​স্বাধীনতার পর আমেরিকা কীভাবে ব্রিটিশ শাসনের আইন, শব্দ ও মানসিকতা বদলে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ে উঠল

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৫:০২ , অনলাইন ভার্সন
ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো কেবল একটি ভূখণ্ড স্বাধীন হলেই প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন একটি জাতি নিজের আইন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভাষা, বিচার, প্রশাসন এবং জাতীয় পরিচয় নিজেই নির্ধারণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রায় ১৬৯ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার পর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিদায় করা নয়; বরং সেই শাসনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করা।

স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রণীত নানা আইন উপনিবেশগুলোতে প্রয়োগ করা হতো। জনগণের মতামত ছাড়াই কর আরোপ, বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সেনা মোতায়েন এবং রাজকীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা ছিল সেই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। “No taxation without representation” বা ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়’- এই দাবিই আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্লোগান হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করে, যেখানে জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস। রাজা বা রানীর পরিবর্তে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হন। বংশগত ক্ষমতার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি ছিল চিন্তারও বিপ্লব।
বিচারব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আসে। যদিও আমেরিকার আইনব্যবস্থার অনেক ভিত্তি ইংরেজ কমন ল থেকে এসেছে, তবুও তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলে। সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং আদালতকে সংবিধানের ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নির্বাহী ও আইনসভাকে সংবিধানের সীমার মধ্যে রাখে।

স্বাধীনতার পর আমেরিকা ভাষাগত পরিচয়েও ধীরে ধীরে নিজস্বতা গড়ে তোলে। ব্রিটিশ ইংরেজির পরিবর্তে গড়ে ওঠে আমেরিকান ইংরেজি। অনেক শব্দের বানান ও ব্যবহার বদলে যায়। যেমন-
American English- British English
Color-Colour
Honor-Honour
Labor-Labour
Favor-Favour
Neighbor-Neighbour
Center-Centre
Theater-Theatre
Meter-Metre
Fiber-Fibre
Defense-Defence
Check-Cheque (ব্যাংক চেক)
Apartment-Flat
Elevator-Lift
Truck-Lorry
Trunk (car)*Boot
Hood (car)-Bonnet
Gasoline / Gas-Petrol
Vacation-Holiday
Cookie-Biscuit
French fries-Chips
Chips-Crisps
Candz-Sweets
Movie-Film
Soccer-Football
Mail-Post
Mailbox-Postbox
Line-Queue
Store-Shop
Drugstore-Chemist’s
Trash / Garbage-Rubbish
Trash can-Bin

এগুলো কেবল বানানের পরিবর্তন নয়; বরং একটি স্বাধীন জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশ।

প্রশাসনিক পরিভাষাতেও পরিবর্তন আসে। ব্রিটেনে “Prime Minister” সরকারপ্রধান হলেও যুক্তরাষ্ট্রে “President” একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। ব্রিটিশ “House of Commons”-এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠে “House of Representatives”। “House of Lords”-এর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় “Senate”, যেখানে বংশগত অভিজাতদের নয়, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্থান দেওয়া হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও পার্থক্য তৈরি হয়। ব্রিটেনে “Constable” শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে “Police Officer”, “Sheriff”, “Marshal” বা “State Trooper”-এর মতো নিজস্ব কাঠামো ও পরিভাষা বিকশিত হয়। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সাংবিধানিক ক্ষমতা পায়।

পরিমাপের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব পথ অনুসরণ করে। যদিও ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল পদ্ধতির ঐতিহাসিক প্রভাব ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব “U.S. Customary System” ব্যবহার অব্যাহত রাখে, যা বর্তমানে ব্রিটিশ ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।

শিক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও আমেরিকা নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সংবিধানের প্রথম দশটি সংশোধনী, যা “Bill of Rights” নামে পরিচিত, নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত হয়। এ ধরনের সুরক্ষা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার আলোকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে এটাও মনে রাখা জরুরি যে স্বাধীনতার পর আমেরিকা ব্রিটিশ ঐতিহ্যের সবকিছু বাতিল করেনি। ইংরেজি ভাষা, কমন ল-এর বহু নীতি, সংসদীয় বিতর্কের কিছু রীতি এবং আইনি ধারণার অনেক অংশ তারা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, যা কার্যকর ও জনকল্যাণমূলক ছিল তা সংরক্ষণ করেছে, আর যা স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা ছিল তা পরিবর্তন করেছে।
এখানেই একটি জাতির প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়। উন্নত রাষ্ট্রগুলো অতীতকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে না, আবার সম্পূর্ণ অস্বীকারও করে না। তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, ভুলগুলো সংশোধন করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও উন্নত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

আজকের পৃথিবীতে যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা শুধু একটি পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত বা একটি আনুষ্ঠানিক দিবসের নাম নয়। স্বাধীনতা মানে জনগণের সম্মতিতে আইন প্রণয়ন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নাগরিকের মর্যাদা এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নয়- আইনই সর্বোচ্চ। আমেরিকার অভিজ্ঞতা তাই আমাদের শেখায়, একটি জাতি যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করার সাহস অর্জন করে, তখন সে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই লাভ করে না; বরং নিজের ভাষা, আইন, প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় পরিচয়েরও পুনর্জন্ম ঘটায়। আর সেই পুনর্জন্মই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে কেবল মানচিত্রে নয়, ইতিহাসেও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
-কলামিস্ট।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]