​জুলাই বিপ্লবের এক বীর শহীদের গল্প

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৩:২৫ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশের রংপুর জেলার পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামের ছোট একটি অতিসাধারণ ঘর। এই ঘরে জন্ম নেওয়া এক শিশু একদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের Catalyst হবেন, তা সে সময় কেউ ভাবতে না পারলেও পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহে সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসন এক জমজমাট হাট বসিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসেছিল। পরপর কয়েকটি তথাকথিত প্রহসনের নির্বাচন, সন্ত্রাস, নজিরবিহীন দুর্নীতি, গুম, খুন ও পাইকারি হারে বিরুদ্ধ মতের লোকদের জেলে পুরে দেশজুড়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতির অবসানে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে দেশের মানুষ নানাভাবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নিলেও স্বৈরশাসকের অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলারের কারণে তার পতন বা পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়নি।

স্বৈরশাসক দম্ভভরে দেশটা তার বাবা স্বাধীন করেছেন ঘোষণা দিয়ে দেশের মালিক তার বাবা দাবি করে জনমানুষের গণতান্ত্রিক আকুতি প্রত্যাখ্যানপূর্বক নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পোষা গুন্ডা-মাস্তান দিয়ে ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে পারিবারিক শাসন প্রতিষ্ঠার আভাস দেন, যা দেখে দেশের জনগণের একটা বড় অংশের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন স্বৈরশাসকের পতন ঘটানো সম্ভব হবে না মর্মে বদ্ধমূল ধারণা জন্মে। কিন্তু দেশের অসমসাহসী বিপুলসংখ্যক তরুণ সেই ধারণা বা স্থিতাবস্থা (Status Quo) মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, যেমনটি তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দাসত্বের নীলনকশা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এসব অসমসাহসী অকুতোভয় তরুণের একজন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর বয়সী ছাত্র আবু সাঈদ।

আবু সাঈদ তার পিতামাতার ৯ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ। এত বড় একটি পরিবারের ভরণ-পোষণ ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে তার পিতামাতা হিমশিম খেলেও তারা কষ্টেসৃষ্টে আবু সাঈদের পড়াশোনা চালিয়ে যান; যে কারণে তিনি হন তার পরিবারের একমাত্র সদস্য, যিনি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পড়ার সুযোগ পান। লেখাপড়ায় ভালো করায় মেধাবী আবু সাঈদ বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে একসময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্সে ভর্তির সুযোগ পান।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের বহু ছাত্র সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটাপ্রথা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করে। আবু সাঈদ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

মেধার ভিত্তিতে এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ছাত্রদের চাকরির সুযোগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা তাকে আন্দোলনে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করে। সরকারি দমন-পীড়নের কারণে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের আন্দোলন একপর্যায়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দমনে স্বৈরশাসক নির্মম ও কঠোর পথ বেছে নেন।

প্রথম দিকে ছাত্ররা চাকরিক্ষেত্রে কোটাপ্রথা সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি করলেও স্বৈরশাসক ও তার দোসররা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্র বর্ণনা করে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ ও ‘রাজাকারের বাচ্চা’ উল্লেখ করে তাদের দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুংকার দিলে ছাত্ররা “আমরা সবাই ‘রাজাকার’, কে বলেছে কে বলেছে হাসিনা স্বৈরাচার” ইত্যাদি স্লোগান তুলে সারা দেশের সড়ক-রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে সরকারি বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের হামলায় বহু ছাত্র আহত হলে দেশের সর্বস্তরের জনগণ সরকারের দমননীতির প্রতিবাদে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটে আবু সাঈদের নেতৃত্বে প্রতিবাদী ছাত্রদের এক মিছিলকে পুলিশ শক্তি প্রয়োগে ছত্রভঙ্গ করতে ছাত্রদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ শুরু করলে শান্তিপূর্ণ মিছিলের অনেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলেও আবু সাঈদ মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মিছিলের অগ্রভাগে থেকে স্থান ত্যাগ না করে একটি ছোট লাঠি হাতে পুলিশের মুখোমুখি অকুতোভয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। নিরস্ত্র আবু সাঈদ কারও জন্য কোনোরূপ হুমকির কারণ না হলেও পুলিশ শটগানের গুলিতে তার দেহ ঝাঁঝরা করে দেয়। গুরুতর আহত আবু সাঈদ হাসপাতালে যাওয়ার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর সামাজিক মাধ্যম ও অন্যভাবে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের মানুষের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা বাংলাদেশের এক টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। স্বৈরশাসকের হাতে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে এবং জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, যা কোটা আন্দোলনকে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে পরিণত করে বিপ্লবের রূপ দান করে। অবস্থা বেগতিক দেখে স্বৈরশাসক ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া হয়ে বিপ্লব দমনে নির্বিচার গুলিবর্ষণ এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে Lethal weapon ব্যবহারের আদেশ দিলে বহুসংখ্যক ছাত্র-জনতা হতাহত হয়।

বিপ্লবে আবু সাঈদ ছাড়াও আরও যারা শহীদ হন, তাদের মধ্যে রয়েছেন মীর মুগ্ধ, গোলাম নাফিস, ওয়াসিম আকরাম, ফারহান ফাইয়াজ, তাহজিব ফেরদৌস, শেখ আসহাবুল ইয়ামিন, তাহের জামান প্রিয়, শাহরিয়ার খান আনাস প্রমুখ। বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারীদের কয়েকজন হলেন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদ, মাহফুজ আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ওসমান হাদি প্রমুখ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনে সরকারি বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের হামলা ও গুলিবর্ষণে কমবেশি চৌদ্দশত মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়। আহতদের অনেকে বিপ্লবের দুই বছর পর এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

পরে বিপ্লবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও এটা সর্বজনস্বীকৃত এবং সন্দেহাতীত যে হামলা ও গুলিবর্ষণে বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হন।
জুলাই বিপ্লব বেগবান হয়ে একসময় দাবানলের রূপ নিলে জনরোষে ভীতসন্ত্রস্ত স্বৈরশাসক ও তার দোসরদের অনেকে নিজ নিজ জীবন বাঁচাতে ৫ আগস্ট দেশ-বিদেশে পালিয়ে ও আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়।

পৃথিবীর বিপ্লবের ইতিহাসে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও অনন্যসাধারণ ঘটনা, যা থেকে বিশ্ববাসী একজন স্বৈরশাসক তথা একনায়ককে কীভাবে পরাজিত করতে হয়, তার শিক্ষা নিতে পারে।

১৮৩০ সালের জুলাইয়ের ফরাসি বিপ্লবে নিহতদের স্মরণে প্যারিসে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভের (July Column) অনুরূপ ঢাকার একটি উপযুক্ত স্থানে (গণভবন, জুলাই জাদুঘর এলাকা, শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর বাড়ি ইত্যাদি) একটি জুলাই স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা সমীচীন হবে।

জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যেকেই এক একজন বীর। এসব বীরের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হলে দেশের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে বর্তমান প্রজন্ম প্রশংসাভাজন হবেন বলে সুধীমহল মনে করেন। জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সকল জুলাইযোদ্ধার প্রতি রইল অশেষ শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।
লেখক : কলামিস্ট
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]