​চট্টগ্রামে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত ৯ লাখ মানুষ

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪৬ , অনলাইন ভার্সন
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ জনে। নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে বিভাগের পাঁচ জেলার অন্তত ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দুর্গত এলাকায় এখনো উদ্ধার, ত্রাণ ও আশ্রয় কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় আটজন, বান্দরবান জেলায় ছয়জন এবং রাঙামাটি জেলায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার ১৬ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার কবলে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।

বন্যার্তদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এরমধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ বুলেটিনে পাঁচ জেলাকে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে টেকনাফে ১৬৯ মিলিমিটার, রাঙামাটিতে ১০৬ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলো- বাহারছড়া ইউনিয়নের আশিক (১১) ও মিরাজ (৬)। স্থানীয়রা জানান, বন্যার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সময় পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যায় দুই শিশু। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

বাহারছড়া ইউনিয়নসহ বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে বসতঘর, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি ও মাছের ঘের। দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকট।

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জেলার চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও বসতঘর।

বন্যার পানিতে নলকূপ ডুবে যাওয়ায় কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার দিনের পর দিন রান্না করতে পারছে না। নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছেন দুর্গতরা।

বান্দরবান জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সময় আরও তিন দিন বাড়িয়েছে। আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকবে।

রাঙামাটি জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। একইসঙ্গে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক উপত্যকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বিভাগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তিনি উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও দ্রুত করার আহ্বান জানান।

প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকায় দুর্গত এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ নয়, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষতি কমাতে স্থায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।

ঠিকানা/এএস 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]