যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়, বিশেষ করে বাংলাদেশি আমেরিকানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষা এবং মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির অঙ্গীকার নিয়ে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে অ্যালায়েন্স অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লেবার (অ্যাসাল)-এর ১৯তম বার্ষিক সম্মেলন। গত ১৭ অক্টোবর শনিবার নিউইয়র্ক সিটির ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল ৩৭-এর সদর দপ্তরে দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্মেলনে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর, নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, কমিউনিটি সংগঠক এবং বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমাদের ভোট, আমাদের কণ্ঠ, আমাদের শক্তি, আমরাই গড়ে তুলব পরিবর্তন’।
বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সচেতনতা,ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস, নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার মার্ক লেভিন, ব্রঙ্কস বরো প্রেসিডেন্ট ভেনেসা গিবসন, মার্কিন কংগ্রেস সদস্য গ্রেস মেং, জর্জিয়া স্টেট সিনেটর শেখ রহমান, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর নাথালিয়া ফার্নান্দেজ, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল সদস্য শেখর কৃষ্ণান ও লিন্ডা লি। এ ছাড়া নিউইয়র্ক সিটি মেয়র অফিসের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর বাশার, অ্যাসালের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস মাফ মিসবাহ উদ্দিন, জাতীয় সভাপতি মোহাম্মদ করিম চৌধুরী এবং জাতীয় সেক্রেটারি হরজিৎ সিং মিনহাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
সম্মেলনের কর্মসূচিতে নিউইয়র্ক স্টেট কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলি, স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস, কংগ্রেস সদস্য থমাস সুয়োজি, কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডনোভান রিচার্ডস, ব্রঙ্কস বরো প্রেসিডেন্ট ভেনেসা গিবসনসহ আরও অনেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। মূল বক্তা হিসেবে নাম ছিল নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা আন্দ্রেয়া স্টুয়ার্ট-কাজিনসের।
সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার মার্ক লেভিন এবং কংগ্রেস সদস্য গ্রেস মেং দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির কর্মকাণ্ড ও আসালের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তাঁরা মূলধারার রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয়দের অংশগ্রহণ এবং কমিউনিটির অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটির কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেন।
জর্জিয়া স্টেট সিনেটর শেখ রহমান আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সম্মেলনে ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি এবং দলমত-নির্বিশেষে কমিউনিটির ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর নাথালিয়া ফার্নান্দেজ, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল সদস্য শেখর কৃষ্ণান এবং মেয়র অফিসের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর বাশারও দক্ষিণ এশীয়দের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদানের কথা তুলে ধরেন। তাঁরা নিউইয়র্কের অর্থনীতি ও জনজীবনে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা এবং সিটির সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন।
গত ১৮ বছর ধরে অ্যাসাল যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে আসছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে।
সম্মেলনে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা নিউইয়র্কের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন পেশা, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও সেবামূলক খাতে তাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য। এই জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে শ্রমিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন।
আসালের প্রতিষ্ঠাতা ও এমিরেটাস সভাপতি মাফ মিসবাহ উদ্দিন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য, দীর্ঘদিনের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় সংগঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। আসালের জাতীয় সভাপতি মোহাম্মদ করিম চৌধুরী সংগঠনটির কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তুলে ধরেন। জাতীয় সেক্রেটারি হরজিৎ সিং মিনহাস দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দিনব্যাপী সম্মেলনে দক্ষিণ এশীয় নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, মূলধারার রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয়দের অংশগ্রহণ এবং ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
‘ব্রেকিং সাইলেন্স: সাউথ এশিয়ান উইমেন কনফ্রন্ট ডমেস্টিক ভায়োলেন্স’ শীর্ষক অধিবেশনে নারীদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং কমিউনিটিতে সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এই পর্বের ঘোষিত আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সাউথ কুইন্স উইমেন্স মার্চের প্রতিষ্ঠাতা অমিতা কিলাওয়ান ও কমিউনিটি অধিকারকর্মী উমা খান।
‘সাউথ এশিয়ানস রাইজিং ইন মেইনস্ট্রিম পলিটিকস’ শীর্ষক অধিবেশনে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত রাজনৈতিক সংগঠক ও নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অংশ নেন। আলোচনার বিষয় ছিল রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক আলোচনায় ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী সচেতনতা এবং দক্ষিণ এশীয় তরুণ প্রজন্মকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনে শ্রমিক ও কমিউনিটি নেতাদের জন্য একটি বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কর্মসূচি ছিল।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিস্ময়বালক সুবর্ণ আইজ্যাক বারী। অল্প বয়সে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য পরিচিতি পাওয়া সুবর্ণ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর উপস্থিতি সম্মেলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাকে মূলধারায় তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বক্তারা বলেন, নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানদের শিক্ষা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে কমিউনিটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে তরুণদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
সম্মেলনের শেষ পর্বে দক্ষিণ এশীয় সংগীত ও নৃত্যের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন আসালের কুইন্স চ্যাপ্টারের রাজনৈতিক পরিচালক সুলতানা খানম। অনুষ্ঠানে আসালের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও কমিউনিটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আসালের জাতীয় সভাপতি মোহাম্মদ করিম চৌধুরী, জাতীয় সেক্রেটারি হরজিৎ সিং মিনহাস এবং প্রতিষ্ঠাতা ও ইমেরিটাস সভাপতি মাফ মিসবাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে আয়োজিত সম্মেলনটি পরিচালনা করেন সংগঠনের জাতীয় নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জামিলা এ. উদ্দিন।
শ্রমিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশের আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আসালের ১৯তম বার্ষিক সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয়দের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অ্যাসাল আগামীতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা।