ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কিছু মাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা হয়ে আসে না, আসে একেকটি যুগের অবসান ঘটাতে। তেমনি মানবসভ্যতার মুক্তি, স্বাধিকার আর স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে ‘জুলাই’ মাসটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়, বরং এটি শৃঙ্খল ভাঙার এক অবিনাশী প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এই জুলাই মাসেই বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়া এমন কিছু মহাকাব্যিক ঘটনার জন্ম হয়েছে, যা মানবজাতিকে শিখিয়েছে অন্যায় আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে কীভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই খোদ ব্রিটিশ রাজদণ্ডকে কাঁপিয়ে দিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ কিংবা ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফরাসি রাজতন্ত্রের অহংকার ও স্বৈরাচারের প্রতীক ‘বাস্তিল দুর্গ’ গুঁড়িয়ে দিয়ে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার জয়গান গাওয়াÑসবই এই জুলাইয়ের তপ্ত দিনগুলোতেই ঘটেছিল। এমনকি ১৮৬৩ সালের ৩ জুলাই আমেরিকার রক্তক্ষয়ী গেটিসবার্গ যুদ্ধের সমাপ্তি কিংবা ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির নতুন সমীকরণ তৈরিÑসবখানেই জুলাই মাসটি এক অবিসংবাদিত নাম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
ইতিহাসের সেই একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে এসে বিশ্ব রাজনীতিতে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ও প্রতিবাদী জুলাইয়ের তালিকায় চিরতরে যুক্ত হয়েছে আরেকটি রক্তস্নাত অধ্যায়Ñবাংলাদেশের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’।
পৃথিবীর বুকে যখনই কোনো শাসকগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে, তখনই জুলাই মাসের অবিনাশী চেতনা যেন নতুন রূপে জেগে উঠেছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ ছাত্র-জনতা কোনো অস্ত্রের শক্তিতে নয়, বরং বুকে অসীম সাহস আর ন্যায়ের প্রত্যয় নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বুকে ফরাসি বিপ্লব বা আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন যেভাবে মুক্তির নতুন আলো দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের এই জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, শোষকের দেয়াল যত উঁচুই হোক না কেন, জনতার সুসংহত স্রোতের সামনে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। বিশ্ব রাজনীতির সেই কালজয়ী জুলাইয়ের প্রেক্ষাপটেই আজ আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে-কীভাবে বাংলাদেশের এই চব্বিশের জুলাই বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসের সেই মহান বিপ্লবগুলোর সমান্তরালে নিজের নামটিকে অবিসংবাদিত করে তুলল।
২০২৪-এর জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করলে কীভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলন (কোটা সংস্কার) স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তা আজও অবিশ্বাস্য মনে হয়। কেননা আওয়ামী দুঃশাসনের চরম সময়ে যখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সকল কলাকৌশল ও আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে গেছে, তখন ফ্যাসিস্ট সরকারের অহংকার আকাশ ছুঁয়েছিল। সংসদ কিংবা রাজপথে প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার মন্ত্রীরা হুংকার দিয়ে বলত, আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণ করার মতো কোনো শক্তি কিংবা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে জন্মায়নি। একদিকে শাসকের দাপট, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের আত্মসমর্পণ দেখে সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এই ফ্যাসিবাদের দাসত্ব করাই নিয়তি।
কিন্তু সব হিসাব বদলে দিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোটা আন্দোলনের হাত ধরে তারা রাজপথে নেমে এল। বীর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ফারহান ফাইয়াজসহ বহু তরুণ ছাত্র যুব সর্বসাধারণ যখন পুলিশ, বিজেপি, সেনাবাহিনীর বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে রাজপথে নেমে এল; তখন সেই অভূতপূর্ব প্রেক্ষাপট দেখে খোদ পুলিশ কর্মকর্তা মন্ত্রীকে বলতে বাধ্য হন, ‘স্যার, একটা পড়লে আরেকটা উঠে দাঁড়ায়!’ এই অলৌকিক বীরত্বই স্বৈরাচারের আয়ুষ্কালের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও আমরা ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারিনি; একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর এই বিচ্যুতির খেসারত হিসেবেই আজ ‘জুলাই সনদ’ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লড়াইয়ে আমাদের আবারও আন্দোলনে নামতে হচ্ছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের গঠিত স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটি এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছিল। এই তালিকায় প্রায় ১৪২৩ জনের নাম প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) তাদের প্রাথমিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে কয়েকশ মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে এবং একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্তের ওপর জোর দিয়েছে।
গুম কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৩,৫০০ জনেরও বেশি কমিশন এ পর্যন্ত গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে ১,৮০০টিরও বেশি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ১,৬৭৬টি প্রাথমিক অভিযোগ খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৯৩ জন পঙ্গুর আংশিক তালিকার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। তালিকার মধ্যে ৪৭২ নম্বরে আমার গ্রামের মোহাম্মদ মিনহাজ আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও জুলাই বিপ্লবে গুলিবিদ্ধ ও অঙ্গহানি হওয়া এই মানুষদের চিকিৎসাসেবা ও পরিপূর্ণ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব প্রতীয়মান হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার বড় অমিল রয়ে গেছে।
গুমের প্রতীক ‘আয়নাঘর’-এর নির্মম সেলগুলোতে বছরের পর বছর বন্দী রেখে যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি ডক্টর ইউনূস সরকারের পদক্ষেপে ৩২ নম্বরে জাতীয় জাদুঘর রচিত হওয়ার পদক্ষেপটা এখন অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে দেশের মানুষকে এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তি দিল, তা আগামী প্রজন্মের কাছে জানানো বর্তমান সরকারের জন্য অপরিহার্য। কেননা বর্তমান সরকার এবং বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী এই ‘আয়নাঘরের’ নির্মম শিকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য দলমত-নির্বিশেষে জাগরণ; ডান-বাম, সাধারণ শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে অভিভাবক ও আপামর জনতার এক প্ল্যাটফর্মে চলে আসা। জানতে হবে কীভাবে বুলেট ও কামানের সামনে বুক পেতে দিয়ে সাধারণ মানুষ ভয়ের সংস্কৃতিকে জয় করেছিল।
কিন্তু রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের দ্বারা অর্জিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারের রাষ্ট্রপতিকে কেন এখনো রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরাচ্ছে নাÑএটি সাধারণ মানুষের কাছে এখনো একটি বড় ধোঁয়াশা বা অবোধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বিগত শাসনামলের বা নানা বিতর্কে জড়ানো সেনাপ্রধান এখনো সেনাপ্রধানের পদে বহাল আছেন, তা নিয়েও জনমনে গভীর অসন্তোষ ও প্রশ্ন রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার যে বাহাত্তর সালের সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল, তখন প্রয়াত আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া বন্দিশালা থেকে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধান একদিন জনগণ ছুড়ে ফেলে দেবে। অথচ আজ সেই একই বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই বিপ্লবের সনদকে উপেক্ষা করছে। এই অবস্থান অনেকের কাছেই স্পষ্ট বৈপরীত্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করেছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা কেবলই নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং ক্ষমতায় আসার একটি কৌশল ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আরও প্রমাণ করে, লোভ ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য জনগণের আবেগ ও গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে (জুলাই সনদ) স্রেফ সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আরও প্রমাণ করে, নীতি বা আদর্শ নয়, বরং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য; যা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটি প্রকাশ্য ও চরম প্রতারণা বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করছেন।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদল ও যুবদলের অসামান্য অবদান এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অথচ বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
এত সংশয় সংকল্পের মাঝেও কিছু প্রত্যাশা এখনো চলমান রয়েছে। বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়া অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
সর্বশেষ রায়টি গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ঘোষিত হয়, যেখানে জাসদের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ঘোষিত ৬টি রায়ের মূল চিত্র
মোট সাজাপ্রাপ্ত আসামি : ৬১ জন (কারাগারে আছেন ২১ জন এবং ৪০ জন পলাতক)।
মৃত্যুদণ্ড : ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ মোট ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনই পলাতক।
কারাদণ্ড : যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৪৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে (যেমন সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে)।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম-খুন সংক্রান্ত মোট ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা
রায়ের অপেক্ষায় (CAV) : ১টি মামলা বর্তমানে সম্পূর্ণ শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আরও ২ থেকে ৩টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য গ্রহণ একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা খুব দ্রুতই রায়ের দিকে এগোবে।
তদন্ত ও শুনানির অধীনে : বাকি মামলাগুলোর তদন্ত, ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন (Indictment) এবং সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনাল (ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২) সমান্তরালভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
লক্ষ্যণীয় বিষয়, চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন। বিচারের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান এবং বিদ্যমান থাকলেও প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সিদ্ধান্তহীনতা বা আকস্মিক পরিবর্তন জনগণের মনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আর এই অনিশ্চয়তার মূল লক্ষণ হচ্ছে দেশব্যাপী প্রশাসনিক দলীয়করণের প্রক্রিয়া এবং ফ্যাসিস্ট দোসরদের বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ দৃশ্যমান হওয়া।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের এই ঐতিহাসিক বিজয় কেবল একটি সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ফ্যাসিবাদের অবসান এবং মানুষের হারিয়ে যাওয়া বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার এক চূড়ান্ত লড়াই।
এই নতুন অধ্যায়ের সূচনাকে সফল করতে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, যে গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায্যতার জন্য প্রায় ১৪০০ বীর প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের সেই রক্ত যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। এই আত্মত্যাগকে সার্থক করতে তরুণ প্রজন্ম আজ অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা এমন একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং স্বৈরাচারের পুনরুত্থান চিরতরে বন্ধ হবে।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই খোদ ব্রিটিশ রাজদণ্ডকে কাঁপিয়ে দিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ কিংবা ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফরাসি রাজতন্ত্রের অহংকার ও স্বৈরাচারের প্রতীক ‘বাস্তিল দুর্গ’ গুঁড়িয়ে দিয়ে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার জয়গান গাওয়াÑসবই এই জুলাইয়ের তপ্ত দিনগুলোতেই ঘটেছিল। এমনকি ১৮৬৩ সালের ৩ জুলাই আমেরিকার রক্তক্ষয়ী গেটিসবার্গ যুদ্ধের সমাপ্তি কিংবা ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির নতুন সমীকরণ তৈরিÑসবখানেই জুলাই মাসটি এক অবিসংবাদিত নাম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
ইতিহাসের সেই একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে এসে বিশ্ব রাজনীতিতে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ও প্রতিবাদী জুলাইয়ের তালিকায় চিরতরে যুক্ত হয়েছে আরেকটি রক্তস্নাত অধ্যায়Ñবাংলাদেশের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’।
পৃথিবীর বুকে যখনই কোনো শাসকগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে, তখনই জুলাই মাসের অবিনাশী চেতনা যেন নতুন রূপে জেগে উঠেছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ ছাত্র-জনতা কোনো অস্ত্রের শক্তিতে নয়, বরং বুকে অসীম সাহস আর ন্যায়ের প্রত্যয় নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বুকে ফরাসি বিপ্লব বা আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন যেভাবে মুক্তির নতুন আলো দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের এই জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, শোষকের দেয়াল যত উঁচুই হোক না কেন, জনতার সুসংহত স্রোতের সামনে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। বিশ্ব রাজনীতির সেই কালজয়ী জুলাইয়ের প্রেক্ষাপটেই আজ আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে-কীভাবে বাংলাদেশের এই চব্বিশের জুলাই বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসের সেই মহান বিপ্লবগুলোর সমান্তরালে নিজের নামটিকে অবিসংবাদিত করে তুলল।
২০২৪-এর জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করলে কীভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলন (কোটা সংস্কার) স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তা আজও অবিশ্বাস্য মনে হয়। কেননা আওয়ামী দুঃশাসনের চরম সময়ে যখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সকল কলাকৌশল ও আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে গেছে, তখন ফ্যাসিস্ট সরকারের অহংকার আকাশ ছুঁয়েছিল। সংসদ কিংবা রাজপথে প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার মন্ত্রীরা হুংকার দিয়ে বলত, আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণ করার মতো কোনো শক্তি কিংবা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে জন্মায়নি। একদিকে শাসকের দাপট, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের আত্মসমর্পণ দেখে সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এই ফ্যাসিবাদের দাসত্ব করাই নিয়তি।
কিন্তু সব হিসাব বদলে দিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোটা আন্দোলনের হাত ধরে তারা রাজপথে নেমে এল। বীর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ফারহান ফাইয়াজসহ বহু তরুণ ছাত্র যুব সর্বসাধারণ যখন পুলিশ, বিজেপি, সেনাবাহিনীর বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে রাজপথে নেমে এল; তখন সেই অভূতপূর্ব প্রেক্ষাপট দেখে খোদ পুলিশ কর্মকর্তা মন্ত্রীকে বলতে বাধ্য হন, ‘স্যার, একটা পড়লে আরেকটা উঠে দাঁড়ায়!’ এই অলৌকিক বীরত্বই স্বৈরাচারের আয়ুষ্কালের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও আমরা ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারিনি; একটি বিপ্লবী সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর এই বিচ্যুতির খেসারত হিসেবেই আজ ‘জুলাই সনদ’ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লড়াইয়ে আমাদের আবারও আন্দোলনে নামতে হচ্ছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের গঠিত স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটি এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছিল। এই তালিকায় প্রায় ১৪২৩ জনের নাম প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) তাদের প্রাথমিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে কয়েকশ মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে এবং একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্তের ওপর জোর দিয়েছে।
গুম কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৩,৫০০ জনেরও বেশি কমিশন এ পর্যন্ত গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে ১,৮০০টিরও বেশি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ১,৬৭৬টি প্রাথমিক অভিযোগ খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৯৩ জন পঙ্গুর আংশিক তালিকার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। তালিকার মধ্যে ৪৭২ নম্বরে আমার গ্রামের মোহাম্মদ মিনহাজ আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও জুলাই বিপ্লবে গুলিবিদ্ধ ও অঙ্গহানি হওয়া এই মানুষদের চিকিৎসাসেবা ও পরিপূর্ণ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব প্রতীয়মান হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার বড় অমিল রয়ে গেছে।
গুমের প্রতীক ‘আয়নাঘর’-এর নির্মম সেলগুলোতে বছরের পর বছর বন্দী রেখে যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি ডক্টর ইউনূস সরকারের পদক্ষেপে ৩২ নম্বরে জাতীয় জাদুঘর রচিত হওয়ার পদক্ষেপটা এখন অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে দেশের মানুষকে এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তি দিল, তা আগামী প্রজন্মের কাছে জানানো বর্তমান সরকারের জন্য অপরিহার্য। কেননা বর্তমান সরকার এবং বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী এই ‘আয়নাঘরের’ নির্মম শিকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য দলমত-নির্বিশেষে জাগরণ; ডান-বাম, সাধারণ শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে অভিভাবক ও আপামর জনতার এক প্ল্যাটফর্মে চলে আসা। জানতে হবে কীভাবে বুলেট ও কামানের সামনে বুক পেতে দিয়ে সাধারণ মানুষ ভয়ের সংস্কৃতিকে জয় করেছিল।
কিন্তু রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের দ্বারা অর্জিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারের রাষ্ট্রপতিকে কেন এখনো রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরাচ্ছে নাÑএটি সাধারণ মানুষের কাছে এখনো একটি বড় ধোঁয়াশা বা অবোধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বিগত শাসনামলের বা নানা বিতর্কে জড়ানো সেনাপ্রধান এখনো সেনাপ্রধানের পদে বহাল আছেন, তা নিয়েও জনমনে গভীর অসন্তোষ ও প্রশ্ন রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার যে বাহাত্তর সালের সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল, তখন প্রয়াত আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া বন্দিশালা থেকে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধান একদিন জনগণ ছুড়ে ফেলে দেবে। অথচ আজ সেই একই বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই বিপ্লবের সনদকে উপেক্ষা করছে। এই অবস্থান অনেকের কাছেই স্পষ্ট বৈপরীত্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করেছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা কেবলই নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং ক্ষমতায় আসার একটি কৌশল ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আরও প্রমাণ করে, লোভ ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য জনগণের আবেগ ও গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে (জুলাই সনদ) স্রেফ সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আরও প্রমাণ করে, নীতি বা আদর্শ নয়, বরং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য; যা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটি প্রকাশ্য ও চরম প্রতারণা বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করছেন।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদল ও যুবদলের অসামান্য অবদান এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অথচ বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
এত সংশয় সংকল্পের মাঝেও কিছু প্রত্যাশা এখনো চলমান রয়েছে। বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়া অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
সর্বশেষ রায়টি গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ঘোষিত হয়, যেখানে জাসদের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ঘোষিত ৬টি রায়ের মূল চিত্র
মোট সাজাপ্রাপ্ত আসামি : ৬১ জন (কারাগারে আছেন ২১ জন এবং ৪০ জন পলাতক)।
মৃত্যুদণ্ড : ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ মোট ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনই পলাতক।
কারাদণ্ড : যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৪৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে (যেমন সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে)।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম-খুন সংক্রান্ত মোট ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা
রায়ের অপেক্ষায় (CAV) : ১টি মামলা বর্তমানে সম্পূর্ণ শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আরও ২ থেকে ৩টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য গ্রহণ একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা খুব দ্রুতই রায়ের দিকে এগোবে।
তদন্ত ও শুনানির অধীনে : বাকি মামলাগুলোর তদন্ত, ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন (Indictment) এবং সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনাল (ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২) সমান্তরালভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
লক্ষ্যণীয় বিষয়, চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন। বিচারের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান এবং বিদ্যমান থাকলেও প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সিদ্ধান্তহীনতা বা আকস্মিক পরিবর্তন জনগণের মনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আর এই অনিশ্চয়তার মূল লক্ষণ হচ্ছে দেশব্যাপী প্রশাসনিক দলীয়করণের প্রক্রিয়া এবং ফ্যাসিস্ট দোসরদের বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ দৃশ্যমান হওয়া।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের এই ঐতিহাসিক বিজয় কেবল একটি সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ফ্যাসিবাদের অবসান এবং মানুষের হারিয়ে যাওয়া বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার এক চূড়ান্ত লড়াই।
এই নতুন অধ্যায়ের সূচনাকে সফল করতে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, যে গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায্যতার জন্য প্রায় ১৪০০ বীর প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের সেই রক্ত যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। এই আত্মত্যাগকে সার্থক করতে তরুণ প্রজন্ম আজ অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা এমন একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং স্বৈরাচারের পুনরুত্থান চিরতরে বন্ধ হবে।