রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

স্ত্রী-মেয়ে-বোনের হাতে কবর খোঁড়া, গভীর রাতে দাফন মুক্তিযোদ্ধার

দাফনে বাধার অভিযোগ পরিবারের, অস্বীকার জামায়াত নেতার; কবর খুঁড়েছেন স্বজনেরা
স্ত্রী-মেয়ে-বোনের হাতে কবর খোঁড়া, গভীর রাতে দাফন মুক্তিযোদ্ধার

মানিক পশারীর কবর খুঁড়েছেন পরিবারের নারী সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন
পিরোজপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া ও দাফন নিয়ে দিনভর অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর শনিবার দিবাগত রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। দাফন নিয়ে জটিলতার কারণে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী, মেয়ে, বোনসহ স্বজনেরা নিজেরাই কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নিয়ে আসা হলে গার্ড অব অনার প্রদান এবং নিজ গ্রামে দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মরদেহ দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে জেলা জামায়াতের এক নেতা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাফনে কোনো বাধা দেননি।

পুলিশ লাইনে গার্ড অব অনার
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিরাপত্তার কারণে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। সেখানে অবস্থানকালে গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা জড়ো হন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এ সময় মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং পিরোজপুরে তাঁর দাফন নিয়ে আপত্তি ওঠে।

পরিস্থিতির কারণে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পুলিশি পাহারায় পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে পৌঁছানোর পর গার্ড অব অনারের জন্য তাঁদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফতেখারুল ইসলাম শামীমের কাছে গেলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। এ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ফারুক হোসেনের অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পুলিশ লাইনের ভেতরে অনেকটা গোপনেই গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর মরদেহ কোথায় এবং কীভাবে দাফন করা হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা নিশ্চিত করা হলেও শুরুতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম শামীমও গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নিজ গ্রামে দাফন নিয়েও জটিলতা
গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও নিজ বাড়িতে দাফনের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। স্থানীয় কিছু জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থক দাফনে বাধা দেন বলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা ইউনিয়নে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে লোকজনের জড়ো হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। দিনের বেশির ভাগ সময় মরদেহ নিয়ে অপেক্ষা করার পর রাতের দিকে দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। একবার কবর খোঁড়ার পর সেটি আবার ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার।

তিনি বলেন, “আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পরে মোরাই মাডি দিছি। কোনও পুরুষ মানুষ আয় নাই।”

পরিবারের এ বক্তব্যে দাফন নিয়ে তাঁদের ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। তবে কবর ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনার স্বাধীন যাচাইয়ের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত ১২টার দিকে সদর থানা-পুলিশ মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেয় এবং রাত ১টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। ওই প্রতিবেদনে পুলিশি নিরাপত্তায় দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জামায়াত নেতার দাবি, তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা
মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও আপত্তি তুলেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি দাবি করেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করার বিরোধিতাও করেন তিনি।

তবে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে জামায়াত নেতার এ দাবির সমর্থনে কোনো যাচাইকৃত নথি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদনে জামায়াত নেতার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, তিনি দাফন ও গার্ড অব অনারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি; স্থানীয় কিছু মানুষ বা উৎসুক জনতা বাধা দিয়ে থাকতে পারেন। ফলে দাফন নিয়ে কারা বাধা দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য রয়েছে।

সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে দাফন নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ছিলেন মানিক পশারী
মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মানিক পশারী ওই মামলার বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের একজন ছিলেন।

সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাকে কেন্দ্র করেই মানিক পশারীর পরিচিতি তৈরি হয়। তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান এবং নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, মরদেহের মর্যাদা এবং পরিবারের স্বাভাবিকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করার অধিকার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা প্রমাণসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ বা রাজনৈতিক বিরোধের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির মরদেহের দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা শুধু পরিবারের ভোগান্তিই বাড়ায় না, সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

ঠিকানা/এসআর

 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz