতি বা পরিবারের সদস্যদের কাউন্সেলিং নেওয়াও সম্পর্ক রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
অনিশ্চয়তার এই সময়ে প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি থেকে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি শতভাগ ভিসা নিশ্চিত করার দাবি করে, দূতাবাসের ভেতরে যোগাযোগ থাকার কথা বলে অথবা বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্থগিতাদেশ পাশ কাটানোর নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সেটি বড় সতর্কসংকেত।
ভিসা বন্ডের অর্থও কেবল কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশনার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নির্ধারিত পে ডট গভ ব্যবস্থায় জমা দিতে হয়। কোনো তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইট বা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে বন্ডের অর্থ পাঠানো উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কর্মকর্তার নির্দেশনা ছাড়া অর্থ দিলে তা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং বন্ড প্রদান করলেও ভিসা নিশ্চিত হয় না। 
একইভাবে ভিসার জন্য মিথ্যা চাকরি, ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাজানো ব্যবসা, কাগুজে বিয়ে অথবা ভ্রমণের উদ্দেশ্য গোপন করার প্রলোভন ভবিষ্যতের সব বৈধ সুযোগ নষ্ট করতে পারে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা, ভিসার অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং সরকারি সুবিধার ওপর সম্ভাব্য চাপ—এসব বিষয়ে সরকারের নীতিগত উদ্বেগ থাকতে পারে। কিন্তু সেই নীতির মানবিক মূল্যও উপেক্ষা করা যায় না।
একটি স্থগিত ভিসা শুধু একটি পাসপোর্টে সিল না পড়ার ঘটনা নয়। এর অর্থ হতে পারে একজন মা সন্তানের শৈশব হারাচ্ছেন। একজন স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সংসার শুরু করতে পারছেন না। একজন নাগরিক অসুস্থ বাবা-মাকে শেষ বয়সে কাছে রাখতে পারছেন না। একটি বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। একটি শিশু বাবাকে শুধু ফোনের পর্দায় চিনছে।
আইন ও নীতির ভাষা নিরাবেগ। সেখানে লেখা থাকে—‘ভিসা ইস্যু স্থগিত’, ‘অতিরিক্ত যাচাই’, ‘পাবলিক চার্জ’, ‘প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’। কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে আছে জীবন্ত মানুষ, সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি এবং অপেক্ষা।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর কারও কাছে নেই - বাংলাদেশিদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যুর স্থগিতাদেশ কবে প্রত্যাহার হবে?
যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেয়নি। নিয়মিত পর্যালোচনা চলছে বলা হলেও পরিবারগুলোর জন্য তা কোনো দৃশ্যমান নিশ্চয়তা তৈরি করছে না। তারা শুধু দেখছেন, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাচ্ছে, সন্তানের বয়স বাড়ছে, বাবা-মা দুর্বল হচ্ছেন এবং সম্পর্কের ওপর চাপ গভীর হচ্ছে।
তারপরও তারা আবেদন ধরে রেখেছেন। প্রতিদিন ই-মেইল পরীক্ষা করেন। কেস স্ট্যাটাস দেখেন। আইনজীবীকে ফোন করেন। কংগ্রেস সদস্যের অফিসে অনুরোধ জানান। নতুন কোনো সরকারি ঘোষণা এসেছে কি না খোঁজ নেন।
কারণ অপেক্ষার কষ্ট যতই গভীর হোক, প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
নিউইয়র্কের একটি নিঃসঙ্গ ঘরে রাত গভীর হয়। ঢাকা থেকে ভিডিওকল আসে। স্বামী-স্ত্রী কিছুক্ষণ কথা বলেন। আবারও একই প্রশ্ন ওঠে-“কবে আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব?”
উত্তর নেই। শুধু অপেক্ষা আছে। আর আছে দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা অসংখ্য পরিবারের কান্না, হতাশা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]