বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এ দেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী। অন্যদিকে, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদারে দেশটির সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২৬ অক্টোবর সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় বেলা ৩টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব বিষয় উঠে আসে। জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এ সাক্ষাতে অংশ নেয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন উভয় পক্ষ। বিশেষ করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের ধারাবাহিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। এ সময় তিনি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান।
আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে জাপান সফরের স্মৃতিচারণ করেন। ওই সময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তারো আসোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। তারো আসোও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তারো আসো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারো আসো। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই তরুণ। এই তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তাঁর সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কিছু আইন সংশোধনের প্রক্রিয়াও চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির প্রসঙ্গও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এ চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর সক্রিয় সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
উভয় পক্ষই বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ অংশীদারত্বে উন্নীত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক) ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীসহ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, জাপানি প্রতিনিধিদলে তারো আসোর সঙ্গে ছিলেন দেশটির সাবেক মন্ত্রী ও উদার গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান ইয়াসুতোশি নিশিমুরা, ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশিসহ জাপানের পার্লামেন্টের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা।
ঠিকানা/শইনিউজটি শেয়ার করুন