অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান নিউইয়র্কের মেয়রের, দুর্গোৎসবে সম্প্রীতি ও বহু‘ত্ববাদের বার্তা
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৬
•
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক বন্ধন ভেঙে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘অসুরেরা থেমে নেই।’ তাঁর মতে, দেবী দুর্গার আরাধনা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয় এবং শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠারও প্রতীক।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ওঁম শক্তি মন্দিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুর্গোৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন মামদানি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক ঐক্য এবং বহুজাতিক নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব।
মন্দিরে পৌঁছালে মেয়রকে স্বাগত জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা গৌরাঙ্গ কুন্ডু, মন্দির কমিটির সভাপতি স্বরূপ সাহা ও সাধারণ সম্পাদক ভবতোষ পাল। এ সময় তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানানো হয়।
মামদানি বলেন, দেবী দুর্গার পূজা করা হয় অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে। সেই বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় দুর্গোৎসবে সমবেত হন। বহুজাতিক এই শহরকে আরও বর্ণাঢ্য ও সমৃদ্ধ করে তুলতে বাংলাদেশি হিন্দুদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিউইয়র্কের মতো বহুজাতিক শহরে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান সামাজিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ বাস্তবতায় দুর্গোৎসবের মতো আয়োজন ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরা, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে শেকড়ের সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
টাইমস স্কয়ারেও দুর্গোৎসবের আয়োজন
এ বছর নিউইয়র্কে দুর্গাপূজা ঘিরে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসবের আয়োজন করা হয়। টাইমস স্কয়ারসহ কুইন্স, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন, ম্যানহাটান ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা।
বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জনসমাগমস্থল টাইমস স্কয়ারেও দুর্গোৎসবের আয়োজন প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরছে। টাইমস স্কয়ার দুর্গোৎসব আয়োজকদের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ১০ ও ১১ অক্টোবর ফাদার ডাফি স্কয়ারে পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সিঁদুর খেলা, ধুনুচি নাচ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৭ ও ১৮ অক্টোবরও টাইমস স্কয়ার এলাকায় আরেকটি দুর্গাপূজার আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষা, বাঙালির ঐতিহ্য, ধর্মীয় আচার এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে বাঙালির উৎসব, শিল্প, সংগীত ও সামাজিক ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রও তৈরি হয়।
সম্প্রীতির বার্তা আয়োজকদের
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি অশোক কর্মকার, অধ্যাপক দ্বীজেন ভট্টাচার্য, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য শেকর কৃষ্ণান এবং আয়োজকদের অন্যতম দীনেশ মজুমদার।
দীনেশ মজুমদার বলেন, বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজনের বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যেই টাইমস স্কয়ারে দুর্গোৎসব আয়োজনের জনপ্রিয়তা ক্রমে বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দুর্গাপূজার পৌরাণিক তাৎপর্যে দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয় অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ন্যায় ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। প্রবাসজীবনে এই প্রতীকী তাৎপর্য নতুন মাত্রা পায়। ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে উৎসব হয়ে ওঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গোৎসব তাই কেবল পূজা-অর্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রবাসে বাঙালির শেকড়ের সন্ধান, নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বহুত্ববাদী সমাজে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার প্রত্যাশা। মেয়র মামদানির বক্তব্যেও উঠে এসেছে সেই বার্তা—বিভেদ নয়, ঐক্য; বিদ্বেষ নয়, সহাবস্থান; অশুভের পরিবর্তে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা।