তার পুরো নাম আইরিন জুবেদা খান। সিলেটের বিখ্যাত খান পরিবারের সন্তান। যার জীবনের শুরু থেকেই এক বর্ণাঢ্য পথচলার রয়েছে অনবদ্য এক ইতিহাস। এককথায় আন্তর্জাতিক পরিসরে তার পরিচয় কোনো গণ্ডিতে আটকে নেই। এতটাই পরিচিত এবং সম্মানিত এক ব্যক্তিত্ব তিনি, সেই তাকে নিয়েই সাম্প্রতিক সময়কালে কিছু কিছু গুঞ্জন ডালপালা মেলা শুরু করেছে। তার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। আর সেটা হলো বিএনপি সরকার সম্প্রতি আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। গত ৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে আইরিন খানকে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি (রাষ্ট্রদূত) রূপে নিয়োগদানের কথা বলা হয়েছে। এই নিয়োগদানের মধ্য দিয়ে তিনি হবেন তার পূর্বসূরি সালাউদ্দিন নোমানের স্থলাভিষিক্ত। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা লাভের পর এ পর্যন্ত স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে ১৪ জন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ওই পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ওই ১৪ জনের মধ্যে সিলেটি ব্যক্তিত্ব ছিলেন মোট চারজন। তারা হলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, ইফতেখার আহমদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত এবং ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এবার ওই তালিকায় যুক্ত হলেন আইরিন জুবেদা খান। তাকে নিয়ে হলেন মোট পাঁচজন। বিষয়টা বৃহত্তর সিলেটের জনগণের জন্য অত্যন্ত গর্বের। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো ওই বিষয়টাকে কেউ কেউ অন্য ধরনের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করেছেন। যেহেতু আইরিন খান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোন, তাই ওই সম্মানজনক বিষয়টাকে তারা পারিবারিক বলয়ের ভেতরের একটা অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেই নানা মাত্রার গুঞ্জন তৈরিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। অথচ তারা নিজেরা জানেন না, বিশ্ব ইতিহাসে ওই নারী ব্যক্তিত্বের অবস্থান কোন পর্যায়ের এবং কতটা উন্নত পর্যায়ের।
সিলেটের বিরাহিমপুরের ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারের এই সদস্য আইরিন খানের জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর। জন্ম তার ঢাকায় এবং পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন ঢাকার গ্রিন হেরাল্ড স্কুলে। নিতান্তই কম বয়সে একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের নারকীয় তাণ্ডব খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের পাশবিক অত্যাচার। কৈশোরকালে ওই সব ঘটনা তাকে এতটাই মানসিকভাবে জর্জরিত করেছিল যে সেই সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। একসময় উচ্চতর পড়ার ইচ্ছা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। প্রথমে আয়ারল্যান্ড, তারপর ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড থেকে আইনের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কনসার্ন ইউনিভার্সাল নামে একটি সংস্থা গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকাও পালন করেন আইরিন খান। তারপর ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক জুরি কমিশনে যোগ দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা ঘটান তিনি। ১৯৮০ সালে যোগ দেন জাতিসংঘে। জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজি (UNHCR) নামক বিভাগে যোগ্য দিয়ে ওখানেই কাটিয়ে দিলেন কুড়ি বছরের মতো সময়। ১৯৯৫ সালে ইউএনএইচসিআর-এর চিফ অব মিশন ইন ইন্ডিয়া পদে পদোন্নতি ঘটে তার। ওই সময়কালে ওই রকম এক গুরুত্বপূর্ণ পদে এ রকম কম বয়সে আর কারও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৯৯ সালের কমোডো ক্রাইসিসের সময় তিনি UNHCR-এর প্রতিনিধি দলেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যার ফলে ওই বছরেই ডেপুটি ডাইরেক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশন পদে পদোন্নতি ঘটে তার। ২০০১ সালে আইরিন খান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে যোগ দিয়ে ওই সম্মানজনক পদে কাটিয়ে দিলেন পাক্কা ৯টি বছর।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার এত গুরুত্বপূর্ণ পদে তার আগে আর কোনো নারীর দায়িত্ব পালনের ইতিহাস নেই। তিনি ছিলেন প্রথম কোনো নারী, যিনি কিনা গুরুত্বপূর্ণ এতগুলো পদে যোগদানের ইতিহাস তৈরি করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ছিলেন একমাত্র মুসলিম এবং একমাত্র এশিয়ান। সেই হিসেবে আইরিন খান শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই নন, এশিয়ান মানুষদের জন্যও গৌরবোজ্জ্বল এক ইতিহাস তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বে ডিটেনশন সেন্টারের কতিপয় বিতর্কিত আইনের সংশোধনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি দুনিয়াব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। ২০০৯ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টির ‘ডিমান্ড ডিগনিটি’র বিষয়েও তিনি একটি আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছিলেন। সেখান থেকে দাবি তোলা হয়েছিল ‘মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার’। একজন গরিব মানুষেরও অধিকার রয়েছে মানুষের মতো মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার। ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করে University of Salford এর চ্যান্সেলর পদে যোগ দেন। ওই সময়ে তিনি লন্ডনের চ্যারিটি কমিশন অব ইংল্যান্ডের মেম্বার পদেও কাজ করেছেন। ২০২০ সালের পহেলা আগস্ট থেকে জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি জেনেভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করে যাচ্ছেন।
একজন লেখক হিসেবেও তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ : পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ গ্রন্থের একজন সহলেখক তিনি। ওই গ্রন্থটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৯ সময়কালে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশনের (আইডিএলও) মহাপরিচালক পদেও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস তৈরি করেছেন আইরিন। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল’ স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর পদে কাজ করার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আইরিন খান একসময় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব সম্মাননা স্মারকে ভূষিত হয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০০৬ সালে পাওয়া সিডনি পিস প্রাইজ, ২০০২ সালে পিলকিংটন ‘উইমেন অব দি ইয়ার’, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া জন ওয়েন্স ডিস্টিংগুইশড অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া তাকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের স্টাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানের ফেরিশ বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০০৭ সালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই) ও বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উগান্ডার বেয়ারফুট ল’র গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে এত সম্মানজনক পদে বাংলাদেশের আর কোনো নাগরিক পুরুষ কিংবা নারী কারও পৌঁছানোর কোনো ইতিহাস নেই। অথচ জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টাকে অনেকে দেখছেন জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোনের স্বীকৃতি পাওয়ার মতো ঘটনা। আসলে তিনি জুবাইদা রহমানের পিতা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের ভাতিজি, এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিদ্যাপিঠ অক্সফোর্ড থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিপ্রাপ্ত মিস জিল খানের গর্বিত উত্তরাধিকার। আইরিন খানের প্রপিতামহ ডা. আসাদ্দর আলী খান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বাঙালি মুসলিম সিভিল সার্জন এবং তিনি ভারতের পাটনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি ছিলেন বিহারের দারভাঙ্গা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। আইরিন খানের পিতার নাম ডা. সেকেন্দার আলী খান। তিনি মাহবুব আলী খানের ভাই ছিলেন। এই পরিবারের দুই কৃতী পুরুষ আসাদ্দর আলী খান এবং গজনফর আলী খান ছিলেন তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের দুই কৃতী পুরুষ। গজনফর আলী খান কেমব্রিজ থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফেরত এসে প্রশাসনিক ক্যাডার-ভিত্তিক আইসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৮৯৭ সালে প্রথম স্থান অর্জন করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তার আগে ওই আইসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৮৬৩ সালে কবিগুরুর ভাই সত্যেন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় আইসিএস ছিলেন।
আইরিন খানের পরিবারে অনেক কৃতী পুরুষের জন্ম, তার মধ্যে আসাদ্দর আলী খানের আট পুত্রের মধ্যে আহমদ আলী খান এবং মোহাম্মদ আলী খান দুজনই বার অ্যাট ল’ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীও পারিবারিক সূত্রে তার পিতৃব্য। এমন এক ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রের কল্যাণে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন-এম নটাই প্রত্যাশা সাধারণ জনগণের। আমরা তার সাফল্য কামনা করছি।
সিলেটের বিরাহিমপুরের ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারের এই সদস্য আইরিন খানের জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর। জন্ম তার ঢাকায় এবং পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন ঢাকার গ্রিন হেরাল্ড স্কুলে। নিতান্তই কম বয়সে একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের নারকীয় তাণ্ডব খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের পাশবিক অত্যাচার। কৈশোরকালে ওই সব ঘটনা তাকে এতটাই মানসিকভাবে জর্জরিত করেছিল যে সেই সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। একসময় উচ্চতর পড়ার ইচ্ছা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। প্রথমে আয়ারল্যান্ড, তারপর ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড থেকে আইনের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কনসার্ন ইউনিভার্সাল নামে একটি সংস্থা গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকাও পালন করেন আইরিন খান। তারপর ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক জুরি কমিশনে যোগ দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা ঘটান তিনি। ১৯৮০ সালে যোগ দেন জাতিসংঘে। জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজি (UNHCR) নামক বিভাগে যোগ্য দিয়ে ওখানেই কাটিয়ে দিলেন কুড়ি বছরের মতো সময়। ১৯৯৫ সালে ইউএনএইচসিআর-এর চিফ অব মিশন ইন ইন্ডিয়া পদে পদোন্নতি ঘটে তার। ওই সময়কালে ওই রকম এক গুরুত্বপূর্ণ পদে এ রকম কম বয়সে আর কারও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৯৯ সালের কমোডো ক্রাইসিসের সময় তিনি UNHCR-এর প্রতিনিধি দলেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যার ফলে ওই বছরেই ডেপুটি ডাইরেক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশন পদে পদোন্নতি ঘটে তার। ২০০১ সালে আইরিন খান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে যোগ দিয়ে ওই সম্মানজনক পদে কাটিয়ে দিলেন পাক্কা ৯টি বছর।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার এত গুরুত্বপূর্ণ পদে তার আগে আর কোনো নারীর দায়িত্ব পালনের ইতিহাস নেই। তিনি ছিলেন প্রথম কোনো নারী, যিনি কিনা গুরুত্বপূর্ণ এতগুলো পদে যোগদানের ইতিহাস তৈরি করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ছিলেন একমাত্র মুসলিম এবং একমাত্র এশিয়ান। সেই হিসেবে আইরিন খান শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই নন, এশিয়ান মানুষদের জন্যও গৌরবোজ্জ্বল এক ইতিহাস তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বে ডিটেনশন সেন্টারের কতিপয় বিতর্কিত আইনের সংশোধনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি দুনিয়াব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। ২০০৯ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টির ‘ডিমান্ড ডিগনিটি’র বিষয়েও তিনি একটি আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছিলেন। সেখান থেকে দাবি তোলা হয়েছিল ‘মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার’। একজন গরিব মানুষেরও অধিকার রয়েছে মানুষের মতো মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার। ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করে University of Salford এর চ্যান্সেলর পদে যোগ দেন। ওই সময়ে তিনি লন্ডনের চ্যারিটি কমিশন অব ইংল্যান্ডের মেম্বার পদেও কাজ করেছেন। ২০২০ সালের পহেলা আগস্ট থেকে জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি জেনেভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করে যাচ্ছেন।
একজন লেখক হিসেবেও তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ : পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ গ্রন্থের একজন সহলেখক তিনি। ওই গ্রন্থটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৯ সময়কালে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশনের (আইডিএলও) মহাপরিচালক পদেও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস তৈরি করেছেন আইরিন। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল’ স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর পদে কাজ করার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আইরিন খান একসময় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব সম্মাননা স্মারকে ভূষিত হয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০০৬ সালে পাওয়া সিডনি পিস প্রাইজ, ২০০২ সালে পিলকিংটন ‘উইমেন অব দি ইয়ার’, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া জন ওয়েন্স ডিস্টিংগুইশড অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া তাকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের স্টাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানের ফেরিশ বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০০৭ সালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই) ও বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উগান্ডার বেয়ারফুট ল’র গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে এত সম্মানজনক পদে বাংলাদেশের আর কোনো নাগরিক পুরুষ কিংবা নারী কারও পৌঁছানোর কোনো ইতিহাস নেই। অথচ জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টাকে অনেকে দেখছেন জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোনের স্বীকৃতি পাওয়ার মতো ঘটনা। আসলে তিনি জুবাইদা রহমানের পিতা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের ভাতিজি, এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিদ্যাপিঠ অক্সফোর্ড থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিপ্রাপ্ত মিস জিল খানের গর্বিত উত্তরাধিকার। আইরিন খানের প্রপিতামহ ডা. আসাদ্দর আলী খান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বাঙালি মুসলিম সিভিল সার্জন এবং তিনি ভারতের পাটনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি ছিলেন বিহারের দারভাঙ্গা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। আইরিন খানের পিতার নাম ডা. সেকেন্দার আলী খান। তিনি মাহবুব আলী খানের ভাই ছিলেন। এই পরিবারের দুই কৃতী পুরুষ আসাদ্দর আলী খান এবং গজনফর আলী খান ছিলেন তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের দুই কৃতী পুরুষ। গজনফর আলী খান কেমব্রিজ থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফেরত এসে প্রশাসনিক ক্যাডার-ভিত্তিক আইসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৮৯৭ সালে প্রথম স্থান অর্জন করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তার আগে ওই আইসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৮৬৩ সালে কবিগুরুর ভাই সত্যেন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় আইসিএস ছিলেন।
আইরিন খানের পরিবারে অনেক কৃতী পুরুষের জন্ম, তার মধ্যে আসাদ্দর আলী খানের আট পুত্রের মধ্যে আহমদ আলী খান এবং মোহাম্মদ আলী খান দুজনই বার অ্যাট ল’ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীও পারিবারিক সূত্রে তার পিতৃব্য। এমন এক ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রের কল্যাণে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন-এম নটাই প্রত্যাশা সাধারণ জনগণের। আমরা তার সাফল্য কামনা করছি।