শেখ হাসিনার দেশে ফেরা: রাজনৈতিক কৌশল, নাকি শেষ ইচ্ছু পূরণ

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৩ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর তিনি আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘‘দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যাও করা হতে পারে; তবুও তিনি ফিরবেন। দলের নেতাকর্মীরা কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং মৃত্যু যদি আসেই, তবে সেটি নিজের দেশের মাটিতেই হোক, যেখানে তার বাবা-মায়ের কবর রয়েছে।’’

শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তুঙ্গে। এটি কি সত্যিই দেশে ফেরার পরিকল্পনা, নাকি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনরুজ্জীবিত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল বা দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণের শেষ ইচ্ছা-আকাঙ্খা পূরণে মনের অতৃপ্ত বাসনা- এ প্রশ্নই এখন দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে চাউর হচ্ছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- তিনি কেবল নিজের ফেরার কথা বলেননি; বরং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়েও একসঙ্গে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দলকেও একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, নেতৃত্ব এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং রাজনৈতিক লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। ২৪-এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বহু নেতা গ্রেপ্তার, আত্মগোপন বা দেশের বাইরে অবস্থান করায় তৃণমূলের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এ অবস্থায় ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার দেশের ফেরার ঘোষণা দলটিতে নতুন শক্তিমাত্রা বাড়াবে। 

অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাও যাচাই করতে চান। তার অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই সঙ্গে তিনি জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তার কোনো আলোচনা হয়নি।

শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এই ঘোষণার পেছনে ব্যক্তিগত ও মানবিক কারণও থাকতে পারে। শেখ হাসিনার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর নির্বাসিত অবস্থায় জীবনের শেষ সময় কাটানোর পরিবর্তে নিজের দেশেই ফিরে আসার প্রবল ইচ্ছা-আকাঙ্খা তাঁর মধ্যে কাজ করতে পারে। তাছাড়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে পারিবারিক স্মৃতি, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং জন্মভূমির প্রতি আবেগও তাঁর দেশের ফেরার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে। যদিও, বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ও সহিংস রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ৫ আগস্ট তিনি তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। পরে ভারত তাঁকে আশ্রয় দেয়। 
এদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

ডিসেম্বরকে কেন লক্ষ্য করেছেন শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক, নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন চমকের সম্ভাবনা রয়েছে। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে শেখ হাসিনার দেশ ফেরার ঘোষণাটি দেওয়া কাকতালীয় নয়। ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে শেখ  হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণা সময়ের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দেশ তখন নির্বাচনে উৎসবে থাকবে। আর সেই সময়টিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।  

শেখ হাসিনা ফেরা: রাজনৈতিক কৌশল, নাকি শেষ ইচ্ছু পূরণ    
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অংশ দেশের বাইরে বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকায় তৃণমূলে হতাশা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের প্রধান যদি বলেন, তিনি দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তাহলে তা কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। দলের কর্মীদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হতে পারে। ‘শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন’ এমন রাজনৈতিক সমালোচনার জবাব দেওয়া পরিবেশ সৃষ্টি করা। নিজেকে একজন রাজনৈতিক সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান সম্পর্কে বার্তা দেওয়া। এবং দেশের মাটিতে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে মৃত্যুবরণের শেষ ইচ্ছা-আকাঙ্খা পূরণে মনের অতৃপ্ত বাসনার বার্তা জাতিকে জানিয়ে জনগণের অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা।

এখন প্রশ্ন: সত্যিই কি শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান?
শেখ হাসিনার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। বয়স ও জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি। সেই হিসেবে দীর্ঘ সময় নির্বাসিত বা দেশের বাইরে অবস্থান অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার জন্য মানসিকভাবে কঠিন হয়ে ওঠে। অনেকেই জীবনের শেষ সময় নিজের জন্মভূমিতে কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যা শেখ হাসিনার মধ্যেও কাজ করতে পারে। এছাড়া পারিবারিক আবেগ, শেখ পরিবারের অধিকাংশ স্মৃতি, আত্মীয়স্বজন এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের সঙ্গে শেখ হাসিনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই আবেগও শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার ইচ্ছা-আকাঙ্খায় প্রভাবিত করতে পারে। যা ভবিষ্যতের ইতিহাসের মূল্যায়নেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা এবং একাধিক মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। 

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে- শেখ হাসিনার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, বিচারিক প্রক্রিয়ার কাঠামো কতটা স্বচ্ছতা বজায় থাকবে, রাজনৈতিক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা কী হতে পারে। যদিও, বিশ্ব রাজনীতিতে অতীতেও এমন নজির রয়েছে যে, নির্বাসিত বা ক্ষমতাচ্যুত অনেক নেতা দেশে ফিরে বিচার বা রাজনৈতিক লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেন। পাকিস্তানেরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আইনি লড়াই করেন। বিভিন্ন আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকার দেশেও ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের প্রত্যাবর্তনের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। তবে, প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও আইনগত বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় এসব উদাহরণ সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় নয় বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কী হতে পারে 
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তাঁর ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে। তিনি যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরেন, তবে সেই চাপের একটি অংশ কমতে পারে। রয়টার্সও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি জটিল অধ্যায়ের অবসানও ঘটাতে পারে।

মোরদ্দাকথা, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে তাঁর দেশে ফেরা রাজনৈতিক কৌশল, নাকি দেশের মাটিতে জীবনের শেষ ইচ্ছু পূরণের উচ্চ বাসনা তাও বিবেচ্য। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
লেখক : সাংবাদিক
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]