যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সাক্ষী হলো ২০২৬ সালের ৪ জুলাই। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে উদযাপিত হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক আসর। এই বিশেষ বর্ষপূর্তি ‘আমেরিকা ২৫০’ নামে পরিচিত, যা শুধু একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকার ইতিহাসকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
নিউইয়র্কসহ দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শুরু করে বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, হিউস্টনসহ বড় বড় শহরে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, সামরিক প্রদর্শন এবং চোখ ধাঁধানো আতশবাজির আয়োজন।
এবারের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্ক ছিল উদযাপনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শহরের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে অংশ নেন বিশেষ অনুষ্ঠানমালায়। বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্ক হারবারে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ‘টল শিপ’শোভাযাত্রা, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী পালতোলা জাহাজ অংশ নেয়। শত শত নৌযান এবং লাখো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে নিউইয়র্ক হারবার এক উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়। এই আয়োজনকে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপনের পর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এছাড়া ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন কমিউনিটি প্যারেড, লাইভ মিউজিক, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, পারিবারিক বিনোদন এবং স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় পূর্ব নদী ও নিউইয়র্কের আকাশ আলোকিত করে ঐতিহ্যবাহী আতশবাজির মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী, যা দেখতে লাখো মানুষ নদীর তীর, পার্ক, ছাদ এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভিড় করেন। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল মলে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পর্যায়ের ‘স্যালুট টু আমেরিকা’ অনুষ্ঠান। সেখানে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠানে সামরিক ব্যান্ড, দেশাত্মবোধক সংগীত, ঐতিহাসিক উপস্থাপনা এবং বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়াশিংটনে প্রবল ঝড়, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রায় দুই ঘণ্টার জন্য ন্যাশনাল মল খালি করে দেয়া হয়। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দর্শনার্থীরা আবারও অনুষ্ঠানস্থলে ফিরে আসেন। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঞ্চে উঠে উপস্থিত জনতাকে ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, আমাদের কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যাবে না। প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস, নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্য এবং দেশের জন্য একটি নতুন ‘সুবর্ণ যুগ’ গড়ার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
ভাষণে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভোটার পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে ‘সেইভ আমেরিকা’ আইন পাসের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ভাষণ শেষে ন্যাশনাল মলসংলগ্ন মার্কিন ক্যাপিটল ভবনের পাশে প্রায় ৪০ মিনিটব্যাপী মনোমুগ্ধকর আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। হালকা বৃষ্টির মধ্যেও হাজারো দর্শনার্থী এ আয়োজন উপভোগ করেন।
আয়োজকদের দাবি, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আতশবাজির প্রদর্শনীর মাধ্যমে গিনেস বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েই এ আয়োজন করা হয়।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সারা দেশে ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
দেশটির সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সংবিধান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকারের ওপর বিশেষ প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালন করে।
বিশ্বের নানা দেশের অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অংশ নেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয়, লাতিনো, আফ্রিকান, আরব এবং অন্যান্য কমিউনিটির সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠান, প্যারেড ও পারিবারিক উৎসবে অংশ নেন।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও অনেক পরিবার জাতীয় পতাকা, বারবিকিউ, পিকনিক ও আতশবাজি উপভোগের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেন।
২৫০তম স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাস, গণতান্ত্রিক যাত্রা এবং বহুজাতিক সমাজব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতা, সমতা, নাগরিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশটি ঐতিহাসিক এই মাইলফলক উদযাপন করেছে। একই সঙ্গে এটি ছিল অতীতের অর্জনকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী মুহূর্ত।
আতশবাজির মধ্যেই ব্রুকলিন ব্রিজে আগুন : নিউইয়র্কে স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহ্যবাহী আতশবাজি প্রদর্শনীর সময় ব্রুকলিন ব্রিজের কয়েকটি অংশে স্বল্প সময়ের জন্য আগুন লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেতুর কয়েকটি স্থান থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়।
নিউইয়র্ক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, আগুন প্রায় এক মিনিটের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আতশবাজির স্পার্ক থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেনি।
এবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কে ৮৫ হাজারের বেশি আতশবাজি ব্যবহার করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সত্ত্বেও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পুরো প্রদর্শনী সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
ওয়াশিংটনে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মিছিল : স্বাধীনতা দিবসেই রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সংগঠন প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট মিছিল বের করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মুখ ঢেকে খাঁকি পোশাক পরে সংগঠিতভাবে মেট্রো স্টেশন থেকে মিছিল শুরু করেন।
তাদের হাতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা, ঢাল ও ড্রাম। কয়েকজনের হাতে গৃহযুদ্ধকালীন কনফেডারেট পতাকাও দেখা যায়।
সংগঠনটির টেলিগ্রাম চ্যানেলের দাবি, কর্মসূচিতে চার শতাধিক সদস্য অংশ নেন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজম-এর গবেষকদের মতে, প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা একটি ফ্যাসিবাদী সংগঠন। সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করেছে।
বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউইয়র্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ৪ জুলাই শুক্রবার নিউইয়র্কে এক আলোচনা সভা, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং কেক কাটার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউইয়র্ক’। জ্যামাইকার হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ের একটি রেস্তোরাঁর পার্টি হলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনের কয়েকজন প্রার্থী অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশটির অঙ্গীকার ও ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন।
বক্তারা বলেন, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সংগঠনের সঠিক সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী এসব সংগঠনের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। বাংলা নববর্ষ, জাতীয় দিবস, বনভোজন, নির্বাচন, প্যানেল পরিচিতি কিংবা অভিষেক অনুষ্ঠানÑএসব আয়োজন নিয়ে সারা বছরই কমিউনিটি ব্যস্ত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনে বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। তারা বলেন, অনেকেই মনে করেন, এটি তো আমেরিকার দিবস, আমরা কেন উদযাপন করব? অথচ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এ দেশের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও মূল্যবোধের প্রতিও সম্মান জানানো প্রয়োজন।
বক্তারা নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির শীর্ষ সংগঠনগুলোর প্রতি আগামী বছর থেকে ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কয়েকজন প্রার্থী বক্তব্য দেন। তারা নির্বাচিত হলে আগামী বছর থেকে বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এ অনুষ্ঠানে কোনো সভাপতি বা প্রধান অতিথি নির্ধারণ করা হয়নি; মঞ্চেও কারও জন্য আলাদা চেয়ার রাখা হয়নি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউ ইয়র্ক’ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংগঠন নয়; এটি নিউইয়র্কে বসবাসরত সকল বাংলাদেশি আমেরিকানের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এখানে সবাই সমান মর্যাদার অংশীদার।
সিনিয়র সাংবাদিক শেখ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিনিয়র কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব নাসির আলী খান পল, নজরুল একাডেমির সভাপতি কিউ জামান, সিনিয়র সাংবাদিক সাঈদ তারেক, তাসের মাহমুদ, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ, নবযুগ-এর সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সাগর, কবি ও সাহিত্যিক এবিএম সালেহ উদ্দিন, রিয়েল এস্টেট প্রশিক্ষক আজিজুল হক মুন্না, সন্দ্বীপ সোসাইটির সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফিরোজ আহমেদ, বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম, সিনিয়র সাংবাদিক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ রাব্বী, সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফজলে রাব্বী, ব্যাংকার মনিউর রহমান, মিডিয়াকর্মী রাশিদা আক্তার, সাবেক আমলা আজিজুর রহমান, হায়দার আলীসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি সালেহা ইসলাম।
শেষে কেক কাটার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
ব্রঙ্কস বাংলাদেশি কমিউনিটি : নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, ধর্মীয় আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা বাজার এলাকার পদ্মা সেলুন প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আমেরিকান বাংলাদেশি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের সভাপতি আব্দুস শহীদ। কাজী রবিউজ্জামান ও শামীম আহমেদ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিরাজ উদ্দীন আহমেদ সোহাগ, আব্দুল মুহিত, জুনেদ চৌধুরী, মাহবুব আলম, শেখ জামাল হোসেন, সিপিএ জাকির চৌধুরী, হাসান আলী, শামীম মিয়া, সোহান আহমেদ টুটুল, শাহজাহান, বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুর আহমদ, লুকমান হোসেন লুকু, অধ্যাপক সুধাংশু মণ্ডল, কামাল উদ্দীন, কফিল উদ্দীন চৌধুরী, শ্যামল চন্দ্র চন্দ, আব্দুর রউফ, জামাল আহমেদ ও মিয়া মোহাম্মদ দাউদসহ কমিউনিটির আরো অনেকে।
সভাপতির বক্তব্যে আব্দুস শহীদ তীব্র গরম উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া সব অতিথি, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি ভবিষ্যতেও কমিউনিটির কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
নাসাউ কাউন্টি ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায় : নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের নাসাউ কাউন্টিতে ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। গত ১ জুলাই লং আইল্যান্ডের হিক্সভিলের লেভিটটাউন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নাসাউ কাউন্টির ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সদস্যরা গর্ব, দেশপ্রেম ও সম্প্রীতির পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপন করেন।
রোটারিয়ান, সমাজসেবক, লেখক, আলোকচিত্রী এবং অর্থনৈতিক পরামর্শক মিজান রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অবারিত সুযোগের ২৫০ বছর পূর্তি বা ‘সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল’ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নাসাউ কাউন্টি ও লং আইল্যান্ডের বিভিন্ন টাউনশিপের ৩০ জনেরও বেশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তা অংশ নেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য এবং সবার জন্য সমান সুযোগের দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে চিরন্তন আদর্শ ও অঙ্গীকার রয়েছে, তা উদযাপনের লক্ষ্যেই কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এ অনুষ্ঠানে একত্রিত হন।
বার্ষিক ‘লিডারশিপ মিটিং’-এর ব্যানারে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত সফল। এতে নাগরিক অংশগ্রহণ, জনসেবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধ বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটে।
অনুষ্ঠানে জোসেফ জি. কায়রো এবং ববি কুমার কালোটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আয়োজনের সার্বিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দেন।
নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিটি নেতা, পেশাজীবী, নির্বাচিত প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত আয়োজক কমিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। আয়োজকদের মতে, তাদের এই সেবামূলক উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সেই চেতনাকেই ধারণ করে, যে দেশটি বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষের অবদান, ত্যাগ এবং স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং যা আজও গণতন্ত্রের ভিতকে আরও সুদৃঢ় করে চলেছে।
আটলান্টিক সিটিতে উৎসবের আমেজ : নিউজার্সির আটলান্টিক সিটিতেও স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল মনোমুগ্ধকর আতশবাজি, ড্রোন শো, আলোকসজ্জা, বারবিকিউ পার্টি, ব্লক পার্টি, লাইভ সংগীত এবং পারিবারিক বিনোদনের নানা আয়োজন।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, মহাকাশ গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় অন্যতম নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এবারের উদযাপনে সেই ইতিহাস ও অর্জনের প্রতিফলনও ছিল স্পষ্ট।
আটলান্টিক সিটির আশপাশের বিভিন্ন শহরে সাইকেল র্যালি, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। দিনভর পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল শহরের ঐতিহাসিক বোর্ডওয়াক। আটলান্টিক মহাসাগরসংলগ্ন সৈকতগুলোও ছিল ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়ে প্রাণচঞ্চল।
বিশ্বখ্যাত ক্যাসিনোগুলোও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, লাইভ মিউজিক, আলোকসজ্জা ও নানা আকর্ষণীয় আয়োজনের ব্যবস্থা করে।
স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এসব উৎসবে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা সপরিবারে অংশ নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করেন।
নিউইয়র্কসহ দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শুরু করে বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, হিউস্টনসহ বড় বড় শহরে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, সামরিক প্রদর্শন এবং চোখ ধাঁধানো আতশবাজির আয়োজন।
এবারের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্ক ছিল উদযাপনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শহরের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে অংশ নেন বিশেষ অনুষ্ঠানমালায়। বিশ্বখ্যাত নিউইয়র্ক হারবারে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ‘টল শিপ’শোভাযাত্রা, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী পালতোলা জাহাজ অংশ নেয়। শত শত নৌযান এবং লাখো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে নিউইয়র্ক হারবার এক উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়। এই আয়োজনকে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপনের পর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এছাড়া ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন কমিউনিটি প্যারেড, লাইভ মিউজিক, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, পারিবারিক বিনোদন এবং স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় পূর্ব নদী ও নিউইয়র্কের আকাশ আলোকিত করে ঐতিহ্যবাহী আতশবাজির মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী, যা দেখতে লাখো মানুষ নদীর তীর, পার্ক, ছাদ এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভিড় করেন। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল মলে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পর্যায়ের ‘স্যালুট টু আমেরিকা’ অনুষ্ঠান। সেখানে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠানে সামরিক ব্যান্ড, দেশাত্মবোধক সংগীত, ঐতিহাসিক উপস্থাপনা এবং বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়াশিংটনে প্রবল ঝড়, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রায় দুই ঘণ্টার জন্য ন্যাশনাল মল খালি করে দেয়া হয়। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দর্শনার্থীরা আবারও অনুষ্ঠানস্থলে ফিরে আসেন। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঞ্চে উঠে উপস্থিত জনতাকে ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, আমাদের কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যাবে না। প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস, নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্য এবং দেশের জন্য একটি নতুন ‘সুবর্ণ যুগ’ গড়ার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
ভাষণে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভোটার পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে ‘সেইভ আমেরিকা’ আইন পাসের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ভাষণ শেষে ন্যাশনাল মলসংলগ্ন মার্কিন ক্যাপিটল ভবনের পাশে প্রায় ৪০ মিনিটব্যাপী মনোমুগ্ধকর আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। হালকা বৃষ্টির মধ্যেও হাজারো দর্শনার্থী এ আয়োজন উপভোগ করেন।
আয়োজকদের দাবি, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আতশবাজির প্রদর্শনীর মাধ্যমে গিনেস বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েই এ আয়োজন করা হয়।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সারা দেশে ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
দেশটির সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সংবিধান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকারের ওপর বিশেষ প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালন করে।
বিশ্বের নানা দেশের অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অংশ নেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয়, লাতিনো, আফ্রিকান, আরব এবং অন্যান্য কমিউনিটির সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠান, প্যারেড ও পারিবারিক উৎসবে অংশ নেন।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও অনেক পরিবার জাতীয় পতাকা, বারবিকিউ, পিকনিক ও আতশবাজি উপভোগের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেন।
২৫০তম স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাস, গণতান্ত্রিক যাত্রা এবং বহুজাতিক সমাজব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতা, সমতা, নাগরিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশটি ঐতিহাসিক এই মাইলফলক উদযাপন করেছে। একই সঙ্গে এটি ছিল অতীতের অর্জনকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী মুহূর্ত।
আতশবাজির মধ্যেই ব্রুকলিন ব্রিজে আগুন : নিউইয়র্কে স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহ্যবাহী আতশবাজি প্রদর্শনীর সময় ব্রুকলিন ব্রিজের কয়েকটি অংশে স্বল্প সময়ের জন্য আগুন লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেতুর কয়েকটি স্থান থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়।
নিউইয়র্ক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, আগুন প্রায় এক মিনিটের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আতশবাজির স্পার্ক থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেনি।
এবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কে ৮৫ হাজারের বেশি আতশবাজি ব্যবহার করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সত্ত্বেও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পুরো প্রদর্শনী সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
ওয়াশিংটনে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মিছিল : স্বাধীনতা দিবসেই রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সংগঠন প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট মিছিল বের করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মুখ ঢেকে খাঁকি পোশাক পরে সংগঠিতভাবে মেট্রো স্টেশন থেকে মিছিল শুরু করেন।
তাদের হাতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা, ঢাল ও ড্রাম। কয়েকজনের হাতে গৃহযুদ্ধকালীন কনফেডারেট পতাকাও দেখা যায়।
সংগঠনটির টেলিগ্রাম চ্যানেলের দাবি, কর্মসূচিতে চার শতাধিক সদস্য অংশ নেন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজম-এর গবেষকদের মতে, প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা একটি ফ্যাসিবাদী সংগঠন। সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করেছে।
বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউইয়র্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ৪ জুলাই শুক্রবার নিউইয়র্কে এক আলোচনা সভা, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং কেক কাটার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউইয়র্ক’। জ্যামাইকার হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ের একটি রেস্তোরাঁর পার্টি হলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনের কয়েকজন প্রার্থী অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশটির অঙ্গীকার ও ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন।
বক্তারা বলেন, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সংগঠনের সঠিক সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী এসব সংগঠনের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। বাংলা নববর্ষ, জাতীয় দিবস, বনভোজন, নির্বাচন, প্যানেল পরিচিতি কিংবা অভিষেক অনুষ্ঠানÑএসব আয়োজন নিয়ে সারা বছরই কমিউনিটি ব্যস্ত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনে বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। তারা বলেন, অনেকেই মনে করেন, এটি তো আমেরিকার দিবস, আমরা কেন উদযাপন করব? অথচ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এ দেশের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও মূল্যবোধের প্রতিও সম্মান জানানো প্রয়োজন।
বক্তারা নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির শীর্ষ সংগঠনগুলোর প্রতি আগামী বছর থেকে ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কয়েকজন প্রার্থী বক্তব্য দেন। তারা নির্বাচিত হলে আগামী বছর থেকে বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এ অনুষ্ঠানে কোনো সভাপতি বা প্রধান অতিথি নির্ধারণ করা হয়নি; মঞ্চেও কারও জন্য আলাদা চেয়ার রাখা হয়নি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশি আমেরিকানস ইন নিউ ইয়র্ক’ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংগঠন নয়; এটি নিউইয়র্কে বসবাসরত সকল বাংলাদেশি আমেরিকানের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এখানে সবাই সমান মর্যাদার অংশীদার।
সিনিয়র সাংবাদিক শেখ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিনিয়র কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব নাসির আলী খান পল, নজরুল একাডেমির সভাপতি কিউ জামান, সিনিয়র সাংবাদিক সাঈদ তারেক, তাসের মাহমুদ, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ, নবযুগ-এর সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সাগর, কবি ও সাহিত্যিক এবিএম সালেহ উদ্দিন, রিয়েল এস্টেট প্রশিক্ষক আজিজুল হক মুন্না, সন্দ্বীপ সোসাইটির সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফিরোজ আহমেদ, বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম, সিনিয়র সাংবাদিক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ রাব্বী, সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফজলে রাব্বী, ব্যাংকার মনিউর রহমান, মিডিয়াকর্মী রাশিদা আক্তার, সাবেক আমলা আজিজুর রহমান, হায়দার আলীসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি সালেহা ইসলাম।
শেষে কেক কাটার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
ব্রঙ্কস বাংলাদেশি কমিউনিটি : নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, ধর্মীয় আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা বাজার এলাকার পদ্মা সেলুন প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আমেরিকান বাংলাদেশি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের সভাপতি আব্দুস শহীদ। কাজী রবিউজ্জামান ও শামীম আহমেদ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিরাজ উদ্দীন আহমেদ সোহাগ, আব্দুল মুহিত, জুনেদ চৌধুরী, মাহবুব আলম, শেখ জামাল হোসেন, সিপিএ জাকির চৌধুরী, হাসান আলী, শামীম মিয়া, সোহান আহমেদ টুটুল, শাহজাহান, বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুর আহমদ, লুকমান হোসেন লুকু, অধ্যাপক সুধাংশু মণ্ডল, কামাল উদ্দীন, কফিল উদ্দীন চৌধুরী, শ্যামল চন্দ্র চন্দ, আব্দুর রউফ, জামাল আহমেদ ও মিয়া মোহাম্মদ দাউদসহ কমিউনিটির আরো অনেকে।
সভাপতির বক্তব্যে আব্দুস শহীদ তীব্র গরম উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া সব অতিথি, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি ভবিষ্যতেও কমিউনিটির কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
নাসাউ কাউন্টি ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায় : নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের নাসাউ কাউন্টিতে ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। গত ১ জুলাই লং আইল্যান্ডের হিক্সভিলের লেভিটটাউন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নাসাউ কাউন্টির ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সদস্যরা গর্ব, দেশপ্রেম ও সম্প্রীতির পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপন করেন।
রোটারিয়ান, সমাজসেবক, লেখক, আলোকচিত্রী এবং অর্থনৈতিক পরামর্শক মিজান রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অবারিত সুযোগের ২৫০ বছর পূর্তি বা ‘সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল’ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নাসাউ কাউন্টি ও লং আইল্যান্ডের বিভিন্ন টাউনশিপের ৩০ জনেরও বেশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তা অংশ নেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য এবং সবার জন্য সমান সুযোগের দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে চিরন্তন আদর্শ ও অঙ্গীকার রয়েছে, তা উদযাপনের লক্ষ্যেই কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এ অনুষ্ঠানে একত্রিত হন।
বার্ষিক ‘লিডারশিপ মিটিং’-এর ব্যানারে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত সফল। এতে নাগরিক অংশগ্রহণ, জনসেবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধ বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটে।
অনুষ্ঠানে জোসেফ জি. কায়রো এবং ববি কুমার কালোটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আয়োজনের সার্বিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দেন।
নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিটি নেতা, পেশাজীবী, নির্বাচিত প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত আয়োজক কমিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। আয়োজকদের মতে, তাদের এই সেবামূলক উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সেই চেতনাকেই ধারণ করে, যে দেশটি বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষের অবদান, ত্যাগ এবং স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং যা আজও গণতন্ত্রের ভিতকে আরও সুদৃঢ় করে চলেছে।
আটলান্টিক সিটিতে উৎসবের আমেজ : নিউজার্সির আটলান্টিক সিটিতেও স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল মনোমুগ্ধকর আতশবাজি, ড্রোন শো, আলোকসজ্জা, বারবিকিউ পার্টি, ব্লক পার্টি, লাইভ সংগীত এবং পারিবারিক বিনোদনের নানা আয়োজন।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, মহাকাশ গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় অন্যতম নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এবারের উদযাপনে সেই ইতিহাস ও অর্জনের প্রতিফলনও ছিল স্পষ্ট।
আটলান্টিক সিটির আশপাশের বিভিন্ন শহরে সাইকেল র্যালি, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। দিনভর পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল শহরের ঐতিহাসিক বোর্ডওয়াক। আটলান্টিক মহাসাগরসংলগ্ন সৈকতগুলোও ছিল ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়ে প্রাণচঞ্চল।
বিশ্বখ্যাত ক্যাসিনোগুলোও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, লাইভ মিউজিক, আলোকসজ্জা ও নানা আকর্ষণীয় আয়োজনের ব্যবস্থা করে।
স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এসব উৎসবে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা সপরিবারে অংশ নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করেন।