রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে পরিকল্পনার ছাপ খুবই কম। নগরজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই চলছে হযবরল অবস্থা। এই বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে নগরায়ণে শৃঙ্খলা আনতে নেওয়া হয়েছিল বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সংশোধন নিয়েই সম্প্রতি নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ড্যাপের সংশোধনী গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এতে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী তিনটি প্লটকে ভারী শিল্প এলাকার শ্রেণিতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহার-সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এসব পরিবর্তনে কিছু শিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ী সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু নগরায়ণের শৃঙ্খলা ও পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থই যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ শহর গড়ার লক্ষ্য কীভাবে পূরণ হবে? নগর পরিকল্পনা-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টও (আইপিডি) সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
ঢাকাবাসী জানেন, বুড়িগঙ্গা দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। অথচ এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানীর পরিবেশ, জলপ্রবাহ ও জনজীবন। এর তীরে ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হলে পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। একইভাবে বন্যাপ্রবাহ এলাকার সুরক্ষা দুর্বল হলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে পরিকল্পনার লক্ষ্য ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখা, সেই পরিকল্পনার সংশোধনেই যদি নদী ও জলপ্রবাহের সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে ড্যাপের সুফল পাবে কারা? এত আয়োজন করে ড্যাপ প্রণয়নের প্রয়োজনই-বা কী?
ড্যাপ সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সংশোধনীর কারণ, প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি। নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার দায়ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। কায়েমি স্বার্থের কাছে বুড়িগঙ্গার ভবিষ্যৎ জিম্মি হতে পারে না।
রাজধানীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের জুলাইয়ে প্রথম ড্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। জরিপ ও গণশুনানি শেষে ২০১০ সালের ২২ জুন রাজউক প্রথম ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। পরে ঢাকা ও আশপাশের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ২০২২-২০৩৫ মেয়াদের নতুন ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়, যা ২০২২ সালের আগস্টে কার্যকর হয়। এর মূল লক্ষ্য জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং বন্যাপ্রবাহের পথ সচল রাখা। অথচ পরিকল্পনাটির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। এর মধ্যেই নতুন সংশোধনী বিতর্ক তৈরি করেছে।
ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীও দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের শিকার। নদীগুলোকে রক্ষায় ২০০৯ সালে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। হাইকোর্টের আদেশসহ নানা উদ্যোগের পরও নদীগুলোর তীরভূমি পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। সীমানা নির্ধারণের জটিলতা, অবৈধ দখল ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধীরগতিতে নদী রক্ষার কাজ এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আদালতের আদেশ ও সরকারি ঘোষণার পরও নদীগুলোকে নিরাপদ করা যাচ্ছে না কেন?
দখলে দখলে তুরাগ ও বালু নদ লুপ্তপ্রায় পরিস্থিতির মধ্যে আছে। ছোট পরিধি নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। বুড়িগঙ্গাকে সেদিকে ঠেলে দেওয়া মোটেই ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, বুড়িগঙ্গা ঢাকার প্রাণ, এই নগরের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত চার-পাঁচশ বছরে ঢাকার উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মিশে আছে এই নদী। মুঘল শাসক, সুবাদার ইসলাম খান এবং ইউরোপীয় বণিকদের আগমন থেকে শুরু করে নগরজীবনের বিস্তার—বুড়িগঙ্গার তীর ও নদীপথ ঢাকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই নদী ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদ, জমেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিস্তৃত হয়েছে নগরজীবন।
তাই ড্যাপ যদি বুড়িগঙ্গাকে রক্ষার কার্যকর সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে সেই পরিকল্পনার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে। বুড়িগঙ্গা বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে—এই সত্য ড্যাপ-প্রণেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে। মনে রাখবেন তো?